কিয়েরান ট্রিপিয়ের : ইংল্যান্ডের নতুন বেকহ্যাম?

কিয়েরান ট্রিপিয়ের : ইংল্যান্ডের নতুন বেকহ্যাম?

বিংশ শতাব্দীর শুরু দিকটায় ইংল্যান্ড দলের সোনালী প্রজন্মের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন ছিলেন বোধকরি ডেভিড বেকহ্যাম। মাঠের বাইরে ঈর্ষণীয় লাইফস্টাইল, দুর্দান্ত ফ্যাশনসচেতনতা থেকে শুরু করে মাঠের ভেতরে রাইট মিডফিল্ডারের ভূমিকাটাকে গুলে খেয়ে নেওয়া ডেভিড বেকহ্যামের খেলার সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক ছিল দুর্দান্ত সেটপিস নিতে পারার দক্ষতা। সেটপিস বলতে – ফ্রিকিক, পেনাল্টি, কর্নার আর কি। বেকহ্যামের ক্রসগুলোর তো কোন জুড়িই ছিল না তখন। বোঝাই যায়, তাঁকে পাওয়ার জন্য এককালে রিয়াল মাদ্রিদ ও বার্সেলোনা কেন কাড়াকাড়ি লাগিয়ে দিয়েছিল। মাঝমাঠের ডান প্রান্ত থেকে নিখুঁত নিশানায় বাতাসে ভাসিয়ে একটা ক্রস ফেলবেন প্রতিপক্ষের ডি-বক্সের মধ্যে, মাইকেল ওয়েন, রুড ভ্যান নিস্টলরয় বা জিনেদিন জিদানের মত তারকারা গোল না করে যাবেন কোথায়?

সব খেলোয়াড়েরই একটা সমাপ্তিরেখা থাকে, ডেভিড বেকহ্যামেরও ছিল। বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের ইতি টেনেছেন তাও বছর পাঁচেক হল। কিন্তু বেকহ্যাম যাওয়ার পর থেকে সেরকম কার্যকরী রাইট মিডফিল্ডার/রাইট উইংব্যাক কি পেয়েছে ইংল্যান্ড যার ক্রস বেকহ্যামের মত বা কাছাকছি মানের ছিল? যার কর্নারগুলোতে নিশ্চিন্ত মনে হেড করলেই গোল হয়ে যেত?

এই সময়গুলোতে ইংল্যান্ডের জাতীয় দলে কতই না থিও ওয়ালকট, গ্লেন জনসন, অ্যাডাম জনসন, শন রাইট ফিলিপস এলেন-গেলেন, কতজন বেকহ্যামের মত প্রভাব রাখতে পেরেছেন মাঠের খেলায়? কতজনের ডান পা থেকে গোলার মত নিখুঁত ক্রস বেরিয়ে একদম প্রতিপক্ষের ডিবক্সে ওঁত পেতে থাকা সতীর্থ স্ট্রাইকারের কাছে পড়েছে?

এতদিন ধরে হাপিত্যেশ করে খুঁজতে থাকা সেরকম কার্যকরী ক্রসারের অভাব এতদিন বুঝি মিটলো ইংল্যান্ডের! টটেনহ্যাম হটস্পারের রাইটব্যাক কিয়েরান ট্রিপিয়ের চলে এসেছেন ডেভিড বেকহ্যামের উত্তরসূরি হতে! এতদিন পর বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের খেলা ও সেই খেলায় একজন কার্যকরী ক্রসার ও সেটপিস নেওয়ার মানুষের সুস্পষ্ট প্রভাব দেখে নতুন বেকহ্যামের পুনরাগমন হয়েছে ভাবাটা অমূলক নয় একদম।

এই বিশ্বকাপে এর মধ্যেই দুই ম্যাচ খেলে ফেলেছে ইংল্যান্ড, এই দুই ম্যাচের মধ্যে তিউনিসিয়াকে ২-১ গোলে ও পানামাকে ৬-১ গোলে হারিয়ে এর মধ্যেই বিশ্বকাপের দ্বিতীয় রাউন্ডে জায়গা করে নিয়েছে তারা। ৫ গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকার শীর্ষস্থানে আছেন অধিনায়ক হ্যারি কেইন। কিন্তু ইংল্যান্ডের এই কার্যকরী ও সৃষ্টিশীল খেলার পেছনে আসল কারিগর কে? আশ্চর্যজনকভাবে সেটা কোন সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার, উইঙ্গার বা অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার নন – তিনি একজন রাইটব্যাক, খেলতে পারেন রাইট উইংব্যাক হিসেবেও, আর তাঁর নাম কিয়েরান ট্রিপিয়ের।

তিউনিসিয়ার বিপক্ষে ম্যাচটাই দেখুন, শেষ মূহুর্তের গোলে তিউনিসিয়ার নাকের ডগা থেকে জয় ছিনিয়ে এনেছে ইংলিশরা। গোল করেছেন হ্যারি কেইন, অসাধারণ এক কর্নার থেকে গোল করে। কর্নারটা কে নিয়েছিলেন? ট্রিপিয়ের!

