কার্লেস পুয়োল : বার্সেলোনায় চীনের মহাপ্রাচীর

কার্লেস পুয়োল : বার্সেলোনায় চীনের মহাপ্রাচীর
চীনের প্রাচীর বা গ্রেট ওয়াল অব চায়না (Great Wall of China) এর নাম আপনারা নিশ্চয়ই শুনেছেন। কিন্তু এটি কেন নির্মাণ করা হয়েছিল তা কি আপনারা কেউ জানেন?
 
প্রথমেই বলে নেয়া ভালো পৃথিবীর দীর্ঘতম এই প্রাচীরটি দৈর্ঘ্যে প্রায় ২৬৯৫ কিলোমিটার আর চওড়ায় প্রায় ৩২ ফুট। ভূমি থেকে উচ্চতা স্থান ভেদে ১৫ থেকে ৩০ ফুট পর্যন্ত।
 
এই প্রাচীর নির্মাণের কাজ ২২১ খ্রিস্টপূর্বাব্দে শুরু হয়ে শেষ হতে সময় লাগে প্রায় ১৫ বছর।
 
প্রতিবেশী মাঞ্চুরিয়া আর মঙ্গোলিয়ার যাযাবর দস্যুদের হাত থেকে চীনকে রক্ষা করার জন্য নির্মাণ করা হয়েছিল চীনের মহাপ্রাচীর বা গ্রেট ওয়াল অব চায়না। ২৪৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে চীন বিভক্ত ছিল খণ্ড খণ্ড রাজ্য আর প্রদেশে। এ রাজ্যগুলোর একটির রাজা শি হুয়াং-টি (Shih Huang-ti)। প্রভাবশালী এই রাজা আশপাশের রাজাদের সংঘবদ্ধ করে নিজে সম্রাট হন। চীনের উত্তরে গোবী (Gobi) মরুভূমির পূর্বাংশে দুর্ধর্ষ মঙ্গলদের বাস ছিল। লুটতরাজই ছিল তাদের জীবিকার প্রধান উৎস। এদের হাত থেকে দেশ ও দেশের মানুষকে নিরাপদ রাখার জন্য সম্রাটের নির্দেশে চীনের প্রাচীর নির্মাণের কাজ আরম্ভ হয়। হেডলাইন কিংবা নিচের বর্ণনা দেখে অনেকের মনে প্রশ্ন আসতেই পারে হঠাৎ আমি চীনের প্রাচীরের কথা বলছি কেন?
 
কেন আমি এই কথা বলেছি সেটা জানার জন্য আপনাদের একটু কষ্ট করে, ধৈর্য ধরে লেখাগুলো পড়তে হবে।যাদের কষ্ট করা কিংবা ধৈর্য নেই তাদের জন্য এই পোস্ট নয়।
 
আর যারা পড়তে বসছেন মুখে একটা চুইংগাম পুরে নিয়ে শুরু করে দিন! কিন্তু সাবধান! খেয়ে ফেলেন না আবার! ফুটবল খেলা সৃষ্টির পর থেকে সেকাল থেকে একাল পর্যন্ত অগণিত লিজেন্ড পৃথিবীর বুকে বিচরণ করে গেছেন। ১২০ গজ দীর্ঘ মাঠের সবুজ গালিচায় চালিয়ে গেছেন তাদের রাজত্ব। এদের মধ্যে কেউ ছিলেন দেশের হয়ে সেরা কেউ বা আবার ক্লাবের হয়ে। তাদের রাজত্বের সব থেকে বড় সাক্ষী ছিলো ফুটবল মাঠের প্রতিটি ঘাস।
 
আজ আমি এমন একজন কে নিয়ে লিখার দুঃসাহস করতে বসেছি জানিনা কতটুকু কলমের আঁচড়ে তার অর্জন, সাফল্য আপনাদের সামনে তুলে ধরতে পারব। ভুল হলে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন আশা করি!
 
