এক গোলমেশিনের কথা

তখন লিভারপুলে এখনকার মত কোন টিনএজ খেলোয়াড় ভালো করলেই তাঁকে হুট করে মূল একাদশে নামিয়ে দেওয়া হত না। এখন যেরকম রাহিম স্টার্লিং, মাইকেল ওয়েন, জ্যাক রবিনসনদের ক্ষেত্রে করা হয়েছে, বলতে গেলে এখন নিয়মিতই কোন কিশোর খেলোয়াড় ভালো করলেই তাঁকে মূল দলে অভিষেক করিয়ে দেওয়া হয়। তখনকার অবস্থাটা ঠিক এরকম ছিল না। শ্যাঙ্কলি-পাইসলি, দুই দিগ্বিজয়ী কোচেরই মূল লক্ষ্য ছিল মাঠে লিভারপুলকে প্রতিনিধিত্ব করবে এমন এগারোজন খেলোয়াড়, যাদের ভেতরে লিভারপুলের সেই সংস্কৃতিটা প্রোথিত হয়ে আছে। কোন একজন কিশোর যত ভালোই করুক না কেন তাঁকে অবশ্যই রিজার্ভ দলের সাথে খেলে “দ্য লিভারপুল ওয়ে” বা লিভারপুল ক্লাবের সংস্কৃতিটা আগে আয়ত্ত্ব করতে হবে, তারপর মূল দলে খেলার চিন্তা – শ্যাঙ্কলি বা পাইসলির লিভারপুল ছিল এমনই।

ত যাই হোক না কেন, ওয়েলস থেকে আসা নীল চোখের এক কিশোরের সেই পথ পছন্দ হল না। চেস্টার সিটির হয়ে প্রতিভার স্ফূরণ ঘটানো সেই কিশোর ভেবে বসল – অবশ্যই আমার মূল দলে খেলার যোগ্যতা আছে, নাহলে লিভারপুলের মত দল তৎকালীন ব্রিটিশ রেকর্ড ৩০০,০০০ পাউন্ড খরচ করে আমাকে দলে টানল কেন? ক্লাবের কিংবদন্তীরা, সুপারস্টার খেলোয়াড়েরা তাঁর উপর একটু দাদাগিরি করতে চায় – চুপচাপ, একটু লাজুক সেই কিশোরের এই বিষয়টাও পছন্দ হল না সেরকম। পত্রপাঠ কোচ বব পাইসলির দরজায় কড়া নাড়লো ছেলেটি –

“বস, দেখুন, আমাকে মূল একাদশের সাথে খেলার সুযোগ করে দিন। এভাবে আর কত? এভাবে রিজার্ভ দলের সাথে আমাকে যদি নিয়মিত খেলতে হয় তাহলে আমি আর কিন্তু আর লিভারপুলে থাকবো না, আমাকে বিক্রি করার ব্যবস্থা করুন”

প্রাজ্ঞ পাইসলি মনে মনে মুচকি হাসলেন একটু। কিন্তু সেটা মুখে প্রকাশ করলেন না। মাত্র আঠার-উনিশ বছর বয়স ছেলেটার, কিছু করে দেখানোর একটা উদ্যম বইছে রক্তে, সেটা বোঝেন তিনি। স্বভাবসুলভ গম্ভীর ও বিরক্ত কণ্ঠে ছেলেটাকে বললেন –

“ঠিক আছে। তুমি এত করে চাইলে ত তোমাকে আর আটকিয়ে রাখতে পারি না তাই না? ট্রান্সফারের সময় আসুক, তোমাকে ক্লাব থেকে বিদায় করবার ব্যবস্থা করব”

অফিস থেকে ঝড়ের বেগে বের হয়ে আসলো ছেলেটি, রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে। সেদিনই ছেলেটা প্রতিজ্ঞা করলো কিছু করে দেখানোর, প্রতিজ্ঞা করল রিজার্ভ দলের হয়ে গোলের পর গোল করে যাওয়ার। গোলের ধারায় থাকলে অন্যান্য ক্লাবগুলোও তাঁকে দলে নেওয়ার ব্যাপারে আগ্রহী হবে, তাই। নতুন মৌসুমে রিজার্ভ দলের হয়ে প্রথম চার ম্যাচেই পাঁচ গোল করে দেখালো ছেলেটি। পাইসলির মনের হাসি তখন মুখেও দেখা গেল। এটিই ত চেয়েছিলেন তিনি, ছেলেটার মধ্যের বারুদটাকে আরেকটু জ্বালিয়ে দিয়ে তাঁকে মূল একাদশের জন্য যাতে আরও ভালভাবে প্রস্তুত করা যায়! ছেলেটাকে বিক্রি করার ইচ্ছা পাইসলির কোনকালেই ছিল না, তা বলাই বাহুল্য।

