এক জেন্টলম্যানের বিদায়

জুলাই, ২০০০। জিম্বাবুয়ে এ দলের বিপক্ষে ১৫৬ করে অপরাজিত থাকলেন। ডাক পেয়ে গেলেন জিম্বাবুয়ে-পাকিস্তান-শ্রীলংকার মধ্যকার ট্রায়াঙ্গুলার সিরিজে। দ্বিতীয় ম্যাচেই তার ৮৫ রানের ইনিংস শ্রীলংকাকে জেতালো ৩৭ রানে। ম্যান অফ দ্যা ম্যাচ। আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

টেস্টের অভিষেক পরের মাসেই। অভিষেক ওয়ানডে সিরিজের ৬৬.৩৩ গড়ের রান এনে দিলো টেস্ট ক্যাপ। কিন্তু ওয়ানডের সাফল্যটা দক্ষিণ আফ্রিকার সাথে তিন টেস্টে ধরে রাখতে পারলেন না। কিন্তু ভালো কিপিং সেযাত্রা টিকিয়ে দিলো।

৯ টেস্ট আর ১৬ ইনিংস পর এলো কাঙ্ক্ষিত ট্রিপল ডিজিট স্কোর। ভারতের বিপক্ষে। ১০৫। আগস্ট, ২০০১। সাত মাস পরেই প্রথম ডাবল। ৩২৭ বলে ২৩৪। প্রতিপক্ষ পাকিস্তান। সেই যে ডাবল সাঙ্গার ঘাড়ে আসন গেড়ে বসলো তাতে বাকি ১৪ বছর নিয়মিত বিরতিতেই সেখানে পৌছাতে থাকলেন। ডন ব্রাডম্যানের ডাবল সেঞ্চুরি ছিলো ১২ টা। ৩৭ বছর বয়সে অবসরের আগ মুহূর্তে সাঙ্গার নামের পাশে ১১ টা। চলতি কলম্বো টেস্টে ৪১৩ রানের লক্ষ্যে সাঙ্গা যখন ব্যাট করতে নামলেন তখনও প্যাভিলিয়ন থেকে ভেসে এলো ‘গো ফর ইয়োর ডাবল’।

ওয়ানডেতে অবশ্য ট্রিপল ডিজিটের দেখা পেতে অনেক অপেক্ষা করা লেগেছে। প্রায় তিন বছর। ৮৬ ম্যাচ। তারপর ২০০৩ এ সারজায় পাকিস্তানের বিপক্ষে পেয়েছেন সেই ম্যাজিক ফিগার। অপরাজিত ১০০। ৪০৪ ওয়ানডেতে ৪১.৯৮ গড়ে ১৪২৩৪ রান। ২৫ সেঞ্চুরির সাথে ৯৩ হাফ সেঞ্চুরি। শচীন টেন্ডুলকারের ১৮৪২৬ রানের পর ওয়ানডের ইতিহাসেই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ স্কোরার।

পি সারা ওভালে গতকাল যখন শেষবারের মত ব্যাট হাতে নামলেন তখন চারিদিকে জাতীয় পতাকা উড়ছে। সাঙ্গাকারার এক একটা রানের সাথে সাথে গ্যালারি থেকে ম্যাচ জেতার সমপরিমান উচ্ছ্বাস ঝরে পড়ছে। একপাশে করুণারত্নেও যে রান করছেন তা তখন কেউ খেয়ালই করছেই না। এমন অবস্থায় নার্ভ ধরে রাখা কঠিন না, প্রায় অসম্ভব। তাই হলো। অশ্বিনের একটা অফ স্ট্যাম্প থেকে স্পিন করে বেরিয়ে যাওয়া বল কপিবুক স্টাইলে ডিফেন্স করতে গিয়ে ব্যাট ছুঁয়ে মুরালি বিজয়ের হাতে জমা পড়লো। চার ইনিংসে চারবারই অশ্বিনের শিকার। উল্লাস করার আগেই বিজয়-মিশ্ররা হ্যান্ডশেক করার প্রয়োজনবোধ করলেন। কলম্বোর পি সারা ওভাল নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে গেলো। সাঙ্গাকারা নার্ভলেস ভাবে হেটে পার হয়ে গেলেন প্রিয় মাঠটা। দাঁড়িয়ে সম্মান দেখিয়ে একটু পর গ্যালারি খালি করে চলে গেলেন অনেকেই। কারণ বেশিরভাগ শ্রীলংকানের কাছে ভারতের তিন টেস্ট আর তিন ওয়ানডের এই ট্যুরটা ভাগ হয়েছে দুই ভাগে। প্রথম দুই টেস্ট এবং এক টেস্ট ও তিন ওয়ানডে। সহজে বললে সাঙ্গা কালীন এবং সাঙ্গা পরবর্তী সিরিজ।

