এডগার ডাভিডস : গগলস পরা এক পিটবুলের কথা

এডগার ডাভিডস : গগলস পরা এক পিটবুলের কথা
বড় টুর্নামেন্ট বা তার বাছাইপর্বে ডাচ ফুটবল দলের বাদানুবাদ নতুন কিছু নয়। কিংবদন্তী ইয়োহান ক্রুইফের ‘৭৮ এর বিশ্বকাপ খেলতে না যাওয়া বা ‘৯৪ বিশ্বকাপের আগে কোচিং এর দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানো থেকে শুরু করে হালের রবিন ভ্যান পার্সি এর সাথে ওয়েসলি স্নাইডার বা ক্লাস ইয়ান হান্টেলার এর বিবাদ – যুগ যুগ ধরে হল্যান্ড টিমের একটা অপ্রিয় ঐতিহ্য হয়ে চলে এসেছে। এই বিবাদের ফল কেউ কেউ জাতীয় দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান চিরজীবনের জন্য – যেমনটি হয়েছিলেন ‘৯৪ বিশ্বকাপের আগে রুদ খুলিত, কোচ ডিক এডভোকেটের সাথে বিবাদে জড়িয়ে। আবার কেউ কেউ ঠিকই ফিরে আসেন। যেমন এসেছিলেন এডগার স্টেফান “পিটবুল” ডাভিডস ; সমর্থকদের প্রিয় এডগার ডাভিডস।
উপনিবেশিক কারণেই দক্ষিণ আমেরিকার দেশ সুরিনাম থেকে ডাচ দলের ফুটবলারদের এক বিরাট যোগান চলে আসছে। সুরিনাম এর রাজধানী পারামারিবো তে ১৯৭৩ সাল এর ১৩ মার্চ জন্মগ্রহণ করেন এডগার ডাভিডস। ভাগ্যের সন্ধানে হারমান রাইকার্ড এবং জর্জ গুলিট যখন তাদের পরিবার ( যাদের পরিচয় বলে দিতে হবে না) কে নিয়ে একই নৌকায় সুরিনাম থেকে ওলন্দাজ দের দেশের পথ ধরেন, তখন থেকেই খুলে যায় ডাচ দলে অভিবাসীদের আগমনের দরজা। এভাবেই একই পথে হল্যান্ডে চলে আসেন এডগার ডাভিডস, ক্লারেন্স সিডর্ফ, প্যাট্রিক ক্লুইভার্টরা।
এডগার ডাভিডস : গগলস পরা এক পিটবুলের কথা
এখন বড় দল বলতেই আমাদের সামনে ভাসে বার্সা-বায়ার্ন-মাদ্রিদের নাম। ১৯৯১-৯৬ এই খেতাবটা বরাদ্দ থাকত ডাচ ফুটবলের আতুরঘর আয়াক্স আমস্টারডামের জন্য। প্রখ্যাত কোচ লুই ফন হাল, একগাদা তরুণ প্রতিভা নিয়ে গড়ে তুলেছিলেন একটি গতিময় দল, যার কাণ্ডারি ছিলেন অভিজ্ঞ ফ্রাংক রাইকার্ড ও ড্যানি ব্লিন্ড ( ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের লেফটব্যাক ডেলি ব্লিন্ড এর পিতা)। সেই দলে আরো ছিলেন মার্ক ওফারমার্স, মাইকেল রেইজিগার, এডগার ডাভিডস, ক্ল্যারেন্স সিডর্ফ, প্যাট্রিক ক্লুইভার্ট, ফ্র্যাঙ্ক ডি বোর ও রোনাল্ড ডি ব্যোর। এই ক্লাবেই এডগার ডাভিডস জিতেন ডাচ এরেডিভিসি, ইউয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ ও সুপারকাপ।
