উরুগুয়ে ও ফুটবল : অবিচ্ছেদ্য বন্ধন

উরুগুয়ে ও ফুটবল : অবিচ্ছেদ্য বন্ধন

উরুগুয়েতে সন্তান প্রসবের সময় প্রচণ্ড চিৎকার চেঁচামেচির শব্দ শুনা যায়। কারণ কি জানেন? কারণ প্রতিটি উরুগুয়ান জন্মের সাথে সাথে ‘গোল’ বলে চিৎকার করে। আমিও ছোটবেলায় একজন ফুটবলার হতে চেয়েছিলাম, যখন শিশু ছিলাম, যেমনটি উরুগুয়ের প্রতিটি শিশুই স্বপ্ন দেখে থাকে (EDUARDO GALEANO, কবি ও লেখক)

ফুটবলের সাথে উরুগুয়ানদের সম্পর্ক বুঝতে হলে লেখক এদুয়ার্দো গালিয়ানোর লিখা EL FUTBOL A SOL Y SOMBRA বইয়ের এই লাইনটিই যথেষ্ট। আমরা আইসল্যান্ড কে দেখে অবাক হই কারণ মাত্র ৩.৫ লক্ষ জনসংখ্যার দেশে হয়েও তারা বিশ্বকাপের মত টুর্নামেন্ট খেলেছে, কিন্তু এই কথা চিন্তা করিনা যে উরুগুয়ে মাত্র ৩৫ লাখের জনসংখ্যা নিয়েও প্রায় প্রতিবারই তারা বিশ্বকাপ খেলে থাকে এবং শুধু তাই নয় ট্রফিও ঘরে নিয়ে আসে। এটা কিভাবে সম্ভব হয়েছে ? সম্ভব হয়েছে কারণ উরুগুয়েতে ফুটবল শুধু মাত্র তথাকথিত কোনো খেলা নয় , এখানে ফুটবল হচ্ছে তাদের দ্বিতীয় ধর্ম যেই ধর্মের প্রতি আস্তিক নাস্তিক সকলেই বিশ্বাসী। ফুটবল হচ্ছে উরুগুইয়ানদের রক্তের সাথে মিশ্রিত ; রাজধানী মন্টেভিডিওর ৬২ টি BARRIOS বলেন, অথবা অ্যাটলান্টিক মহাসাগরের তীরে অবস্থিত ছোট গ্রামের কথা বলেন কিংবা দেশের যে কোনো প্রান্তেই যান না কেন একটি বিষয় নজরে পড়বেই : তা হচ্ছে শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ সকল বয়সের মানুষই কোথাও না কোথাও ফুটবল খেলা নিয়ে ব্যাস্ত।

উরুগুইয়ানদের কাছে থেকে দুটি জিনিস আপনি কখনো আলাদা করতে পারবেনা : একটি হচ্ছে তাদের পানীয় MATE এবং একটি হচ্ছে ফুটবল। আর যদি দুটোই একসাথে হয় তাহলেতো কোনো কথাই নেই। বিকাল হলেই কাজ শেষে সকলে হাতে একটি MATE নিয়ে গল্প গুজব করতে ভালোবাসে এবং গল্পের সিংহভাগ থাকে এই ফুটবলকে ঘিরেই।

উরুগুয়ের মূলত একটি শহর কেন্দ্রিক দেশ , তাদের রাজধানী মন্টেভিডিও যেখানে বাস করে ১/৩ ভাগ লোক এবং এই রাজধানীতেই রয়েছে দেশের সবথেকে বড় দুটি ক্লাব যেই দুটি ক্লাবের জন্য প্রায় অর্ধেকের বেশি উরুগুইয়ান সমর্থন করে থাকে : ন্যাসিওনাল ও পেনারল ; এই ডার্বি হচ্ছে ইংল্যান্ডের বাহিরে ফুটবল ইতিহাসের প্রথম ডার্বি ম্যাচ এবং সমস্ত উরুগুয়ে থেমে যায় এই ম্যাচের দিন। কিন্তু যখন জাতীয় দল সেলেস্তে মাঠে নামে তখন একদিনের জন্য সব রাইভালরি ভুলে গিয়ে সকলেই একটি রং ও একটি পতাকার জন্যই সমর্থন করে থাকে।

সেলেস্তে মাঠে নামা মানেই ৯০ মিনিটের জন্য সমস্ত দেশের থেমে যাওয়া। এ যেন একটি রিমোট কন্ট্রোলের মত, রিমোটের পজ বাটনটি চাপ দিয়ে দেশের সমস্ত ব্যবসা-বাণিজ্য, অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজ সবকিছুকে বন্ধ করে দেয়া হয় ৯০ মিনিটের জন্য। পুরো দেশ মিলে সমর্থন করে মাঠের এগারোজন হিরোকে, যাতে করে তারা দেশের জন্য ভালো কোনো ফলাফল নিয়ে আসতে পারে। উরুগুয়ানদের এই প্যাশন ও সমর্থনই আসলে উরুগুয়ানদের সাহায্য করে থাকে বিশ্বকাপ ও কোপা আমেরিকাতে এতো ভালো করার জন্য। খেলোয়াড়রা বিষয়টিকে খুব বেশি অনুভব করে এবং জাতীয় দলের জার্সি গায়ে তারা নিজেদের ১০০ ভাগ শুধু নয়, তার থেকেও বেশি দেয়ার চেষ্টা করে থাকে। প্রতিটা উরুগুইয়ানের স্বপ্ন থাকে ফুটবলার হওয়ার এবং জাতীয় দলের জার্সি পড়া হচ্ছে তাদের জন্য সর্বোচ্চ আনন্দের বিষয় যার কারণে এই জাতীয় দলের জার্সি গায়ে দেয়া তাদের কাছে অনেকটা ধর্মীয় দায়িত্বের মত যার কারণে সবসময় নিজের সবকিছু উজাড় করে দিয়েই তারা খেলে। এ কারণেই এতো ছোট দেশ ও ছোট জনসংখ্যা হওয়া সত্ত্বেও তাদের রয়েছে ২ টি বিশ্বকাপ, ২ টি অলিম্পিক মেডেল ও ১৫ টি কোপা আমেরিকা।

