আই ওন ট্রেবল উইদ ক্যাম্বিয়াসো

কয়েকদিনের কষ্টসাধ্য তল্লাশির পরে পাওয়া নথিটা দেখেই চেহারায় একটা রসাত্মক হাসি ফুটে উঠলো ডন স্টেফানো ভ্যাসালোর।আর দেরী না করে পরের দিনই ইন্টার মিলানের প্রেসিডেন্ট ম্যাসিমো মোরাত্তির কথায় এই বিশেষ নথিটি দেখাতে ছুঠে গেলেন ইতালির জেনোয়া শহরের উত্তরে। মাইকেল জর্ডানকে অনুকরণ বা হুবহু তার মতোন করে খেলার জন্যে ঘন্টার পর ঘন্টা মায়ের কাছে তালিম নিতেন।গ্যারেজে থাকা টুলকে বানাতেন বিপক্ষ দলের খেলোয়াড়।অত অল্প বয়সে এত নির্বিঘ্নচিত্তের শিক্ষার্থী মনে হয় দ্বিতীয়টি পাওয়া সম্ভব নয়।তখনো ওই মনোযোগী বাচ্চা জানতো না বাস্কেটবল নয় ফুটবলই হবে তার “ইলিক্সার”।স্কুলে উঠার পরে ‘চুচো’ এর হৃদয়ে আস্তে আস্তে জায়গা পেতে শুরু করল ফুটবল।‘চুচো’, এই ডাকনামটি পেয়েছিল জনপ্রিয় আর্জেন্টাইন টিভি চরিত্র ‘চুচোফিলিতো’ থেকে।কারণ তার হালকাপাতলা গায়ের গড়ন,সোনালী রঙ্গের চুল এবং উষ্ম হৃদয়ের জন্যে।‘চুচো’,এই ডাকনাম বলার পরে অনেক না হলেও কিছু ফুটবল ভক্তের এতক্ষনে তাকে চিনে ফেলার কথা। ছয় বছর ধরে নিজের নতুন শিল্পবিদ্যায় নিরন্তর শান দেয়ার পরেই পেশাভিত্তিক ফুটবল ক্যারিয়ার শুরু হয় এস্তেবান ক্যাম্বিয়াসোর,তাও আবার বিখ্যাত আর্জেন্টাইন ফুটবল ক্লাব “আর্জেইন্টাইন জুনিয়র্সের একাডেমীতে”।আর তখন থেকেই তার জন্যে আসতে থাকে ইউরোপের হাতছানি।ফুটবলার তৈরীর আতুড়ঘর আয়াক্সে তাকে নেয়ার জন্যে চেষ্টা করেছিলেন তখনকার কোচ ভ্যান গাল।ক্যাম্বিয়াসোর হল্যান্ড যাত্রা হলো না শুধু ভাষা এবং সংস্কৃতিগত পার্থক্যের কারণে,তাছাড়া মাত্র ১৫ বছর বয়সী ছেলেকে আর্জেন্টিনা ছাড়তেও যেন মা-বাবার আপত্তি। কিন্ত বেশিদিন আর থাকা হয়নি দক্ষিন আমেরিকার দেশটিতে।কারণ “রিয়াল মাদ্রিদ হ্যাপেন্ড”।ওই ১৫তেই স্পেনের রাজধানীতে পাড়ি জমায় ক্যাম্বিয়াসো।পরবর্তীতে মার্কাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন আইকনিক লস ব্লাংকোসদের হয়ে খেলা তার স্বপ্ন ছিল,১৫তেই সতীর্থ হিসেবে পেলেন সানচেজ,হিয়েরো,রেদন্দো,আলকোর্টা ও চেন্দোকে।কিন্ত মাদ্রিদে প্রথম অধ্যায়টা ভালো ছিলো না তার জন্যে।রিয়ালের বি দল ক্যাস্টিলার হয়ে দুই বছরে ৪১ ম্যাচ খেলেছেন,মূল দলে জায়গা পাচ্ছিলেন না একদমই।গ্যালাক্টিকোস এবং একাডেমী খেলোয়াড়ে গড়া দলে ক্যাম্বিয়াসো যেন এক “ফিশ আউট অফ ওয়াটার”। স্বদেশী ক্লাব ইন্দিপেন্দিয়ান্তেতে আসলেন মাদ্রিদ থেকে,সাথেসাথেই ক্লাবের মূল দলে খেলা শুরু করলেন।তার খেলাতে পুরোদস্তুর বিকশিত মিডফিল্ডারের ছাপ।বাহবা পেতে লাগলেন চারদিক থেকে।নিজের খেলাকে আরো উন্নত করতে নিয়মিত যোগাযোগ করতেন বিখ্যাত কোচ সিজার লুই মেনোত্তির সাথে।এই থেকেই প্রমাণিত হয় যে চুচো শুধু এই সুন্দর খেলার একজন খেলোয়াড় নয়,সে একজন যথেষ্ট নৈষ্ঠিক ছাত্রও বটে।