এডগার্ডো বাউজা – কে এই নতুন আর্জেন্টাইন কোচ?

হোর্হে সাম্পাওলি, মরিসিও পচেত্তিনো, ডিয়েগো সিমিওনে, মার্সেলো বিয়েলসা, র‍্যামন অ্যানহেল দিয়াজ, মার্সেলো গ্যালার্দোদের পেছনে ফেলে টাটা মার্টিনোর জায়গায় আর্জেন্টিনার নতুন ম্যানেজার হিসেবে সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছেন সাও পাওলো, সান লরেঞ্জো, লিগা ডে কিটোর সাবেক ম্যানেজার, কোপা লিবার্তোদোরেসজয়ী সাবেক আর্জেন্টাইন ডিফেন্ডার – এডগার্ডো বাউজা। সোমবার বিকেলে  আর্জেন্টাইন ফুটবল ফেডারেশানের কাছ থেকে কোচ হবার প্রস্তাব আসে, যেটা কিনা ফেলতে পারেননি বাউজা। সাও পাওলোর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা অনুযায়ী তাদের কোচের দায়িত্ব ছেড়ে তাই হিগুয়েইন-অ্যাগুয়েরো-ডি মারিয়াদের কোচ হবার গুরুদায়িত্ব নিয়েছেন ১৯৫৮ সালের ২৬ জানুয়ারী আর্জেন্টিনার রোজারিওতে জন্ম নেওয়া আটান্ন বছর বয়সী একহারা গড়নের এই মানুষটি।

আর্জেন্টিনার ফুটবল ফেডারেশানের ক্ষমতালোভী মনোভাবের কারণে সৃষ্ট দুর্নীতি ও চরম বিশৃঙ্খল অবস্থার মধ্যে এই দেশের জাতীয় দলের দায়িত্ব নেওয়াটা সহজ কোন কাজ নয়, যেখানে আবার পরপর তিন-তিনটা ফাইনাল হারের দুঃখ সহ্য করতে না পেরে হুট করে জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়ে দিয়েছেন তর্কযোগ্যভাবে দেশের ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সবচেয়ে বড় তারকা লিওনেল মেসি। আবার সাবেক কোচ টাটা মার্টিনোর আর্জেন্টিনার কোচের পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর অন্যতম উল্লেখযোগ্য কারণ ছিল ফেডারেশানের বেতন না দেওয়ার ক্ষমতা ; শেষ কটা মাস বেতন ছাড়াই একরকম স্বেচ্ছায় কাজ করে গেছেন সাবেক বার্সেলোনা কোচ এই টাটা মার্টিনো। ফেডারেশানের এহেন দুর্দশায় নিজেদের ক্লাবের লোভনীয় চাকরি ছেড়ে টটেনহ্যামের মরিসিও পচেত্তিনো, অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের ডিয়েগো সিমিওনে কিংবা সেভিয়ার হোর্হে সাম্পাওলির মত বাঘা বাঘা ম্যানেজাররা নিজের দেশের ডাকে সেভাবে সাড়া দেবেন না, সেটাই স্বাভাবিক। এইসব সমস্যাজর্জর পরিস্থিতিতে তাই আর্জেন্টাইন ফেডারেশানের কাছে কোচ নিয়োগ দেওয়ার মত কেউই ছিল না – তালিকাটা হয়ে পড়েছিল অনেক অনেক ছোট। সেই তালিকার মধ্যে থেকেই কালকে নতুন আর্জেন্টিনার কোচের নাম ঘোষণা করলেন আর্জেন্টাইন ফুটবল ফেডারেশানের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আরমান্দো পেরেজ।