এরপর এডগার ডাভিডস এক সিজনের জন্য ইতালিয়ান জায়ান্ট এসি মিলানে যোগ দেন। সেখানে খাপ খাওয়াতে না পারায় জুভেন্টাস তাকে লুফে নেয়। মূলত এখানেই এডগার ডাভিডস একজন ভয়ানক সেন্ট্রাল মিডফিল্ডারের খ্যাতি পান। জিনেদিন জিদানের সাথে তার মিডফিল্ড জুটি ক্লাবটিকে এনে দেয় লীগ, ইন্টারটোটো কাপ, ইটালিয়ান কাপ। লুই ফন হাল তাকে যেমন বলতেন “পিটবুল”, তেমনি মারসেলো লিপ্পি বলেছিলেন “আমার ওয়ান ম্যান ইঞ্জিন রুম”।
এডগার ডাভিডস : গগলস পরা এক পিটবুলের কথা
বার্সেলোনার আধিপত্য এর আগের পাঁচ বছর ছিল হতাশার। টানা পঞ্চম বার এর মত লিগ জিতেনি তারা। দলে নেতৃত্বের অভাব বুঝতে পেরে কোচ ফ্র্যাঙ্ক রাইকার্ড দলে ভিড়ান তার এক সময়ের সতীর্থ এডগার ডাভিডসকে। ম্যাজিকের মত কাজ হয়, ছয় মাসেই দল কে পথে ফিরিয়ে আনেন এডগার ডাভিডস। এরপর বিভিন্ন মেয়াদে খেলেছেন ইন্টার মিলান, টটেনহাম,ক্রিস্টাল প্যালেস ও বার্নেটে। এরই মাঝে আরেক দফায় আয়াক্সেও খেলে এসেছিলেন তিনি।
জাতীয় দলে শুরুটা ভাল হয় নাই এডগার ডাভিডস এর। কোচ গাস হিডিংক এর নামে বিরূপ মন্তব্য করায় ইউরো ৯৬ এর আগেই দেশে ফিরে যেতে হয় তাকে। তবে ভুল বুঝেছিলেন দুইজনই, তাই হিডিংক তাকে ৯৮ এর বিশ্বকাপের দলে রাখতে ভুল করেননি। এডগার ডাভিডস ও বিশ্বাসের প্রতিদান দিয়েছিলেন হল্যান্ডকে সেমিফাইনালে তুলে। এরপরে আবার ২০০০ এর ইউরোতেও দলকে সেমিফাইনালে নিয়ে গেছিলেন এডগার ডাভিডস। দুইবারই ছিলেন অল স্টার টিমে। ২০০৪ সালে দলের নেতৃত্ব পেলেও ক্লাব দলে অনিয়মিত হয়ে পড়ায় তা ছেড়ে দিতে হয়েছিল। এরপর আর জাতীয় দলে ফেরা হয়নি তার।
এডগার ডাভিডস এর নাম বলতে আমাদের প্রজন্মের সামনে কোন ছবিটা ভেসে উঠে? একজন গাট্টাগোট্টা কৃষ্ণবর্ণের মিডফিল্ডার – এই একটা দুর্ধর্ষ ট্যাকেল করছেন, তো এরপরেই একটি ডিফেন্স চেরা পাস দিচ্ছেন বা বা পায়ের কার্যকরী ড্রিবলে দলের আক্রমণে সাহায্য করছেন? নাকি গোলার মত শট নিয়ে গোল করছেন, যেমনটি করেছিলেন যুগোস্লাভিয়ার সাথে অন্তিম সময়ে, ‘৯৮ বিশ্বকাপে?
এডগার ডাভিডস : গগলস পরা এক পিটবুলের কথা
না, ডেভিডস মানে গগলস পরে ফুটবল খেলা। আমরা আপনারা যারা চোখের দৃষ্টিশক্তির দূর্বলতার জন্য মাঠে চশমা পরে ফুটবল খেলার অসুবিধা নিয়ে কিঞ্চিত টানাপোড়েনে থাকি, তাদের কি মনের ছবিতে গ্লুকোমায় আক্রান্ত চোখে কালো গগলস পরা ডেভিডস এর যুদ্ধংদেহী কিন্তু পরিশীলিত খেলার দৃশ্য মনে আসেনি কখনো? সেই দৃশ্য ভেবে কি আরেকটু বেশি সাহস নিয়ে খেলাটা ধরিনি আমরা?
তাই আজ ১৩ মার্চ, এই পরিশ্রমী নাছোড়বান্দা ডাচ মিডফিল্ড মেশিনকে “পাওয়ারের চশমা পরা চোখে” জানাচ্ছি জন্মদিনের শুভেচ্ছা।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

4 × 1 =