১৮৯৯ সালের ২২ অক্টোবর, জোয়ান গাম্পার ‘‘লস দেপোর্তেস’’ পত্রিকায় একটি বিজ্ঞাপন প্রকাশ করে ফুটবল ক্লাব প্রতিষ্ঠা করতে তার আগ্রহ প্রকাশ করেন। এবং ২৯ নভেম্বর, জিমনাসিও সোলে একটি সম্মেলনে তিনি ইতিবাচক সাড়াও পান। যতটুকু মনে পড়ে এই সম্মেলনে তৎকালীন ১১ জন খেলোয়াড় উপস্থিত ছিলেন। এভাবেই শুরু হয় ফুটবল ক্লাব বার্সেলোনার যাত্রা। ১৯৪২ সালে কোপা দেল-রে সেমিফাইনালে প্রথমবারের মতো ফুটবল ক্লাব বার্সেলোনা ও রিয়াল মাদ্রিদ মুখোমুখি হয়, যে ম্যাচের প্রথম লেগে বার্সেলোনা ৩-০ ব্যবধানে জয়লাভ করে। দ্বিতীয় লেগ শুরুর আগে স্পেনের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রধান বার্সেলোনার ড্রেসিংরুমে প্রবেশ করেন ও খেলোয়াড়দের মনে করিয়ে দেয় এই বলে যে “তারা শুধুমাত্র শাসকদের উদারতার কারণে খেলতে পারছে” এবং পরের লেগে রিয়াল মাদ্রিদ ১১-১ ব্যাবধানে জয় লাভ করে!
 
তখন থেকেই এই দুইদলের মধ্যে প্রতিটি ম্যাচে একধরনের কোন্দল লক্ষ্য করা যেতো। এই সহিংসতার ভিতরেই ১৯৯৫ সালে তিনি লা-মাসিয়া তে যোগদান করেন। শুরুটা করেন ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবেই। দুই বছর পরে তিনি বার্সেলোনা ‘বি” টিমে রাইট ব্যাক পজিশনে খেলা শুরু করেন। ১৯৯৮ সালে মালাগা এফসি থেকে বার্সেলোনা তার জন্য একটা অফার পায়। এবং তারা তাকে ছেড়ে দেবারও সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু তার প্রিয় বন্ধু ‘জাভি’ এর মূল টিমে সুযোগ পাওয়া দেখে তিনি বার্সেলোনা ছাড়ার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন। থেকে যান বার্সেলোনাতেই।
এখনোও কি কেউ ধরতে পারছেন আমি কার কথা বলতেছি? কে হতে পারে? হ্যাঁ তিনি আর কেউ নন ফুটবল ক্লাব বার্সেলোনা ইতিহাসের দ্য ওয়াল খ্যাত ”কার্লোস পুয়োল সাফোকাডা”…
 
বার্সেলোনা ক্লাব ক্যারিয়ার
১৯৯৯ সালের ২ অক্টোবার লুইস ভ্যান গাল এর আমলেই লা-লিগা তে পুয়োল এর প্রথম প্রারাম্ভ হয়। যে ম্যাচে রিয়েল ভালোদেলিদ এর বিপক্ষে বার্সেলোনা ২-০ তে জয়লাভ করে। এর পর থেকে তিনি সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার হিসাবে পজিশন পরিবর্তন করেন। ২০০৩ এর অফ সিজনে বার্সেলোনার খুব আর্থিক ভরাডুবি হয়। ঠিক তখন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড থেকে পুয়োল এর জন্য অফার আসে। যেটা তিনি ফিরিয়ে দেন। দুই বছর পরে পুয়োল ক্লাব বার্সেলোনার সাথে ৫ বছরের চুক্তি করেন। লুইস এনরিকের অবসরের পরে ২০০৩-০৪ সিজনে পুয়োল ক্লাব কাপ্তান হিসাবে পরিচিতি লাভ করেন। ২০০২ সালে উয়েফা থেকে তিনি বেস্ট ইউরোপিয়ান রাইট ব্যাক এওয়ার্ড পান পাশাপাশি ধারাবাহিক ভাবে বার্সাকে দুটি শিরোপা জিতাতে সাহায্য করেন। মূলত এভাবেই ফুটবল জগৎ এ আগমন ঘটে ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই ডিফেন্ডারের। ২০০৫/০৬ সিজনে পুয়োল তার ক্যারিয়ারের ৫২ টি ম্যাচ খেলেন যার ভিতরে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে ১২ টি ম্যাচ খেলার পাশাপাশি আর্সেনালকে হারিয়ে বার্সার ২য় ও নিজের হয়ে জয় করে নেন প্রথম ইউসিএল ট্রফি।
 
