ওলে গানার সোলস্কায়ার : কার্যকরী এক সুপার সাব-কথন

ওলে গানার সোলস্কায়ার : কার্যকরী এক সুপার সাব-কথন
(১)
ছিয়ানব্বইয়ের কথা। তখন ব্রিটেন কাঁপছে শিয়ারার-জ্বরে। এক বছর আগে ব্ল্যাকবার্ন রোভার্সের হয়ে ইংলিশ লিগ শিরোপা জেতা এই কিংবদন্তী স্ট্রাইকার নিজ দেশে হওয়া ইউরোতেও কাঁপিয়েছেন প্রতিপক্ষদের, পাঁচ গোল করে জিতে নিয়েছেন টুর্নামেন্টের গোল্ডেন বুট। তাঁকে নেওয়ার জন্য বাঘা বাঘা ক্লাবগুলো লাইন লাগিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবেই। সেটা হয়েছিলও। শিয়ারারের জন্য হাপিত্যেশ করছিলো ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, নিউক্যাসল ইউনাইটেডের মত ক্লাবগুলো। স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন শিয়ারারকে বানিয়েছিলেন সেই দলবদলের বাজারে নাম্বার ওয়ান টার্গেট, শিয়ারারকে ভেবে রেখেছিলেন এরিক ক্যান্টোনার যোগ্য পার্টনার হিসেবে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে ব্ল্যাকবার্ন রোভার্সের মালিকের শিয়ারারকে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের কাছে বিক্রি করার অনীহা এবং শিয়ারারের নিজের ছোটবেলার পছন্দের ক্লাব নিউক্যাসল ইউনাইটেডে যাওয়ার আগ্রহের বিষয়টা মিলিয়ে শিয়ারারের পরবর্তী ঠিকানা শেষ পর্যন্ত জর্ডিদের কাছেই হয়। বছর চারেক আগে সাউদাম্পটন থেকে যেরকম শিয়ারারকে ইউনাইটেডে আনতে পারেননি, ঠিক এরইরকম ভাবে এবারও শিয়ারারের গায়ে লাল জার্সি চড়াতে ব্যর্থ হলেন ফার্গুসন।
 
সমর্থকরাও হতাশ। শ্মাইকেল, নেভিলদের শক্ত ডিফেন্সের সামনে স্কোলস, গিগস, বেকহ্যাম, কিন-রা সামনে থাকা স্ট্রাইকারদের বলের পর বল যোগান দিয়ে যাবেন, এটাই ছিল প্রত্যাশা। আর সেই স্ট্রাইকিং ডিপার্টমেন্টে ক্যান্টোনার সাথে থাকবেন শিয়ারার। তা যাই হোক, সেটা আর হল না।
(২)
বাইশ বছর বয়সী এক ছোটখাট স্ট্রাইকারের অভিষেক হয়েছে নরওয়ের হয়ে। বাচ্চা-বাচ্চা চেহারা, উষ্কখুষ্ক চুলের ছেলেটাকে দেখলে মনে হয়না গোল করাটা তাঁর জন্য কোন ধরণের সমস্যার কিছু। জ্যামাইকার সাথে ১-১ গোলে ড্র হওয়া সেই ম্যাচটাতে বাচ্চা ছেলেটাকে গোল করতে দেখলেন জিম রায়ান আর লেস কেরশ’ – ইউনাইটেডের দুই স্কাউট। ঘাঁটাঘাঁটি করে দেখলেন, ঘরোয়া লিগে ছেলেটা একরকম গোলের বন্যাই বইয়ে দিয়েছে – প্রথমে নরওয়ের নিচু সারির দল ক্লাউসেনেঞ্জেনের হয়ে, পরে উঁচুসারির ক্লাব মলডে’র হয়ে। মলডে’র হয়ে একটা ম্যাচে দুই গোল করেছিল ছেলেটা, সেই ম্যাচেও গ্যালারিতে ছিলেন জিম রায়ান, ছেলেটাকে নিয়ে ফাইনাল রিপোর্ট লিখেই রায়ানের হাত চলে গেল ফোনের ডায়ালপ্যাডে, “ফার্গি, এই ছেলেকে যেভাবেই হোক ইউনাইটেডে আনতেই হবে, একে হাতছাড়া করা ঠিক হবেনা!”
ওলে গানার সোলস্কায়ার : কার্যকরী এক সুপার সাব-কথন
রায়ানের ফোন রাখতে রাখতে ফার্গি ভাবলেন, ঠিকই ত। কয়েকবছর আগে আনকোরা ডেভিড বেকহ্যাম, নিকি বাট, পল স্কোলস, গ্যারি আর ফিল নেভিল, রায়ান গিগসদের নিয়ে গড়া সেই “ক্লাস অফ ৯২” এর জুয়াটা যেহেতু এখন পর্যন্ত মোটামুটি সফলভাবেই কাজে লেগেছে, আরেকটা জুয়া খেলতে ক্ষতি কি? এমন ত না ছেলেটাকে দলে আনার জন্য বিশেষ মালপানি খরচ হবে, রায়ান মলডে’র কমিটির সাথে কথা বলে জানিয়েছে, শিয়ারারকে আনতে যা খরচ হত, ছেলেটাকে আনতে খরচ হবে তার দশগুণ কম (শিয়ারার নিউক্যাসলে গিয়েছিলেন ১৫ মিলিয়ন পাউন্ডে, আর ওলে গানার সোলস্কায়ার নামের সেই আনকোরা স্ট্রাইকারের জন্য ফার্গুসনকে খসাতে হয়েছিল মাত্র ১.৫ মিলিয়নের মত)। আরেকটা জুয়া খেলাই যায়। প্রথম ছয়মাস রিজার্ভ দলের সাথে খেলে নাহয় নিজেকে মানিয়ে নিল, পরে আস্তে আস্তে ক্যান্টোনা, অ্যান্ডি কোল, ব্রায়ান ম্যাকক্লেয়ারদের সাবস্টিটিউট খেলোয়াড় হিসেবে ম্যাচে ম্যাচে হালকাপাতলা খেলানো যাবে নাহয়।
 