গত দু’টো সিরিজ সাঙ্গা কোয়ালিটির গেলো না। পাকিস্তানের সাথে দুই টেস্টে করেছিলেন ৫০, ১৮, ৩৪, ০। ভারতের সাথে চার ইনিংসে করলেন ৪০, ৫, ৩২, ১৮। ক্যারিয়ারের ৫৭.৪১ গড়ের সাথে গত দুই সিরিজের ২৪.৬৩ গড় যাচ্ছিলো না। বিশ্বকাপে চার সেঞ্চুরি করে ফেরার পরেই নাকি অবসরে যেতে চেয়েছিলেন। দক্ষিণ আফ্রিকার সাথে হেরে বিদায় নেওয়া ওই ম্যাচে করেছিলেন ৪৫। ওটাই ওয়ানডেতে শেষ ম্যাচ হয়ে আছে। বন্ধু জয়বর্ধনের সাথে তখনই অবসরে যেতে চেয়েছিলেন বলে শোনা যায়। কিন্তু সিলেক্টররা অনেক বলে কয়ে নাকি আরও চারটা টেস্ট খেলালেন। কারণ জয়বর্ধনে-সাঙ্গার একই সময়ে অবসর যাতে দেশের ক্রিকেটে বড় প্রভাব না ফেলে, সেজন্য, বিশেষ করে দেশের জন্য খানিকটা জোর করেই আরও কয়েক মাস ক্যারিয়ার দীর্ঘায়িত করলেন সাঙ্গা।

১২৪০০ রান। আগে শুধুমাত্র শচীন, পন্টিং, দ্রাবিড় এবং ক্যালিস। কিন্তু গড়টা শচীন (৫৩.৭৮), রাহুল (৫২.৩১) লারা (৫২.৮৮), পন্টিং (৫১.৮৫), ক্যালিস (৫৫.৩৭) থেকে বেশি (৫৭.৪১)। অন্তত ২০ টা টেস্ট ম্যাচ খেলা ব্যাটসম্যানদের যদি মাপকাঠি ধরা হয় সাঙ্গাকারার চেয়ে বেশি টেস্ট গড় মাত্র চার জনের। ডন ব্রাডম্যান- ৯৯.৯৪, কেন ব্যারিংটন- ৫৮.৬৭, ওয়ালি হ্যামন্ড- ৫৮.৪৬, গ্যারি সোবার্স- ৫৭.৭৮। এখানেও সাঙ্গা পঞ্চম। শতাধিক টেস্ট খেলা ব্যাটসম্যানের মধ্যে সাঙ্গার গড় সবচেয়ে বেশী। উইকেট কিপিং করার সময়ে সাঙ্গার গড় ছিল ৪০.৪৮। কিপিং ছেড়ে দেবার পর গড় ৬৭.১৩। কিপিং করার সময়ের ৭ সেঞ্চুরির বিপরীতে কিপিং ছেড়ে ৩১ সেঞ্চুরি। কিছুদিন আগেই একটা সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন টেস্টে কিপিং ছাড়ার সিদ্ধান্ত তার সবচেয়ে কঠিন এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ছিলো।

