কাদের দেখানো পথ অনুসরণ করলেন জ্যো হার্ট?

ক্যারিয়ারের খুব একটা ভালো সময় পার করছেন না বর্তমান ইংল্যান্ড নাম্বার ওয়ান ও ম্যানচেস্টার সিটির গোলরক্ষক জ্যো হার্ট। পেপ গার্দিওলা আসার সাথে সাথেই মোটামুটি ক্যারিয়ারে শনির দশা শুরু হয়ে গেছে তাঁর। গার্দিওলার পছন্দমাফিক বল প্লেয়িং গোলকিপার না হবার ফলে এর মধ্যেই হার্টকে বেঞ্চে বসিয়ে দিয়েছেন তিনি, তাঁর জায়গায় প্রিমিয়ার লিগে হওয়া ম্যানচেস্টার সিটির তিনটি ম্যাচেই খেলিয়েছেন আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক উইলফ্রেডো ক্যাবায়েরোকে। শুধু তাই নয়, সিটির নতুন নাম্বার ওয়ান হিসেবে বার্সেলোনা থেকে উড়িয়ে এনেছেন চিলিয়ান অধিয়ানক ক্লদিও ব্রাভো কেও। সুতরাং এটা মোটামুটি নিশ্চিত, গার্দিওলার সিটি সাম্রাজ্যের গোলবার আগলানোর গুরুদায়িত্ব থাকছে এই চিলিয়ানের হাতেই, আর তাঁর ব্যাকআপ হিসেবে থাকছেন ক্যাবায়েরো। অর্থাৎ হার্টের জায়গা নেই। এইদিকে ইংল্যান্ডের নতুন কোচ আকারে ইঙ্গিতে জানিয়েও দিয়েছেন হার্ট যদি নিয়মিত না খেলেন তবে জাতীয় দলের জায়গা নিয়েও টানাটানি পড়ে যেতে পারে তাঁর, কারণ ইংল্যান্ডের নাম্বার ওয়ান স্পটটা পাওয়ার জন্য হার্টের সাথে ক্রমাগত মোকাবিলা করে যাচ্ছেন সাউদাম্পটনের ফ্রেইজার ফরস্টার, ওয়েস্ট ব্রমের বেন ফস্টার, স্টোক সিটির জ্যাক বাটল্যান্ড, বার্নলির টম হিটনের মত গোলরক্ষকরা। তাই নিয়মিত খেলার জন্য একটা অন্য ক্লাব হার্টকে বেছে নিতে হতই। দুর্ভাগ্যবশতঃ প্রিমিয়ার লিগের কোন ক্লাবই হার্টের পরবর্তী ঠিকানা হতে পারছে না। অনেকটা আশ্চর্যজনকভাবেই ইতালিয়ান সিরি আ এর মাঝটেবিলের ক্লাব তোরিনোতে ধারে যোগ দিচ্ছেন তিনি।

ইংলিশ খেলোয়াড়দের ইতালিয়ান ক্লাবে খেলার খবর একটু কমই শোনা যায়। তাও, হার্টই প্রথম ব্যক্তি না যিনি ইংলিশ হয়েও ইতালিতে খেলছেন। এই সুযোগে এক নজরে দেখে নেওয়া যাক হার্টের আগে কোন কোন ইংরেজ করেছেন ইতালি অভিযান…

  • জেরি হিচেন্স

ইতালিতে খেলা ইংলিশদের মধ্যে মোটামুটিভাবে সবচাইতে সফল বলা যেতে পারে এই সেন্টার ফরোয়ার্ডকে। ১৯৬১-৬২ সালের দিকে ইংল্যান্ড জাতীয় দলের হয়ে ৭ ম্যাচে ৫ গোল করা এই স্ট্রাইকার মাতিয়ে গেছেন কার্ডিফ সিটি ও অ্যাস্টন ভিলার সমর্থকদের। দেশ ছেড়ে ইতালিতে গিয়েও বইয়ে দিয়েছেন গোলের বন্যা। ইন্টার মিলান, তোরিনো, আটালান্টা, ক্যালিয়ারির মত ক্লাবে মোটামুটি দুই শ’ এর কাছাকাছি ম্যাচ খেলে ষাটটার মত গোল করেছেন এই স্ট্রাইকার। ইন্টার মিলানের হয়ে একবার সিরি আ জেতা এই স্ট্রাইকার ক্যালিয়ারির ও আরেকবার ইন্টার মিলানের হয়ে গিয়েছিলেন সিরি আ জয়ের কাছাকাছি। ইন্টারের হয়ে খেলা প্রথম মৌসুমে ছিলেন ক্লাবের সর্বোচ্চ গোলদাতাও। আবার তোরিনোর হয়ে ইউরোপীয়ান কাপ উইনার্স কাপ ও কোপা ইতালিয়ার রানার্সআপ হবার কৃতিত্বও আছে তাঁর।

