কিলিয়ান এমবাপ্পে : ফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার মূল বাধা

গত দুই বছর ধরেই বিশ্বমঞ্চে কিলিয়ান এমবাপ্পে নিজেকে এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন যে, ১৯ বছর স্ট্রাইকারের নাড়িনক্ষত্র সম্পর্কে নিয়মিত ফুটবল অনুসরণ করা সবারই জানা হয়ে গেছে। বাকী ছিল সেসব দর্শক যারা হয়তোবা নিয়মিত বিভিন্ন লিগের খেলা দেখেন না, কিন্তু চার বছর পর পর বিশ্বকাপ ঠিকই দেখেন আগ্রহ ভরে। এই বিশ্বকাপে এমবাপ্পে তাদেরকেও হাতেকলমে দেখিয়ে দিলেন কেন তাঁকে নিয়ে এত মাতামাতি করা হয়। কেন তাঁকে পরবর্তী থিয়েরি অঁরি বলা হয়। কেন তিনি বিশ্বের সবচেয়ে দামী টিনএজার।

এই বিশ্বকাপে ফ্রান্স কোচ দিদিয়ের দেশম প্রায় পুরো টুর্নামেন্টেই দলকে খেলিয়েছেন ৪-২-৩-১ ছকে। এই ছকের সবচেয়ে বিচিত্র দিক হল সারাজীবন ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবে খেলা ব্লেইজ মাতুইদির লেফট উইঙ্গার হিসেবে খেলা। আর দিদিয়ের দেশমের এই রক্ষণাত্মক কৌশলের কারণ হল দুটো –

  • সেন্ট্রাল মিডফিল্ড থেকে পল পগবা যেন নিশ্চিন্তে বল নিয়ে উপরে উঠে আসতে পারেন
  • রাইট উইংয়ে খেলা কিলিয়ান এমবাপ্পে যেন সঠিকভাবে ঝলসে উঠতে পারেন

কিলিয়ান এমবাপ্পের খেলার স্টাইলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল তাঁর গতি ও দুর্দান্ত ড্রিবলিং ক্ষমতা। এই বিশ্বকাপে এমবাপ্পের এই গুণগুলোর চূড়ান্ত ব্যবহার করেছেন দেশম। চূড়ান্ত গতিশীলতার কারণে দেখা যায় এমবাপ্পে প্রায়ই সামনে চলে যান, প্রতিপক্ষ দলের ডিফেন্সের একটা অংশ এমবাপ্পেকে সামলাতে খাবি খায়, তখন নিজের দলের রক্ষণ যাতে হুট করে উন্মুক্ত না হয়ে যায় সে কারণে ব্লেইজ মাতুইদি আস্তে করে নিচে নেমে পগবা আর এনগোলো কান্তের সাথে সেন্ট্রাল মিডফিল্ডে চলে গিয়ে  দলের ফর্মেশনকে অনেকটা ৪-৩-৩ এ রূপ দেন। মাতুইদি নিচে চলে আসার কারণে ওদিকে আবার পগবা আস্তে আস্তে বল নিয়ে উপরে চলে গিয়ে এমবাপ্পের সাথে সংযোগ স্থাপন করার চেষ্টা করেন। পিছনে এনগোলো কান্তের মত একজন পশু ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার আর ব্লেইজ মাতুদিইর মত স্বার্থহীন দায়িত্ববান ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার থাকার কারণে পগবা বা এমবাপ্পে কাউকেই সেরকম দলের রক্ষণের দিকে বিশেষ লক্ষ্য রাখতে হয় না। ওদিকে রাইট উইংয়ে খেলার কারণে ডিফেন্সের ডানদিকে রাইটব্যাক হিসেবে খেলা বেনজামিন পাভার্ডের সাথে নিয়মিত সগযোগ স্থাপন করে আক্রমণ রচনা করেন এমবাপ্পে। নিচে নেমে পাভার্ডের সাথে যোগাযোগ করে পাস আদান-প্রদান করেন, তখন এমবাপ্পে নিচে নেমে আসলে পাভার্ড উপরে উঠে চলে যান, এমবাপ্পেকে নজরে রাখা খেলোয়াড় তখন একটু ধন্দে পড়ে যান এমবাপ্পেকেই মার্ক করবেন, নাকি উপরে চলে যাওয়া পাভার্ডকে অনুসরণ করে সেই আক্রমণটা নস্যাৎ করবেন।

কান্তে ও মাতুইদি ছাড়াও এই ফরাসি দলে আরেকজন স্বার্থহীন খেলোয়াড় আছেন, তিনি অলিভিয়ের জিরু। ৪-২-৩-১ ছকে একক স্ট্রাইকার হিসেবে খেলা জিরু সবসময়ই দেশমের কৌশলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছেন বারবার, এবারো তাঁর ব্যতিক্রম নয়। হ্যাঁ, এটাও সত্যি, এই বিশ্বকাপে অনেক সহজ সহজ গোল করার সুযোগ মিস করেছেন জিরু। তাই বলে এমবাপ্পেকে স্বাধীনভাবে খেলতে দেওয়ার পিছনে তাঁর ভূমিকাটাকে ছোট করে দেখার কোন অবকাশ নেই। শারীরিকভাবে বেশ শক্তিশালী হবার কারণে এক-দুইজন খেলোয়াড়কে এমনিতেই ব্যস্ত রাখেন জিরু, তখন ঐ ফাঁকা জায়গায় এমবাপ্পে গিয়ে নিজের কাজ নিশ্চিন্তে করে আসতে পারেন। জিরুর ছোট ছোট ফ্লিক বা থ্রু বল, কিংবা সামান্য বল ধরে রেখে খেলতে পারার প্রবণতাটা এমবাপ্পেকে প্রতিপক্ষ ডিফেন্সের পেছনে গিয়ে অবস্থান নিতে অনেক সহায়তা করে থাকে। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ম্যাচটার কথাই ধরুন, এমবাপ্পের দুই গোলের পিছনে জিরুর অবদানই কিন্তু সবচেয়ে বেশী।

মাতুইদি, জিরু ও কান্তের এরকম স্বার্থহীনভাবে খেলা ও পগবা আর গ্রিজম্যানের সামনে এসে সৃষ্টিশীলভাবে এমবাপ্পেকে থ্রু পাস দেওয়া – এগুলো এমবাপ্পেকে এই বিশ্বকাপের ভয়ংকরতম রাইট উইঙ্গার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। বিশ্বকাপ জিততে হলে ক্রোয়েশিয়াকে এই এমবাপ্পে-জুজুর সমাধান করতে হবেই।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

8 + sixteen =