ইয়োহান ক্রুইফ : বার্সেলোনার ড্রিম টিমের পুরোধা

ইয়োহান ক্রুইফ : বার্সেলোনার ড্রিম টিমের পুরোধা
১৪ বছর ধরে কোন শিরোপা নেই – আজকের বার্সেলোনা সম্বন্ধে কেউ এই কথা বললে হয়ত হাসতে হাসতেই উড়িয়ে দেবেন আপনি। কিন্তু বার্সা সবসময়ই যে এখনকার মত দিগ্বিজয়ী ছিল, সেটা বলার অবকাশ নেই বিন্দুমাত্র। ১৯৮৮ সালের দিকে ঠিক এরকম এক শিরোপাশূণ্য পর্যায়ই পার করতে হয়েছে আজকের মেসি-জাভি-পুয়োল-ইনিয়েস্তাদের বার্সেলোনার। মাত্র দুই বছর আগে ১৯৮৬ সালের ইউরোপিয়ান কাপের ফাইনালিস্টরা একরকম হাস্যাস্পদ বস্তুই হয়ে গিয়েছিল বাকী ফুটবল বিশ্বের কাছে। সেই ১৯৪১-৪২ মৌসুমের পর এই ১৯৮৮ মৌসুমটাই ছিল বার্সেলোনার ইতিহাসের সবচাইতে জঘন্যতম। কোচ লুই আরাগোনেসের কোচিংয়ে মন নেই তেমন – ভুগছেন ডিপ্রেশানে, বার্সা ছেড়ে চলে যাবেন মৌসুম শেষেই। আর প্রেসিডেন্ট জোসেপ লুইস নুনেজের যথেচ্ছাচারিতার উপর ধীরে ধীরে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠছিল বার্সার ড্রেসিংরুম, আর হবে নাই বা কেন – এখন মেসি বা মাসচেরানোরা যেরকম ট্যাক্স সংক্রান্ত জটিলতায় আক্রান্ত, সেরকম ট্যাক্সের বিড়ম্বনা গ্রাস করেছিল তৎকালীন বার্সার প্রায় প্রত্যেকটা খেলোয়াড়কেই, এবং সেটা হচ্ছিল প্রেসিডেন্টের দায়িত্বজ্ঞানহীনতার কারণেই। স্প্যানিশ ট্রেজারি খুব সতর্কতার সাথে প্রত্যেকটা বার্সা খেলোয়াড়ের চুক্তিপত্র পর্যবেক্ষণ করছিল, যেটা যথেষ্ট ছিল প্রেসিডেন্টের বার্সা খেলোয়াড়দের রোষানলে পড়ার জন্য। এমনকি অধিনায়ক অ্যালেক্সাঙ্কোর নেতৃত্বে প্রেসিডেন্টের অব্যাহতি প্রার্থনা করে পুরো বার্সা দল প্রেস কনফারেন্সও করে।
 
“নুনেজ বার্সা ক্লাব কে মন দিয়ে অনুভব করেন না, ক্লাবটা শুধুমাত্র তাঁর কাছে অর্থ উপার্জনের একটা উপায় মাত্র। ক্লাবের ভক্তদেরকেও তিনি কাছের মানুষ বলে মনে করেন না। তিনি শুধুমাত্র নিজেকেই ভালোবাসেন, নিজের ভালো মন্দের উর্ধ্বে উঠে ক্লাব-স্বার্থ কে দেখতে পারেন না তিনি, দেখতে চান না।”
ইয়োহান ক্রুইফ : বার্সেলোনার ড্রিম টিমের পুরোধা
জোসেপ লুইস নুনেজ
এরকম টালমাটাল পরিস্থিতিতে আসন্ন প্রেসিডেন্সিয়াল ইলেকশানে জয়লাভ করার জন্য জোসেপ লুইস নুনেজের হাতে ছিল মাত্র একটি তুরুপের তাস। সময়মত সেই তাস ব্যবহার করতে ভুল করেননি তিনি। লুই আরাগোনেস যাওয়ার পর বার্সার কোচ করে নিয়ে আসলেন তর্কযোগ্যভাবে তৎকালীন বার্সার সর্বশ্রেষ্ঠ খেলোয়াড় ইয়োহান ক্রুইফ কে। আশা, খেলোয়াড় হিসেবে বার্সাকে যেরকম অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন ইয়োহান ক্রুইফ, কোচ হিসেবেও সেরকম সাফল্যরই পুনরাবৃত্তি করতে পারবেন তিনি। বলা বাহুল্য – ভুল আশা করেননি নুনেজ। সে যাত্রা ইয়োহান ক্রুইফ এ ভর করে পার হলেন প্রেসিডেন্ট নুনেজ।
 
নতুন বার্সার সূচনা হল এই ইয়োহান ক্রুইফ এর হাত ধরেই!
 