ফ্ল্যাশব্যাকে আরো কতশত স্মৃতি। সবগুলো টেস্ট প্লেইং দলের বিপক্ষে সেঞ্চুরি। ২০০৬ এ মাহেলার সাথে ৬২৪ রানের এপিক জুটিতে সাঙ্গার মাত্র ১৩ রানের জন্যে ট্রিপল মিস। ২৮৭ করেও অসন্তোষে মাথা নাড়াতে নাড়াতে প্যাভিলিয়নে ফেরা। ২০০৭ এ বাংলাদেশের সাথেই পরপর দুই টেস্টে ২০০ আর ২২২ করে অপরাজিত থাকা। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতেই বাংলাদেশের সাথেই প্রথম ইনিংসে ৩০৯ করে পরের ইনিংসেও ১০৫ করেছিলেন! পুরো শ্রীলংকা যখন খাবি খাচ্ছে অস্ট্রেলিয়ান পেসে তখন, ২০০৭ এ, হোবার্টে বুক চিতিয়ে ১৯২ রানের ইনিংসটা আমার দেখা সেরা ইনিংসগুলোর তালিকায় থাকবে নি:সন্দেহে। আক্রমণাত্মক ক্যাপ্টেন্সি আর অনন্যসাধারণ ক্রিকেট জ্ঞান। ২০০৯ এ টি-টুয়েন্টি আর ২০১১ তে দলকে ওয়ানডে বিশ্বকাপের ফাইনালে নিয়ে যাওয়া। গেলো বিশ্বকাপেই চার সেঞ্চুরি। চোখে লেগে থাকা সব কাভার ড্রাইভ, স্ট্রেইট ড্রাইভ, ব্যাকফুট পাঞ্চ, ফ্লিক। লর্ডসে সবচেয়ে তরুণ এবং একমাত্র খেলতে থাকা প্লেয়ার হিসেবে এমসিসি স্পিরিট অফ ক্রিকেট লেকচার।

ছোটকালে কেউ মারা যাবার দিনে বৃষ্টি হলে সবাই বলতো লোকটা এত ভালো ছিলো যে আকাশও আজ কাঁদতেছে। আজকেও শ্রীলংকা যখন পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে। ১ উইকেট হাতে আছে তখনই পূর্বাভাস না থাকার পরেও কলম্বোর আকাশে হঠাতই এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেলো! খেলা বন্ধ রেখে আগেভাগে লান্সে গেলো দু’দলের প্লেয়াররা। আমার অদৃষ্টে বা কুসংস্কারে মোটেই বিশ্বাস নেই। তারপরও আজ ছোটবেলায় শোনা কথাগুলো মনে এসে যাচ্ছে।

উপমহাদেশের প্লেয়ারদের বিদায় সাধারণত এতটা মধুর হয় না যতটা সাঙ্গাকারার ক্ষেত্রে হলো। একটা প্লাকার্ডে লেখা দেখা গেলো ‘সাঙ্গা, ইউ আর দ্যা মোস্ট লাভড পারসন ইন শ্রীলংকা’। এই প্লাকার্ডের কাছে বাকি সব অর্জন নগন্য হতে বাধ্য। অসাধারণ লাস্ট স্পিস ছিলো। শচীন ঠিক কাঁদাতে পারেননি। খারাপ লাগার মধ্যেই ছিলো। মা-বাবার কথা বলতে গিয়ে সাঙ্গা নিজে শুধু কাঁদলেন না, অনেককেই কাঁদিয়ে ছাড়লেন। কী অনন্য জীবনবোধ। প্রতিপক্ষকে সম্মান। শেষ বাক্যটাতেও ম্যাথুসকে দিলেন জাতীয় পতাকার জন্যে লড়ে যাবার প্রেরণা।

বিদায় কুমার চোকশান্দা সাঙ্গাকারা। বিদায় কুমার ‘ডাবল’ সাঙ্গাকারা। থ্যাংস ফর অল দ্যা মেমোরিস, লিজেন্ড।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

5 × four =