পাইসলির এই টোটকা কাজে লাগলো। বলা উচিত বেশ ভালোভাবেই কাজে লাগল। কাজে লাগলো তৎকালীন ক্লাব সুপারস্টার ‘কিং’ কেনি ডালগ্লিশের দাদাগিরিও! ক্লাবের হয়ে দুই দফায় মোট ষোল বছর খেলে গোলবন্যা বইয়ে দিল ছেলেটি, ৬৬০ ম্যাচে করল ৩৪৬ গোল – যেটা কিনা এখনো ক্লাবের ইতিহাসের সর্বোচ্চ।

358030325b49c876c9bcb77a6f8f1c1f

ওয়েলস থেকে আসা সেই ফিনফিনে গোঁফওয়ালা গোলমেশিন ছেলেটার নাম ইয়ান রাশ।

১৯৮০ সালে ইপসউইচ টাউনের বিপক্ষে লিভারপুলের মূল একাদশে সুযোগ পায় ছেলেটি, কিংবদন্তী কেনি ডালগ্লিশের জায়গায়। সেই যে শুরু, আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ক্লাবের হয়ে প্রথম পূর্ণ মৌসুমেই ৪৯ ম্যাচে ৩০ গোল করলেন রাশ। পিএফএ ইয়াং প্লেয়ার ওফ দ্য ইয়ার, প্লেয়ার অফ দ্য ইয়ার – পুরষ্কারগুলো মৌসুমের পর মৌসুম আসতে থাকল। ১৯৮৩-৮৪ মৌসুমে ৪৭ গোল করে ভাংলেন ২০ বছর আগেকার রজার হান্টের এক মৌসুমে লিভারপুলের হয়ে সর্বোচ্চ গোল (৪১) করার রেকর্ড, লিভারপুলও ঘরে আনল তাদের চতুর্থ ইউরোপিয়ান ট্রফি, লিগ কাপ ও ইংলিশ লিগের ট্রেবল। ইউরোপের সর্বোচ্চ গোলদাতা হবার সুবাদে জিতলেন গোল্ডেন বুটও।

কেনি ডালগ্লিশের সাথে তাঁর স্ট্রাইক জুটিটাকে এখনো ইতিহাসের অন্যতম সেরা জুটি বলা হয়। ডালগ্লিশ তখন তাঁর খেলোয়াড়ি জীবনের শেষেরদিকে বলতে গেলে, খেলতেন রাশের একটু পেছনে, রাশকে প্সফুটিত হতে সাহায্য করতেন। আর রাশও ছিলেন সেরকম, ডালগ্লিশের পায়ে বল দেখলেই ডিফেন্ডারদের মধ্যে ফাঁক বের করে কখন যে দৌড় লাগাতেন গোলের দিকে প্রতিপক্ষ দল ঠাওরও করতে পারত না, ফলে তাঁর ডাকনামই হয়ে গিয়েছিল “দ্য ঘোস্ট” – ভূতের মত ডিফেন্ডারদের ফাঁকি দিয়ে নিজের জন্য জায়গা বানিয়ে করে যেতেন গোলের পর গোল। রাশের এই দুর্দান্ত ফর্ম আগ্রহী করল ইতালিয়ান ক্লাব নাপোলিকে, তাঁরা পেতে চাইলো রাশকে, এক মিলিয়ন পাউন্ডের বিনিময়ে রাশ নাপোলিতে চলেও যাচ্ছিলেন, শেষ মুহূর্তে বাদ সাধলেন লিভারপুল চেয়ারম্যান জন স্মিথ, যেতে দিলেন না রাশকে। তাতে নাপোলির বিশেষ কোন ক্ষতি হয়েছে সেটা বলা যায়না, কারণ রাশ কে না পেয়ে বার্সেলোনা থেকে নিয়ে আসে আর্জেন্টাইন কিংবদন্তী ডিয়েগো ম্যারাডোনাকে!রাশের গোলবন্যা চলতেই থাকল। আর লিভারপুলেও আসতে থাকল একের পর এক ট্রফি। ছিয়াশিতে আরেক ইতালিয়ান ক্লাব জুভেন্টাস এবার রাশকে পাওয়ার জন্য ৩.২ মিলিয়ন পাউন্ডের বিশ্বরেকর্ড ট্রান্সফার ফি প্রস্তাব করে বসল, যেটা কিনা লিভারপুলের ফিরিয়ে দেওয়ার সাধ্য ছিল না। জুভেন্টাস কিংবদন্তী মিশেল প্লাতিনি ক্লাব ছেড়ে চলে যাচ্ছেন তখন, তাই তাঁর অভাব পূরণ করার জন্য একটা সুপারস্টার লাগতই। কিন্তু ট্রান্সফার হয়ে যাওয়ার পর প্লাতিনি আবার বেঁকে বসলেন, জুভেন্টাসের হয়ে আরেক মৌসুম খেলার সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি। কিন্তু তখন ইতালিয়ান লিগে এক দল দুইজনের বেশী বিদেশী খেলোয়াড় নিবন্ধন করতে পারত না – জুভেন্টাসে তখন প্লাতিনি ছাড়াও ড্যানিশ সুপারস্টয়ার মাইকেল লাউড্রপও ছিলেন। তাই রাশ নিজেই জুভেন্টাস প্রেসিডেন্ট জিয়ামপিয়েরো বোনিপার্তিকে প্রস্তাব করলেন তাঁকে যেন লিভারপুলে এক মৌসুমের জন্য ধারে পাঠানো হয়। বোনিপার্তির পছন্দ হল প্রস্তাবটা। লিভারপুলের অনেকেই তখন ভেবেছিলেন নতুন দলে রাশের মন পড়ে থাকবে, রাশ আর আগের মত লিভারপুলের হয়ে গোল করবেন না। কিন্তু সবাইকে ভুল প্রমাণ করে দিয়ে সেই মৌসুমেও ৪২ ম্যাচ খেলে ৩০ গোল করলেন রাশ, মৌসুমশেষে লিভারপুল সমর্থকেরা তাঁকে জানালো কান্নাভরা বিদায়।