বিধ্বস্ত, বিপর্যস্ত, ত্রস্ত, নিজেদের শক্তি সম্বন্ধে সন্দিহান, আত্মবিশ্বাসহীনতার শেষ সীমায় পৌঁছে যাওয়া বার্সেলোনাকে গড়ার কাজ শুরু করতে যেন তর সইছিলো না ক্রুইফ এর। বলতে গেলে ১৯৮৮ সালের ৪ মে বার্সার দায়িত্ব পাওয়ার পরের দিন থেকেই বার্সাকে আবার আগের গৌরবের জায়গায় নিয়ে যেতে কাজ শুরু করে দেন এই ডাচ লিজেন্ড। আগের মৌসুমের দল থেকে ১৫ জন খেলোয়াড়কে দল থেকে বিদায় করেন তিনি, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন জার্মান মিডফিল্ডার বার্নড শুস্টার, স্প্যানিশ মিডফিল্ডার ভিক্টর মুনোজ ও র‍্যামন ক্যালদ্রে। এর মধ্যে বার্নড শুস্টার ত আবার এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে চিরবৈরী রিয়াল মাদ্রিদেই নাম লেখালেন। পরবর্তী রিয়াল মাদ্রিদের কোচের দায়িত্বও পালন করেছেন এই শুস্টার।
 
এদিকে ক্রুইফ পনের জনকে ক্লাব থেকে ছাঁটাই করে দলে নতুন মুখ আনলেন বারো জন। যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন উইঙ্গার টসিকি বেজিরিস্টেইন, ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার ইউসেবিও স্যাকরিস্টান, অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার হোসে মারি বেকেরো, স্ট্রাইকার আর্নেস্তো ভালভার্দে ও হুলিও স্যালিনাস। টসিকি বেজিরিস্টান পরে বার্সেলোনার স্পর্টিং ডিরেক্টরের ভূমিকাও পালন করেছেন ও বর্তমানে ম্যানচেস্টার সিটিতে একই দায়িত্বে আছেন। আর আর্নেস্তো ভালভার্দে নামটা ফুটবলানুরাগীরা চিনতে পারবেন, ভদ্রলোক পরবর্তী জীবন অ্যাথলেটিক বিলবাও ও ভ্যালেন্সিয়ার মত ক্লাব কোচিং করিয়ে নিজের ক্যারিয়ারকে করেছেন সমৃদ্ধ, এখন এই বার্সেলোনারই ম্যানেজার হয়েছেন ভালভার্দে। ক্রুইফ দলে আরও নিয়ে আসেন মিডফিল্ডার গিলের্মো আমোর ও জর্ডি রৌরা, ডিফেন্ডার মিগুয়েল সোলারকে। জর্ডি রৌরা কে চিনতে পেরেছেন ত? প্রয়াত বার্সা কোচ টিটো ভিয়ানোভা অসুস্থ থাকার সময় মেসি-ইনিয়েস্তাদের দায়িত্ব যাঁর হাতে সঁপে দেওয়া হয়েছিল, এই সেই জর্ডি রৌরা।
 
