ইন্টার মিলান, এসি মিলান : সুদিনের অপেক্ষায়

ইন্টার মিলান, এসি মিলান : সুদিনের অপেক্ষায়

::: আরাফাত ইয়াসের :::

অনেকেই প্রায় সময়েই জিজ্ঞাসা করে থাকে ইন্টার ও মিলান কিভাবে ও কেন একই সময়ে তাদের গৌরবোজ্জ্বল সময়টি পার করলো এবং এক সময় এতো বড় ক্লাব হওয়া সত্ত্বেও কেন হঠাৎ করে তারা কঠিন সময় পার করছে।

বিষয়টি বুঝতে হলে কয়েকটি প্রাথমিক জিনিস জানতে হবে : ১০/১৫ বছর আগে ফুটবল এতটা বাণিজ্যিক ছিলোনা এবং টিভি-স্পনসর থেকে এতো পরিমান টাকা আয় হতোনা। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যেত ধনী পরিবারের মানুষ ফুটবল ক্লাব পরিচালনা করতো শখের খেলনা হিসেবে এবং কিছুটা জনপ্রিয়তা আদায়ের জন্য। ইতালিয়ান প্রতিটি ক্লাব ছিল এই ধরণের বড় বড় পরিবারের মালিকানাধীন। বিশেষ করে ইউভেন্তুস, মিলান ও ইন্টার ছিল ইতালির তৎকালীন সবথেকে বড় ৩ টি পরিবারের নিয়ন্ত্রণে : পর্যায়ক্রমে আইনেল্লি, বের্লুস্কোনি ও মোরাত্তি পরিবার। প্রতিটি ইতালিয়ানদের মত এরাও ছিল ফুটবলের বিশাল ভক্ত যার কারণে তাদের ব্যাক্তিগত টাকা তারা খরচ করতো তাদের ক্লাবের জন্য। ক্লাবের আয় ও ব্যায় এর পর যেই লস থাকতো তা প্রতি বছরই এই ধনী মানুষগুলো নিজেদের পকেট থেকে দিতো।

তারপর আসে ২০০৮-২০১৫ সাল, উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর জন্য সেটি ছিল একটি দুঃসপ্ন। ২০০৮ এর আগ পর্যন্ত কাজ ও টাকার জন্য ইতালি ছিল এক স্বর্গীয় দেশ। কিনতু ২০০৮ অর্থনৈতিক মন্দার কারণে ইতালিতে তার প্রভাব হয় ভয়াবহ। প্রতিদিন কোনো না কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, কল-কারখানা বন্ধ হয়ে যেতে থাকে এবং বিশাল সংখ্যক মানুষ হয়ে পরে বেকার। এই মন্দার প্রভাব পরে ইতালিয়ান শিল্পপতী দের ওপরেও। তবে আলহামদুলিল্লাহ ৩ বছর আগে আমরা অবশেষে সেই অন্ধকার টানেল থেকে বের হয়েছি এবং আমাদের অর্থনৈতিক চাকা আবার ঘুরে শুরু করেছে যার প্রভাব আমরা ইতালিয়ান ফুটবলেও দেখতে পাচ্ছি।

ইন্টার মিলান

ইন্টারের সাবেক প্রেসিডেন্ট মাসিমো মোরাত্তি হচ্ছেন ইতালির সবথেকে বড় তেল ব্যাবসায়ী। তার জীবনের সবথেকে বড় শখ ছিল তার বাবার মত করে তিনিও চ্যাম্পিয়ন্স লীগ জয় করবেন। মাসিমো মোরাত্তির বাবা আঞ্জেলো মোরাত্তি প্রেসিডেন্ট থাকা কালীন তিনি যখন ১৯৬৪ ০ ৬৫ সালে ২ বার চ্যাম্পিয়ন্স লীগ উত্তোলন করেন তখন মাসিমো মোরাত্তি ছিলেন শিশু। তারা বাবার হাতে সেই কাপ দেখে তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন তিনিও একবার এই কাপ উত্তোলন করবেন এবং এই জন্যই প্রতি বছর তিনি মিলিয়ন মিলিয়ন ইউরো খরচ করতেন শুধুমাত্র তার এই স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করার জন্য যা ২০১০ সালে এসে বাস্তবায়িত হয়। স্বপ্ন বাস্তবায়ন করার পর তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন ক্লাবকে বিক্রি করার জন্য কারণ একই সময়ে ব্যাবসায়িক মন্দার দরুন প্রতি বছর এতো টাকা ব্যায় করা তার জন্য আর সম্ভবপর ছিলোনা। এরপর আসে আমেরিকান-ইন্দোনেশিয়ান মালিক এরিক থয়ির যিনি ক্লাব কিনেন এই উদ্দেশ্য করেই যে কয়েকবছর বিজনেস করে আবার আরেকজনের কাছে বিক্রি করে দিবেন। সুতরাং ক্লাবের কোনো উন্নয়ন না হয়ে উল্টো পতন হতে থাকে। ক্লাবের সেরা সেরা খেলোয়াড় সবাইকে বিক্রি করে দেয়া হয় এবং ৩ বছর ব্যবসা করার পর তিনি চাইনিজ কোম্পানি সুনিং এর কাছে পুনরায় বিক্রি করেন এবং তার ইনভেস্টের ফুল টাকা তিনি ফেরত পান, সেইসাথে ৩ বছরের ব্যাবসাতো রয়েছেই। নতুন কোম্পানি আসার পর তাদের কাঁধে থাকে পূর্বের ম্যানেজমেন্টের ভুলের ফসল এবং বিশাল বড় ডেবিট যা নতুন মালিকানা ধীরে ধীরে শোধ করতে থাকে এবং সত্যিকারেই ক্লাবের পিছে ইনভেস্ট করতে থাকে। তাদের এই নতুন ম্যানেজমেন্টের নিয়ন্ত্রণে মাত্র ৩ বছরের মাথাতেই ইন্টার পুনরায় তাদের হারানো দিনগুলো ফিরে পেতে যাচ্ছে।