কিংবা আজকের ম্যাচটার কথা চিন্তা করুন। ম্যাচের দ্বিতীয় গোল আসে আবারো সেই কর্নার থেকে। কর্নার থেকে ভেসে আসা বলে হেড করে দলকে ২-০ গোলে এগিয়ে দেন ম্যানচেস্টার সিটির সেন্টারব্যাক জন স্টোনস। কর্নারটা কে নিয়েছিলেন? ট্রিপিয়ের!

আজকের ম্যাচেরই চতুর্থ গোলটার কথা ভাবুন। সেই স্টোনসের গোল। একজনের ফ্রি কিক থেকেই বল এসেছিল জর্ডান হেন্ডারসনের কাছে, যেখান থেকে বল পেয়ে হেড করে দলের চতুর্থ গোল করেন স্টোনস। কে নিয়েছিলেন সেই ফ্রি-কিকটা? ট্রিপিয়ের!

কিয়েরান ট্রিপিয়ের : ইংল্যান্ডের নতুন বেকহ্যাম?
gollachhut.com

টুর্নামেন্ট শুরুর অনেক আগে থেকেই ইংল্যান্ড কোচ গ্যারেথ সাউথগেট একটা বেশ সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, আজীবন ৪-৪-২ বা ৪-২-৩-১ বা ৪-৩-৩ ফর্মেশনে খেলতে স্বচ্ছন্দ ইংল্যান্ডকে ৩-৫-২ ফর্মেশনে খেলাবেন বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এর পেছনে একটা বেশ বড় কারণ আছে। সাউথগেটের হাতে এখন দু-দুটো বিশ্বমানের রাইটব্যাক – ম্যানচেস্টার সিটিতে খেলা পেপ গার্দিওলার শিষ্য কাইল ওয়াকার ও টটেনহ্যামের এই কিয়েরান ট্রিপিয়ের। এই দুইজনকে একইসাথে খেলাতে গেলে ও ট্রিপিয়েরের দুর্দান্ত সেট পিস ও ক্রস দেওয়ার ক্ষমতার পূর্ণ সদ্ব্যবহার করতে চাইলে ট্রিপিয়েরকে মাঠের ডানদিকে একটু উপরে খেলাতে হবেই। তাই সাউথগেট ওয়াকারকে রাইটব্যাকে খেলতে না দিয়ে সেন্টারব্যাক হিসেবে খেলাচ্ছেন। যদিও প্রথাগত সেন্টারব্যাক না হবার কারণে বেশ মানিয়ে নিতে কষ্ট হচ্ছে ওয়াকারের, যার প্রমাণ তিউনিসিয়ার বিপক্ষে খামোকা করা ডি-বক্সের মধ্যে ফাউলটা, যে ফাউলটার কারণেই পেনাল্টি পায় তিউনিসিয়ানরা। কিন্তু ওয়াকারকে সেন্টারব্যাক বানানোর ফলে ওদিকে ট্রিপিয়ের সাউথগেটকে আক্রমণভাগে যে নজিরবিহীন সহযোগিতাটা করে যাচ্ছেন, সে সুবিধাটুকু পাওয়ার জন্য সাউথগেট চাইলে ওয়াকারের মানিয়ে না নিতে পারার বিষয়টা খানিক উপেক্ষা করতেই পারেন!

এই বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের সৃষ্টিশীলতার অন্যতম প্রধান অঙ্গ হচ্ছেন এই ট্রিপিয়ের। রাইট উইংব্যাক পজিশন থেকেই একের পর এক গোলের সুযোগ করে যাচ্ছেন তিনি, ক্লাব-সতীর্থ হবার কারণে দলের মূল স্ট্রাইকার ও অধিনায়ক হ্যারি কেইনের সাথে ট্রিপিয়ের এর বোঝাপড়াটাও হচ্ছে ভালো। অত্যন্ত বিচক্ষণভাবেই ট্রিপিয়েরকে শুধু রাইটব্যাকের ভূমিকা না দিয়ে আরেকটু উপরে রাইট উইংব্যাকের ভূমিকা দিয়েছেন সাউথগেট, যাতে তাঁর টেকনিক্যাল সামর্থ্যের পুরো উপযোগিতাটা পেতে পারে ইংল্যান্ড। এই বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশী গোলের সুযোগ সৃষ্টি করতে পেরেছেন এই পর্যন্ত বেলজিয়ামের কেভিন ডে ব্রুইনিয়া (৯টা), তাঁর ঠিক পরেই আছেন কিয়েরান ট্রিপিয়ের (৭টা)। এবং এখন পর্যন্ত সেই ফাটকাটাই কাজে লেগেছে। আর ট্রিপিয়েরের দুর্দান্ত সেট পিস দক্ষতা মনে করিয়ে দিচ্ছে ডেভিড বেকহ্যামকে। সমর্থকেরা আদর করে ডাকা শুরু করেছেন, “দ্য বেকহ্যাম ফ্র বিউরি” অর্থাৎ “বিউরির বেকহ্যাম”!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

2 × one =