ক্রুইফ মূলত দলে নতুন মুখ, নতুন প্রাণ, তথা নবযৌবনের সঞ্চার করতে চেয়েছিলেন এক ঝাঁক নতুন মুখ এনে ; যারা কেউ সেরকম সুপারস্টার নন, যাদের মধ্যে রয়েছে নিজেদের প্রমাণ করে দেখানোর অদম্য স্পৃহা। আগের দল থেকে ক্রুইফ এর নতুন দলে টিকে যাওয়াদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন প্রখ্যাত ইংলিশ স্ট্রাইকার গ্যারি লিনেকার, গোলরক্ষক আন্দোনি জুবিজারেতা, অধিনায়ক অ্যালেক্সাঙ্কো প্রমুখ। প্রেসিডেন্ট নুনেজের ঘোর বিরোধী ভিক্টর মুনোজ ও র‍্যামন ক্যালদ্রে দল ছাড়লেও টিকে গিয়েছিলেন অধিনায়ক অ্যালেক্সাঙ্কো। ক্রুইফ জানতেন, তাঁর নতুন দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য মাঠেও সেরকম একজন খেলোয়াড় দরকার, যার রয়েছে স্বভাবজাত নেতৃত্বগুণ ও যার কথা মোটামুটি সবাই মানবে, এবং সবাইকে একতাবদ্ধ করে রাখার ক্ষমতাটা যার মধ্যে থাকবে। তাই ক্রুইফ এর খড়্গ থেকে বেঁচে যান অ্যালেক্সাঙ্কো।
ইয়োহান ক্রুইফ : বার্সেলোনার ড্রিম টিমের পুরোধা
হোসে র‍্যামন অ্যালেক্সাঙ্কো
আপাতদৃষ্টিতে প্রেসিডেন্ট নুনেজের বিরোধী বেশীরভাগ খেলোয়াড়দের দল থেকে বিদায় করে দিলেও এমনটা কিন্তু ভাবা মোটেও উচিত হবে না যে ক্রুইফ নুনেজের খুব প্রিয়পাত্র ছিলেন কিংবা নুনেজকেও ক্রুইফ খুব ভালো মানুষ হিসেবে ভাবতেন। দুইজন দুজনের ছায়াও মাড়াতেন না পারতপক্ষে। ক্রুইফ ত নুনেজকে বলেই দিয়েছিলেন, আমার সাথে দেখা করার জন্য আমিই আপনার অফিসে যাবো, তবুও আমার ড্রেসিংরুমে আসার স্পর্ধা দেখাবেন না…
 
তো, মোটামুটি ১৫ জন খেলোয়াড় ছাঁটাই করে ও ১২ জন খেলোয়াড়কে তাঁদের জায়গায় এনে প্রথম মৌসুমে ক্রুইফ শুরু করলেন তাঁর তেলেসমাতি দেখানো। নতুন খেলোয়াড়দের মধ্যে ইউসেবিও, বেজিরিস্টেইন, সালিনাস, বেকেরো – এরা ক্রুইফ এর ড্রিম টিম গঠনে ভূমিকা রাখেন সবচাইতে বেশী। প্রথম মৌসুমে নিজের পছন্দমত খেলোয়াড় কিনে ক্রুইফ এবার গুরুত্ব দেওয়া শুরু করলেন ক্লাবের খেলোয়ড়দের মাঝে নিজের দর্শনটাকে পোক্ত করার দিকে। যে দর্শনটাই পরে বদলে দেবে বার্সেলোনার খোলনলচে, যে দর্শনটাই পরে আবির্ভূত হবে আধুনিক বার্সার ভিত্তি হিসেবে, যে ভিত্তির উপর নির্ভর করে গড়ে উঠবে ‘লা মাসিয়া’, বের হবে মেসি-ইনিয়েস্তা-জাভি-পুয়োলদের মত একেকজন দিগ্বিজয়ী গ্র্যাজুয়েট।
 
আশির দশকে তখন নতুন নতুন ফুটবলীয় ধ্যানধারণার উন্মেষ ঘটতনা সেরকম, যেমনটা এখন ঘটে প্রতিনিয়ত, সময়ের সাথে সাথে বদলায় ফুটবলীয় দর্শন ও ট্যাকটিকস। তখন মূলত ৪-৪-২ ফর্মেশানকে কেন্দ্র করেই কোচদের সকল ট্যাকটিক্স ঘুরাফেরা করত। ঐ সময়ে ৪-৪-২ বাদ দিয়েও যে আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলা যায়, সত্তরের দশকের দিকে সেটা দেখান কিংবদন্তী ডাচ কোচ রাইনাস মিশেলস। ৪-৩-৩ ফর্মেশানের টোটাল ফুটবলের সাথে পরিচিত করান তিনি পুরো ফুটবল বিশ্বকে। এবং তাঁর একাগ্র ছাত্র ছিলেন এই ইয়োহান ক্রুইফ। এই ক্রুইফ আর মিশেলস মিলেই সত্তরের দশকে ক্লাব পর্যায়ে আয়াক্সকে বানিয়েছিলেন বিশ্বজয়ী, আর নেদারল্যান্ডসকে বানিয়েছিলেন ফুটবলে বিশ্বের অন্যতম সমীহ জাগানিয়া শক্তি হিসেবে।
 
