এক রাজপুত্রের কথা

ভালবাসার শহর প্যারিস । আর সেই প্যারিসের ভালবাসা আইফেল টাওয়ার কাল সেজেছিল বর্ণিল সাজে ।
দৈত্যকার এই প্রখ্যাত টাওয়ারের নিচে সমবেত হয়েছিল হাজার হাজার ফরাসী ।
উদ্দেশ্যে, ইউরোপ ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনে সাক্ষী হওয়া । মিনিট পাঁচেকের দুরত্বে তখন চলছে ইউরো শ্রেষ্ঠত্বের শেষ লড়াই । দুর্ভেদ্য ফরাসী দূর্গ জয় করতে আসা পর্তুগীজদের চোখে তখন অনন্য এক স্বপ্ন । যে স্বপ্নের সওয়ারী ফুটবলের বরপুত্র ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ।
১২ বছর পূর্বে গ্রীক ট্র্যাজেটির শিকার সেই লিকলিকে ছেলেটি এখন পুরোদস্তুর পরিণত সুঠামী ।
সেদিনের সেই নব্য তরুনের হাতে এখন সেনাপতির বাহু বন্ধনী ।
১২ বছর আগে ঠিক এই মঞ্চেই কাঁদতে হয়েছিল তাকে ।
দেশের মাটিতে সেই আক্ষেপ ঘোঁচানোর সুযোগ ভালোবাসার শহর প্যারিসে ।
কিন্তু প্যারিস যে এ যাত্রায় ভালোবাসায় পক্ষ নিলো ।
তাই স্বাভাবিক ।
প্যারিসের ভালোবাসা ও গ্রীক ট্র্যাজেটি স্বরণে তখন ফরাসী-পর্তুগীজ যুদ্ধের দামামা বেজে উঠলো ।
ইউরো শ্রেষ্ঠত্ব যুদ্ধের বয়স তখন সবে ১২ মিনিট । পর্তুগীজ সেনাপতির পায়ে বল । বুটের তলায় বল রেখে সেনাপতির দৃষ্টি তখন সতীর্থ খুঁজে ফিরছে ।
আচমকাই ঘটলো ব্যাপারটি । ফরাসী মাঝমাঠ সেনা দিমিত্রি পায়েট বলের দখল পেতে পা চালালেন সজোরে । প্রস্তুত ছিলেননা পর্তুগীজ সেনাপতি । বাম উঁরুতে ব্যাথা পেয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন তীব্র আর্তনাদে । ১২ বছরের আক্ষেপ ঘোঁচানোর সুযোগটা কি তবে ১২ মিনিটেই সলীল সমাধীস্থ ?
মানতে চাইলেননা তা পর্তুগীজ ত্রাণকর্তা । টোটকা নিয়ে ফিরলেন মিনিট খানেক বাদেই । যোগ দিলেন দলের এক আক্রমণে । তবে এ যাত্রায় যেন গতিরাজ সেই অশ্ব কাছিমের অবয়বে ।
গতির দৃশ্যেই বলে দিচ্ছিলো থামতে হবে রোনালদোকে । থামলেন তিনি ।
আর পারছিলেননা । ভাগ্যের প্রতি প্রচণ্ড ক্ষোভ নিয়ে মাটিতে আছড়ে ফেললেন অধিনায়কের বাহু বন্ধনীটি ।
লড়াইয়ের চূড়ান্ত পরিণতির আগেই তাকে চূড়ান্তভাবে হারতে হলো ব্যাথার কাছে । উরুর ব্যাথায় লুটিয়ে পড়া রোনালদো তখন রীতিমত কাঁদছেন । কাঁদছেন হৃদয়ের রক্তক্ষরণে ।
১২ বছর ধরে পুষে আসা স্বপ্নটি যে প্রায় শেষ ।
স্ট্রেচার এলো ।
ফাইনালের রঙ যেন মাঠ থেকে বেড়িয়ে গেলো ঐ স্ট্রেচারে করেই । এরপরে দুর্ভেদ্য ফরাসীদের সাথে দাঁতে দাঁত চেঁপে লড়ে গেল রোনালদোর সতীর্থরা ।
সহসাই সেনাপতিকে হারানোর শোক তখন যেন শক্তিতে রুপান্তরিত ।
এই শক্তি নতুন মাত্রা পেলো যখন অতিরিক্ত সময়ের ঠিক পূর্ব মুহুর্তে সেনাপতি ফিরে এলো ।
পায়ে ব্যাণ্ডেজ নিয়ে সতীর্থদের বলে গেল- ‘লড়ে যাও, ইতিহাস দাও বদলে’ । যুদ্ধ তখন চূড়ান্ত উন্মাদনায় । আর এই উন্মাদনায় রোনালদো ভুলে গেলেন তিনি ভাঙ্গা পা নিয়ে দাঁপাচ্ছেন । ডাগ আউটে নতুন রোনালদোর সেই উন্মাদনা ফুটবল বিশ্ব মনে রাখবে অনেকদিন । উত্তেজনায় কোচ তখন বসতে চাইছিলেন । রোনালদো তাকে আর বসতে দিলেন কই !