সিমিওনে-বিয়েলসা, কিংবা সাম্পাওলি-পচেত্তিনোদের মতো বিশ্বব্যাপী সেরকম পরিচিতি না থাকলেও এডগার্ডো বাউজা এমনিতে কিন্তু কোচ হিসেবে দুর্দান্ত, দক্ষিণ আমেরিকান অঞ্চলে তাঁর প্রভাব যথেষ্ট লক্ষণীয়। ২০০৮ ও ২০১৪ সালে দুইবার দক্ষিণ আমেরিকার চ্যাম্পিয়নস লিগ নামে খ্যাত কোপা লিবার্তোদোরেস কাপ জিততে গিয়ে জন্ম দিয়েছিলেন দুটি রূপকথার। বিশ্বের প্রথম ম্যানেজার হিসেবে কোন ইকুয়েডোরিয়ান ক্লাবকে কোপা লিবার্তোদোরেস জেতানো ম্যানেজার তিনি। লিগা ডে কিটোর হয়ে লিবার্তোদোরেস জেতার পর ২০০৮ ক্লাব বিশ্বকাপেও দলকে নিয়ে যান তিনি, কিন্তু হেরে যেতে হয় স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের ইংলিশ ক্লাব ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের কাছে। দুইবার লিগা ডে কিটোর হয়ে ইকুয়েডোরিয়ান লিগ ও একবার পেরুভিয়ান লিগ জেতা এই কোচ আর্জেন্টাইন ক্লাব সান লরেঞ্জোর হয়ে ২০১৪ কোপা লিবার্তোদোরেসও জিতেছেন আবার। দক্ষিণ আমেরিকার ক্লাব শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট এই দুবারই এনে দিয়েছিলেন তুলনামূলক পিছিয়ে থাকা দুটি দলকে। লিগা ডে কিটো বা সান লরেঞ্জো – দুটি ক্লাবের জন্যই সেটি ছিল চ্যাম্পিয়নস লিগের সমকক্ষ এই ট্রফি প্রথম জেতা। সর্বশেষ দায়িত্বে ছিলেন ব্রাজিলের সাও পাওলোর। এই তিনটি ক্লাব ছাড়াও ১৯৯৮ সাল থেকে কোচিং শুরু করা এই কোচ কোচিং করিয়েছেন রোজারিও সেন্ট্রাল, ভেলেজ সার্সফেল্ড, কোলন, স্পোর্টিং ক্রিস্টাল, আল নাসর রিয়াদের মত দলকে। বিশেষ করে রোজারিওতে জন্ম নেওয়া এই কোচ নিজের শহরের ক্লাব রোজারিও সেন্ট্রালে ত কিংবদন্তীসম। এই ক্লাবের হয়ে দুই দফায় মোটমাট ৩১০টি ম্যাচ খেলে ৮০ গোল করা “এল প্যাতন” বা “বিগ ফুট (বড় পা)” ডাকনামের অধিকারী এই সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার বিশ্বের সবচেয়ে বেশী গোল করা চারজন সেন্ট্রাল ডিফেন্ডারের মধ্যে একজন – বাকী তিনজন হলেন আর্জেন্টাইন সতীর্থ ড্যানিয়েল প্যাসারেলা, জার্মান কিংবদন্তী ফ্র্যাঞ্জ বেকেনবাওয়ার ও রিয়াল মাদ্রিদের কিংবদন্তী ডিফেন্ডার ফার্নান্দো হিয়েরো। “বড় পা” ডাকনাম হবেই না বা কেন? জুতো যে পরতেন ১৩.৫ সাইজের! খেলোয়াড়ি জীবনে রোজারিও সেন্ট্রালের হয়ে দুইবার লিগ জেতা এই ডিফেন্ডার আর্জেন্টাইন স্ট্রাইকার মারিও কেম্পেসের পরে ক্লাবের ইতিহাসের সর্বাধিক গোলদাতা, ভাবা যায়? বাকী তিনজন প্যাসারেলা-বেকেনবাওয়ার-হিয়েরোর সাথে বাউজার পার্থক্য একটাই, বাকী তিনজন ইউরোপের বিভিন্ন ক্লাবে মাঠ মাতালেও দক্ষিণ আমেরিকা ছেড়ে বিদেশ-বিভূঁইয়ে খেলোয়াড় হিসেবে কখনোই পাড়ি জমাননি বাউজা।

media-photo_573dcdf17dc32a080ab89167_640w

সাও পাওলোর ম্যানেজার থাকা অবস্থায়
সাও পাওলোর ম্যানেজার থাকা অবস্থায়

খেলোয়াড়ি জীবনে রোজারিও সেন্ট্রাল ছাড়াও অ্যাটলিটেকো জুনিয়র, ইন্দিপেন্দিয়েন্তে ও ভেরাক্রুজে খেলেছেন বাউজা। আর্জেন্টিনার বিখ্যাত আকাশী-সাদা জার্সি মাত্র তিনবার গায়ে চাপানো এই ডিফেন্ডার ছিলেন আর্জেন্টিনার ১৯৯০ বিশ্বকাপ স্কোয়াডেও, যদিও এক ম্যাচেও মাঠে নামা হয়নি তাঁর, ডাগ-আউটে বসেই সহ্য করতে হয়েছে দলের ফাইনালে হার ও রানার্সআপ হবার যন্ত্রণা।