ইন্টারের হয়ে খেলার সময় জেরি হিচেন্স
ইন্টারের হয়ে খেলার সময় জেরি হিচেন্স
  • ডেভিড প্ল্যাট

ক্যারিয়ারে আর্সেনালের হয়ে খেলা এই মিডফিল্ডার ইংল্যান্ডের হয়ে খেলেছেন ৬২ ম্যাচ, করেছেন ২৭ গোল। বহুদিন ম্যানচেস্টার সিটির বয়সভিত্তিক দলে কোচ থাকা ও বর্তমানে ভারতের আইএসএলে পুনে সিটির দায়িত্বে থাকা এই মিডফিল্ডার ইতালি মাতিয়ে গেছেন বারি, জুভেন্টাস ও সাম্পদোরিয়ার হয়ে। বারির হয়ে ২৯ ম্যাচে ১১ গোল করে জুভেন্টাসের হয়ে এক মৌসুম খেলে ১৬ ম্যাচে ৩ গোল করা প্ল্যাট সেখানে জেতেন ইউয়েফা কাপ। পরে সাম্পদোরিয়ার হয়ে জেতেন সুপারকোপাও।

ডেভিড প্ল্যাট
ডেভিড প্ল্যাট
  • ট্রেভর ফ্র্যান্সিস

ইংল্যান্ডের এই স্ট্রাইকার সাম্পদোরিয়ার হয়ে জিতেছেন একটি কোপা ইতালিয়া। সাম্পদোরিয়ার হয়ে ৬৮ ম্যাচে ১৭ গোল করা এই স্ট্রাইকারকে অনেক সময়েই বলা হয় ইতালিতে ইংলিশ অভ্যুত্থানের অন্যতম কারিগর।

  • পল ইনস

ইংলিশ মিডফিল্ডার পল ইনস হলেন সেই বিরল প্রজাতির মিডফিল্ডার যিনি কিনা দুই চিরশত্রু ইংলিশ জায়ান্ট লিভারপুল ও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড দুই দলের হয়েই খেলেছেন। এই দুই দলের হয়ে খেলার মাঝে তিনি দুই মৌসুম খেলে এসেছিলেন ইতালিতে, ইন্টার মিলানের হয়ে। ইন্টারের হয়ে ৫৪ ম্যাচে ১০ গোল করা এই মিডফিল্ডার দুইবছর পরদেশে থাকার পর ফিরে আসেন নিজভূমে, লিভারপুলের হয়ে।

এসি মিলানের রবার্তো বাজ্জিওর সাথে ইন্টারের পল ইনস
এসি মিলানের রবার্তো বাজ্জিওর সাথে ইন্টারের পল ইনস
  • জ্যো বেকার

ইংল্যান্ডের হয়ে ১৯৫৯-৬৬ এই সময়কালে খেলা এই স্ট্রাইকার ইতালিতে খেলে গেছেন তোরিনোর হয়ে, সেখানে ১৯ ম্যাচে করেছেন ৭ গোল। তোরিনো ছাড়ার পর আর্সেনাল ও নটিংহ্যাম ফরেস্টের হয়ে মাঠ মাতিয়েছেন তিনি।

  • চার্লস অ্যাডকক

১৯৪৯ থেকে ১৯৫১ সালের মধ্যে পাদোভা ও ট্রিয়েস্টিনার হয়ে ২০টি করে ম্যাচ খেলা এই ইংলিশ স্ট্রাইকারের ইতালিতে গোলসংখ্যা ১১।

  • ডেভিড বেকহ্যাম

ইতালিতে খেলা ইংলিশদের মধ্যে তর্কাতীতভাবে সবচাইতে জনপ্রিয় নাম। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের এই কিংবদন্তী রিয়াল মাদ্রিদ ছাড়ার পর যখন লস অ্যাঞ্জেলস গ্যালাক্সীতে যোগ দিলেন, তখন মেজর লীগ সকারের মৌসুম শেষে পরপর দুইবার সিরি আ তে ধারে খেলতে এসেছিলেন এসি মিলানের হয়ে। দুই দফায় মোটামুটি মিলানের হয়ে ২৯টা মত ম্যাচ খেলা ডেভিড বেকহ্যাম গোল করেছিলেন দুটি।

AC+Milan+v+AC+Siena+Serie+A+Eqgss_w8uHul

  • পল রাইডআউট

ইংলিশ এই স্ট্রাইকার ১৯৮৫ থেকে ১৯৮৮ সালের মধ্যে ইতালিয়ান ক্লাব বারির হয়ে ৯৯ ম্যাচ খেলে গোল করে গেছেন ২৩টি।