এসি মিলান

মিলানের সিচুয়েশন বুঝার জন্য বুঝতে হবে তাদের মালিক বের্লুস্কোনির ব্যাক্তিগত জীবন। বের্লুস্কোনি দীর্ঘ সময় ছিল ইতালির সবথেকে ধনী ব্যাক্তি ও বিশ্বের মধ্যে সবথেকে ধনী ব্যাক্তিদের একজন। তিনি প্রচন্ড ফুটবল ভালোবাসেন, বিশেষ করে সুন্দর ফুটবল দেখা হচ্ছে তার সবথেকে বড় শখ। যার কারণে এস মিলান ঐতিহাসিকভাবেই ইতালির মধ্যে সবথেকে সুন্দর ফুটবল খেলে থাকতো এবং ফিজিক্যাল ফুটবল থেকে টেকনিক্যাল ফুটবলকে প্রাধান্য দিতো। এখানেও বের্লুস্কোনি তার শখ পূরণের জন্য অনেক টাকা ব্যায় করতেন। বের্লুস্কোনি শুধু মিলান ক্লাবেরই প্রেসিডেন্ট ছিলোনা, সেই সাথে ইতালিয়ান ডান পন্থী দল এর প্রেসিডেন্টও ছিলেন। এর মধ্যে তিনি রাজনীতিতে খুব জড়িয়ে পড়েন এবং ইতালির প্রধানমন্ত্রীও হন। রাজনৈতিক কারণে তিনি ক্লাবের দিকে সময় খুব দিতে পারতেননা যার প্রভাব পড়তে থাকে ক্লাবের ওপর। সেই সাথে আবার হয়ে যায় ইতালির ঐতিহাসিক ডিভোর্স। বের্লুস্কোনি তার স্ত্রী থেকে সেপারেট হয়ে যান এবং তার সম্পত্তির একটি বিশাল অংশ চলে যায় তার স্ত্রীর কাছে , একই সময় শুরু হয় অর্থনৈতিক মন্দা এবং তার কিছু ব্যাক্তিগত স্ক্যান্ডাল যার কারণে প্রধানমন্ত্রী পদ থেকেও পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। রাজনৈতিক, পারিবারিক ও অর্থনৈতিক এই চাপের মধ্যে থেকে মিলান হয়ে ওঠে তার শেষ চিন্তা। এক সময় তিনিও চিন্তা করেন ক্লাবকে বিক্রি করার জন্য। ক্লাব কিনে আরেকটি চাইনিজ মালিক কিনতু ইন্টারের মালিক পক্ষ যেমন বিশ্বের মধ্যে বড় বড় কোম্পানির একটি এবং সুপরিচিত , মিলানের মালিক কে কেউই চিনেনা। তার অর্থনীতির উৎস কি সেটিও কারো জানা নেই। অনেকেই কানাঘুষা করছে যে এটা আসলে বের্লুস্কোনির কালো টাকাই সাদা করার একটি বুদ্ধি। যাই হোক অবশেষে মাত্র কিছুদিন আগে ম্যানেজমেন্টে আসলো আমেরিকান ব্যাবসায়ী জন এলিয়ট যিনি এখন ক্লাবের মূল। নতুন মালিকানা আসার সাথে সাথে উয়েফা থেকেও মিলানের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হয় কারণ নতুন মালিক পক্ষের একটি অর্থনৈতিক ভিত্তি রয়েছে। সুতরাং আশা করা যায় ইন্টারের পর মিলানও তাদের সমস্যাগুলো সমাধান করে ফেলতে পারবে।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

13 − 7 =