ক্রুইফের বার্সাও মূলত সেই টোটাল ফুটবলের নির্যাস থেকেই নিজেদের আলাদা একটা আইডেন্টিটি গঠন করার দিকে নজর দেয়। বলা বাহুল্য, সেটা করার পেছনে মাস্টারমাইন্ড এই ইয়োহান ক্রুইফ।
 
প্রথম টিম মিটিংয়েই তিনি একটা ব্ল্যাকবোর্ড আর একটা চক নিয়ে পুরো দলের সামনে বোঝাতে শুরু করলেন তাঁর দর্শন। বোর্ডে একে একে আঁকা শুরু করলেন তিনজন ডিফেন্ডার, চারজন মিডফিল্ডার, দুইজন আউট-অ্যান্ড-আউট উইঙ্গার আর একজন সেন্টার ফরোয়ার্ড। ইউসেবিও, বেজিরিস্টেইন, লিনেকাররা আশ্চর্য হয়ে একে অপরের দিকে তাকাতে লাগলেন।
 
করছে কি এই লোক?
 
এখন ৪-৪-২ কিংবা খুব জোর ৩-৫-২ এর জমানা। স্কোয়াডে যেই পজিশানে যত যাই খেলোয়াড় থাকুক না কেন, ঘুরেফিরে চার ডিফেন্ডারে খেলতেই অভ্যস্ত সবাই। তা যাই হোক, এভাবেই ৪-৪-২ কে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে জন্ম হল ৩-৪-৩ ফর্মেশানের, যা কিনা খুব গভীরভাবে রাইনাস মিশেলস ও ইয়োহান ক্রুইফের সেই বিখ্যাত টোটাল ফুটবলের ৪-৩-৩ ফর্মেশান দ্বারা অনুপ্রাণিত।
 
ক্রুইফ এর চিন্তাধারা ছিল সোজাসাপ্টা। তৎকালীন গতানুগতিক ৪-৪-২ ফর্মেশানের উপর নির্ভর করে আপনি যদি বিপক্ষ দলের দুইজন স্ট্রাইকারকে আটকানোর জন্যই ৪ জন ডিফেন্ডার খরচ করে ফেলেন, তবে আউটফিল্ডের বাকী আটজন খেলোয়াড় আটকানোর জন্য আপনার মাঠে থাকবে মাত্র ছয়জন খেলোয়াড়। সেক্ষেত্রে খেলা শুরু হবার আগেই আপনি বিপক্ষ দলের কাছে নাম্বার-গেইমে হেরে যাচ্ছেন। এভাবে আগেই হেরে বসে থাকলে ম্যাচ জয় করা খুব কঠিন হয়ে যায়। তাই অবশ্যই একজন বল-প্লেয়িং সেন্টারব্যাককে ডিফেন্স লাইন থেকে আরও এগিয়ে এসে একরকম মিডফিল্ডারের ভূমিকা নিতে হয়। ক্রুইফের ড্রিম টিমে পরে যেই ভূমিকা পালন করে বিশ্ববিখ্যাত হয়েছিলেন ডাচ ডিফেন্ডার ও বর্তমান নেদারল্যান্ডের কোচ রোনাল্ড ক্যোম্যান, ১৯৯২ সালের চ্যাম্পিয়নস লিগ বা ইউরোপিয়ান কাপ ফাইনালে সাম্পদোরিয়ার বিপক্ষে জয়সূচক গোলটাও এসেছিল এই ক্যোম্যানের পা থেকেই!
ইয়োহান ক্রুইফ : বার্সেলোনার ড্রিম টিমের পুরোধা
কোম্যান ও ক্রুইফ
এভাবেই ডাচদের বিখ্যাত ৪-৩-৩ ফর্মেশান থেকে আইডিয়া নিয়ে আস্তে আস্তে ক্রুইফ বার্সেলোনাতে শুরু করলেন নিজের সাম্রাজ্য গড়া। ৩-৪-৩ ফর্মেশানে খেলতে লাগলো বার্সেলোনা। প্রথমে খেলোয়াড়েরা হকচকিয়ে গেলেও, মানিয়ে নেওয়া শুরু করতে থাকল। ক্রুইফ যে অল-অ্যাটাকিং ফুটবলের প্রতি কি ধরণের অবসেসড ছিলেন সেটা বোঝা যায় একটা ঘটনা থেকেই। গোলরক্ষক আন্দোনি জুবিজারেতা একদিন তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন কিভাবে সেট-পিস ডিফেন্ড করবেন তাঁরা। ক্রুইফ এর তৎক্ষণাৎ উত্তর, “আমি কি জানি, তুমি জানো সেটা”, জুবিজারেতা বললেন, “আমি কিভাবে জানবো?” ক্রুইফের উত্তর – “কর্নার ডিফেন্ড করতে ত আমার থেকে তুমিই বেশী আগ্রহী, তাই!”
 
