উনাই এমেরি : দ্য ইউরোপা স্পেশালিস্ট

প্রতিযোগিতাপূর্ণ ফুটবলের এই যুগে, যেখানে এক বছরে জেতা যেকোন ট্রফিই পরের বছর নিজেদের কাছে রাখা মোটামুটি অসম্ভব একটা ব্যাপার, সেখানে এই নিয়ে টানা তিন বছর ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পুরষ্কার ইউরোপা লিগ জিতে, একরকম হ্যাটট্রিকই করে ফেললো সেভিয়া। আর এই অসম্ভবকে সম্ভব করার পেছনে অবদান আর কারোরই না, স্প্যানিশ কোচ উনাই এমেরির। যে কাজ বিশ্ব ইতিহাসে এখন পর্যন্ত ইনি ছাড়া আর অন্য কোন কোচ করতে পারেননি। টানা তিনবার ইউরোপা লিগ জিতে নিজেকে নিয়ে গেছেন অনতিক্রমণীয় এক উচ্চতায়।

উনাই এমেরি - ইউরোপা জাদুকর
উনাই এমেরি – ইউরোপা জাদুকর

কে এই উনাই এমেরি? এবং কিভাবেই বা তিনি এই অসাধারণ অর্জন করতে পারলেন?

খেলোয়াড় হিসেবে বিশেষ কেউ ছিলেন না লেফট মিডফিল্ডার হিসেবে ক্যারিয়ারের প্রায় পুরোটাই স্পেইনের দ্বিতীয় বিভাগে কাটিয়ে দেওয়া এই ফুটবলার। বাবা, দাদা – দুইজনই ছিলেন ফুটবলার, কিন্তু তাঁকে ৩২ বছর বয়সেই ইনজুরির কারণে খেলোয়াড়ি জীবনে পাট চুকিয়ে দিয়ে কোচিংয়ে নাম লেখাতে হয়। লোরকা দেপোরতিভা হয়ে আলমেরিয়ার কোচ হওয়া এমেরি প্রথম মৌসুমেই আলমেরিয়াকে তাঁদের ইতিহাসের প্রথমবারের মত স্পেইনের প্রথম বিভাগ তথা লা লিগা তে তুলে নিয়ে আসেন ও লা লিগায় প্রথম মৌসুমেই এমেরির অধীনে আলমেরিয়া লিগে অষ্টম হয়, প্রোমোশান পাওয়া দলের জন্য যেটা অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য একটা অর্জন।

আলমেরিয়ার হয়ে এমেরির এইসব অর্জন নজর এড়ায়নি ভ্যালেন্সিয়ার। পরের মৌসুমে নিজেদের কোচ হিসেবে এমেরির নাম ঘোষণা করে তারা। তিন বছরের ভ্যালেন্সিয়া অভিজ্ঞতায় এমেরি ভ্যালেন্সিয়াকে রিয়াল-বার্সার সাথে টেক্কা দেওয়ার মত শক্তিতে গড়ে তুলেছিলেন, যদিও এই তিন বছরে ক্লাব ছেড়ে চলে যান ডেভিড ভিয়া, ডেভিড সিলভা, হুয়ান মাতার মত খেলোয়াড়েরা।

সুপারস্টার খেলোয়াড়েরা এভাবে ক্লাব ছেড়ে গেলেও সমস্যা হয়নি তাঁর। নিজের কাজ ঠিকই করে গেছেন। টানা দুই মৌসুম রিয়াল বার্সার পরে লা লিগায় ভ্যালেন্সিয়াকে তৃতীয় স্থান এনে দিয়ে এবার পাড়ি জমান রাশিয়ায়, স্পার্তাক মস্কো তে। এক মৌসুম সেখানে থাকার পরেই আবার ডাক আসে নিজভূমে, চলে আসেন সেভিয়ায় – ইউরোপা-কাব্য রচনা তাঁর যেখানে।

তাঁর আবার কি, বলতে গেলে প্রতি মৌসুমেই নিজের স্কোয়াড নতুন করে সাজাতে হয়েছে তাঁকে। প্রথম ইউরোপা জয়ের পর ক্লাব ছেড়ে চলে গেলেন হেসাস নাভাস, লুইস আলবার্তো, আলভারো নেগ্রেদো, গ্যারি মেডেল ও জফ্রি কনডগবিয়া। পরের মৌসুমে এবার যাওয়ার পালা কার্লোস বাক্কা, আলবার্তো মরেনো, ইভান রাকিটিচ, অ্যালেক্স ভিদাল, ফেদেরিকো ফাজিওদের। তাও এমেরির স্কোয়াডে মরচে পড়েনি মোটেও। যেই চলে যাক না কেন, অবশিষ্ট ও নতুনদের নিয়ে গড়া স্কোয়াডেই বারবার ছুঁয়েছেন ইউরোপা লিগ সাফল্য।

 