দলবদলের বাকি আনুষ্ঠানিকতাটুকু শেষ করতে ট্র্যাফোর্ড ট্রেইনিং সেন্টারে আনা হল বাচ্চা বাচ্চা চেহারার ছেলেটাকে, চোখে হাজারো স্বপ্নের আনাগোনা তার, দেখেই বোঝা যাচ্ছে। ছেলেটাকে বরণ করে নেওয়ার জন্য ছিল না কোন সাংবাদিক, হল না কোন প্রেস কনফারেন্স। আস্তে ধীরে কোন ধরণের কোন আড়ম্বর ছাড়াই চুক্তিপত্রে সই করে মলডের ছেলেটা হয়ে গেল ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের। চুক্তি সই করে চলে গেল বাসায়। পরে ছেলেটার ক্যারিয়ার গ্রাফ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, লাইমলাইটের আড়ালে থেকে থেকে এভাবেই ছেলেটার পুরো ক্যারিয়ারটাই কেটে গিয়েছে। কখনো ক্যান্টোনা, কখনো স্কোলস, কখনো গিগস, কখনো বেকহ্যাম, কখনো নিস্টলরয়, কখনো ইয়র্ক – প্রত্যেকবার কারোর না কারোর ছায়ার আড়ালেই খুঁজে পেয়েছে ছেলেটা নিজেকে।
(৩)
অভিষেকে ব্ল্যাকবার্ন রোভার্সের বিরুদ্ধে ডেভিড মে-এর বদলি হিসেবে নেমেই মহাগুরুত্বপূর্ণ এক গোল করে দলকে ড্র এনে দেয় ছেলেটা, অভিষেকের মতই এই পরে বদলি হিসেবে নেমে গোল করার ধারাটাকে সে তার ক্যারিয়ারের শেষ পর্যন্ত টেনে নিয়ে গিয়েছিল। ব্ল্যাকবার্নের বিপক্ষে সেই গোলটার পর ফার্গুসন কি মুচকি হেসেছিলেন ব্ল্যাকবার্নের মালিকের কথা মনে করে? যে মালিকের জন্যই মূলত শিয়ারার ইউনাইটেডে না এসে নিউক্যাসলে গিয়েছিলেন? ফার্গির মনে কি এই চিন্তা এসেছিল যে, “দেখ, শিয়ারারকে দিস নি তাতে আমার দলের বিশেষ কোন ক্ষতিবৃদ্ধি হয়নি, সেই শিয়ারারে বদলেই দলে যাকে এনেছি তার গোলেই তোর মুখ থেকে জয়টা কেড়ে নিয়ে আসলাম!”…? আসতেই পারে, আসাটা অস্বাভাবিক নয়।
 
কিন্তু সেদিন ফার্গুসন কি বুঝতে পেরেছিলেন এই বাচ্চা বাচ্চা চেহারার ছেলেটার ভিতরে যে কতবড় একটা পরিণত পুরুষ লুকিয়ে আছে? ফার্গুসন কি বুঝেছিলেন যে নরওয়ে থেকে আসা ছেলেটার ইংল্যান্ডে মানিয়ে নিতে কোন সমস্যাই হবে না, এতটাই মানিয়ে নিতে পারবে এখানকার লিগের সাথে নিজেকে যে প্রথম মৌসুমেই সবার সকল ধারণাকে ভুল প্রমাণিত করে ১৮টা গোল করে বসবে?
 
