এবার পারবে মেসির আর্জেন্টিনা?

এবার পারবে মেসির আর্জেন্টিনা?
১১ অক্টোবর, ২০১৭…
 
স্থান : স্ট্যাডিও অলিম্পিকো আথাহুয়ালপা, কিটো, ইকুয়েডর।
 
বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের শেষ ম্যাচটা খেলতে নেমেছেন ম্যারাডোনার উত্তরসূরিরা, ২৫ পয়েন্ট নিয়ে পয়েন্ট টেবিলের ৬ নম্বরে থেকে।
 
শেষ ম্যাচে ইকুয়েডর এর সাথে প্রতিপক্ষ প্রায় ২৮০০ মিটার উঁচু কিটোর আবহাওয়া আর ওপেন প্লে তে ৪৫০ মিনিট গোল করতে না পারার ব্যর্থতাও।
 
পয়েন্ট টেবিলে গায়ে গা ঘেঁষে অবস্থান চিলি, পেরু, কলম্বিয়া, উরুগুয়ে, আর্জেন্টিনা আর প্যারাগুয়ের। ৬ দলকে আলাদা করেছে স্রেফ ৫ টি পয়েন্ট।
 
শেষ রাউন্ডে ইকুয়েডরের কাছে হারলে ১৯৭০ এর পর প্রথমবার বিশ্বকাপে থাকবে না আর্জেন্টিনা, রেকর্ডের বরপুত্র লিওনেল মেসি পারবেন না অর্জনের খাতায় বিশ্বকাপ যোগ করার শেষ চেষ্টাটা চালাতে।
 
কিক অফের ৩০ সেকেন্ডের মাথায় নিজেদের ডিফেন্সের ডানপ্রান্ত থেকে লম্বা করে বল বাড়ালেন ইকুয়েডর এর সেন্টারব্যাক দারিও আইমার। ওটামেন্ডি-মাচেরানো-মেরকাদো কে নিয়ে গড়া আর্জেন্টাইন ডিফেন্স কে হতবুদ্ধি করে সেটা পড়ল মিডফিল্ডার রোমারিও ইবারার মাথায়। হতভম্ব ওটামেন্ডিকে ওভাবে রেখেই স্ট্রাইকার রবার্তো ওরদোনেজের সাথে ওয়ান টু খেলে বাম পায়ে শট নিলেন ইবারা।
 
আর্জেন্টিনা র বুক চিরে সেটা সোজা পৌঁছে গেল জালে।।
 
৪০ সেকেন্ডে গোল!
 
বাঁচা মরার ম্যাচে এরচেয়ে খারাপ শুরু হতে পারত না আর্জেন্টিনার।
 
তবে গোলটার ঠিক পরের মিনিট থেকেই নিজের জাদুর বাক্স থেকে একটার পর একটা সারপ্রাইজ বের করতে থাকলেন লিওনেল মেসি। সহকারী হিসেবে পেলেন অ্যানহেল ডি মারিয়া কে। দুজনে মিলে পরের পাঁচ মিনিটে তিন বার আক্রমণ শানালেন ইকুয়েডর ডিফেন্সে।
 
দুবার মিস করলেন ডি মারিয়া, আরেকবার বলে ছোঁয়া লাগাতে ব্যর্থ হলেন নিকোলাস ওটামেন্ডি।
 
১২ মিনিটে আরেকবার জাদুকরী স্পর্শ বুলিয়ে আক্রমণে গেল আর্জেন্টাইন রা। গঞ্জালো হিগুয়েইন এর ছোট্ট ফ্লিক ধরে বাম প্রান্ত দিয়ে ঝড়ের বেগে ডি বক্সে ঢুকে গেলেন ডি মারিয়া। নিখুঁত মাইনাস টা সফল পরিণতি পেল মেসির পায়ে।
 