ক্রুইফের সিস্টেমে টেকনিক্যালি পারদর্শী খেলোয়াড়ের দরকার অনেক। যারা বল পায়ে খেলতে পছন্দ করে, যারা ছোট ছোট পাসে খেলে স্বচ্ছন্দ, যারা শুধুমাত্র শারীরিক শক্তি বা ট্যাকল ইন্টারসেপশানের উপর নির্ভর না করে বিন্দু থেকে সিন্ধুর মত করে আক্রমণ শানাতে পছন্দ করে, বল পজেশানে রাখতে পছন্দ করে। এই ধরণের খেলোয়াড় গড়ার জন্য তাই বার্সার অ্যাকাডেমির খোলনলচেও বদলে ফেলেন ক্রুইফ। ছোটবেলা থেকেই যুবদলের খেলোয়াড়েরা তাই ক্রুইফ এর দর্শনের সাথে অভ্যস্ত হতে থাকে। গড়ে উঠে আধুনিক লা মাসিয়া। যে লা মাসিয়া থেকেই পরে মেসি, পুয়োল, ইনিয়েস্তা, জাভি, ফ্যাব্রিগাস, পেদ্রো, সার্জি রবার্তো, সার্জি স্যাম্পার, পিকে, সার্জিও বুসকেটস – এদের জন্ম হয়েছে। বলা বাহুল্য – ক্রুইফ না থাকলে এরা কেউই আসত না।
ইয়োহান ক্রুইফ : বার্সেলোনার ড্রিম টিমের পুরোধা
পেপ গার্দিওলা
খেলোয়াড় বাতাসে ভেসে আসা বলে কিরকম স্বচ্ছন্দ কিংবা কোন খেলোয়াড় কতটুকু উঁচু, কিরকম গাট্টাগোট্টা – ক্রুইফ এর সেসব নিয়ে পর্যালোচনা করার সময় ছিল না, ইচ্ছাও ছিল না। উচ্চতা, ওজন যাই হোক না কেন – খেলোয়াড় যদি টেকনিক্যালি অনেক দক্ষ হয়, ক্রুইফের ড্রিম টিমের টিকেট চলে যাবে তাঁর হাতে। ফলে এই সিস্টেমের অধীনে খেলেই বিখ্যাত হতে পেরেছিলেন পেপ গার্দিওলারা, যার উচ্চতা ও ওজন অনেক কম হওয়া সত্বেও টেকনিক্যালি বল পায়ে অনেক বুদ্ধিদীপ্ত একজন খেলোয়াড় ছিলেন বলেই ক্রুইফ এর ড্রিম টিমে স্থান পেয়েছিলেন তিনি, সেখান থেকে শিক্ষা পরে নিজে বার্সার কোচ করে সৃষ্টি করেছেন বার্সার আরেক দিগ্বিজয়ী প্রজন্ম।
 