রিজার্ভ দলে যেই ছেলেটার থাকার কথা শুরুতে, সেই ছেলেটাই পরের এগারো বছর ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সকল সাফল্যের অন্যতম সারথি হিসেবে ছিল। পুরো ক্যারিয়ারজুড়েই মূল একাদশে সেরকম খেলতেন না, সবসময় নামতেন বদলি হিসেবে, ফার্গুসন তাঁকে জমিয়ে রাখতেন বিশেষ কিছু মুহূর্তের জন্য। আর সেই মুহূর্তগুলোকেই স্পেশালি রাঙ্গিয়ে দিতে ছেলেটার কোন জুড়ি ছিল না, এমনকি শিয়ারারেরও ছিল না। শ্যেনদৃষ্টিতে ম্যাচ দেখত ছেলেটা সাইডলাইনে বসে বসে, পর্যালোচনা করত খেলার গতিপ্রকৃতি, পরে দরকার হলে বদলি হিসেবে নেমে করত গোলের পর গোল। ইউনাইটেড ক্যারিয়ারে এরকম পরে বদলি হিসেবে নেমেই ছেলেটা গোল করেছে ২৯টি, ভাবা যায়?
ওলে গানার সোলস্কায়ার : কার্যকরী এক সুপার সাব-কথন
প্রতিপক্ষরা সেই প্রথম মৌসুমের পরেই বুঝে গেল ক্যান্টোনা, বেকহ্যাম, কোল ছাড়াও তাদের ডিফেন্স ছিঁড়েখুঁড়ে খেয়ে ফেলতে আসছে এক নরওয়েজিয়ান “বেবি ফেইসড অ্যাসাসিন”… ওলে গানার সোলস্কায়ার!
(৪)
“তোমার নামের শেষ অংশ উচ্চারণ করা ত বেজায় কষ্ট, কিভাবে ধারাভাষ্যকার আর সাংবাদিকেরা তোমার নাম উচ্চারণ করবে?” ইউনাইটেডে যোগ দেওয়ার কয়েক মাস পর দেওয়া এই সাক্ষাৎকারে ওলে গানার সোলস্কায়ারের উত্তর ছিল, “নিয়মিত গোল করতে থাকলে এমনিতেই ধারাভাষ্যকারেরা উচ্চারণ করতে শিখে যাবে!”
 
কি সহজাত অথচ অকপট উত্তর! নিজের ক্ষমতা সম্বন্ধে কতটা নিঃসংশয় হলে এভাবে দেওয়া যায় উত্তর?
 
হয়তোবা তখনই দিব্যদৃষ্টিতে নিজের সোনায় মোড়ানো ক্যারিয়ারটাকে দেখে ফেলেছিলেন তিনি, হয়তোবা দেখে ফেলেছিলেন তিন বছর পরের বার্সেলোনার সেই শ্বাসরুদ্ধকর রাতটাকে, যে রাতে এক ওলে গানার সোলস্কায়ার এর শেষমুহূর্তের গোলের কাছেই নত হয়েছিল বায়ার্ন মিউনিখ, ওলে গানার সোলস্কায়ার ও ইউনাইটেডকে ভাসিয়েছিলেন চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ের আনন্দে! বলা বাহুল্য, সেই গোলটিও এসেছিল একেবারে শেষ মুহূর্তে, সুপার-সাব হিসেবে!
 
আজ থেকে প্রায় বিশ বছর আগের সেই দিনটার কথা যখন স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন মনে করেন, তখন কি তার শিয়ারারকে না পাওয়ার আক্ষেপ হয়? না, হয় না। যেমনটা হয়না বিশ্বজোড়া ইউনাইটেডের কোটি কোটি সমর্থকদের।
 
ওলে গানার সোলস্কায়ার এর মহিমা এমনই!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

eighteen + one =