ওরা পোড় খাওয়াদের দল !

ক্রিকেট আর ফুটবলের হাজারটা পার্থক্য । হাজার রকমের পার্থক্য ! খেলার দৈর্ঘ্যে পার্থক্য , খেলার প্রচারে পার্থক্য আর প্রসারে পার্থক্য – এমন অসংখ্য পার্থক্য । অতদিকে যাবো না । কিন্তু একটা পার্থক্যের কথা আলাদা করে এখন বলবো । সেটা হলো ক্রিকেটারদের ম্যাচ ফিটনেস বা মূল ধারার খেলায় থাকার ক্ষমতাটা ফুটবলারদের চাইতে বেশি থাকে । আন্দ্রেয়া পির্লো ৩৪ বছর বয়সে বিশ্বকাপে দাঁপিয়ে খেললে সবার চোখ কপালে উঠে যায় , কিন্তু মিসবাহ উল হক ৪০ পেরিয়ে বিশ্বকাপ দলের নেতৃত্ব দিলেও তা নিয়ে অবাক হবার বেশী কিছু থাকে না । কারণ ক্রিকেট গ্রেটদের প্রায় সবাই যে মূলধারার ক্রিকেটে থাকেন গড়ে ৩৪-৩৫ বছর বয়স পর্যন্ত ! সেখানে দুই একটা ব্যতিক্রম ৪০ পেরোলে তেমন অবাক হওয়াটা যে পাপ ! বিশ্বকাপ ক্রিকেটটাও তাই পোড় খাওয়া ক্রিকেটারদের গল্পে ভরপুর ।

706752-21410345-1600-900

এক লাফে অনেক অতীতের ফ্ল্যাশব্যাকে যেতে চাই না । তাই গল্পটা শুরু করব এখনো সবচাইতে তাজা বিশ্বকাপের স্মৃতি দিয়ে । ২০১১ বিশ্বকাপ । সেখান থেকেও তাদের দিয়েই গল্পটা শুরু করব যাদের নামের সাথে বিশ্বকাপে অপ্রাপ্তি জিনিসটা একদম ভালোভাবে লেপ্টে গেছে । হ্যাঁ ! ঠিক ধরেছেন । দক্ষিণ আফ্রিকা ।

ক্রিকেট পাগলদের স্মৃতিতে আজও তাজা পোলকের এই কান্নার দৃশ্য
ক্রিকেট পাগলদের স্মৃতিতে আজও তাজা পোলকের এই কান্নার দৃশ্য

আধুনিক ক্রিকেটের সবচাইতে ইনফর্ম ব্যাটসম্যান হাশিম আমলা আর সবচাইতে কমপ্লিট ব্যাটসম্যান এবি ডি ভিলিয়ার্স । ভিলিয়ার্সকে কমপ্লিট ব্যাটসম্যান বলার কারণ হলো এবি ডি ভিলিয়ার্স এমন একজন ব্যাটসম্যান যিনি দলের চটজলদি উইকেট পড়ে গেলেও ইনিংসটাকে মেরামত করতে পারেন আবার ২০টা বল আগে নামলেও ঐ ২০টা বল হাঁকিয়েই বদলে দেন ম্যাচের চেহারা । এবারের অন্যতম ফেবারিট প্রোটিয়ারা চ্যাম্পিয়ন হবার মত দল নিয়ে এসেছিল গেলো বারও । চ্যাম্পিয়ন ভারতকে গ্রুপপর্বে একমাত্র পরাজয়ের স্বাদটা দিতে পেরেছিল ওরাই । কোয়ার্টারে পেয়ে যায় ধুঁকতে ধুঁকতে নক আউটে আসা নিউজিল্যান্ডকে । কিন্তু কীসের কী ? ২২১ রানের টার্গেটে চোকারের তকমাটা আরো ভালোভাবে লেপ্টানোর জন্যে মুখ থুবড়ে পড়ে স্মিথের দল । এবারের স্টেইন মর্কেলরাও ছিলেন সেদিন ঢাকায় । কিন্তু আফসোস আর অপরাধবোধটা কমই থাকার কথা স্টেইন আর মর্নির । নিজেদের কাজটা যে ঠিকঠাকমতোই সেরে দিয়েছিলেন এ দুইজন । ঘাঁটা সবচাইতে দগদগে হবার কথা ডি ভিলিয়ার্স আর ফ্যাফ ডু প্লেসির । সাথে আমলারও । ৩০ পেরোনো ভালো সূচনা পেয়েছিলেন প্রথম দুজনেই । কিন্তু সোয়া দুশ পেরোনোর মত করে খেলতে পারলেন না একজনও । আগের চাইতে অনেক বেশি কমপ্লিট এই দক্ষিণ আফ্রিকা, আগের চাইতে এই দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে কন্ডিশনটাও অনেক বেশি কথা বলে ।বিশ্বকাপটা যে অস্ট্রেলিয়ায়, উপমহাদেশে নয় !