আর্জেন্টিনা অনুর্ধ ২০ দলের হয়ে ১৯৯৭ সালে যুব বিশ্বকাপ দিয়ে শুরু হয় সাফল্যের। করলেন ক্লাব বদলও।আসলেন বিখ্যাত আর্জেন্টাইন ক্লাব রিভারপ্লেটে। ক্যাম্বিয়াসোর খেলায় অতিরঞ্জিত কিছু ছিল না।কদাচিৎ করতেন হালকা ট্রিকারি।কিন্তু রিভারের মিডফিল্ডে যেন সে এক অর্কেস্ট্রার নেতা।তার উতকর্ষতা চোখে পড়তে পিউরিস্টদের সময় লাগবে এক-দুই মিনিট।ক্যাম্বিয়াসোর একেকটা পাস ছিল সর্বদায় দলের অভিষ্টসাধনে রত।এমন চোখধাধানো পারফর্ম্যান্সের কথা জেনে তাকে আবার দলে টেনে নেয় রিয়াল মাদ্রিদ।তাদের আস্থার প্রতিদান দিয়েছেন দুহাত ভরে।মায়েস্ট্রো ম্যাকলেলের সাথে করেছিলেন অনন্যসাধারণ এক মিডফিল্ড জুটি।পেলেন বেশ কয়েকটি শিরোপা।পাপা পেরেজের আগমণ এবং তার ডিপ লাইং প্লেমেকারে অনীহার দরুন চুচোকে ছাড়তে হল রিয়াল মাদ্রিদ।তখনই তাকে দলে ভেড়ানোর জন্যে এগিয়ে আসেন ম্যাসিমো মোরাত্তির ইন্টার মিলান।লোম্বার্দিরা অনেকদিন থেকেই তার খেলায় মুগ্ধ।ইন্টারে যাওয়া অনেকটাই অসম্ভব হয়ে পড়েছিলো সিটিজেনশীপ সম্পর্কিত এক জটিলতায়,তখনই ত্রাতায় ভূমিকায় আসেন একদম শুরুতেই বলা ভদ্রলোক ভ্যাসালো।তার অক্লান্ত রিসার্চ প্রমাণ করে চুচোর পূর্বপুরুষদের ইতালির শিকড়।অ-ইউরোপীয় কোটা সংক্রান্ত আর কোন ঝামেলায় রইল না।ইন্টারে গিয়েই পেলেন এক টুকরা আর্জেন্টিনা।জানেত্তি,ভেরন,নিকোলাস বুর্দিসো এবং হুলিও ক্রুজ তাকে নিলেন আপন করে।ইন্টার তখন পেতে থাকলো অভূতপূর্ব এক সাফল্য।কার্লো আনচেলত্তির মিলানের ভরাডুবি আর বিতর্কিত জুভেন্টাস দেখতে শুরু করলো নেরাজজুরিদের রূপগাথা।টানা পাচবারের সিরি আ চ্যাম্পিয়ান তারা।হেলেনিও হেরেরা নিশ্চয়ই তার উত্তরসূরীদের এই সাফল্যে ব্যাপক খুশি,তার অধীনে থাকাকালীন সময় এর পরে ক্লাবের এমন অর্জন আর আসেনি।আর এস্তেবান চুচো ক্যাম্বিয়াসো ছিলেন এই অর্জনের নিভ্রবিন্দু।মাঝমাঠের আজ্ঞাকারী নেতা তো ছিলেনই,তার ধুর্ততা রবার্তো মানচিনিকে সাহায্য করেছিল ইতালিয়ান লীগের ডুয়োপলি মানে রোজানিরি আর ওল্ড লেডিদের প্রতাপ ভাঙ্গতে।

ক্লাব ফুটবলে যথেষ্ট সাফল্য পেয়েছেন।কিন্ত ক্যাম্বিয়াসোর ক্যারিয়ারের মাইক্রোকোজম বললে সবার আগে আসবে ২০০৬ বিশ্বকাপে জাতীয় দলের হয়ে সার্বিয়ার বিপক্ষে করা গোলটি।২৫ পাসের সেই অসাধারণ গোলের শেষ ছোয়া মানে সার্বিয়ার জালে বল জড়ানোর কাজটি করেছেন চুচো।সেই গোলটিকে পত্রিকা এল মুন্ডো অ্যাখ্যা দেন “জ্যামিতির স্মৃতিস্তম্ভ হিসেবে আর ক্যাম্বিয়াসো তার উপকেন্দ্র”। ঠিক চার বছর পরে ২০১০ বিশ্বকাপে জায়গা হলো না ক্লাবের হয়ে ট্রেবলজয়ী জানেত্তি আর ক্যাম্বিয়াসোর।ওই বিশ্বকাপে আলবিলেসেলস্তিদের ‘রাইটব্যাক’ আর ‘ডীপ লাইং প্লেমেকিং’ এই দুই পজিশন প্রতি ম্যাচেই কেঁদেছে।ম্যারাডোনা বলেই হয়তো এসব খামখেয়ালিপনা দেখতে হয়েছে সমর্থকদের।