ভিয়া, মাতা, সিলভা - ভ্যালেন্সিয়া থেকে চলে গেলেও তেমন সমস্যা হয়নি এমেরির
ভিয়া, মাতা, সিলভা – ভ্যালেন্সিয়া থেকে চলে গেলেও তেমন সমস্যা হয়নি এমেরির

এই সাফল্যের রহস্য কি? ফাঁস করেছেন এমেরির অধীনে ভ্যালেন্সিয়ায় খেলা সাবেক স্প্যানিশ উইঙ্গার জোয়াক্যুইন। প্রত্যেকটা ম্যাচের আগে প্রতিপক্ষের অসংখ্য ভিডিও ক্লিপস দেখিয়ে একেবারে কাটাছেঁড়া চলে ড্রেসিংরুমে, এবং প্রত্যেকটা খেলোয়াড়ের সেসব ভিডিও দেখা বাধ্যতামূলক। জোয়াক্যুইন বলেন, “আমার পপকর্ন শেষ হয়ে যায়, কিন্তু এমেরির ভিডিও আর শেষ হয় না!”

ভ্যালেন্সিয়ায় থাকতে একবার বলে এমেরির সন্দেহ হয়েছিল সেন্টারব্যাক জেরেমি ম্যাথিউ তাঁর ভিডিও ক্লিপস গুলো দেখছেন না। সেটা ধরার জন্য একবার ম্যাথিউকে খালি পেনড্রাইভ দেন এমেরি, পরেরদিন সকালে ম্যাথিউ ঠিকই এসে বলে যান তিনি ভিডিও দেখেছেন। ফলাফল, ঝাড়ি!

এই ভিডিও ক্লিপস পদ্ধতির এমেরি অনেক ভক্ত। এতটাই ভক্ত যে তিনি তাঁর ক্লাবের কোচিং স্টাফে কোন ভিডিও অ্যানালিস্ট রাখেননি, নিজের দলের জন্য প্রয়োজনীয় ভিডিও ক্লিপস তিনি নিজেই তৈরি করেন। ভিডিও কাটা, জোড়া লাগানো, এডিট করা – সব কাজ খেটেখুটে এই এমেরিই করেন, আর ঘন্টার পর ঘন্টা সেগুলো দেখতে হয় খেলোয়াড়দের!

ভিডিও এডিটিং-এ পটু এই কোচ নিজের ক্লিপস নিজেই বানান
ভিডিও এডিটিং-এ পটু এই কোচ নিজের ক্লিপস নিজেই বানান

তাঁর সাফল্যের আরো একটা কারণ তাঁর খেলোয়াড়দের উপর অগাধ বিশ্বাস রাখা, তাঁর তুখোড় ম্যান ম্যানেজমেন্ট। তাঁর অধীনেই আর্সেনাল ফ্লপ হোসে আন্তোনিও রেয়েস পেয়েছেন নতুন জীবন। মার্কো অ্যান্দ্রেওল্লি, স্টেফানে এমবিয়া, ড্যানিয়েল ক্যারিকো, সার্জিও এসকুদেরোর মত অন্য ক্লাবের ফ্লপ খেলোয়াড়রা এইখানে এসে জিতে যাচ্ছেন ইউরোপা। যেখানে সেভিয়ার নিয়মিত গোলরক্ষক সার্জিও রিকো সেভিয়ার দুর্দান্ত খেলার পুরষ্কারস্বরূপ স্পেইনের ইউরো দলে সুযোগ পেয়ে যাচ্ছেন, সেখানে ইউরোপা লিগ ফাইনালে ডেভিড সোরিয়ার মত আনকোরা গোলরক্ষকের উপর ভরসা রেখে নামিয়ে দিচ্ছেন মাঠে! খেলোয়াড়দের উপর এরকম অগাধ আস্থা যে কোচের, সে কোচ ত খেলোয়াড়দের কাছে থেকে যোগ্য উপহারই পাবেন!

ভক্তদের সাথেও উনাই এমেরির সম্পর্ক বেশ দারুণ। ভদ্রলোকের নিজের ওয়েবসাইটে তিনি নিয়মিত ট্যাকটিকস ও জীবনদর্শন নিয়ে বিভিন্ন লেখা লেখেন, আর সেভিয়ার পরবর্তী ম্যাচের একাদশ কি হবে সেটা অনুমান করার জন্য ভক্তদের কাছে কুইজের ব্যবস্থা করেন তিনি নিয়মিত, যে ঠিকঠাক স্টার্টিং ইলেভেন অনুমান করতে পারবে তাঁর জন্য রয়েছে পুরষ্কার!
দিনে দিনে এমেরির অধীনে এইভাবেই কাপ স্পেশালিস্ট হয়ে যাচ্ছে সেভিয়া। আজ রাতে বার্সেলোনার বিপক্ষে খেলছে কোপা দেল রে এর ফাইনালেও। দেখা যাক, সেভিয়ার কাপ-জাদু বার্সার উপরেও চলে কি না!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

6 + 1 =