নিজের ক্যারিয়ারের সেরা ফর্মে আছেন , দলও পার করছে অসাধারণ সময় , দারুন ইনফর্ম একটি দল পেয়েছেন হাতে । ২০০৭ এ সেমিফাইনালে অজিদের কাছে লজ্জাজনক হার এবং ২০১১ এর কোয়ার্টারে কিউইদের কাছে হারটার জ্বালা জুড়ানোর সুযোগটা তাদের দেশেই পেয়ে যাচ্ছেন এবি । ইতিহাস আর বিদ্রূপকারীদের বুড়ো আঙুল দেখানোর জন্যে এটাই কি এবির জীবনে সবচেয়ে মোক্ষম সুযোগ ? হয়তোবা এটাই ।

ফ্যাফ আমলা আর ভিলিয়ার্সের সুযোগ ২০১১ এর হিসাব মেটানোর
ফ্যাফ আমলা আর ভিলিয়ার্সের সুযোগ ২০১১ এর হিসাব মেটানোর

দক্ষিণ আফ্রিকা আর নিউজিল্যান্ডের সাম্প্রতিক সাফল্যের ইতিহাসে হয়তো ফাড়াকটা বিশাল । কিন্তু আপনি বিশ্বকাপের খাতা ঘেঁটে দেখলে তাতে খুব বেশি পার্থক্য দেখতে পাবেন না । নিউজিল্যান্ডকে নিয়ে কথাটা কম হবার কারণ বোধহয় কিউইদের ক্লাস পারফরম্যান্স ৭-৮ রোলনম্বরধারী ছাত্রের হলেও ফাইনাল পরীক্ষা প্রথম চারে থাকার সাফল্য দেখানো । প্রত্যশাকে ছাড়িয়ে যাওয়া পারফরম্যান্স নিয়ে শুধু আশাবাদীই হওয়া যায় , নিরাশাবাদীর মতো ঘাটাঘাটি নয় ! কিন্তু দিনের শেষে নিউজিল্যান্ড আর দক্ষিণ আফ্রিকার গল্পগুলো খুব আলাদা কিছু নয় ।

ম্যাককুলাম আর টেলরের আগ্রাসী ব্যাটিং সমাপ্তি ঘটাতে পারে ব্ল্যাকক্যাপ্সদের অপেক্ষার
ম্যাককুলাম আর টেলরের আগ্রাসী ব্যাটিং সমাপ্তি ঘটাতে পারে ব্ল্যাকক্যাপ্সদের অপেক্ষার

এবার কিন্তু আর তা হচ্ছে না । শ্রীলংকা আর পাকিস্তানকে হারিয়ে কিউইরা দেখিয়েছে তারাও রেডি । আর তাতে দক্ষিণ আফ্রিকার যেমন ডু প্লেসিস-আমলা আর এবি , নিউজিল্যান্ডের ভরসা তিন অভিজ্ঞ তারকা সৈনিক টেলর-ম্যাককুলাম আর ভেট্টোরি । ৯০ ছাড়ানো স্ট্রাইকরেটের মালিক ম্যাককুলাম তার সেরা দিনে কি করতে পারেন তা আর নতুন করে না বললেও চলবে । একটা বিগ ম্যাচ ! একটা ম্যাককুলাম ইনিংস ! আর সেটাই হতে পারে টুর্নামেন্টের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস । ৩০ গড়টা ওপেনারসুলভ না হলেও ম্যাককুলামকে নিয়ে আলাদা করে পরিকল্পনা ফাঁদবেন না এমন কাপ্তান পাওয়া যাবে না । এই পেশিসুলভ ব্যাটিং এর সাথে নিজের দেশের বিশ্বকাপে দলের দ্বায়িত্ব পাওয়া নেতা ম্যাককুলাম ২০১১তে লঙ্কানদের কাছ থেকে পাওয়া জ্বালাটা ফিরিয়ে দিতে চাইবেন প্রথম ম্যাচেই ।