ন্যাশনাল গ্রেট অজি আর্দিলেস ম্যারাডোনার এমন হঠকারিতা দেখে বললেনই সংসক্তির খেলা ফুটবলে দলেই সবার আগে, কোনো খেলোয়াড় না।আঙ্গুল তুলে দেখালেন পজিশন ওয়াইজ খেলোয়াড়ের গুরুত্ব। “গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ” এ না খেলতে পারার আফসোস নিয়েই ইন্টারে ফিরলেন ক্যাম্বিয়াসো।ট্রেবল জেতানো কোচ জোসে মরিনহোর রিয়ালে গমন এবং একের পর এক কোচ বদলের ভীড়ে চুচো ঠিকই ছিলেন দৃঢ়নিশ্চয়।কিন্ত দীর্ঘদিনের ক্লাব প্রেসিডেন্ট এবং বন্ধু ম্যাসিমো মোরাত্তির ক্লাব থেকে চলে যাওয়া ভীষণভাবে কষ্ট দেয় চুচোকে।অবশেষে দীর্ঘ ১০ বছরের সম্পর্কের ইতি টেনে ইন্টার থেকে ইংলিশ ক্লাব লেস্টার সিটিতে পাড়ি জমান এস্তেবান ক্যাম্বিয়াসো। চুচো যখন লেস্টারে আসলেন তখন লেস্টারের যায় যায় অবস্থা।রেলিগেশন এড়ানোই যেন ‘হার্কুলিয়ান টাস্ক’।ইন্টার থেকে আসার সময় চুচো সাথে করে নিয়ে আসলেন তার মাঠে এবং মাঠের বাইরে দেয়া নেতৃত্বের সহজাত ভূমিকা।বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে চুচো বলেন লেস্টারকে প্রিমিয়ার লীগে বাচিয়ে রাখা তার কাছে অন্য দলের সাথে লীগ জেতার সমতুল্য এবং এই ব্যাপারে সে আত্মবিশ্বাসী।নয় ম্যাচের মধ্যে সাত ম্যাচ জয়েই শিয়ালরা রয়ে গেলো প্রিমিয়ার লীগে।তাতেই ভিত্তি হয়ে গেছিলো ঠিক ১২ মাস পরের এক রূপকথার।“ম্যাজিক” এই নামে লেস্টারবাসীরা ডাকত ক্যাম্বিয়াসোকে।তার পায়ের প্রেমে পড়া ব্লুজরা চেয়েছিল তাকে লেস্টারে আরো কিছুদিন রাখতে কিন্ত ততদিনে চুচো তার কেরামতির বাক্সপেটরা গুছিয়ে চলল অ্যাপোলো-পসাইডনদের দেশে।গ্রীক ক্লাব অলিম্পিয়াকোসকে টানা দুবার জিতালেন লীগ শিরোপা। ৩৭ বছরে এসে তুলে রাখলেন নিজের বুটজোড়া।ইতি টানলেন দ্যুতিময় এক ক্যারিয়ারের।মনোযোগ দিতে লাগলেন কোচিং পেশায়।অবশ্য তার মতোন আধুনিক ফুটবলের অন্যতম সেরা শিক্ষার্থীর কাছে এটা নতুন কিছু নাহ।এর সবকিছুই হতে পারতো অন্যরকম যদি না ক্যাম্বিয়াসো পরিবারের ইতালিয়ান শিকড় এত শক্ত না হতো।যদি না পারতেন ইন্টার মিলানের হয়ে মাঠে না নামতে।পরিবারের ইতিহাস ইতালিতে যেমন শক্তই হোক না কেন চাইলেই এক কদম পিছিয়ে গিয়ে দেখা যায় এস্তেবান ক্যাম্বিয়াসো নিজের গড়া ইতিহাসের দিকে যা অনুরণিত হবে অনন্তকাল। ক্যাম্বিয়াসো-কীর্তন শেষ করবো ইন্টারকে ট্রেবল জেতানো কোচ মরিনহোর কথা দিয়ে।২০১৫ সালে আহ্লাদিত মরিনহো বলেন “আমি ট্রেবল জিতেছি ক্যাম্বিয়াসোকে নিয়ে।সে আমার কাঞ্চননির্মিত দলের অঙ্গ।চুচোর আবিষ্ট করা ছন্দতে তাল মিলিয়েছে তার সতীর্থরা।ক্যাম্বিয়াসোর উপস্থিতি ছিল তাদের জন্যে রূল,বল ছিল তাদের মাপক এবং কাউন্টার অ্যাটাক ছিল এই ঐক্যতানের মূল সুর”।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

17 + 3 =