সতীর্থ রাফায়েল যখন হালকা চোঁট সেরে লাইনের এপার হাঁপাচ্ছিলো রোনালদো তখন প্রায় ঠেলেই তাকে মাঠে ঠুকিয়ে দিলো । ফরাসী গুরু দেশমের সামনেই ঘটলো অভিনব দৃশ্যেটি ।
ততক্ষণে অবশ্য ইতিহাস রচিত হয়েছে ।
বদলী খেলোয়ার এডেরের দুরপাল্লার শটে পরাস্ত ফরাসী কাপ্তান হুগো লরিস । প্রতিটি মিনিট যেন তখন পর্তুগীজদের বলে কয়ে যাচ্ছিলো । অবশিষ্ট ১২ মিনিট রোনালদোদের দিলো জীবনের দীর্ঘ ১২ মিনিটের স্বাদ ।
১২ বছরের আক্ষেপ শুরুর ১২ মিনিটে যে শেষের করুণ ইঙ্গিত করছিলো শেষের ১২ মিনিট করলো ঠিক উল্টোটা ।
খোদ শেষের সেই ১২ মিনিট যেন লড়ে গেল পর্তুগীজদের হয়েই ।
রেফারির শেষ বাঁশিতে তখন এক আবেগের রঙ্গমঞ্চ । যে মঞ্চের নাম ভূমিকায় পর্তুগীজ স্বপ্নদ্রষ্টা, পর্তুগীজ স্বপ্নস্রষ্টা রোনালদো । আবারও কাঁদলেন তিনি । গ্রীক ট্র্যাজেটি ও পায়েট ট্র্যাজেটির সেই কান্নার শোধ যেন তার অমরত্বের অশ্রুজলে ।
রোনালদোর সেই কান্না কি ছুঁয়েছিল সদর্পে উঁচুতে দাঁড়িয়ে থাকা আইফেল টাওয়ারকে ?
কে জানে হয়ত ছুঁয়েছিল । তবে সে আবেগ নিশ্চই লুকিয়েছিল আইফেল স্তম্ভটি ।
কারণ তখন যে কাঁদছে প্যারিস, কাঁদছে ফ্রান্স ।
গ্রীজম্যান, পগবাদের দূর্গটি অবশেষে জয় পর্তুগীজ নাবিকদের । ইতিহাস বদলে যাওয়া কিংবা ইতিহাস গড়ার দিনটিতে ভালোবাসার শহর প্যারিস হয়ত বেদনার নীল রঙে দংশিত হয়েছে । কিন্তু লিসবন থেকে ম্যানচেষ্টার হয়ে মাদ্রিদে কিন্তু ছুঁয়ে গেছে কয়েক পশলা আনন্দের শুভ্রতা ।
শুভ্রতা ছুঁয়ে গেছে ফুটবল বিশ্বের অগণিত রোনালদো ও পর্তুগীজ ভক্তদের । ছুঁয়ে যাওয়ার দিবসটিতে রোনালদো ছাড়িয়ে গেলেন নিজেকেই ।
জিতলেন শ্রেষ্ঠত্বে ।
জিতলেন এক অমরগাথার রাজপুত্তুরের চরিত্র ।
ম্যানচেষ্টার কিংবা ২০১৪ এর লিসবন । কিংবা শ্রেষ্ঠত্বের পয়া প্রাসাদ মাদ্রিদ ।
এদের পাশাপাশি প্যারিসও যে এখন রোনালদোর এক প্রিয় নাম ।
ভালোবাসার শহর প্যারিস এখন হয়ত পর্তুগীজ যুবরাজের হৃদয় নিংড়ানো এক ভালোবাসার নাম ।
যে ভালোবাসায় প্যারিস না হোক, আজীবন স্বখেদে সিক্ত থাকবেন সর্বজয়ী রোনালদো দস সান্তোস এ্যাভেইরো ।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

19 + 13 =