কাজমিরিজ ডেনা : পোলিশ ফুটবলের কিংবদন্তীর কথা

কাজমিরিজ ডেনা : পোলিশ ফুটবলের কিংবদন্তীর কথা

বর্তমানে ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী দল হল পোল্যান্ড। রবার্ট লেফান্ডফস্কি, আরকাদিউশ মিলিকের হাত ধরে শুধু ইউরোপ নয় গোটা বিশ্বের মধ্যে অন্যতম একটি শক্তিশালী দল এখন পোলিশরা। অনেকেই বর্তমান পোলিশ দলকে তাদের ইতিহাসের অন্যতম সেরা দল বলে। কিন্তু সত্যিকার অর্থে ১৯৭০ -১৯৮০ এই সময়ের পোলিশ দলকে তাদের গোল্ডেন জেনারেশন বলা হয়। জেগর্জ লাটো, জন টমাসজোয়েস্কি, লোডজিমিয়েরজ লুবান্সকি এই নাম গুলোর কারনেই তখনকার পোলিশ দলকে তাদের ইতিহাসের অন্যতম সেরা দল বলা হত। কিন্তু তাদের নামের পাশে আরো একজন নায়ক আছেন যাকে পোলিশ ফুটবলের সর্বকালের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় ভাবা হয়। আর এই দুর্ভাগা খেলোয়াড়টি হলেন কাজমিরিজ ডেনা।

১৯৪৭ সালের ২৩ অক্টোবর পোল্যান্ডের শহর স্টুগার্ড ডিয়ান্সকি নামক শহরে জন্মগ্রহণ করেন কাজমিরিজ ডেনা। ডেনার পরিবারের সাথে ফুটবলের একটি বন্ধন ছিল। ডেনার বেলায় তার ব্যতিক্রম হয় নি। দশ বছর বয়সে ডেনা স্টুগার্ড ডিয়ান্সকির একটা লোকাল ক্লাবে ভর্তি হন। সেখানেই বিকাশ ঘটে তার প্রতিভার। স্টুর্গাডে যখন নিজেকে মেলে ধরতে শুরু করেছেন ঠিক তখনি পোল্যান্ডের বয়সভিত্তিক দলে সুযোগ পেয়ে যান। যার ফলে ইউরোপের প্রথম সারির কয়েকটা দলের নজরে পড়ে যান। ১৯৬৬ সালে ডেনার ১৮তম জন্মদিনের ঠিক কয়েকদিন আগে পোল্যান্ডের প্রথম সারির দল এলকেএস লর্ডজ তাকে দলে টেনে নেয়। এলকেএস লর্ডজে কিছুদিন খেলার পর পোল্যান্ডের অন্যতম সেরা দল লেগিয়া ওয়ার্সও ডেনাকে দলে ভেড়ায়। লেগিয়ার নতুন কোচ জেরুসলাভ ভেজভুদার অধীনে নিজেকে আরো পরিপক্ক করে তুলেন কাজমিরিজ ডেনা।

লেগিয়া ওয়ার্সও এর হয়ে নিজের প্রথম মৌসুমে ১২ ম্যাচে ৬ গোল করেন তিনি। সে মৌসুমে লেগিয়া ওয়ার্সও লীগে ৪র্থ এবং পোলিশ কাপের শিরোপা জিতে। কিন্তু এরপরেই ডেনার ক্যারিয়ারে শুরু হয় দুর্দিন। নিয়মিত পার্টি এবং রাতে ক্লাবে যাওয়ার ফলে প্রতিনিয়ত ট্রেনিং অনুপস্থিত থাকতেন। ওয়ার্সও কোচ ডেনার প্রতি ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে মিলিটারি জেলে পাঠিয়ে দেন। সেখানে কিছুদিন থাকার পর নিজের ক্যারিয়ারে অনেক পরিবর্তন আনেন কাজমিরিজ ডেনা। নিজের আচরণের উন্নতি করে আরো পরিপক্ক হয়ে দলে ফিরেন ।

সে মৌসুমে ডেনার হাত ধরে ১২ বছর পর শিরোপা জিতে লেগিয়া ওয়ার্সও। লিগে ২৬ ম্যাচে ১২ গোল, পোলিশ কাপে ৬ ম্যাচে ৫ গোল জানান দেন পোলিশদের নতুন কিংবদন্তী চলে এসেছে। লেগিয়া ওয়ার্সও এ খেলার ১৮ মাসের মধ্যে প্রথম বারের মত পোল্যান্ডের জাতীয় দলে সুযোগ পেয়ে যান কাজমিরিজ ডেনা।

১৯৭১ সালে কজিমিরিজ গর্রস্কি পোল্যান্ড জাতীয় দলের কোচ হয়ে আসার পর ডেনার প্যারফরম্যান্সে ব্যাপক উন্নতি হয়। গর্রস্কি ১৯৫৬ -১৯৭০ একধারে ১৪ বছর পোল্যান্ডের বয়সভিত্তিক দলের কোচ ছিলেন। যার ফলে তার অধীনে প্রত্যেক তরুণ খেলোয়াড় নিজেকে প্রমাণ করতে পেরেছেন। ১৯৭২ অলিম্পিকে পোল্যান্ড জাতীয় দল অংশগ্রহণ করে। সে সময় বেশিরভাগ দল তাদের মূল স্কোয়াড অলিম্পিকে না খেলানোয় পোল্যান্ডের শিরোপা জেতার আশা বেড়ে যায়। কাজমিরিজ ডেনা, জের্গজ লাটো, ফ্রি স্কোরিং স্টাইকার লোবান্সকিকে নিয়ে গড়া পোল্যান্ড দল হাঙ্গেরীকে হারিয়ে প্রথমবারের মত শিরোপা জিতে নেয়। যদিও ফাইনালে হাঙ্গেরীকে হারানো তেমন সহজ ছিল না। সেসময়কার হাঙ্গেরী দল ইউরোপ তথা গোটা বিশ্বের জন্য অন্যতম ভয়ংকর দল ছিল। তাছাড়া হাঙ্গেরীর সামনে অলিম্পিকে ৩য় বারের মত চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সুযোগ ছিল।