এরকম উদযাপন লিভারপুল সমর্থকেরা এককালে দেখেছেন হামেশাই
এরকম উদযাপন লিভারপুল সমর্থকেরা এককালে দেখেছেন হামেশাই

তবে ইতালিয়ান ফুটবল রাশের জন্য ছিল না। ইতালিয়ানদের অতিরিক্ত ডিফেন্সিভ ট্যাকটিক্সের সাথে অসুস্থতা, বিদেশে খাপ খাইয়ে না নিতে পারা, প্লাতিনির পাকামো – সবকিছু মিলিয়ে রাশের জুভেন্টাস অধ্যায়টা সেরকম সুখকর হল না। ১৯৮৭-৮৮ মৌসুমে জুভেন্টাসের হয়ে সব মিলিয়ে ১৪ গোল (লিগে আট গোল) করলেন ঠিকই, কিন্তু খেলাতে ছিল না রাশসুলভ কোন ছোঁয়া। তাও লিগে আট গোল করে সেই মৌসুমে স্কোরিং চার্টে এসি মিলানের ডাচ কিংবদন্তী মার্ক ভ্যান বাস্তেনের সাথে সহাবস্থানে ছিলেন তিনি, এএস রোমার জার্মান কিংবদন্তী রুডি ফোলারের চেয়ে ছিলেন উপরে। ত যাই হোক, সেই মৌসুমের শেষেই ইউক্রেইনিয়ান স্ট্রাইকার ওলেকজান্ডার জাভারোভকে দলে নেওয়ার ব্যাপারে তোড়জোড় শুরু করে জুভেন্টাস, ওদিকে খবর শুনে লিভারপুলও ঝোঁপ বুঝে মারল আবার কোপ। ২.৭ মিলিয়ন পাউন্ডের বিনিময়ে জুভেন্টাস থেকে আবারো লিভারপুলে নাম লেখালেন রাশ।

জুভেন্টাসে রাশ
জুভেন্টাসে রাশ

লিভারপুলে যেখান থেকে শেষ করেছিলেন, সেখান থেকেই যেন আবার শুরু করলেন রাশ। গোলের পর গোল আসতে থাকলো, ফলাফল, একের পর এক ট্রফি। লিভারপুলের হয়ে ক্যারিয়ারের শেষের দিকে রবি ফাওলার বলে একজন স্ট্রাইকারকে নিজের ছাত্র বানিয়ে গোল করা শিখিয়ে দিয়ে সেন্টার ফরোয়ার্ড হবার সব যোগ্যতা বুঝিয়ে দিয়ে কৃতার্থ বানিয়ে দিয়ে গেছেন বিশ্বভরা কোটি কোটি লিভারপুল সমর্থকদের।

গ্যারি লিনেকার, জিমি গ্রিভস, অ্যালান শিয়ারারের মত অন্যান্য সেন্টার ফরোয়ার্ডের সাথে রাশের মূল পার্থক্য যেটা ছিল, রাশ ছিলেন পুরোপুরি নিঃস্বার্থ একজন টিম প্লেয়ার। ডিবক্সের মধ্যে বসে থেকে টিপিক্যাল সেন্টার ফরোয়ার্ডের মত অপেক্ষা করতেন না তিনি বলের জন্য, বরং ডিফেন্ডারদের মাঝে ফাঁকা জায়গা পেলেই নিজের জন্য “স্পেইস ক্রিয়েট” করে নিজের জন্য গোল করার সম্ভাবনা ত তৈরি করতেনই, কেনি ডালগ্লিশ-পিটার বেয়ার্ডসলি-জন অলড্রিজদের মত সতীর্থদেরও গোল করার সুযোগ করে দিতেন তিনি অনেক।

আজ এই মহান কিংবদন্তীর জন্মদিন। শুভ জন্মদিন, রাশশি!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

9 − 8 =