এরাই বাংলাদেশ ক্রিকেটের রত্ন!

ছেলেগুলির জন্য কষ্ট লাগছে। গত দেড় বছর ধরে কী কষ্টই না করে আসছে সবাই!
বলতে পারেন, সে তো বিশ্বকাপের সব দলই করেছে! না, সব দল করেনি। আর কোনো দেশই দেড়-দুবছর ধরে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের প্রস্তুতি নেয় না। আমাদের এই দলটি এত দীর্ঘ সময় ধরেই প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই বয়সী ছেলেদের এত লম্বা সময় বাড়ি, পরিবার-পরিজন, বন্ধুদের থেকে দূরে থাকাও বড় ত্যাগ। এই ছেলেরা দিনের পর দিন প্রচণ্ড খেটেছে, মাঠে নেমে নিজেদের উজার করে দিয়েছে। শেষ পর্যন্ত শেষ ধাপটায় যেতে পারেনি। খেলায় কেউ জেতে, কেউ হারে। কোনো টুর্নামেন্টে সব দলই যদি নিজেদের সেরাটা খেলা, তার পরও ফাইনাল খেলবে স্রেফ ২টা দলই।
ক্রিকেটীয় ব্যখ্যায় কাঁটাছেড়া করা যায়। টিম ম্যানেজমেন্ট যদি টুর্নামেন্টের শুরু থেকে টপ অর্ডারকে শেকলবদ্ধ করে রাখার অদ্ভূত ট্যাকটিকস না নিত, অতিরিক্ত সমীহ করে আজ ক্যারিবিয়ান পেসকে যদি জুজু বানানো না হতো! মিরাজ যদি ৫০ ওভার উইকেট থাকত, কিংবা মিরাজ আউট হওয়ার পরের বলেই সাইফুদ্দিন তেড়ে ফুড়ে মারতে না যেত, রান তাহলে হয়ত গোটা বিশেক বেশি হত। যথেষ্ট হতো সেটাই!
প্রথম ইনিংস শেষে ২২৬ রানকেও অবশ্য আমার মনে হয়েছিল যখেষ্টই। সিরিয়াসলি, এই দলের যে বোলিং-ফিল্ডিং গত এক বছরে আর এই টুর্নামেন্টে দেখে এসেছি, আমার স্থির বিশ্বাস ছিল ৩৫-৪০ রানে জিতে যাব। কিন্তু চাপে সব গড়বড় হয়ে গেল। বড় ম্যাচে মাঝারি স্কোরের চাপ। শুরুতেই গিডরন পোপের আক্রণে আরও হতভম্ব দল। বোলিং হলো এলোমেলো, স্পিনাররা শর্ট বল করতে থাকলেন, ভুল লাইনে বল করতে থাকলেন, ধার হারিয়ে গেল। যে দলের ফিল্ডিং দেখতে পারাও ছিল দারুণ বিনোদন, সেই দলটিই সহজ ক্যাচ ছাড়ল, গ্রাউন্ড ফিল্ডিংয়ে ছন্নছাড়া। অধিনায়ক মিরাজ দীর্ঘসময় দলের সেরা বোলার সাইফুদ্দিনের কথা ভুলে গেলেন।
চাপে এমনই হয়। ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে মিরাজের সরল ও অসহায় স্বীকারোক্তি, ‘আমরা সবাই অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেটে খেলি। যতই বলি চাপ নিব না, কিন্তু চাপ এসেই যায় নানা ভাবে। মাঠে সব সময়ই চাপ থাকে। এত দর্শকের সামনে কেউ কোনো দিনও খেলেনি, এটা স্বাভাবিকভাবেই চাপ। সেমিফাইনাল ম্যাচ জিততে হবে, সেই চাপ। আমাদের বয়স এখনো কম। এতকিছু সামলে ওঠা, এখনও আমরা অভ্যস্ত নই।”
চাপের কারণে আজ দল সেরাটা দিতে পারেনি। তবে চেষ্টাটা ছিল। আমরা নাহয় সেই চেষ্টাই দেখি! সৎ চেষ্টা, দেশের জন্য কিছু করার চেষ্টা, নিজেকে নিংড়ে দেওয়া। আমরা স্টাম্প মাইকে শুনেছি, মাঠে দলের একজন বলছেন, “চেষ্টা তো করতেছি…পারলে তো জানটা দিয়ে দেই…”। আমরা শুনেছি, ম্যাচ শেষে অধিনায়ক মিরাজ বলেছেন, “একদম শেষ চারটা মারার আগ পর্যন্ত বিশ্বাস করেছি আমরা পারব।”

233905
আজ অনেকেই হয়ত হতাশ। কিন্তু স্বপ্নভঙ্গের যন্ত্রণায় সবচেয়ে বেশি পুড়ছেন কিন্তু এই ছেলেকটাই! দেশকে যুব ক্রিকেটের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন করতে দিনের পর দিন কত খাটুনি, কত ত্যাগ! এই দলটাকে দেখতেও দারুণ লাগত। এতটা প্রাণচঞ্চল, উচ্ছ্বল, একাগ্র, একাত্ম, দারুণ একটা ইউনিট! ওদের জন্য খারাপ লাগছে। স্রেফ ওদের জন্য খারাপ লাগছে।
দল হেরে যাওয়ায় এমন কিছু এসে-যায়নি। টুর্নামেন্টের আগেই বলেছি-লিখেছি, একটা অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ জিতে কিছুই হয় না। ক্রিকেট দল বা জাতি হিসেবে উন্নতির পরিচায়কও নয়। বরং কিছু প্রতিভার সন্ধান পাওয়া, সব ঠিকঠাক থাকলে ঘষেমেজে যাঁরা হতে পারেন বাংলাদেশ ক্রিকেটের রত্ন, এই প্রাপ্তিই সবচেয়ে বড়।
তার পরও হতাশাবোধ থাকলে, আজকে সংবাদ সম্মেলনে মিরাজের শেষ কথাগুলি শুনুন এবং ভাবুন… “একটা বিশ্বকাপ সেরা তিন-চারে থাকাও কম নয়। আস্তে আস্তে আমরা উন্নতি করছি। মুশফিক ভাইরা পাঁচ নম্বর হয়েছিল, আমরা আরেকটু এগোলাম। আশা করি সামনের প্রজন্ম আরও এগোবে। ওরা চিন্তা করবে চ্যাম্পিয়ন-রানার্স আপ হতে হবে।”

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

nineteen − two =