কি পাবে আর্সেনাল লুকাস পেরেজের কাছ থেকে?

সেই দলবদলের বাজার শুরু হতে না হতেই সেই যে বরুশিয়া মনশেনগ্ল্যাডবাখ থেকে সুইস মিডফিল্ডার গ্রানিত শাকা কে ৩৫ মিলিয়ন পাউণ্ডের বিনিময়ে দলে টানলেন আর্সেন ওয়েঙ্গার, তাঁর পর থেকে বোধহয় তিনি ভুলেই গিয়েছিলেন যে তাঁর দলে আরো কিছু খেলোয়াড়ের প্রয়োজন হতে পারে। মাঝে বোল্টন ওয়ান্ডারার্স থেকে তরুণ ডিফেন্ডার রব হোল্ডিং আসলেও তাঁকে মূলত ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করেই আনা হয়েছে, আর্সেনাল ফ্যান রা যে ধরণের সুপারস্টার খেলোয়াড় প্রত্যাশা করেন দলে, সেরকম কেউ তিনি নন। তা যাই হোক, একজন সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার, একজন স্ট্রাইকারের অভাবে ভোগা আর্সেনাল অবশেষে দুই দুর্বলতার জায়গাতেই খেলোয়াড় আনছে, ঘুম ভেঙ্গেছে কোচ আর্সেন ওয়েঙ্গারের, নির্ভরযোগ্য সূত্রের খবর মানলে বলা যেতে পারে যে ভ্যালেন্সিয়া থেকে জার্মান সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার শকোদ্রান মুস্তাফি ও স্প্যানিশ ক্লাব দেপোর্তিভো লা করুনিয়া থেকে ১৭ মিলিয়ন পাউন্ডের বিনিময়ে স্ট্রাইকার লুকাস পেরেজকে দলে টানছে আর্সেনাল। এই পেরেজকে নেওয়ার ব্যাপারে অনেকটাই এগিয়ে গিয়েছিল রোনাল্ড ক্যোম্যানের এভারটন, ১৭ মিলিয়ন পাউন্ডের প্রস্তাব রেখেছিল তারাও, কিন্তু শেষ মুহূর্তে লুকাস পেরেজকে পাওয়ার লড়াইয়ে আর্সেনাল তাঁদের হারিয়ে দিয়েছে বলেই মনে হচ্ছে।

আসছেন লুকাস পেরেজ
আসছেন লুকাস পেরেজ

কে এই লুকাস পেরেজ? আর্সেনালের আক্রমণভাগে তিনি নতুন কি যোগ করতে পারেন? ২৭ বছর বয়সী এই স্প্যানিশ স্ট্রাইকারকে ফুটবলীয় পরিভাষায় তথাকথিত “লেইট ব্লুমার” বা “পরে প্রস্ফুটিত” স্ট্রাইকার বললেও ভুল হবেনা। ক্যারিয়ারের শুরু দিকে স্পেইনের নিচের দিকের লীগগুলোতে খেলা লুকাস স্পেইনের লা লিগায় প্রথম সুযোগ পান মূলত রায়ো ভ্যায়োকানোর হয়ে। ৭ ম্যাচে এক গোল করা পেরেজকে রাখার ব্যাপারে রায়ো কি, স্পেইনের অন্য কোন দলই আগ্রহী হয়নি। ফলে ক্লাব খুঁজতে থাকা পেরেজের স্থান হয় ইউক্রেইনে, কারপাতি লাভিভ এর হয়ে ৫১ ম্যাচে ১৪ গোল করেন তিনি। পরে ইউক্রেইনের চ্যাম্পিয়ন ক্লাব ডায়নামো কিয়েভ হয়ে গ্রিসের পিএওকে ক্লাবে ৩২ ম্যাচে ৯ গোল করার পর নিজের শহর দেপোর্তিভোর নজরে পড়েন তিনি। এক মৌসুম ধারে থেকে দেখিয়ে দেন তিনি কিরকম হতে পারেন, পরের মৌসুমেই পাকাপাকিভাবে চলে আসেন দেপোর্তিভোতে, এবং সেখানেই তাঁর প্রতিভা পূর্ণতা পাওয়ার পথে যাত্রা শুরু করে। গত মৌসুমে লা লিগায় ১৭ গোল ও ৮ অ্যাসিস্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন তাঁর প্রতিভার কথা সবাইকে।