একটু পরের দিকে তাকালে দেখতে পাব ২০০৮ সালের ২ অক্টোবর চ্যাম্পিয়ন্স লিগে পুয়েল এর ৪০০ তম ম্যাচে স্পোটিং দে ক্লাব পর্তুগাল এর বিপক্ষে ইঞ্জুরিতে পড়েন। কিন্তু এর পরেও একজন লড়াকু নেতার মতো লিগে ২৮ ম্যাচে প্রত্যক্ষ ভাবে জড়িত ছিলেন ও বার্সাকে আরোও একটি লিগ শিরোপা জিতাতে অবদান রাখেন। ঐ সিজনেই রিয়ালের হোম গ্রাউন্ড সান্তিয়াগো বার্নাব্যু তে ২-৬ গোলে হারায় মাদ্রিদকে, যেখানে পুয়োল নিজে একটি গোল করেন।
 
২০০৮-১০ পর্যন্ত দুটি লিগ জয় করার পাশাপাশি ২০০৯ এর উয়েফা সুপার কাপ, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ও ক্লাব বিশ্বকাপ জয়লাভে তার অবদান ছিলো চোখে পড়ার মতো।
 
“সত্যি বলতে প্রতিটা কাতালানই চায় এসব জয় করতে। এটা সত্যি যে আমি এখন স্বপ্নের দলের সাথে আছি,আর খুব করে চাচ্ছি এই দলের হয়েই অবসর নেই” – কথাগুলো বলছিলেন কাপ্তান পুয়োল। বার্সেলোনা ইতিহাসের প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে ১৩ নভেম্বর, ২০১০ সালে পুয়োল ভিয়ারিয়ালের বিপক্ষে তার ক্যারিয়ারের ৫০০ তম লা লিগা ম্যাচ খেলতে নামেন।
 
কিন্ত্য ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস! ২০১০-১১ সিজনে পুয়োল আবারো ইঞ্জুরিতে পড়েন। কিন্তু এবারো একজন লড়াকু নেতার মতো সিজনে মোট ২৮ টি ম্যাচ খেলে এবং বার্সেলোনাকে লিগ জিতাতে সাহায্য করেন।
 
২০০৯ এর পরে আবারো মুখোমুখি দুই জায়ান্ট ক্লাব বার্সেলোনা ও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড। ফাইনালে মাত্র ৬ মিনিট খেলতে পারেন। নিজে খেলতে না পারলেও দল কিন্তু জয় পেয়েছিলো ১-৩ গোলে। যেটি পুয়োল এর ক্যারিয়ারের ৩য় ইউসিএল জয় ছিলো।
 
২০০৯-১০ সিজনে চ্যাম্পিয়নস লিগের সেমিফাইনালে ইন্টার মিলানের কাছে হারার আগে বার্সেলোনার হয়ে একাধারে ৫৬ টি অফিসিয়াল ম্যাচ জয় করেন। যেটা বার্সার হয়ে তার একটা রেকর্ড ছিলো। একই সিজনে কোপা দেল-রে তে রিয়াল মাদ্রিদ ও ভ্যালেন্সিয়া এর হয়ে ২ টি গুরুত্বপূর্ণ গোল করে দলকে জিতাতে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি। ১৮ ডিসেম্বরে বার্সা পুয়োল এর সাথে নতুন করে চুক্তি করে যেটা ছিলো ২০১৬ এর ৩০ জুন পর্যন্ত। কিন্তু বারবার ভাগ্যের কাছে হেরে যান তিনি। আবারোও ইঞ্জুরিতে পড়েন তিনি। এবার ডান পায়ের হাঁটুর ইঞ্জুরিতে পড়েন, যেখানে এর আগে আরোও ৬ বার অপারেশন করাতে হয়েছিলো। আর এর জন্যই তিনি সময়ের আগেই অবসর নেবার সিদ্ধান্ত নেন, যেটা ছিলো বার্সেলোনার জন্য বড় ধরনের একটু ধাক্কা।তার ক্লাব ক্যারিয়ারের ১৫ বছরে তিনি মোট ২১ টী ট্রফি জতে নেয় বার্সা।
 