ম্যাককুলাম পাশে পাবেন ভেট্টোরিকেও
ম্যাককুলাম পাশে পাবেন ভেট্টোরিকেও

১৯৯৯তে সেমিতে পাকিস্তানের কাছে হেরে বাদ পড়া , ২০০৭ এ সেমিতেই আবার বাদ পড়া । প্রতিপক্ষ আরেক এশিয়ান দল । শ্রীলঙ্কা ! ২০১১ তে আবার সেমি ! আবার শ্রীলংকা । ভেট্টোরির গল্পটা আরো বড় । ১৯৯৯ থেকে প্রতিবারই ছিলেন দলের সাথে । ২০১১ এর পরাজয় আবার দেখতে হয়েছে ক্যাপ্টেন হয়ে । ড্যানিয়েল ভেট্টোরিকেও রাখতে হবে বহুদর্শীদের দলে । আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ভদ্র দল বলে পরিচিত নিউজিল্যান্ড এবার আর ফেয়ার প্লের তকমা নয় , খুব করে চাইবে ট্রফিটাই জিততে ।

ওয়ানডে ক্যারিয়ারে প্রায় ২৬ হাজারের মতো রান । ৩৯ টা হান্ড্রেড । আপনি ক্রিকেটের মনোযোগী ফলোয়ার হলে বুঝে ফেলার কথা এতক্ষণে । হ্যাঁ ! আমি কুমার সাঙ্গাকার আর মাহেলা জয়াবর্ধনের কথা বলছি । সাঙ্গা-জয়া বলে চোখ বুজলে আপনার মাথায় আসবে এমন একটি ডুয়োর কথা যারা বোলারদের বোলিং করতে করতে মাথা কুঁটে মরতে বাধ্য করেন । বাংলাদেশ ক্রিকেটের নিয়মিত ফলোয়ার হওয়াতে এ অভিজ্ঞতা আমাদের চাইতে আর কারই বা ভালো আছে ? আর ক্যারিয়ার জুড়ে ধ্রুপদী ব্যাটিংয়ে গড়া জুটিগুলোরও তো একটা চূড়া থাকা চাই ! আর সেটা হলো দক্ষিণ আফ্রিকার সাথে ৬২৪ রানের জুটি । কিন্তু সাফল্যে মোড়া ক্যারিয়ারে ক্রিকেটের সবচাইতে বড় শিরোপাটি না ছুঁয়ে কীভাবে বা সন্তুষ্ট থাকেন মাহেলা আর সাঙ্গা ?

তার উপর দুজনেরই যদি থাকে আগের টানা দুই আসরে টানা দুইটি ফাইনালে রানার আপ ট্রফি ছোঁয়ার অভিজ্ঞতা । গল্পে আরো বিয়োগাত্মক তথ্য চান ? তাহলে জেনে রাখুন, ২০০৭ এর অস্ট্রেলিয়ার সাথে পরাজিত ফাইনালে অধিনায়ক ছিলেন মাহেলা , আর ২০১১ এরটায় ১২০ কোটি মানুষের ভারত যখন ট্রফি নিয়ে উল্লাসে মাতোয়ারা তখন পরাজিত দলের অধিনায়ক হয়ে তা দেখতে হয়েছে সাঙ্গাকে , আর মাহেলাকে ঝকঝকে একটা সেঞ্চুরি মেরেও থাকতে হয়েছে সাঙ্গার পাশে মুখ গোমড়া করে । ফাইনাল জিনিসটার প্রতি শ্রীলংকার আরো বীতশ্রদ্ধ হবার কথা ২০১২ তে তাদের নিজেদের দেশে তাদের সামনে থেকে ক্যালিপ্সোরা ট্রফি নিয়ে গেলে ।

২০১৪ সালে টি ২০ ট্রফি ছুঁয়ে শিকল ভাঙার বার্তা দিয়ে রেখেছে শ্রীলঙ্কা । আরো ছোট করে বলতে গেলে ফিফটি করে সাঙ্গাকারা যেন বলে রাখলেন , “এবার হবেই ! নয়তো কখনোই নয় । ” তবে কন্ডিশন, স্বাগতিক অজি আর কিউইদের ফর্ম আর মাহেলার সাম্প্রতিক ওভারসিজ নিম্নমুখী পারফরম্যান্স বলে “কাজটা সহজ হবে না । “

এবার শুধু ফাইনালে গিয়ে ফিরে আসতে চায় না লঙ্কানরা
এবার শুধু ফাইনালে গিয়ে ফিরে আসতে চায় না লঙ্কানরা