বহুদিন ধরেই লেস্টার সিটির ইংলিশ স্ট্রাইকার জেইমি ভার্ডির পিছনে পিছনে ঘোরা আর্সেনাল শেষ পর্যন্ত পায়নি তাঁকে, ক্লাবের সাথে নতুন চুক্তি করে আর্সেনালের যাওয়ার বিষয়টা নিজে থেকেই নাকচ করে দিয়েছেন ভার্ডি। তবে লুকাস পেরেজকে পেলেও আর্সেনাল খুব সম্ভবত ভার্ডির থেকে খারাপ কাউকা পাবে না। পেরেজও ভার্ডির মতই লেইট ব্লুমার, দুইজনই খাটো আকৃতির, দুইজনই তথাকথিত সেন্টার ফরোয়ার্ড বা টার্গেটম্যান না, কিন্তু দুইজনেরই রয়েছে অপরিসীম এনার্জি, দুইজনই ফাইনাল থার্ডে খাটতে পারেন অমানুষের মত, দুইজনই গোল করা ছাড়াও চান্স বানানোর ক্ষেত্রেও সমান দক্ষ, এবং তথাকথিত নাম্বার নাইন ছাড়াও উইংয়েও দুইজন সমান স্বচ্ছন্দ, প্রচন্ড গতিশীলতা যাদের অন্যতম ট্রেডমার্ক। ক্যারিয়ারের শুরু দিকে এই লুকাস পেরেজ মূলত লেফট উইঙ্গারই ছিলেন, পরবর্তীতে গত মৌসুমের পুরোটাই সেন্টার ফরোয়ার্ড হিসেবে খেলে ১৭ গোল করে জানিয়ে দিয়েছেন টার্গেটম্যান হিসেবেও তিনি নেহাতই মন্দ নন।

ওয়েঙ্গার অবশেষে পেয়েছেন তাঁর স্ট্রাইকারকে
ওয়েঙ্গার অবশেষে পেয়েছেন তাঁর স্ট্রাইকারকে

আর্সেনালের প্রতিষ্ঠিত স্ট্রাইকার বলতে গেলে এখন ফরাসী স্ট্রাইকার অলিভিয়ার জিরুই আছেন। অলিভিয়ের জিরু মূলত একজন শক্তিশালী টার্গেটম্যান, বাতাসে ভেসে আসা বলগুলা কন্ট্রোল করা কিংবা হেডিংয়ে অস্বাভাবিকভাবে দক্ষ একজন স্ট্রাইকার, ডি বক্সে দাঁড়িয়ে থেকে গোল করাই যার একমাত্র দক্ষতা। আপনি চাইলেও জিরুকে দিয়ে গোলসহায়তার কাজটা করাতে পারবেন না, কিংবা উইং থেকে কাট-ইন করে ঢুকে শট নিয়ে গোল করতে দেখবেন না তাঁকে, তথাকথিত আধুনিক ফরোয়ার্ড তিনি নন যিনি গোল করার পাশাপাশি করানোতেও সেরকম দক্ষ। তাঁকে নিয়মিত বল বানিয়ে দেন স্যানচেজ, ওজিল বা কাজোরলা রা। সেসব বল নিয়ে ট্রেডিশনাল টার্গেটম্যানের কাজটা করে যান জিরু।

hi-res-958119512aa2349532d32822dad3ed56_crop_exact

অলিভিয়ের জিরুর সাথে লুকাস পেরেজের পার্থক্যর জায়গাটা এইখানেই। স্ট্রাইকার হিসেবে অলিভিয়ের জিরুর যা যা দুর্বলতা, সেগুলোই লুকাস পেরেজের শক্তির জায়গা। আর্সেনাল স্কোয়াডে তাই অনায়াসেই শুধু অলিভিয়ের জিরুই নন, থিও ওয়ালকট, ড্যানি ওয়েলবেক কিংবা অ্যালেক্সিস স্যানচেজের সাথেও মূল একাদশে জায়গা নিয়ে লড়াই করার ক্ষমতা আছে তাঁর যথেষ্ট।

এবারই লেস্টার সিটি থেকে হেড অফ রিক্রুটমেন্ট হিসেবে এভারটনে যোগ দিয়েছেন স্টিভ ওয়ালশ। গত মৌসুমে লেস্টার সিটির রুপকথার পেছনে যার অবদান মোটেও কম নয়। এই স্টিভ ওয়ালশকেই কৃতিত্ব দেওয়া হয় লেস্টারের এনগোলো কান্তে, রিয়াদ মাহরেজদের ট্রান্সফারের পেছনে। আর এভারটনে এসে এই লুকাস পেরেজকেই  খুঁজে বের করেছিলেন এই ওয়ালশ ; যেই পেরেজকে এখন পেতে যাচ্ছে আর্সেনাল। তাই বলা যেতে পারে যে, লুকাস পেরেজ সংক্রান্ত এসব ইঙ্গিতই কিন্তু আর্সেনালের আরেকটা সফল ট্রান্সফারেরই ইশারা দিচ্ছে। আর একজন ভার্সেটাইল উইং-ফরোয়ার্ডকে কিভাবে বিশ্বসেরা স্ট্রাইকারে রূপান্তরিত করা যায়, সেই টোটকা ত ওয়েঙ্গারের কাছে আছেই, তাই না? থিয়েরি অঁরির কথা ভুলে গেলেন? আর্সেনালে আসার আগে জুভেন্টাসে খেলা এই ফরাসী স্ট্রাইকারকে সবাই কিন্তু উইঙ্গার হিসেবেই চিনত!

৪-৪-২, ৪-২-৩-১, ৪-৩-৩ যেকোন পজিশানেই পেরেজকে খেলাতে পারবেন ওয়েঙ্গার, এবং অবশ্যই জিরুর স্ট্রাইকিং পার্টনার হিসেবে তাঁর সামর্থ্য আছে একটা সফল পার্টনারশিপ বানানোর।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

sixteen − 11 =