ফলে বাইরে থেকে খেলোয়াড় কেনার বদলে কয়েক বছর পর থেকে নিজের লা মাসিয়া অ্যাকাডেমি থেকেই প্রয়োজনীয় অনেক খেলোয়াড় পাওয়া শুরু করেন ইয়োহান ক্রুইফ। পেপ গার্দিওলার নাম ত বললামই, তাছাড়াও অ্যালবার্ট ফেরার, সার্জি, গিলের্মো আমোরের মত খেলোয়াড়েরাও লা মাসিয়া থেকে গ্র্যাজুয়েটেড হয়ে ক্রুইফের ড্রিম টিমের অংশ হয়েছেন। ক্রুইফের অধীনে বার্সেলোনার এই চারজন খেলেছেন সম্মিলিতভাবে প্রায় দেড় হাজারের মত ম্যাচ।
ইয়োহান ক্রুইফ : বার্সেলোনার ড্রিম টিমের পুরোধা
ক্রুইফ ও গার্দিওলা
আস্তে আস্তে পরের মৌসুমগুলোতে দলে আসলেন ডাচ ডিফেন্ডার রোনাল্ড ক্যোম্যান, ড্যানিশ মিডফিল্ডার মাইকেল লাউড্রপ, ব্রাজিলিয়ান স্ট্রাইকার রোমারিও ও বুলগেরিয়ান স্ট্রাইকার রিস্টো স্টইচকভের মত তারকারা। স্প্যানিশ জাতীয় দলের উইঙ্গার ইওন গোইকয়েতসেয়াও আসলেন বার্সায়। ইয়োহান ক্রুইফের বার্সা সাম্রাজ্য আস্তে আস্তে বাড়তেই থাকলো। ক্রুইফ আসার আগে যে দল আগের ১৪ বছরে বড় শিরোপা জিতেছিল মাত্র একবার, ক্রুইফ আসার পর থেকে প্রতি মৌসুমেই কোন না কোন শিরোপা জেতা শুরু করলো বার্সেলোনা। ক্রুইফের প্রথম মৌসুমে লা লিগায় রানার্স আপ হওয়া বার্সেলোনা ক্রুইফের অধীনে পরে লা লিগা জেতে চারবার, তাও আবার টানা, ১৯৯১ সাল থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত। তৎকালীন ইউরোপীয়ান কাপ বা চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতে একবার, আর রানার্স আপ হয় একবার বার্সেলোনা, ক্রুইফ এর অধীনে। এই সময়ে ইউয়েফা কাপ উইনার্স কাপ, কোপা দেল রে, ইউয়েফা সুপার কাপ, প্রত্যেকটাই বার্সেলোনা জেতে একবার করে, আর সুপারকোপা জেতে তিনবার। ক্রুইফ এর ড্রিম টিমের ট্রফি সাফল্য এতটুকুই। তবে অবশ্যই ট্রফির বিচারে ক্রুইফের ড্রিম টিমের গুরুত্ব অনুধাবন করা যাবেনা। প্রত্যেকটা বার্সা খেলোয়াড়ের ডিএনএ তে তিনি যে জিগীষাটা ঢুকিয়ে দিয়েছেন, যে দর্শনটা পোক্ত করে দিয়েছেন – তাঁর পরিমাপ কি আর কটা ট্রফি করতে পারে?
ইয়োহান ক্রুইফ : বার্সেলোনার ড্রিম টিমের পুরোধা
বিভিন্ন সময়ে ক্রুইফ এর ড্রিম টিমের মূল সদস্য ছিলেন মূলত এরা –
  • গোলরক্ষক – আন্দোনি জুবিজারেতা
  • সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার/সুইপার – রোনাল্ড ক্যোম্যান, হোসে র‍্যামন অ্যালেক্সাঙ্কো, মিগুয়েল অ্যানহেল নাদাল
  • রাইট উইংব্যাক – অ্যালবার্ট ফেরার
  • লেফট উইংব্যাক – হুয়ান কার্লোস
  • ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার – ইউসেবিও স্যাকরিস্টিয়ান
  • সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার – পেপ গার্দিওলা, গিলের্মো আমোর, মাইকেল লাউড্রপ
  • অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার – হোসে মারি বাকেরো
  • স্ট্রাইকার – হুলিও স্যালিনাস, রিস্টো স্টইচকভ, রোমারিও
  • ইনসাইড ফরোয়ার্ড/উইঙ্গার – আন্দনি গোয়িকয়েতসেয়া, টসিকি বেজিরিস্টেইন

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

nine − 2 =