এক অমর গ্যান্টিউমের কথা

ক্রিকেট ট্রিভিয়ায় বরাবরই কমন একটি প্রশ্ন, ‘টেস্ট ইতিহাসের সর্বোচ্চ ব্যাটিং গড় কার?’ বেশির ভাগই, ঝট করে উত্তর দিয়ে ফেলেন, ‘স্যার ডন ব্র্যাডম্যান!’ সহজ প্রশ্ন, কিন্তু উত্তর ভুল!

জীবনের শেষ ইনিংসে ৪টি রান করলেই গড় হয়ে যেত ঠিক ১০০, ব্র্যাডম্যান আউট হলেন শূন্য রানে—ক্রিকেটের সবচেয়ে কৌতুহল জাগানিয়া ও আলোচিত গল্পগুলোর একটি এটি। কিন্তু একজন আছেন, ব্যাটিং গড় যার সত্যিই একশর বেশি! টেস্ট ইতিহাসে তিনিই একমাত্র!

নাম গ্যান্টিউম। অ্যান্ড্রু গর্ডন গ্যান্টিউম।

একই সঙ্গে খেলতেন ত্রিনিদাদের ফুটবল ও ক্রিকেট দলে। ১৯৪০ সালে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্দে দামামায় তখন টেস্ট ক্রিকেট বন্ধ। ১৯৩৯ সালের পর ১৯৪৬ সালে আবার শুরু টেস্ট ক্রিকেট। ১৯৪৭-৪৮ মৌসুমে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে গেল স্যার গাবি অ্যালেনের ইংল্যান্ড দল। একটা প্রস্তুতি ম্যাচে সেঞ্চুরি করলেন গ্যান্টিউম। তবু ওয়েস্ট ইনিডজ দলে সুযোগ মিলছিল না। সুযোগটি এলো দ্বিতীয় টেস্টে। নিয়মিত ওপেনার জেফ স্টোলমেয়ার চোটে, ঘরের মাঠ পোর্ট অব স্পেনে টেস্ট ক্যাপ পেলেন ত্রিনিদাদের উইকেটকিপার-ব্যাটসম্যান গ্যান্টিউম।

স্যার ক্লাইড ওয়ালকট থাকায় কিপিং করা হয়নি গ্যান্টিউমের। তবে ব্যাটিং ওপেন করলেন। ১৩টি বাউন্ডারিতে রান করলেন ১১২! অভিষেকে সেঞ্চুরি, বড় কীর্তি। কিন্তু প্রশংসার বদলে সমালোচনাই জুটেছিল বেশি! ক্যারিবিয়ান ক্রিকেটের দর্শনের সঙ্গে বেমানান রকমের ধীরগতির ব্যাটিং করেছিলেন। এক পর্যায়ে অধিনায়ক জেরি গোমেজ বার্তা পাঠিয়েছিলেন একটু চালিয়ে খেলতে। কিন্তু তাতে কান দেননি কিংবা পারেননি গ্যান্টিউম!

শাস্তিও মিলেছিল হাতেনাতে। দ্বিতীয় ইনিংসে আর ওপেন করতে পাঠানো হয়নি গ্যান্টিউমকে। ড্র ম্যাচে পরে আর ব্যাটিংই পাননি। পরের টেস্টেই চোট কাটিয়ে ফিরেছিলেন স্টোলমেয়ার। জায়গা ছেড়ে দিতে হয় গ্যান্টিউমকে। আর সেই মন্থর ব্যাটিংয়ের অভিযোগের কারণে আর কোনো দিনই সুযোগ হয়নি দলে। অভিষেক টেস্টই তাই তার শেষ টেস্ট!

এক টেস্টের একমাত্র ইনিংসে রান ১১২, গড়ও তাই ঠিক ১১২। কোনো মানদন্ড বিবেচনায় না নিলে, টেস্ট ইতিহাসে স্যার ডনের (৯৯.৯৪) চেয়ে বেশি ব্যাটিং গড় কেবল গ্যান্টিউমেরই!

20010905-ganteaume mjki

ক্যারিয়ারে একটি টেস্ট খেলে একটিতেই সেঞ্চুরি করা ক্রিকেটার গ্যান্টিউম ছাড়া আছেন কেবল আর একজনই। নিউ জিল্যান্ডের রডনি রেডমন্ড ক্যারিয়ারের একমাত্র টেস্টে ১৯৭৩ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে অকল্যান্ডে দুই ইনিংসে করেছিলেন ১০৭ ও ৫৬। কিন্তু পরে চোখের কন্ট্যাক্ট লেন্স বদল করে মানিয়ে নিতে পারেননি, দৃষ্টিশক্তিতে হেরফের হওয়ায় ফর্ম হারিয়ে ফেলেন প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে। আর কখনও টেস্ট খেলতে পারেনি। একমাত্র টেস্টে দুই ইনিংস মিলিয়ে রান ১৬৩, তবে দুবারই আউট হওয়ায় রেডমন্ডের গড় ৮১.৫০। টেস্ট ইতিহাসে একশর বেশি ব্যাটিং গড় একমাত্র গ্যান্টিউমের।

ক্রিকেট ইতিহাসে এই জায়গাটায় তাই অমর হয়ে আছেন গ্যান্টিউম। কিন্তু জীবনের ইনিংসের পরিণতি তো অবধারিতই! বুধবার ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোবাগোর সান্তা মারিয়াতে মারা গেছেন ‘অমর’ এই ব্যাটসম্যান…রেস্ট ইন পিস!

(ক্যারিয়ারের একমাত্র টেস্টে সেঞ্চুরি করলেও জীবনের ইনিংসে হলো না সেঞ্চুরি। বয়স হয়েছিল ৯৫ বছর ২৬ দিন। পরিসংখ্যান ক্রিকেটেরে এতটাই অবিচ্ছেদ্দ অংশ যে জীবন-মৃত্যুর মতো ব্যাপারগুলিরও আলাদা জায়গা আছে রেকর্ডের পাতায়। ওয়েস্ট ইন্ডিজের সবচেয়ে দীর্ঘজীবি টেস্ট ক্রিকেটার যেমন গ্যান্টিউমই!
মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ছিলেন জীবিত দ্বিতীয় বয়োজ্যেষ্ঠ টেস্ট ক্রিকেটার। জীবিত সবচেয়ে বেশি বয়সী ক্রিকেটার এখন লিন্ডসে টাকেট। দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক এই মিডিয়াম ফাস্ট বোলারের বয়স বৃহস্পতিবার ৯৭ বছল ১২ দিন। গ্যান্টিউমের মৃত্যুতে দ্বিতীয় বয়োজ্যেষ্ঠ টেস্ট ক্রিকেটার এখন দক্ষিণ আফ্রিকারই জন ওয়াটকিন্স, সাবেক পেস বোলিং অলরাউন্ডারের বয়স বৃহস্পতিবার ৯২ বছর ৩১৪ দিন)

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

1 × 1 =