ওয়েইন রুনি এখনো ফুরিয়ে যাননি : এভারটনের কথকতা

ওয়েইন রুনি এখনো ফুরিয়ে যাননি : এভারটনের কথকতা

ওয়েইন রুনি। আধুনিক ইংলিশ ফুটবলের সবচেয়ে বড় সুপারস্টার তর্কযোগ্যভাবে। ইংল্যান্ড জাতীয় দল ও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের ইতিহাসের সর্বাধিক গোলদাতা হলেও গত বেশ কয়েকবছর ধরেই ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের মূল একাদশের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিলেন না তিনি আর, যেরকমটা তিনি স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের অধীনে ছিলেন। ফার্গুসন যাওয়ার পর ডেভিড ময়েস, লুই ভ্যান হাল, কিংবা হালের হোসে মরিনহো – কোন কোচের অধীনেই ইউনাইটেডের অবিচ্ছেদ্য অংশ ভাবা হত না তাঁকে। বয়স বাড়ছিলো আস্তে আস্তে, সাথে ফর্মহীনতাও ছিল। তাছাড়া দলে ইতোমধ্যে চলে এসেছিলেন জলাতান ইব্রাহিমোভিচ, মার্কাস র‍্যাশফোর্ড, অ্যান্থনি মার্সিয়ালের মত তারকারা। ফলে মূল একাদশ থেকে আস্তে আস্তে জায়গা হারাতে হারাতে এই মৌসুমে তাঁকে দল থেকেই বাদ দিয়ে দিয়েছে, পাঠিয়ে দিয়েছে তাঁর বাল্যকালের ক্লাব এভারটনে। কারণ, রুনি বলে ইউনাইটেডের মত ক্লাবের প্রত্যাশা পূরণ করার মত খেলতে পারছিলেন না। রুনিকে সরিয়ে ওদিকে সেই এভারটন থেকেই বেলজিয়ান সুপারস্টার স্ট্রাইকার রোমেলু লুকাকুকে দলে নিয়ে আসে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড

এ মৌসুমে এভারটনও দল গঠন করার জন্য খরচ করেছে প্রচুর। ডিফেন্সে মাইকেল কিন আর কুকো মার্টিনা, গোলরক্ষকের জায়গায় জর্ডান পিকফোর্ড, মিডফিল্ডে গিলফি সিগুর্ডসন-নিকোলা ভ্লাসিচ-ডেভি ক্লাসেন, স্ট্রাইকে ওয়েইন রুনি-স্যান্দ্রো রামিরেজ-হেনরি ওনিয়েকুরু ; একরকম নিজেদেরকে ঢেলেই সাজিয়েছে এভারটন। কিন্তু এত খরচ করার পরেও কোচ রোনাল্ড ক্যোম্যানের অধীনে সেভাবে পারফর্ম করতে পারছিলোনা তারা। লিগ অর্ধেক শেষ হতে না হতেই পড়ে গিয়েছিল রেলিগেশনের বেড়াজালে। ফলে ছাঁটাই হতে হয় কোচ কোম্যানকে, তাঁর জায়গায় দলে আসেন স্যাম অ্যালার্ডাইস। অ্যালার্ডাইসের অধীনে এই গত কয়েক ম্যাচে নিজেদের খুঁজে পেয়ে রেলিগেশনের খড়্গ থেকে আপাতত মুক্তি পেয়েছে এভারটন।

ওয়েইন রুনি এখনো ফুরিয়ে যাননি : এভারটনের কথকতা
কোচ স্যাম অ্যালার্ডাইসের সাথে

দল খারাপ পারফর্ম করছিলো বলে এই জিনিসটা সেরকম কারোরই নজরে আসেনি যে ওয়েইন রুনি নিঃশব্দে কত ভালো খেলছেন। নিজের কাজটা ঠিকই করে যাচ্ছিলেন। নীরবে-নিভৃতে প্রমাণ করে যাচ্ছিলেন (এবং যাচ্ছেন) যে তিনি এখনো ফুরিয়ে যাননি।