  • পল গ্যাসকোয়েন

ইংল্যান্ডের ইতিহাসের অন্যতম প্রতিভাবান ও জনপ্রিয় এই মিডফিল্ডার পল “গাজ্জা” গ্যাসকোয়েন ইংল্যান্ডে নিউক্যাসল ইউনাইটেড ও টটেনহ্যাম হটস্পার মাতানোর পর সিদ্ধান্ত নেন ইতালিতে যাওয়ার, লাজিওর হয়ে খেলার জন্য। ৫.৫ মিলিয়ন পাউন্ডের বিনিময়ে ১৯৯২ সালে লাজিওতে যোগ দেওয়া এই মিডফিল্ডারের ইতালি অভিযান সেরকম ভালো কাটেনি, ৪৩ ম্যাচে করেছেন ৬টি গোল, জিততে পারেননি কোন ট্রফি।

রোম ডার্বিতে রোমার বিরুদ্ধে শেষ মিনিটে গোল করে ড্র এনে দেওয়ায় দলের সমর্থকদের নয়নের মণিতে পরিণত হয়েছিলেন পল গ্যাসকোয়েন
রোম ডার্বিতে রোমার বিরুদ্ধে শেষ মিনিটে গোল করে ড্র এনে দেওয়ায় দলের সমর্থকদের নয়নের মণিতে পরিণত হয়েছিলেন পল গ্যাসকোয়েন
  • মার্ক হেইটলি

১৯৮৪ সালে ১ মিলিয়ন পাউন্ডের বিনিময়ে ইংলিশ ক্লাব পোর্টসমাথ থেকে এসি মিলানে যোগ দেওয়া এই স্ট্রাইকার তাঁর ইংল্যান্ড ক্যারিয়ারে ৩২ ম্যাচে করেছেন ৯ গোল।

  • জিমি গ্রিভস

ইংল্যান্ড ইতিহাসের অন্যতম কিংবদন্তীতূল্য এই স্ট্রাইকার চেলসি ও টটেনহ্যাম হটস্পারের হয়েও কিংবদন্তীসম। তবে এই দুই ক্লাবের মাঝে তিনি বিদেশে পাড়ি জমিয়ে খেলে এসেছিলেন এসি মিলানের হয়েও। সেখানে ১২ ম্যাচে ৯ গোল ও সিরি আ জয় প্রমাণ করে গোলের ধারা তাঁর অব্যাহত ছিল সেখানেও। কিন্তু বিদেশী জীবনযাপনের সাথে মানিয়ে না নিতে পারার জন্য মাত্র এক মৌসুম পরেই টটেনহ্যামে যোগ দেন তিনি।

জিমি গ্রিভস
জিমি গ্রিভস
  • গর্ডন কোয়ান্স

১৯৮৫ সালে অ্যাস্টন ভিলা থেকে বারিতে যোগ দেওয়া এই ইংলিশ মিডফিল্ডার তিন মৌসুমে মোটামুটি ৯৪ ম্যাচ খেলে গোল করেন ৩টি।

  • রে উইলকিন্স

চেলসি ও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিখ্যাত এই মিডফিল্ডার ১৯৮৪ সালে যোগ দেন এসি মিলানে। সেখানে ৭৩ ম্যাচ খেলে তাঁর গোলের সংখ্যা ২টি।

মিলানের হয়ে খেলার সময় রে উইলকিন্স
মিলানের হয়ে খেলার সময় রে উইলকিন্স
  • জনি জর্ডান

১৯৪৯ সালে টটেনহ্যাম মাতিয়ে জুভেন্টাসে যোগ দেওয়া এই ইংলিশ স্ট্রাইকার সিরি আ তে জুভদের হয়ে ২০ ম্যাচ খেলে গোল করেছেন ৫টি।

  • টনি মার্চি

১৯৫৭ সালে আবার টটেনহ্যাম থেকে ভিসেনজায় যোগ দেওয়া এই উইং হাফ পরে খেলেছেন তোরিনোতেও। দুই ক্লাবে দুই মৌসুম থেকে ৬০টারও বেশী ম্যাচ খেলে গোল করেছেন ১০টার অধিক।

