একটু ভেবে বলি?

চলমান সময়ে অন্যতম প্রধান আলোড়ন সৃষ্টিকারী টপিকের কথা বললে এক থেকে পাঁচের ভেতরে “আর্সেন ওয়েঙ্গার” প্রসঙ্গটি বিনা প্রতিদ্বন্দিতায় জায়গা করে নেবে তা বাজি ধরে বলা যায়। নিম্ন মাধ্যমিক শ্রেণিগুলোর বাংলা প্রথম পত্রের প্রশ্ন আওড়ানোর মতোই তেতো হয়ে যাওয়া “Wenger in or Wenger Out” নিয়ে কিছু লিখব না, কথা দিচ্ছি। সোশ্যাল নেটওয়ার্কে যেকোন প্রশ্নোত্তর কিংবা ভোটিং পোলে আর্সেনাল ভক্তদের জুড়ি মেলা ভার। কিন্তু “সর্ষের ভেতরেই ভূত” নামের একটা কথা আছেনা বাংলা প্রবাদে? খোদ আর্সেনাল ভক্তরাই যে এখন পোল সৃষ্টি করে সকলের কাছে দলমত নির্বিশেষে মতামত চাচ্ছেন তারা আর্সেন কে চান নাকি চান না! কেউ বলছেন, আমি তাঁকে ভালোবাসি সেহেতু আমি তাঁকে আমৃত্যু চাই; কেউ বলছেন আমি বুড়ো ভামকে চাই না; কেউ আবার মাঝামাঝিতে আর বাকিরা মজা লুটার দলে।

কিছু কিছু ব্যাপার কমন হলেও আপত্তিকর কোন জিনিসই এই ইন্টারনেটের যুগে চোখ এড়িয়ে যায় না। যারা আর্সেনকে চান না তাদের না চাওয়ার পিছে কারণ জানতে চাওয়ায় প্রত্যুত্তরে তাঁদের প্রথম কারণটাই হলো, আর্সেন একরোখা বা Stubborn. নিজে যা ভালো বুঝেন সেটাই করেন। যার কারণে ম্যাচ শুরুর পূর্বে আমার আপনার সম্ভাব্য মূল একাদশের সাথে আর্সেনের ব্যক্তিগত/বাস্তবায়িত একাদশ এ ফারাক থাকে ঢের। ফ্যান্টাসি একাদশে মার খেয়ে আমার আপনার মাঝে জমতে থাকা বিন্দু বিন্দু ফ্যান্টাসি ক্ষোভ আজ রূপ নিয়েছে আর্সেন হটাও নামক সত্যাগ্রহ আন্দোলনে। এখন আপনি আমি যাকে Stubborn বলছি তাঁর সম্পর্কে একটু জেনে নেই এবং এটাও আলোচনা করে আসি আপনি আসলে কাকে Stubborn বলে গালমন্দ করছেন।

হ্যা, আপনাকেই বলছি। ফেইসবুকের রমরমা প্রশ্ন টির অনুকরণে আমিও প্রশ্নটি ছুড়ে দিচ্ছি, “আর্সেনাল ফলো করেন কবে থেকে কিংবা আর্সেন কে জেনেছেন কতটুকু” ; স্মৃতির পাতাকে পেছনে ফিরাই। ১৯৯৬ সালের পহেলা অক্টোবর যখন এই ফরাসি সাহেব ক্লাবে যোগ দেন তখন ইন্টারনেট দূরে থাক, রঙ্গিন টিভি পাওয়াই অনেকটা দুষ্কর। জাপানিজ ক্লাব নাগয়া গ্রাম্পাস এইট থেকে সরাসরি ইংলিশ ফুটবলের টপ নচ ক্লাবে জয়েন করা তখন অনেকেই গিলতে পারেনি আর ব্রিটিশ মিডিয়া তো আরেক কাঠি সরেস। বি গ্রেড পত্রিকাগুলোতে হেডলাইন ছাপলো, “Who the heck is this French Bloke!’’ নিন্দা, ব্যান্টারিং, রঙ্গ তামাশা কম হয়নি। আর্সেনাল বোর্ডের ঘাড় ত্যাড়ামি বা Stubbornness কিন্তু সেকালেও ছিল। না হলে আর্সেনালের মত ক্লাবে এই অখ্যাত ফরাসি সুযোগ পান কিভাবে? একবার ভাবুন তো, আগামী মৌসুমে নাগয়া গ্রাম্পাসের ম্যানেজার আর্সেনের উত্তরসূরী হচ্ছেন। স্ট্যান ক্রোয়েনকের কি দশা করত ভক্তরা? ( এমন যে হবে না সেটাই বা উড়িয়ে দিচ্ছেন কিভাবে? )