প্রিমিয়ার লিগের এই মৌসুমের অর্ধেক শেষ, অর্থাৎ ম্যাচ শেষ হয়েছে ১৮টা। এই ১৮ ম্যাচের মধ্যে রুনি খেলেছেন ১৫টা ম্যাচ, গোল দিয়েছেন ১০টা, গোলসহায়তা ১টি। গোলমুখ বরাবর ৫৭% শট গোলে রূপান্তরিত হয়েছে। সফল পাস দেওয়ার হার ৭৭%। সবচেয়ে বেশী চোখে পড়েছে যেটা, সেটা হল ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে থাকাকালীন সময়ের মত শুধু স্ট্রাইকেই খেলছেন না তিনি, নিয়মিত খেলছেন মিডফিল্ডের বিভিন্ন পজিশানে। এই মৌসুমে রুনিকে দেখা গেছে ৪-৪-২ ফর্মেশানে স্ট্রাইকার হিসেবে, ৩-৪-২-১ ফর্মেশানে ইনসাইড ফরোয়ার্ড/উইঙ্গার হিসেবে, ৪-২-৩-১ ফর্মেশানে অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার হিসেবে, ৪-১-৪-১ ফর্মেশানে সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার হিসেবে। বিশেষত নতুন কোচ স্যাম অ্যালার্ডাইসের অধীনে ওয়েইন রুনি নিজেকে দলের মূল খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন, তাঁকে ঘিরেই এভারটনের পরিকল্পনা রচিত হচ্ছে। রুনিকে ঘিরেই পরিচালিত হচ্ছে সকল আক্রমণ। সেটা রুনি স্ট্রাইকার হিসেবে খেললেও, বা না খেললেও।

ওয়েইন রুনি এখনো ফুরিয়ে যাননি : এভারটনের কথকতা
৩-৪-২-১ ফর্মেশানে রুনি

বয়স বেড়েছে, এখন আর চিতাবাঘের ক্ষিপ্রতায় প্রতিপক্ষের ডিবক্সে গোলশিকারীর ভূমিকায় দেখা যায় না তাঁকে। বরং রুনির ক্ষমতার অন্যান্য দিকগুলো ব্যবহার করছেন কোচ স্যাম অ্যালার্ডাইস ; অত্যন্ত চতুরভাবে, আর এটার সুফলও পাচ্ছে এভারটন, পাচ্ছেন ওয়েইন রুনি নিজেও। এমনিতেই কোচ স্যাম অ্যালার্ডাইসের ইতিহাস আছে অধিক বয়সী সুপারস্টারদেরকে ক্যারিয়ারের শেষবেলায় নিজের দলে নিয়ে এসে তাদের কাছ থেকে চতুরভাবে সেরাটা বেশ করে নিয়ে আসার, ওয়েইন রুনি সেই তালিকার সর্বশেষ সংযোজন। এর আগে বোল্টনের ম্যানেজার যখন ছিলেন অ্যালার্ডাইস, তখন এভাবেই ফরাসী সুপারস্টার ইউরি জুরকায়েফ, নাইজেরিয়ান সুপারস্টার জে-জে ওকোচা এদেরকে ক্যারিয়ারের শেষদিকে বোল্টনে নিয়ে এসে তাদের ক্যারিয়ার দীর্ঘায়িত করেছিলেন অ্যালার্ডাইস, লাভবান হয়েছিল বোল্টন। এবার সেই লাভটাই পাচ্ছে এভারটন, ওয়েইন রুনির ক্ষেত্রে।

ওয়েইন রুনি এখনো ফুরিয়ে যাননি : এভারটনের কথকতা
৪-২-৩-১ ফর্মেশানে রুনি

ওয়েইন রুনি আর অ্যালার্ডাইস দুজনেই ব্যাপারটা মেনে নিয়েছেন যে রুনিকে এখন আর দলের মূল স্ট্রাইকার হিসেবে খেলানো যাবেনা। ফলে রুনি এখন খেলছেন একটু নিচে। ফলে দলের আক্রমণ গঠনের সময় রুনি আগের থেকে অনেক বেশী সক্রিয়ভাবে সংশ্লিষ্ট থাকেন। সেন্ট্রাল মিডফিল্ডের সাথে রুনির যোগাযোগটা হয় এখন আগের থেকে অনেক বেশী, স্ট্রাইকিং পজিশানে থাকা ডমিনিক ক্যালভার্ট-লুইন কিংবা ওমর নিয়াসেকে চূড়ান্ত পাসটা রুনি অ্যাটাকিং মিডফিল্ড বা সেন্ট্রাল মিডফিল্ড থেকেই দেন। রুনি নিজে নিচে থেকে ক্যালভার্ট-লুইন বা নিয়াসের মত অধিক দ্রুতগতির স্ট্রাইকারকে ডিবক্সে খেলার জায়গা করে দেন, যেটা এখনো পর্যন্ত এভারটনের ফর্মে ফেরার মূল রেসিপি।