১৯৯২ তে পাকিস্তান যখন এই অস্ট্রেলিয়াতেই বিশ্বকাপ জেতে তখন শহীদ আফ্রিদির বয়স ১২ বছর ।পাকিস্তান ক্রিকেটের সবচাইতে তারকাবহুল সময়ে দলে ঢুকেছিলেন । আর সে সুবাদে বিশ্বকাপ ফাইনালের স্কোরবোর্ডে নাম উঠে যায় ১৯ বছর বয়সেই । শেন ওয়ার্নের বলে ১৩ রান করে যখন কৈশোর পেরোনো আফ্রিদি আউট হন , তখনও কি জানতেন আরো ১৬ বছর পর এই ওয়ার্নির দেশে আরেকটি বিশ্বকাপ খেলতে যাবার আগে দলে অভিজ্ঞতার বিচারে সবচাইতে সিনিয়র খেলোয়াড় থাকবেন তিনিই । ৯৯ এর পরে ২০০৩ আর ২০০৭ এ দেখতে হয়েছে দলের প্রথম রাউন্ড থেকে বাদ পড়ার দৃশ্য । ২০১১তে এসে ছাড়িয়ে গেলেন নিজের আগের সব বিশ্বকাপের পারফরম্যান্সকে। কিন্তু কে জানত একই বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে হরভজনের অমন এক নিরীহ দর্শন ফুলটসকে আকাশে উড়িয়ে দেবেন ? ২০১১ এর সেমি এসেই যখন গেল , আরেকজনের নাম বলতেই হবে । তিনি পাকিস্তান ক্রিকেটের উজ্জ্বল ব্যতিক্রম মিসবাহ উল হক । মিসবাহ ২০১১ থেকে ২০১৫ এই মাঝের ৪ বছরে যতই রানের ফুলঝুড়ি ছোটান না কেন , জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ভুলতে পারার কথা নয় মোহালিতে নিজের অদ্ভুত স্লথ ব্যাটিং । বিশ্বকাপের সাথে কিছু লেনদেন বাকি মিসবাহ উল হকেরও । পারবেন তো চোকাতে ?

আফ্রিদি আর মিসবাহর অভিজ্ঞতায় আস্থা পাকিস্তানের
আফ্রিদি আর মিসবাহর অভিজ্ঞতায় আস্থা পাকিস্তানের

বাংলাদেশী হওয়াতে নিরাবেগ হওয়া সম্ভব না । তাই এতো লিখার পরেও হতাশার গল্পটা বড্ড অসম্পূর্ণ লাগছিলো । সত্যি বলতে নিজের ভেতর থেকে পরিপূর্ণতা পাচ্ছিলাম না । এমন কিছু একটা এখনো বাকি আছে যা খুব শক্তভাবেই হাহাকারের জন্ম দিয়েছে আমার মধ্যে । কিন্তু সেটা আমি এখনো লিখি নি । কী সেটা ?
কারণটা খুঁজতে রুদ্ধদ্বার ধ্যানের দরকার পড়ল না । মাশরাফি বিন মুর্তজা !
দল মত , ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে বাংলাদেশিদের আবেগের সবচাইতে বড় জায়গাটি দখল করে রাখা ক্রিকেটার । ২০০৩ সালে দলের ব্যর্থ মিশনের অংশ হওয়া মাশরাফি একযুগ পরে অনেক পরিণত । মাঝের ২০০৭ সালের বিশ্বকাপে ব্রায়ান লারার দেশ ত্রিনিদাদে বিরেন্দর শেবাগের মিডল স্ট্যাম্প উপড়ে ফেলার দৃশ্য তার বুকে দিবে দুর্বার সাহস । এখন মাশরাফি নিষ্ঠুর বাস্তবতাকে গ্রহণ করতে জানেন অনেক সহজভাবে । ২০১১ তাকে শিক্ষা দিয়েছে ! দেশের মাটিতে বিশ্বকাপে দর্শক হয়ে থাকা তাকে শিক্ষা দিয়েছে । তবে মাশরাফির চ্যালেঞ্জটা দর্শকের মন জেতা বা ক্যারিয়ারকে সমৃদ্ধ করা নয় । মাশরাফির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এই আবেগপ্রবণ জাতির ভালোবাসার মূল্য দেওয়া ।

অধিনায়ক মাশরাফির কাছে প্রত্যাশাটা অনেক বেশি
অধিনায়ক মাশরাফির কাছে প্রত্যাশাটা অনেক বেশি

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

four × two =