জাতীয় দলের হয়ে পুয়োল
২০০০ সালের ১৫ই নভেম্বর পুয়োল স্পেন জাতীয় দলের হয়ে অভিষেক ঘটে। তখন আমাদের দেশে ক্লাব ফুটবল এতো মাতামাতি ছিলোনা কিংবা জাতীয় দল নিয়ে রেষারেষি হলে ঐ আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল,কিংবা জার্মানি-ফ্রান্স পর্যন্তই।
 
স্পেন দলের রুপকথার নায়কদের মধ্যে পুয়োলের নাম আপনাকে রাখতেই হবে। সবসময় দলকে সামনে থেকে আগলে রেখেছেন। স্পেন জাতীয় দলের হয়ে তিনি ২০০০ অলিম্পিক, ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ ২০০২. ২০০৬, ২০১০ এ অংশগ্রহণ করেছেন। পাশাপাশি উয়েফা ইউরো ২০০৪ ও ২০০৮ এ অংশ নেন। স্পেনের হয়ে খেলেছেন ২০০৯ কনফেডারেশন কাপ। একজন ডিফেন্ডার হয়েও ঠান্ডা মাথায় কিভাবে দলকে সামনে থেকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হয় হয়ত যারা তার খেলা দেখেন নাই তারা না দেখলে বুঝবেন না!
 
২০০৮ ইউরোতে তার অংশ নেয়া মোট ৫ ম্যাচে মাত্র ২ টি গোল হজম করে। যেখানে ফাইনালে জার্মানিকে হারিয়ে শিরোপা অর্জন করে নেয় প্রথমবারের মতো। স্পেন দলের উত্থান যখন হয়, দলের প্রতিটি যুদ্ধক্ষেত্রেই তার অবদান ছিলো অনেক অনেক বেশি। হার না মানা যুদ্ধ! ২০০৯ সালে কনফেডারেশন কাপ না জিততে পারলেও ২০১০ সালে ঠিকি সপ্নের ফাইনাল জিতে নেন। সাউথ আফ্রিকা ২০১০ বিশ্বকাপে প্রথম ম্যাচ থেকে প্রতিটি মিনিট মাঠে পারফর্ম করার সুযোগ পেয়েছিলেন আর তার যথাযথ কাজেও লাগিয়েছিলেন। আর তার প্রমাণ স্বরূপ সেমিফাইনালে জার্মানির বিপক্ষে একমাত্র জয়সূচক গোলটি আসে দ্যা ওয়াল পুয়োল এর হেড থেকেই! আর সেই কর্ণারের রুপকার ছিলেন জাভি হার্নান্দেজ! যেটি পুয়োলের জাতীয় দলে হয়ে ৮৯ ম্যাচে ৩ নাম্বার গোল ছিলো।
 
গোটা টুর্নামেন্টেই তিনি বুক চিতিয়ে পারফর্ম করে গেছেন। টুর্নামেন্টে শুধুমাত্র কোয়ার্টার ফাইনালে প্যারাগুয়ের সাথে ৮৪ মিনিটে মারচেনার সাথে মাত্র একবারই বদলি হিসেবে উঠে যান। দম ছিলো পাগলা ঘোড়ার মতোই। ঐযে বলছিলাম হার না মানা নেতা!
 