আর্জেন্টিনার হয়ে বাউজা
আর্জেন্টিনার হয়ে বাউজা

কোচ হিসেবে সর্বশেষ দায়িত্বে ছিলেন ব্রাজিলিয়ান ক্লাব সাও পাওলোর। রোজারিও চেনি, লিওনিদাস, কারেকা, কাকা, লুই ফাবিয়ানো, কাফু, জুনিনহো, সার্জিনহোর মত ব্রাজিলিয়ান লিজেন্ডদের জন্ম দেওয়া এই ক্লাব বর্তমান সময়েও অনেক ব্রাজিল খেলোয়াড়ের ক্যারিয়ারই গড়ে দিয়েছে। যাদের মধ্যে লুকাস মৌরা, আলেক্সান্দার পাতো, পাওলো হেনরিক গানসো, ক্যাসেমিরো, হার্নানেস, মিরান্ডা এদের নাম উল্লেখযোগ্য। এত এত তারকার জন্ম দেওয়া এই ক্লাব কিন্তু এবার অত শক্তিশালী দল গড়তে পারেনি কোপা লিবার্তোদোরেসের জন্য, শুধুমাত্র এডগার্ডো বাউজার দক্ষ নেতৃত্বে কম শক্তিশালী এই দলকে নিয়েও গত পাঁচ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মত লিবার্তোদোরেসের সেমিফাইনাল খেলেছে সাও পাওলো। হয়তোবা ফাইনালেও খেলতো, কিন্তু খেলতে পারেনি সেমিফাইনালে প্রশ্নবিদ্ধ রেফারিংয়ের কারণে। মৌসুমের শুরুতেই ক্লাব ছেড়ে চলে যান অ্যালেক্সান্দার পাতো, লুইস ফাবিয়ানো, রোজারিও চেনির মত তারকারা। পাওলো হেনরিক গানসো, তরুণ আর্জেন্টাইন স্ট্রাইকার জোনাথান ক্যালেরি, তরুণ ডিফেন্ডার রড্রিগো কাইও আর উরুগুয়ের ডিয়েগো লুগানো, চিলির ইউজিনিও মেনা ও ব্রাজিলের মিশেল বাসতোস – এই পোড় খাওয়া যোদ্ধাদের নিয়ে ভাঙ্গাচোরা একটা দল নিয়েই এবারের লিবার্তোদোরেসে ব্রাজিলিয়ান ক্লাবগুলোর মধ্যে সবচাইতে ভালো করেছে সাও পাওলো, যে টুর্নামেন্টে আরো শক্তিশালী স্কোয়াড থাকা সত্বেও অ্যাটলেটিকো মিনেইরো ও করিন্থিয়ান্সের মত ঐতিহ্যবাহী ক্লাবগুলো কিছু করতে পারেনি। এই স্কোয়াড নিয়ে সাও পাওলো যে প্রথম রাউন্ড পেরোতে পারবে, সেটাই ভাবতে পারেনি কেউ, কিন্তু তাও সেমিফাইনালে খেলা সম্ভব হয়েছে এই বাউজার কারণেই। নয় গোল করে লিবার্তোদোরেসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হবার ফলে জন্ম হয়েছে জোনাথান ক্যালেরির মত নতুন সুপারস্টারের।

সান লরেঞ্জোর হয়ে কোপা লিবার্তোদোরেস জয়ের পর
সান লরেঞ্জোর হয়ে কোপা লিবার্তোদোরেস জয়ের পর

মূলতঃ ডিফেন্সিভ কোচ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া এডগার্ডো বাউজারই আছে সেই কৃতিত্ব – চার চারটা আলাদা আলাদা ক্লাবকে কোপা লিবার্তোদোরেসের সেমিফাইনালে নিয়ে যাওয়ার। তাঁর কোচিং প্রোফাইল ভালোমত লক্ষ্য করলে বোঝা যাবে তাঁর কোন সাফল্যই কিন্তু আকাশ থেকে পড়া বা হুট করে আসা না। এমন না যে তিনি কোন একটা ট্রফি জিতে আবার ট্রফিশূণ্যতায় ভুগেছেন, সবসময়েই যেই ক্লাবের দায়িত্বেই ছিলেন না কেন, প্রত্যেকটা ক্লাবকেই শিরোপাজয়ের মত করে গড়ে তুলেছেন। সর্বদা মিডিয়ার ঝলমলে আলো থেকে দূরে থাকতে পছন্দ করা এই কোচ কখনো কোন খেলোয়াড় বা অন্য কারোর সাথে কোন ধরণের স্ক্যাণ্ডালে জড়িয়েছেন বলে শোনা যায়নি। সব সময় লো প্রোফাইলে থাকা এই কোচ গুরু মানেন নেলসন ম্যান্ডেলাকে।

“এই অবস্থায় আর্জেন্টিনার কোচের দায়িত্ব নেওয়া মানেই কাদায় পা নেওয়া। কিন্তু যে ছেলে কাদার মধ্যেই জন্মেছে তাঁর আবার কাদায় ভয় কিসের?” লিওনেল মেসির মান ভাঙ্গিয়ে আবার জাতীয় দলে ফিরিয়ে আনার গুরুদায়িত্বটা তাই আর্জেন্টাইন ফুটবল ফেডারেশান যোগ্য লোকের হাতেই দিয়েছে বোঝা যাচ্ছে!

কমেন্টস

কমেন্টস

One thought on “এডগার্ডো বাউজা – কে এই নতুন আর্জেন্টাইন কোচ?

মন্তব্য করুন

16 − eight =