কেন কাঁটাতারের বেড়া?

খেয়াল করেন কী-না জানিনা, অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড-আফ্রিকার মাঠগুলো কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘেরা না। এখন আছে কী-না জানিনা তবে শ্রীলংকারও কিছু মাঠ কাঁটাতারের বেড়া ছাড়াই দেখেছি। ঘেরা থাকে শুধু ভারত, পাকিস্তান আর বাংলাদেশের সবগুলো মাঠ। ঘেরা থাকে না বলে ঘিরে রাখতে বাধ্য হয় বলাটা যথার্থ হবে। ভারত-পাকিস্তানের কারণ বের করার দায় নেই। শুধু বাংলাদেশেরটা বলি। বেশ কয়েকবার মাঠে গিয়ে খেলা দেখেছি। মাঠে কিছু মানুষের সাথে সমরূপী কিছু কুকুর-শুয়োর টাইপ জানোয়ারও ঢুকে যায়। বেশ আগে, দিন-তারিখ মনে নেই, খুলনা স্টেডিয়াম উদ্বোধনের পরপরই কেনিয়ার সাথে বাংলাদেশের একটা ম্যাচ দেখতে গিয়েছিলাম। তখন সৈয়দ রাসেল খেলে বাংলাদেশ দলে। একসময় বাউন্ডারিতে ফিল্ডিংয়ে এলো। যারা আবু নাসের স্টেডিয়ামে গেছেন, তারা জানেন মাঠ ছোট হবার কারণে বাউন্ডারি থেকে গ্যালারির সিটগুলো খুব একটা দূরে না। সাইডলাইনে দাঁড়াতে দেখে রাসেলকে খেলার মাঝেই ডাকা শুরু করলো একদল সমর্থক। রাসেল প্রথম প্রথম হাত নেড়ে উত্তর দিলো। দর্শকরা ডাকতেই থাকে। একসময় রাসেল খেলায় কনসেন্ট্রেট করতে ডাক শোনা বন্ধ করলো। অমনি শুরু হলো গালাগাল করে রাসেলকে ডাকা! সেসব বিভৎস, অশ্রাব্য এবং অবশ্যই লেখার অযোগ্য সব গালাগাল।

আমার ধারণা আমাদের দেশের প্লেয়াররা এসব নিয়মিত শুনেই অভ্যস্ত। শিশিরের কটূক্তির জন্যে তাই সাকিবকে প্রতিবাদ করতে কাঁটাতার পার করে চলে যেতে হয় গ্যালারিতে। তামিমকে ড্রেসিংরুমে যাওয়ার পথে গালির উত্তর দিতে হয়। তামিমের স্ত্রীকে ফোনে যা বলা হয় তা তামিম মুখ ফুটে বলতে পারে না। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বাসেও ঢিল আটকানো যায় না। এসব যারা করে তারা আমার-আপনার আশেপাশেই থাকে। ফেসবুক ব্যবহার করে। ‘ক্রিকেটখোর’, ‘ক্রিকেট ফ্রিক’ এসব গ্রুপে গিয়ে দেশাত্মবোধ ফলাতে ভার্চুয়াল জিহাদ করে।

এই যে কিছুদিন কিছু ট্রেন্ড চালু হয়েছে- ‘ভাইঙ্গা দিবো’, ‘ভইরা দিমু’, ঢুকায় দিমু’; এর একটা করে দিয়েছে থার্ডক্লাস, রুচিহীন, বোধ বিবর্জিত কোনো বিজ্ঞাপন নির্মাতা আর বাকিটা আমরা আপন সৃষ্টিশীলতা দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। এই শব্দগুলোকে আমার অশ্লীল পুরুষতান্ত্রিক ভাষা মনে হয়। স্বাভাবিকভাবে এই শব্দগুলো কারা ব্যবহার করে সেসব বলার প্রয়োজন নেই; জানেন। দেখা মতে দুই ধরণের মানুষ ব্যবহার করছে। একটা গ্রুপ টিন এজার। তারা না বুঝেই ট্রেন্ডের সাথে চলতে ব্যবহার করে যাচ্ছেন। আরেকটা, যারা বুঝেও করে, তাদের রুচিই খারাপ বোধকরি। মনের ভাষা প্রকাশের এত সীমাবদ্ধতা? ইংরেজিতে বর্ণ মাত্র ২৬ টা হলেও বাংলায় তো ৫০ টা। তাতেও ওই কয়েকটা শব্দের বাইরে আর ভাবা যায় না? ওই যে ‘মওকা-মওকা’র বিপরীতে ‘ব্যাম্বু ইজ অন’ বের করে দেখালো মোজো, এটাও ঠিক পছন্দ হয়নি আমার। কেন অস্থির প্রতিযোগিতায় সামিল হতে হবে? অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড-আফ্রিকা-শ্রীলংকায় এসব হয়?

দর্শক হিসেবে ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়ার সমর্থকদের বেশ সুনাম আছে। দু’দলের মধ্যকার ম্যাচে একে অন্যকে নিয়ে ট্রল করে গান বাধে! দল বেধে কোরাস গায়। আর আমরা করি গালাগালি। সেটাও নিজ দলের প্লেয়ারদের! Messi পেনাল্টি মিসের পর প্রতিপক্ষ ‘Miss-i, Miss-i’ বলে ট্রল করে আর আমাদের প্রতিপক্ষ কোহলিকে ট্রল করতে আমাদের ‘কুলি’ শব্দ ব্যবহার করা লাগে! এই যে আমরা এসব জঘন্য ইল্লোজিক্যাল নামে ট্রল করি, ওদের পেজে ভার্চুয়াল অ্যাটাক করে বাংলিশে গালাগাল করে আসি- আমার খুব জানতে ইচ্ছে হয় এসব এত পরিমানে বিশ্বের আর কোনো জাতি করে? পাকিস্তানের মত জানোয়ারেরাও এতটা করে?

আরেকটা কথা বলি। এশিয়া কাপে বাংলাদেশ-ভারত ম্যাচ দেখাতে নিয়ে গেছিলো শুভ্র দাদা। শচীন ওই ম্যাচে শততম সেঞ্চুরি করে এবং বাংলাদেশ জেতে। ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে শচীন ডিপ ফাইন লেগ বাউন্ডারিতে ফিল্ডিং করতে আসলে গ্যালারির একটু নিচে নেমে মোবাইল ক্যামেরায় শচীনের ছবি তুলতে গেছিলাম। দেখি শচীনকে বাপ-মা তুলে হিন্দিতেই গালাগাল চলছে! এতটা দূর থেকে চলছে যে শচীনের কান পর্যন্ত পৌছানোর কথাই না, তবু বীর বাঙালি চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। শচীনের মত একজন নির্ভেজাল, বিতর্কমূক্ত লিজেন্ড যদি মিরপুরে গালি খেতে পারেন তাহলে সুধীর গৌতমকে গ্যালারিতে পিটানো, পুলিশি উদ্ধারের পরেও সিএনজিতে ইট মারা অবিশ্বাস্য কিছু না। কারণটা আগেই লিখেছি, মাঠে মানুষের সাথে কুকুর-শুয়োরও ঢোকে।

মাঠের সিকিউরিটি এবং ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করে সুধীরের উপর হামলাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হোক। টিএসসি’র মত প্রহসন যাতে না হয়। সুধীর, আমরা যারা নিজেদের মানুষ ভাবতে চেষ্টা করি, বা মাঝেমধ্যে ভাবি তারা আপনার নিকট ক্ষমাপ্রার্থী।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

two × 1 =