২০১০ ওয়ার্ল্ড কাপ ফাইনালে ১২০ মিনিট তিনি মাঠে পারফর্ম করে গেছেন। সেই ম্যাচের রেজাল্ট তো সবাই জানি আমরা। নতুন করে বলার কিছুই তো নেই। স্পেন জাতীয় দলের একমাত্র বিশ্বকাপ জয়ের অন্যতম সৈনিক ছিলেন তিনি।
 
২০১০ এর ১ই আগস্ট তিনি সিদ্ধান্ত নেন তিনি জাতীয় দলের হয়ে কম করে হলেও আরোও ২ বছর খেলবেন। ইচ্ছা পোষণ করলেও সেটি আর বাস্তবে রূপ দিতে পারেন নি এই নেতা। ডান হাটুর ইঞ্জুরির জন্যই তাকে সময়ের আগেই সরে দাঁড়াতে হয়েছে। পুয়োল ২০১৩ সালের ৬ই ফেব্রুয়ারি তার জাতীয় দলের হয়ে ১০০ তম ম্যাচে উরুগুয়ের সাথে ফ্রেন্ডলি ম্যাচের পর অবসরে যান।
 
খেলার ধরণ
প্রচণ্ড উপস্থিত বুদ্ধি-বিচক্ষণতা, মাঠে দলের বাকি খেলোয়াড়দের উপর কমান্ড করার তীব্র শক্তি, জয় করার অঙ্গীকার, বলের উপরে তার কন্ট্রোলিং এই সবকিছু মিলিয়েই বাকিদের থেকে তার খেলার ধরণ ছিলো সম্পূর্ণ আলাদা।
 
বার্সেলোনার প্রধান ডাক্তারের মতে ” তিনি ছিলেন খুবই শক্তিশালী, খুব তাড়াতাড়ি সিদ্ধান্ত নেবার প্রতিক্রিয়া এবং যার শরীরে সব থেকে বেশি বিষ্ফোরক শক্তি বিদ্যমান।
 
ক্লাবের ফ্যানরা তাকে দ্যা ওয়াল নামেই সম্মোধন করত।
 
মিগুয়েল এঞ্জেল নাদাল পুয়োল এর সাথে বেশিদিন খেলতে পারেন নি যদিও…তিনি উল্লেখ করেন –
 
“পুয়োল তার প্রতিটি ম্যাচ অত্যন্ত পরিপক্কতার সাথেই খেলে থাকেন, রয়েছে প্রতিটি খেলোয়াড় সম্পর্কে তার উপস্থিত অবস্থানগত ধারণা ও সর্বোপরি জ্ঞান।
 
পুয়োল তার নেতৃত্ব ও নীতিশাস্ত্র কাজের জন্য বিখ্যাত ছিলেন। তিনি প্রায়ই একা, একটি দলের অনুশীলন সেশন শেষে কিংবা বন্ধের দিনগুলোতে একা একা অনুশীলন করতেন। আর এটাই তাকে বাকি সবার থেকে আলাদা করে তুলেছিলো।
 
পুয়োল বলেন – “২০১০ বিশ্বকাপে আমার রোমারিও এর মতো প্রযুক্তিগত শিক্ষা কিংবা ওভারমারস এর মতো দ্রুত চলন কিংবা ক্লুইভার্ট এর মতো শক্তি কিছুই ছিলোনা। কিন্তু আমি অন্যদের তুলনায় বেশি পরিশ্রম করতাম, এমন ছিলাম যে ছাত্র খুব একটা চালাক ছিলোনা কিন্তু পরীক্ষার আগে নিজের ভুলগুলো সমাধান করতাম ও শেষ পর্যন্ত সবকিছু ঠিকঠাকভাবে করার চেষ্টা করে যেতাম। তারই সহযোদ্ধা পিকে পুয়োল সম্পর্কে বলেনঃ “পুয়োল এমন একজন, আপনি যখন মাঠে ৩-০ তে জিততে চলেছেন এবং ম্যাচ শেষ হতে কিছু সেকেন্ড বাকি আছে, তখনোও তিনি উচ্চকণ্ঠে চিৎকার করতে থাকবে এবং খেলোয়াড়দের মনোযোগ ম্যাচে রাখার চেষ্টা করে। ঠিক এই সকল বিচিত্রগত কিছু কাজের জন্যই পুয়োল নিজেকে অন্য সকল খেলোয়াড় থেকে নিজেকে অন্য উচ্চতায় নিতে পেরেছিলেন। এখন কি মনে হয়না তার খেলোয়াড়ি জীবনে তার এসব কর্মকাণ্ড একটা টিমের প্রাচীর কিংবা ওয়াল বলা চলেনা? আমার কথা বাদই দিলাম! স্পেনের সমস্ত ভক্তরা তাকে দ্যা ওয়াল নামেই সম্মোধন করত! তাদের কথাও বাদ দিলে ফুটবল ইতিহাসের বাঘা বাঘা প্লেয়ার যারা তাদের সমস্ত ক্যারিয়ার ফুটবল মাঠ দাপটের সাথে মাতিয়ে রেখেছিলেন তারাও তাকে দ্যা ওয়াল নামেই ডাকতেন।
 