ঘাড় ত্যাড়া আর্সেন আর্সেনালের হয়ে বিগত মৌসুমের টপ স্কোরার আর তৎকালীন আর্সেনালের জার্সি গায়ে সর্বোচ্চ গোলদাতা ইয়ান রাইট কে বিক্রি করে আরেক অখ্যাত ফরাসি (যিনি আজ অবধি আর্সেনালের জার্সি গায়ে সেরা খেলোয়াড়) থিয়েরি হেনরিকে দলে ভেড়ান। আট ম্যাচ ধরে গোলশূন্য থাকার পর হেনরি গোলের খাতা খুললেন। ইন্টার মিলানে ৩ মৌসুমে ১২ ম্যাচ খেলে ১ গোল করা আরেক আফ্রিকানকে উত্তর লন্ডনে উড়িয়ে আনেন আর্সেন। কানু নামেই চিনেন আপনারা তাঁকে। তিনি কেমন খেলোয়াড় ছিলেন তা জানতে হলে যেকোন WiFi ওয়ালা রেস্টুরেন্ট এ যেয়ে কফি পান করতে করতে একবার সার্চ দিলেই হবে। ফরাসি ক্লাব মার্সেই এর আরেকজন পুঁচকে যোগ দেন লন্ডনি ক্লাবে ২০০০ সনে। Stubborn আর্সেনের আরেক বিফল ( !!! ) প্রজেক্ট, রবার্ট পিরেস। নামটা তো পরিচিত লাগছে তাইনা? আর সুইডেনের ছেলেটা, ওই যে ইউনবার্গ, না কি যেনো নাম ……

আসুন একটু বিশ্লেষণে যাই, অখ্যাত হেনরি, অখ্যাত কানু, অল্পখ্যাতি পাওা পিরেস এই ঘাড় ত্যাড়ামির উদাহরণে আপনি যখন গর্বে বুকের ছাতি ফোলাচ্ছেন তখন সেই ঘাড় ত্যাড়ামির হেতুতেই আপনি আর্সেনের অপসারণ চাচ্ছেন। ব্যাপারটা কেমন হয়ে গেল না, স্যার? ফ্রান্সিস জেফার্সের কথা স্মরণ আছে? ইনভিন্সিবল আমলে অরি, পিরেস এর সাফল্যে এই সুপার ফ্লপ আরেক গ্যাম্বলের কথা ভুলে গেলেও কিন্তু চলবে না। তৎকালীন ক্লাব রেকর্ড ফি দিয়ে কিন্ত আর্সেনই তাঁকে সাইন করিয়েছিলেন! এত গৌরচন্দ্রিকার করার কারণ একটাই, আপনাকে স্মরণ করিয়ে দেয়া, আর্সেন ওয়েঙ্গার মানুষটাই এমন। আজীবণ স্বীয় সিদ্ধান্তে জুয়া খেলেছেন। জোয়ান বয়সে পেয়েছেন মুহুর্মুহু সাফল্য যার অনেকটাই ভাটা পড়ে গিয়েছে তাঁর জীবণ সায়াহ্নের অপরাহ্ণ বেলায়।

এই Stubborn জুয়াড়ি হলো সেই জুয়াড়ি যার বদৌলতে আপনি অবসর সময়ে থিয়েরির আর্সেনাল জমানার ভিডিও দেখে আফসোস করার সুযোগ পান, এই বৃদ্ধ মাতাল হলো সেই মাতাল যার বদৌলতে আপনি ইউনাইটেড, চেলসি ফ্যানদের খোঁচার পালটা জবাবে ফটো কমেন্টে অপরাজেয় মৌসুমে জয় করা স্বর্ণালি ট্রফির ছবি দিয়ে ব্যান্টারিং এ টিকে থাকেন। তাই “কেন পেরেজ বসে থেকে আইওবি খেলে, কেন কোকুইলান শাকা খেলছেন” এসব প্রশ্ন উঁকি দিলে এই পোস্টটির Url bookmark করে রেখে ঐ মুহুর্তে পড়ে নিজেকে সান্ত্বনা দিবেন বৈকি! আর্সেনের বয়স হয়েছে দেখে তাঁর এমন মাতলামি বেড়েছে যারা মনে করেন তাঁদের জন্যই আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস।

সমালোচনা শব্দটি সন্ধি বিচ্ছেদে দাঁড়ায় সম+আলোচনা অর্থাৎ ভালো-মন্দের যুগপৎ আলোচনা। সমালোচনা হওয়া চাই গঠনমূলক। আপনি আর্সেন কে চান না ভালো কথা, এটা আপনার ব্যক্তিগত মতামত। কিন্তু না চাইবার পেছনের কারণগুলো এমন হওয়া উচিত যাতে আর কিছু না হোক আপনার সোশ্যাল স্ট্যাটাসটা ভার্চুয়াল জগতে বজায় থাকে। ইচ্ছে হল, ফেইসবুক লাইভে আসলাম; লাইভে এসে দু-চার কথা Stubbornness- Stubbornness কপচিয়ে লাইক শেয়ার এবং লাভ রিয়েকশন নিয়ে চলে গেলাম; তাহলে তো আর হল না ভাই। যা বলছেন তা জেনে বলুন-ভেবে বলুন।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

16 + eight =