২০ মিনিট পরে আরেকবার মেসি ম্যাজিক। মাঝমাঠ থেকে দারিও বেনেদেত্তোর পাস থেকে বল পেয়ে মেসির দিকে থ্রু বাড়িয়েছিলেন ডি মারিয়া। বল টা নিয়ন্ত্রণে নিতে এক সেকেন্ড দেরি করায় সেই দারিও আইমারের পা থেকে ছোঁ মেরে বল নিয়ে বেরিয়ে যান মেসি। তার বুলেট গতির শট আটকানোর সাধ্য ছিল না ইকুয়েডর গোলরক্ষক ম্যাক্সিমো বানগুয়েরার।
 
৬২ মিনিটের হ্যাটট্রিক গোলটি সৌন্দর্যে ছাড়িয়ে গেল আগের টিকেও। নিজেদের রক্ষণ থেকে ওতামেন্দির ক্লিয়ার করা বল গিয়ে পড়ে মেসির পায়ে।
 
তারপর চিরচেনা দৃশ্য…
 
তিন ডিফেন্ডার কে ছিটকে দেওয়া গতি, ড্রিবলিং আর ট্রেডমার্ক বডি ডজ…. বাম পায়ের নিখুঁত শটে আর্জেন্টিনা নিশ্চিত করে রাশিয়ার টিকিট।
 
শেষ ম্যাচটি বাদে আর্জেন্টিনা এবার বিশ্বকাপে কিভাবে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে কোয়ালিফাই করছে সবারই মোটামুটি জানা।
 
যদিও বাছাইপর্ব শেষে তারা তৃতীয় স্থান এ ছিল, পুরা কোয়ালিফায়ারে গোল স্কোরিং এ দুর্বলতা তাদের যথেষ্ট ভুগিয়েছে।
 
কোয়ালিফায়ারের ১৮ ম্যাচে আর্জেন্টিনা গোল করেছে ১৯ টা, খেয়েছে ১৬ টা। এত এত বিশ্বমানের ফরওয়ার্ড নিয়েও এই পরিসংখ্যান রীতিমতো হতাশাজনক।
 
এক মেসি ছাড়া আলাদাভাবে কেউই নামের প্রতি সুবিচার করতে পারেন নি, শেষ ম্যাচে হ্যাটট্রিকের পর মেসির গোল হয়েছে ৭ টি। দুটো করে গোল ডি মারিয়া, গ্যাব্রিয়েল মেরকাদো আর লুকাস প্রাতোর।
দেখা যাক, ওয়ার্ল্ড কাপে আর্জেন্টিনা র দলটা কেমন হতে পারে।
 
গোলকিপার:
প্রথম পছন্দ অবশ্যই সার্জিও রোমেরো। আর্জেন্টিনার সেরা শটস্টপার তিনি। যদিও তিনি ডি হেয়া, নয়্যার, এলিসন দূরে থাক…. রুই প্যাত্রিসিও কিংবা কেইলর নাভাসের মানের চেয়েও পিছিয়ে আছেন, তারপরও বড় টুর্নামেন্টে ধারাবাহিক পারফর্ম করার ক্ষমতার কারণে রোমেরো ই হবেন আর্জেন্টিনার নাম্বার ওয়ান।
 
সেকেন্ড কিপার হিসাবে কোচ হোর্হে সাম্পাওলির পছন্দ মেক্সিকান লিগে খেলা নাহুয়েল গুজম্যান কে।
 
যদিও সোসিয়েদাদ এর জেরোনিমো রুল্লি যথেষ্ট ভালো গোলকিপার, তারপরো কেন জানি কোচের সুনজর তার উপরে নেই।
 
থার্ড কিপার হিসাবে চেলসি গোলরক্ষক বর্ষীয়ান উইয়ি কাবায়েরোর সুযোগ ই বেশি।
 
ফুলব্যাক :
পাবলো জাবালেতা ছাড়া আর কোন ফুলব্যাকের কথা মনে আসতেছে না এই মুহুর্তে। কিন্তু তিনি অবসরে।
 
ফুলব্যাক পজিশন টা আর্জেন্টিনা র অনেক বড় দুর্বলতা। মারকাস রোহো, গ্যাব্রিয়েল মেরকাদো আছেন, কিন্তু ওরা ক্লাবেই রেগুলার স্টার্টার না। রামিরো ফুনেস মোরি পুরা মৌসুমই বেঞ্চে কাটিয়ে দিলেন। অন্যান্য বড় টিমের তুলনায় আর্জেন্টাইন ফুলব্যাকদের দূরবস্থা একেবারে চোখে লাগার মতই।
 