বাক্তিগত জীবন
সবার ক্ষেত্রে কি হয়েছে আমি জানিনা,তবে আন্দাজ করতে পারি, আপনি যদি লম্বা, চওড়া, শক্তিশালী লোকটার দিকে তাকান প্রথমেই যে জিনিসটা আপনাকে আকৃষ্ট করবে সেটি তার লম্বা, বাদামী রঙের কার্লি চুল। সত্যি বলতে আমি পুয়োলের চুলের প্রেমে পড়েছি সেই ২০০৬ থেকেই! বর্তমানে যেটা আমাদের কাছে ক্রাশ নামেই পরিচিত! ১৯ বছর বয়সে পুয়োল যখন বার্সা সিনিয়র খেলোয়ারদের সাথে ট্রেনিং এ ব্যস্ত, তখনকার বার্সার ম্যানেজার ভ্যান গাল পুয়োল কে ডেকে বলেছিলেন “এই বালক তোমার সমস্যা কোথায়? তোমার লম্বা চুল কাটার কি সামর্থ্য নেই!
 
অনুশীলন শেষে ভ্যান গাল পুয়োল তার অফিসে ডাকলেন। “আমার এখনোও মনে আছে, আমি কিছুই বলিনি”,পুয়োল স্মরণ করলেন, “আর আমি এই দিনে আমার চুল এমন করেই রাখি”
২০০৬ সালে এক বিবৃতিতে পুয়োল বলেন, যখন তার কোনো কাজ থাকেনা তখন ওই সময়টা শান্তশিষ্ট ভাবেই অতিবাহিত করি। কিংবা আমি সাধারণত নাইট ক্লাবেও যাইনা। যখন বাইরে যাই আমি আমার বন্ধুদের সাথেই আড্ডা দিতেই পছন্দ করি। ২০০৬ সালে এক কৃষি দুর্ঘটনাতে পুয়োল এর বাবা পরলোকগমণ করেন,ওইসময়ে পুয়োল দেপোর্তিভো লা করুনার সাথে ম্যাচ খেলার জন্য পথিমধ্যে ছিলেন।গন্তব্যস্থানে পৌছানোর পরেই কোচ ফ্রাংক রাইকার্ড এর মাধ্যমেই তিনি জানতে পারেন তার বাবার মৃত্যু সংবাদ। স্প্যানিশ জাতীয় দলের ফিজিও রাউল মার্‌টিনেজ বার্সায় এসে বলেছিলেন যে এই ইঞ্জুরী আমার (পুয়োল) ক্যারিয়ারের জন্যে হুমকি হয়ে দাঁড়াবে, সে আমাকে এজন্য কিছু উপদেশ দেয়। আমি তার কথামত জীবনকে আরো বেশি করে উপভোগ করতে থাকি,আর ওইসব জিনিসে আর চিন্তিত হইনা।২০০৯ সালে গোল ডট কমে কে দেয়া এক সাক্ষাতকারে পুয়োল বলেনঃ
“আমি খুব বেশি বাইরে যেতে পছন্দ করিনা, যদিও এটি দূরত্ব সৃষ্টি করে। এবং আমি বই পড়তে পছন্দ করি। ওই বছরেরই সেপ্টেম্বরের দিকে তিনি মডেল মালেনা কস্তার সাথে সম্পর্কে জড়ান।
 