উরুগুইয়ান জাতীয় দলের পিছে রয়েছে অনেক কৌতূহল ও অনেক ইতিহাস তবে দুটি ইতিহাস নিয়ে কথা না বললেই নয় যা শুধু উরুগুইয়ান ফুটবলেরই ইতিহাস নয়, সেই সাথে ফুটবলেরও ইতিহাস হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে : একটি হচ্ছে প্যারিসে অনুষ্ঠিত ১৯২৪ সালের অলিম্পিক গেম চলা সময়ে। টুর্নামেন্টের প্রথম ম্যাচে উরুগুয়ে খেলতে নামবে যুগোস্লাভিয়ার বিপক্ষে। যুগোস্লাভিয়ানরা কিছু স্পাই পাঠায় উরুগুয়ানদের ট্রেনিং দেখার জন্য ও তাদের খেলার টেকনিক বুঝার জন্য। উরুগুয়ানরা কোনো না কোন ভাবে বিষয়টি জানতে পারে এবং সার্বিয়ানদের ধোকা দেয়ার জন্য তারা ইচ্ছা করেই উল্টা পাল্টা খেলতে লাগলো। ভুল পাস্ করতে থাকে, বল গোল পোস্টে শট না করে শট করতো আকাশে, নিজেরা নিজেরা কুস্টাকুস্তি করে মাঠে পরে যেত, বলের কন্ট্রোল খারাপ দেখানোর জন্য বলের সাথে লেগে পরে যেত , এই সব দৃশ্য দেখে যুগোস্লাভিয়ান স্পাই রিপোর্ট করে যে উরুগুয়ানরা ফুটবল কিভাবে খেলে তাও জানেনা। যুগোস্লাভিয়ান রা তো খেলার মাঠে হাজির জয় সম্পূর্ণ কনফিডেন্স নিয়ে যে তারা বিশাল ব্যাবধানে জয় পাবে এবং ঠিক মত ট্রেনিংও তারা করেনি। খেলার মাঠে নেমেতো অবাক , উরুগুয়ে ৭-০ গোলের বিশাল ব্যাবধানে জয়লাভ করে এবং অপরাজিত থেকে অলিম্পিক গেম জয়লাভ করে।

দ্বিতীয় ঘটনাটি হচ্ছে ১৯৫০ সালের ব্রাজিলিয়ান ট্র্যাজেডি ”মারাকানাজো” :মারাকানা স্টেডিয়ামে উরুগুয়ে ঐতিহাসিক এক জয়লাভ করে ব্রাজিলের বিপক্ষে যাদের চ্যাম্পিয়ন হবার জন্য একটি ড্রই যথেষ্ট ছিল। উল্লাস করার জন্য ব্রাজিলিয়ান দের সবকিছু প্রস্তূত ছিল, ম্যাচটি ছিল শুধু ফরম্যালিটি পালনের বিষয়। ব্রাজিল প্রথমে এক গোল দিয়ে এগিয়েও যায় ; তখন উরুগুইয়ান ক্যাপ্টেন OBDULIO VARELA আশঙ্কা করলেন আজ ব্রাজিল হয়তো গোলের বন্যায় তাদেরকে ভাসিয়ে দিবে তখন তিনি চিন্তা করলেন কোনো ভাবে ব্রাজিলিয়ানদের উত্তেজিত করতে হবে। তখন তিনি বল হাতে নিয়ে রেফারির কাছে গিয়ে অফ সাইডের জন্য আবেদন করেন ও প্রোটেস্ট করতে থাকেন। সময় পার হতে থাকে, গ্যালারিতে দর্শকরা এবং ব্রাজিলিয়ান খেলোয়াড়রা এটিকে বিরক্তকর হিসেবে দেখছিলো ; এই ঘটনার পর ব্রাজিলিয়ানরা যেন অজানা কোনো এক কারণে হারিয়ে যায় এবং উরুগুয়ানরা সাহস পেতে থাকে এমনকি এক পর্যায়ে SCHIAFFINO ও GHIGGIA এর গোলের মাধ্যমে ম্যাচটি জিতেই যায়। এ ছিল সমস্ত ব্রাজিলিয়ান জাতির জন্য ন্যাশনাল ট্র্যাজেডি। প্রতিটি বাড়িতে বাড়িতে জানালা থেকে ভেসে আসছিলো কান্নার শব্দ, অনেকেই কষ্ট সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা পর্যন্ত করে ফেলে। সেইদিন রাতে উরুগুইয়ান ক্যাপ্টেন VARELA যখন ব্রাজিলিয়ান রাস্তা দিয়ে হাঁটছিলেন তখন ব্রাজিলিয়ান জাতির কষ্ট দেখে নিজের কাছে নিজেকে অপরাধী মনে করছিলেন এবং সেই বিশ্বকাপের আনন্দ করতে পারেননি ব্রাজিলিয়ানদের কান্নার কারণে।

লেখা – আরাফাত ইয়াসের

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

four × five =