এই পজিশনে এখনো সাম্পাওলি এক্সপেরিমেন্ট করছেন। আয়াক্সের নিকোলাস তাগ্লিয়াফিকো নামে একজন লেফটব্যাক আছেন, ইন্দিপেন্ডিয়েন্তের হয়ে এ মৌসুমে বেশ ভালো পারফর্ম করা ফ্যাব্রিসিও বাস্তোস ইতালির সাথে ফ্রেন্ডলি তে ডাক পেয়েছেন সম্প্রতি। মৌসুমের শেষ দিকে প্রিমিয়ার লিগে ব্রাইটনের হয়ে ভালো পারফর্ম করেছেন এজেকিয়েল শোলেট্টো।
 
দেখা যাক, তারা আর্জেন্টিনা দলে নিজেদের কার্যকারিতা কতটুকু প্রমাণ করতে পারেন।
 
সেন্টারব্যাক:
 
গত বিশ্বকাপ এ আর্জেন্টিনা র দুর্বল জায়গা ধরা হয়েছিল সেন্ট্রাল ডিফেন্স কে, কিন্তু তারা অসাধারণ খেলে সে ধারণা ভেঙে দিয়েছিল।
 
এইবারও এই পজিশনটা মোটামুটি স্থিতিশীল । সেন্টারব্যাক জুটি হাভিয়ের মাচেরানো আর নিকোলাস ওটামেন্দির জায়গা পাকা।
 
ট্যাক্টিকাল কারনে মাচেরানো ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবে খেললে জায়গা নেওয়ার জন্য রোমার ফেদেরিকো ফাজিও আছেন। ব্যাক আপ হিসাবে এভারটন এর ফুনেস মোরি, তোরিনোর ক্রিস্টিয়ান আনসালদি, সোয়ানসির ফেদেরিকো ফার্নেন্দেজ এরাও ভালই কাজ চালাতে পারবেন। রাশিয়ান কন্ডিশনের কথা চিন্তা করলে ২ মৌসুম ধরে জেনিত সেন্ট পিটারসবার্গ এ খেলা ইমানুয়েল মাম্মানাও একটা ভালো অপশন হতে পারেন।
 
সেন্ট্রাল মিডফিল্ড :
 
এই আর্জেন্টিনা টিমের মিডফিল্ডে মোটামুটি সবই আছে নেই কেবল এনগোলো কান্তে বা কাসেমিরোর মত একটা ডেস্ট্রয়ার…ইউরোপিয়ান টিম গুলা র সাথে মিডফিল্ড নিয়ন্ত্রণ করার জন্য এই ধরনের একজন খেলোয়াড় খুব দরকার।
 
তারপরও এভার বানেগা, লুকাস বিলিয়া, ফার্নান্দো গ্যাগো রা আছেন। জায়গা করে নিতে পারেন স্টুটগার্টের তরুণ তুর্কি সান্তিয়াগো এসকাসিবার ও।
 
এরা মোটামুটি ভালো বক্স টু বক্স মিডফিল্ডার।
 
সেভিয়া তে বানেগা দুর্দান্ত খেলেন। আর্জেন্টিনা র জার্সি তে ঐ খেলা কোথায় হারিয়ে যায় কে জানে।
 
পিএসজি এর জিওভান্নি লো চেলসো সম্ভাবনাময়। কিন্তু রিয়াল মাদ্রিদের সাথে চ্যাম্পিয়নস লিগ এর খেলা দেখে মনে হল তিনি এখনো বড় ম্যাচের চাপ সামলাতে প্রস্তুত না।
 
অগত্যা বানেগা, বিলিয়াই ভরসা। বিলিয়াও সম্প্রতি ইনজুরিতে পড়েছেন। তাঁর জায়গায় আসতে পারেন সান্তিয়াগো এসকাসিবার।
 
এটাকিং মিডফিল্ড :
 