১০ সেপ্টেম্বর ১৯৭২ মিউনিখে ৮০ হাজার দর্শকের সামনে ফাইনালে মুখোমুখি হয় পোল্যান্ড এবং হাঙ্গেরী। ম্যাচের প্রথমার্ধে হাঙ্গেরীর ১৯ বছর বয়সি স্ট্রাইকার বেলা ভারার্দির গোলে এগিয়ে যায় হাঙ্গেরী। দ্বিতীয়ার্ধের কয়েক মিনিটের মাথায় হাঙ্গেরীর ডিফেন্ডারকে বোকা বানিয়ে অসাধারণ গোল করেন কাজমিরিজ ডেনা। ম্যাচে ১-১ সমতায় ফিরে পোল্যান্ড। ২০ মিনিট পর লোবান্সকির গোলে প্রথমবারের মত অলিম্পিকে গোল্ড মেডেল জিতে নেয় পোলিশরা।

অলিম্পিক গোল্ড মেডেল জেতার পরেই পোল্যান্ডকে ১৯৭৪ বিশ্বকাপের কোয়ালিফাইং পর্বে নামতে হয়। কোয়ালিফাইং পর্বে পোল্যান্ডকে শক্তিশালী ইংল্যান্ড এবং ওয়েলসের সাথে মুখোমুখি হতে হয়। প্রথম ম্যাচে ওয়েলসকে হারিয়ে বিশ্বকাপের আশা বাঁচিয়ে রাখে গর্রস্কির দল। শেষ ম্যাচে ইংল্যান্ডের সাথে তাদের এক পয়েন্ট দরকার ছিল এবং সে ম্যাচে ইংল্যান্ডের সাথে গোলশূন্য ড্র করে বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে জায়গা করেন পোল্যান্ড।

১৯৭৪ বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে দুই পরাশক্তি আর্জেন্টিনা, ইতালি এবং নবাগত হাইতির মুখোমুখি হয় পোল্যান্ড। গর্রস্কির মাস্টারমাইন্ড ট্যাক্টিক্স এবং ডেনার অসাধারণ প্যারফরম্যান্সে আর্জেন্টিনাকে ৩-২ গোলে, হাইতিকে ৭-০ গোলে এবং ইতালির সাথে ১-১ গোলে ড্র করে পরের রাউন্ডে জায়গা করে নেয় পোল্যান্ড।

দ্বিতীয় রাউন্ডে গ্রুপ বি তে পোল্যান্ডের মুখোমুখি হয় পশ্চিম জার্মানি, সুইডেন এবং যুগোস্লাভিয়া। গ্রুপ বি এর প্রথম ম্যাচে লাটোর দেয়া একমাত্র গোলে সুইডেনকে ১-০ গোলে হারায় পোল্যান্ড। দ্বিতীয় ম্যাচে যুগোস্লাভিয়ার সাথে প্রথম হাফে ডেনার করা পেনাল্টি গোলে এগিয়ে যায় পোল্যান্ড। যদিও কয়েক মিনিট পর ম্যাচে সমতায় ফিরে আসে যুগোস্লাভিয়া। শেষ দিকে ডেনার অসাধারণ পাসে ম্যাচের জয়সূচক গোল করেন আগের ম্যাচের নায়ক লাটো।

কাজমিরিজ ডেনা : পোলিশ ফুটবলের কিংবদন্তীর কথা

দুই ম্যাচে দুই জয় নিয়ে পোল্যান্ড এক ধাপ দূরে ছিল বিশ্বকাপ ফাইনালের। কিন্তু ভাগ্যের কাছে হার মানতে হয় পোল্যান্ডের গোল্ডেন জেনারেশনকে। গার্ড মুলারের দেয়া একমাত্র গোলে পোল্যান্ডকে হারিয়ে ফাইনালে জায়গা করে নেয় পশ্চিম জার্মানি। তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে লাটোর দেয়া একমাত্র গোলে ব্রাজিলকে ১-০ গোলে হারিয়ে শেষ হয় পোল্যান্ডের ঐতিহাসিক বিশ্বকাপ।

বিশ্বকাপে ডেনার অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্স এবং দুর্দান্ত নেতৃত্ব ১৯৭৪ সালের ফিফা ব্যালন ডি অর ( ফিফা বর্ষসেরা খেলোয়াড়) এর সেরা তিনে  তাঁকে জায়গা করে দেয়।

কিন্তু ১৯৮৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর একটি মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় মাত্র ৪২ বছরে না ফেরার দেশে চলে যান কাজমিরিজ ডেনা। লেগিয়া ওয়ার্সও ডেনার স্বরণে তাদের ১০ নাম্বার জার্সি আজীবনের জন্য তুলে রেখেছে। কিন্তু কালের পরিক্রমায় পুরো ফুটবল বিশ্ব এই কিংবদন্তীকে ভুলে যেতে পারেন কিন্তু ফুটবল পিচে তার সাফল্য এবং নেতৃত্বের গুণাবলি প্রত্যেক পোলিশদের কাছে গর্বের এবং আদর্শের।

লেখক – জুয়েল আহমেদ লিপু

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

twelve − eleven =