  • লুথার ব্লিসেট

এই ভদ্রলোকের নামে একটা কাহিনী শোনা যায়, এসি মিলান বলে আসলে ব্লিসেটকে না, তাঁর ওয়াটফোর্ড সতীর্থ (পরে লিভারপুল কিংবদন্তী) জন বার্নসকে দলে আনতে চেয়েছিল। কিন্তু দুইজনের চেহারায় কনফিউজ হয়ে গিয়ে ব্লিসেটকেই দলে টানে। যদিও পরে এই গল্পটা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। তা যাই হোক। ওয়াটফোর্ডের বিখ্যাত এই স্ট্রাইকার কিন্তু মিলানে গিয়ে দর্শকদের মন জয় করতে পারেননি, ৩০ ম্যাচে করেছিলেন মাত্র ৫ গোল। পরে মিলান থেকে আবার ওয়াটফোর্ডে ফেরত যান তিনি।

লুথার ব্লিসেট
লুথার ব্লিসেট
  • জ্যে বথরয়েড

আর্সেনালের যুবদলের এই খেলোয়াড় ২০০৩ থেকে দুই মোউসুম খেলে গেছেন ইতালিয়ান ক্লাব পেরুজিয়ায়। ২৬ ম্যাচে ৪ গোল করেছেন, বলা বাহুল্য, ফ্লপের তকমাই জুটেছিল তাঁর গায়ে।

  • ড্যানি ডিচিও

১৯৯৬ সালে সাম্পদোরিয়া ও পরে লেচ্চে তে যোগ দেওয়া এই স্ট্রাইকার সেরকম কিছুই করতে পারেননি ইতালিতে। দুই ক্লাবের হয়ে ১২ ম্যাচে করেছেন ৪ গোল।

  • পল এলিয়ট

১৯৮৭ সালে অ্যাস্টন ভিলা থেকে পিসা তে যোগ দেওয়া এই ডিফেন্ডার দুই মৌসুমে ২৩ট্রা মত ম্যাচ খেলেছিলেন। পরে যোগ দেন সেল্টিকে।

  • দেস ওয়াকার

নটিংহ্যাম ফরেস্ট ও শেফিল্ড ওয়েনসডের এই বিখ্যাত হার্ড-ট্যাকলিং সেন্টারব্যাক ১৯৯২ সালের দিকে এক মৌসুম খেলে এসেছিলেন সাম্পদোরিয়ার হয়ে, বিশেষ কিছু করতে পারেননি।

  • অ্যাশলি কোল

বর্তমান সময়ের ইংল্যান্ডের অন্যতম জনপ্রিয় এই লেফটব্যাক চেলসি থেকে ২০১৪ সালে যোগ দেন এএস রোমায়। রোমায় সময়টা ভালো কাটেনি তাঁর, মাত্র ১১ ম্যাচ খেলেই তাই পাড়ি কমাতে হয় লস অ্যাঞ্জেলস গ্যালাক্সিতে।

রোমায় সময়টা ভালো কাটেনি অ্যাশলি কোলের
রোমায় সময়টা ভালো কাটেনি অ্যাশলি কোলের
  • লি শার্প

ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিখ্যাত এই ডিফেন্ডার ১৯৯৮ সালে ধারে এক মৌসুম খেলে এসেছিলেন সাম্পদোরিয়ায়, খেলেছিলেন মাত্র ৩ ম্যাচ।

  • মাইকা রিচার্ডস

বর্তমানে অ্যাস্টন ভিলার হয়ে খেলা এই ডিফেন্ডার ২০১৪ সালে এক মৌসুমের জন্য ম্যানচেস্টার সিটি থেকে ধারে ফিওরেন্টিনায় যোগ দিয়েছিলেন, খেলেছেন ১০টার মত ম্যাচ।

  • ফ্র্যাঞ্জ কার

১৯৯৬ সালে অ্যাস্টন ভিলা থেকে রেজিয়ানায় যোগ দেওয়া এই স্ট্রাইকার ৬ ম্যাচ খেলে গোলের খাতা খুলতে পারেননি ইতালিতে।

  • ন্যাথানিয়েল চালোবাহ

২০১৫ সালে ধারে চেলসি থেকে নাপোলিতে এক মৌসুম কাটিয়ে আসা এই ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার খেলেছিলেন ৫টা ম্যাচ, সেরক্ম উল্লেখযোগ্য কিছু করতে পারেননি।

  • র‍্যাভেল মরিসন

২০১৫ সাল থেকে ইতালির লাজিওতে খেলা সাবেক ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের এই তরুণ প্রতিভা এখনো ইতালিতে নিজের তথাকথিত প্রতিভার অপচয় করেই যাচ্ছেন।

এখন দেখা যাক, জ্যো হার্টের কপালে কি ট্রেভর ফ্র্যান্সিস বা ডেভিড প্ল্যাটের মত ভাগ্য লেখা আছে, না মাইকা রিচার্ডস বা র‍্যাভেল মরিসনের মত বৃথাই যাবে তাঁর ইতালি অভিযান!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

three × one =