পিওর এটাকিং মিডফিল্ডার বলতে যা বোঝায়, ওরকম প্লেয়ার এই আর্জেন্টিনা দলে একজনই আছেন।
 
লিওনেল মেসি।
 
মেসি কে বাদ দিলে ওজিল, ড্রাক্সলার, ইস্কোর মানের সৃজনশীল মিডফিল্ডার আর্জেন্টিনা তে নেই। হাভিয়ের পাস্তোরে সে পর্যায়ে যেতে পারতেন, কিন্তু পিএসজি তে গিয়ে রেগুলার প্লেটাইম বা কোচের সুনজর কোনটাই পান নি।
 
কাজ চালানোর মত আছেন বেনফিকার এদুয়ার্দো সালভিও, আটালান্টার আলেহান্দ্রো গোমেজ, ওয়েস্ট হ্যামের ম্যানুয়েল লানজিনি।
এদের নিয়েই চলতে হবে কোচ হোর্হে সাম্পাওলি কে ।
 
উইংগার :
 
আর্জেন্টিনা র সবচেয়ে স্ট্রং পয়েন্ট সম্ভবত উইং। লেফট উইং এ ডি মারিয়া র জায়গা পাকা। রাইট নিয়ে এখনো পরীক্ষা নিরীক্ষা চলছে। কখনো রোমার দিয়েগো পেরোত্তি, কখনো এটলেটিকো মাদ্রিদের এঞ্জেল কোরেইয়া, কখনো বোকা জুনিয়রসের ক্রিস্টিয়ান প্যাভন, এমন কি জুভেন্টাস এর পাওলো দিবালা কেও রাইট উইং এ খেলিয়েছেন কোচ সাম্পাওলি। চূড়ান্ত দলে কার ভাগ্যে শিকে ছিঁড়বে তা বলা মুশকিল।
 
ফরওয়ার্ড :
 
 
বিভিন্ন লিগে প্রমাণিত পারফর্মার দের জাতীয় দলে এসে কি হয় কে জানে। সার্জিও আগুয়েরো(২১ গোল), গঞ্জালো হিগুয়েইন(১৫ গোল), মাউরো ইকার্দি (২৬ গোল), দারিও বেনেদেত্তো, লুকাস প্রাত্তো রা তো আছেই, সাথে আর্জেন্টাইন ক্লাব রেসিং এর উদীয়মান স্ট্রাইকার লাউতারো মার্টিনেজ কে নিয়েও কোচের যথেষ্ট আগ্রহ আছে। ছেলে টা কয়দিন আগে কোপা লিবারতাদরেস এ হ্যাটট্রিকও করছে ক্রুজেইরোর সাথে। ঘরোয়া লিগে ২৪ ম্যাচে এরই মধ্যে ১১ গোল আর ৫ এসিস্ট করা মার্টিনেজ কে সাম্পাওলি রাশিয়ার সাথে প্রীতি ম্যাচে দলে ডেকেছেন। দেখা যাক কি হয়।
 
সাম্পাওলির ট্যাক্টিক্স সিম্পল। মেসি কে ফ্রি রোল দাও আর ঘর সামলিয়ে আক্রমণে যাও। তবে সিম্পল ট্যাকটিক্সটাকে অকেজো করাটাও সহজ।
 
মেসি র চারপাশের পাসিং জোন আটকে, কড়া মার্কিং এর মাধ্যমে মেসির স্বাভাবিক খেলা নষ্ট করে দিলে আর্জেন্টিনা কতটা কি করতে পারবে সেটা প্রশ্নসাপেক্ষ।
 
ভালো দুজন ফুলব্যাক, একজন ডেস্ট্রয়ার, একজন নির্ভরযোগ্য ফিনিশার – এই জায়গাগুলোর শুণ্যতা পূরণ হলে আর ভাগ্য কিছুটা সহায় হলে আর্জেন্টিনা কে নিয়ে বাজি ধরাই যায়।
 
মিরাকলের জন্যে তো লিওনেল মেসি আছেনই।
 
লেটস হোপ ফর দ্য বেস্ট….
::: তানভীর হক তূর্য :::

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

three × three =