ওয়েইন রুনি এখনো ফুরিয়ে যাননি : এভারটনের কথকতা
৪-৪-২ ফর্মেশানে রুনি

রুনির সাথেই এই মৌসুমে দলে আসা অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার গিলফি সিগুর্ডসনের সাথেও রুনির বোঝাপড়া বেড়েছে অনেক, যা রোনাল্ড ক্যোম্যানের আমলে ছিলনা। ফলে সুবিধা পাচ্ছেন দলের স্ট্রাইকাররা। মিডফিল্ড থেকে বল নিয়ে আবারও মিডফিল্ডে পাস দিয়ে বল পাঠিয়ে নিজে সুবিধাজনক অবস্থানে গিয়ে, প্রতিপক্ষ ডিফেন্সের ফাঁকফোকরে গিয়ে আবার মিডফিল্ড থেকে পাস নিয়ে আক্রমণে বল পাঠানো, এরকম খেলা এখন রুনির স্টাইলের অবিচ্ছেদ্য অংশ। স্যাম অ্যালার্ডাইস সবসময় দলকে লম্বা লম্বা পাসে খেলাতে পছন্দ করেন বিধায় রুনি নিজে নিচে নেমে স্ট্রাইকিং পজিশানে নিখুঁত লম্বা পাস পাঠাতে পারেন, ফলে অ্যালার্ডাইসের স্টাইলের সাথে রুনির স্টাইলের সংঘর্ষও হচ্ছেনা। ফলে রুনিই হয়েছেন এখন এভারটনের আক্রমণের মূল কেন্দ্রবিন্দু। দলের সবাই তাঁকে পাস দিয়ে আক্রমণে ওঠেন, তাঁর কাছ থেকে পাস নিয়ে আক্রমণ করার কথা চিন্তা করেন।

ওয়েইন রুনি এখনো ফুরিয়ে যাননি : এভারটনের কথকতা
এভারটনে এখন পর্যন্ত সফল রুনি

এই পরিবর্তিত ওয়েইন রুনি কে আটকানোর অন্যতম পথ হল রুনির পাস দেওয়ার সম্ভাব্য পথগুলোকে প্রেস করে বন্ধ করে দেওয়া। রুনির পাস দেওয়ার পথগুলোকে বন্ধ না করে যদি রুনির উপরে চার্জ বা প্রেস করতে যান, তাহলে অবশ্যই আপনি কোন ফল পাবেন না, কারণ সবসময়েই ওয়েইন রুনি ভীষণভাবে শক্তিশালী একজন খেলোয়াড়, তাই তাঁর উপর চার্জ আসলে হয় তিনি তাঁর শক্তি দিয়ে ঐ চার্জকে নস্যাৎ করবেন, নাহয় চার্জ সহ্য করে নিচে নেমে ঠিকই নিজের নিখুঁত বুদ্ধিদীপ্ততার সাথে বল সামনে পাস দিয়ে দেবেন। তাই তাঁকে নিষ্ক্রিয় করার উপায় এখন তাঁর পাসিং পাথগুলোকে প্রেস করে বন্ধ করে দেওয়া, যে কাজটা নিউক্যাসল কিছুদিন আগে বেশ ভালোভাবেই করেছিল।

রুনিকে দলে আনা হয়েছিল যাতে তিনি একটু নিচে খেলেন, অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার হিসেবে, যাতে দলের আক্রমণ গঠনে তাঁর একটা সক্রিয় ভূমিকা থাকে। এ পর্যন্ত তাঁর ১০ গোল আর ১ অ্যাসিস্ট প্রমাণ করে তাঁর এই কাজে তিনি ইতোমধ্যেই লেটার গ্রেড সহকারে পাস করে গেছেন।

ওয়েইন রুনি এখনো ফুরোননি, অবশ্যই নয়!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

two + nineteen =