১৬ অক্টোবার ভ্যালেন্সিয়ার সাথে একটু ম্যাচে হেড দিয়ে গোল করে সেটি তার গার্লফ্রেন্ড কে উৎসর্গ করেন। যদিও ২০১২ সালে ভেনেসা লরেঞ্জো নামের এক সুন্দরীর সাথে সম্পর্কে জড়ান। ২০১৪ সালে তিনি প্রথম কন্যা সন্তানের জনক হন যার নাম রাখেন ম্যানুয়েলা ও ২০১৪ সালে মারিয়া নামের দ্বিতীয় কন্যা সন্তানের জনক হন। ২০১১ সালে ক্যান্সারে আক্রান্ত এক মহিলা মিকি রৌকি এর জন্য ৩০,০০০ ডলার দান করেন। এছাড়াও তার ব্যক্তিগত সকল খরচ তিনি বহন করেন!
 
ক্লাবের হয়ে অর্জন
১) লা-লিগাঃ ২০০৪-০৫,২০০৫-০৬,২০০৮-০৯,২০০৯-১০,২০১০-১১,২০১২-১৩ টোটাল ৬ টি।
 
২) কোপা দেল রেঃ ২০০৮-০৯,২০১১-১২ টোটাল ২ টি।
 
৩) সুপারকোপা দে স্পানাঃ ২০০৫,২০০৬,২০০৯,২০১০,২০১১,২০১৩ টোটাল ৬ টি।
 
৪) উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগঃ ২০০৫-০৬,২০০৮-০৯,২০১০-১১ টোটাল ৩ টি।
 
৫) উয়েফা সুপার কাপঃ ২০০৯,২০১১ টোটাল ২ টি।
 
৬) ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপঃ ২০০৯,২০১১ টোটাল ২ টি
 
জাতীয় দলের হয়ে অর্জন
১) ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ ২০১০
২) উয়েফা ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ানশীপ ২০০৯
৩) সামার অলেম্পিকসঃ ২০০০
৪) ফিফা কনফেডারেশন কাপঃ ৩য় স্থান
 
ব্যক্তিগত অর্জন
১) লা-লিগা ব্রেক থ্রো প্লেয়ার অফ দ্যা ইয়ারঃ ২০০১
২) ইএসএম টিম অফ দ্যা ইয়ারঃ ২০০১-০২,২০০২-০৩,২০০৪-০৫,২০০৫-০৬
৩) উএফা টিম অফ দ্যা ইয়ারঃ ২০০২,২০০৫,২০০৬,২০০৮,২০০৯,২০১০
৪) উয়েফা ক্লাব বেস্ট ডিফেন্ডারঃ ২০০৬
৫) ফিফা ওয়ার্ল্ড একাদশঃ ২০০৭,২০০৮,২০১০
৬) উয়েফা ইউরো ২০০৮ টিম অফ দ্যা টুর্নামেন্ট
৭) ২০০৯ ফিফা কনফেডারেশন কাপ টিম অফ দ্যা টুর্নামেন্ট
8) ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ ড্রিম টিম
৯) বিবিভিএ ফেয়ার প্লে এওয়ার্ডঃ ২০১১-১২
১০) উয়েফা আল্টিমেট টিম অফ দ্যা ইয়ারঃ (পাবলিশ ২০১৫)
১১) ওয়ার্ল্ড একাদশঃ টিম অফ দ্যা ২১ সেঞ্চুরি
১২)উয়েফা ইউরো অল টাইমঃ (পাবলিশ ২০১৬)
বার্সেলোনার এই মহাপ্রাচীরকে জানাই জন্মদিনের অনেক অনেক শুভেচ্ছা! শুভ জন্মদিন, কার্লেস পুয়োল!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

twenty − 12 =