ইতিহাস গড়ার সর্বোচ্চ পাঁচ সেকেন্ড

রিয়াদ আহমেদ

ঠিক চার বছর আগে এই দিনে শিরোপাখরা ঘুচিয়েছিল পর্তুগাল, ইউরোপ শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট পরেছিল দেশটি। এর আগে পর্তুগালের সোনালি প্রজন্মের কল্যাণে ইউরোপ শ্রেষ্ঠত্বের খুব কাছাকাছি গেলেও নেয়া হয়নি শিরোপার স্বাদ, দুইবার বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল খেললেও শিরোপা জেতা হয়নি ভাস্কো ডা গামার দেশের মানুষের। অবশেষে আন্তর্জাতিক শিরোপার দেখা মেলে রোনালদোদের, চার বছর আগের এই দিনেই। কিন্তু কেউ কি ভেবেছিলেন, ইউসেবিও-ফিগো-পলেতা-রুই কস্তা বা নুনো গোমেজ নন, নন হালের রোনালদো-কারেসমার মত তারকা, স্কুইরোজ-স্কলারির মত কোচের অভিভাবকত্বে নয়, ফার্নান্দো  সান্তোসের হাত ধরে পর্তুগাল ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে গর্বের তটে নোঙ্গর করবেন পশ্চিম আফ্রিকার গিনি-বিসাউ এ জন্ম নেয়া এদের নামের একেবারেই অখ্যাত একজন নাবিক?

কেমন ছিল স্বপ্নপূরণের পাঁচটি সেকেন্ড? মুহূর্তগুলো কতটা গর্বের ছিল পর্তুগিজদের কাছে? কী চলছিল তখন এদের-সান্তোসের মনে? জানা সম্ভব নয় আমাদের পক্ষে, তারচেয়ে বাস্তবকে কিছুটা কল্পনার মিশেলে দেখার চেষ্টা করা যাক বরং!

সন্ধ্যা ১০:৩০; ১০ জুলাই, ২০১৬

প্যারিস, ফ্রান্স

সাইডলাইনে ওয়ার্মআপ করতে করতে এদেরের মনে হলো, তার হাত-পা পেটের ভেতর সেঁধিয়ে যাচ্ছে।

মিনিট দশেক হলো কোচ ফার্নান্দো সান্তোস তাকে ওয়ার্মআপ করতে বলেছেন। কোচ এই দলে সবার কাছেই বাবার মত। গুরুগম্ভীর চেহারা, ক্ষুরধার ফুটবল জ্ঞান। সবসময় শান্ত থাকেন, খুব কম সময়ই তাকে উত্তেজিত হতে দেখেছেন এদের। কিন্তু এই মুহুর্তে তাঁকেও অনেক নার্ভাস দেখাচ্ছে।

কোচের পাশে সহকারীর ভূমিকা পালন করে যাচ্ছেন তারই সবচেয়ে প্রিয় শিষ্য রোনালদো।

রোনালদোর এখানে থাকার কথা না। কিন্তু খেলার ২৫ মিনিটের মাথায়ই তাকে মাঠ ছেড়ে উঠে আসতে হয়েছে। দিমিত্রি পায়েতও বোধহয় বুঝেননি ট্যাকলটি এত গুরুতর হবে। ট্যাকলটির পরপরই হয়তো বেশিরভাগ ফুটবলারই মাঠ ছেড়ে বের হয়ে যেতেন, কিন্তু রোনালদো মাঠেই থাকতে চেয়েছিলেন। আন্তর্জাতিক বড় কোন টুর্নামেন্টে দ্বিতীয়বারের মত ফাইনাল খেলা দেশটির সবচেয়ে বড় ভরসা যে তিনিই, তা তিনিও জানতেন। কিন্তু বেশ কিছুক্ষণ ব্যথায় কাতরানোর পর আর পারেননি।

কোচের পাশেও থাকার কথা না তার। কিন্তু সদা গম্ভীর, শান্ত, প্রৌঢ় সান্তোসকে সবচেয়ে ভালো বোঝেন তিনিই। বেশিক্ষণ থাকতে পারেননি বেঞ্চে, চলে এসেছেন পাশে। এখন চিৎকার করে, হাত ছুড়ে, ইশারা ইঙ্গিতে কোচের চাওয়া পৌঁছে দিচ্ছেন বাকিদের কাছে।

বাঁ পায়ের ব্যান্ডেজ বাঁধা হতে পারেনি দলনেতার 

ওয়ার্মআপ করতে করতে এদেরের মনে হলো, সন্ধ্যাটা একটু বেশিই ঠাণ্ডা আজকে। 

পুরো টুর্নামেন্টেই খুব বেশিক্ষণ থাকেননি মাঠে। নিজের পারফরম্যান্সে নিজেই খুশি হতে পারছিলেন না এদের খুব একটা, সান্তোসেরও খুব একটা খুশি হওয়ার কারণ নেই। তাছাড়া টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই পর্তুগাল খুব যে আধিপত্য বিস্তার করে খেলতে পেরেছে, তাও না। প্রথম ম্যাচে আইসল্যান্ডের সাথে ড্র, এদের নেমেছিলেন একদম শেষদিকে। দ্বিতীয় ম্যাচে অস্ট্রিয়ার সাথেও গোলশূন্য ড্র। সেদিনও এদের নেমেছিলেন শেষ কয়েক মিনিটের জন্য। বাঁচা-মরার গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচেও হাঙ্গেরির সাথে নাটকীয় ড্র। একবার করে হাঙ্গেরি এগিয়ে যায়, কিছুক্ষণের মধ্যেই সমতায় ফিরিয়ে আনেন নানি-রোনালদো। এই ম্যাচে আর নামার সুযোগ হয়নি এদেরের। গ্রুপে তৃতীয় হয়েও গোল ব্যবধান শূন্য রাখায় তৃতীয় সারিতে থেকে পরের রাউন্ডে কোয়ালিফাই করে তারা।

নকআউট পর্বেও কত নাটকীয়তা। সাইডবেঞ্চে বসে এদের দেখেছেন অতিরিক্ত সময়ের শেষদিকে কারেসমার গোলে ক্রোয়েশিয়াকে শেষ মুহুর্তে হারানো, পোল্যান্ডের সাথে টাইব্রেকারে জয়। সেমিফাইনালে অবশ্য ওয়েলসকে হারাতে বেগ পেতে হয়নি, নানি-রোনালদোতে ভর করে ফাইনালে এসেছেন তারা।

কোনোটিতেই আর মাঠে নামা হয়নি এদেরের।

আর এখন ওয়ার্মআপ করতে করতে এদেরের মনে হয়, আজ কি কোচ নামাবেন তাকে? এদের সুযোগ চান, এদের নামতে চান। তিনি জানেন, তিনি তার নামের প্রতি সুবিচার করছেন না তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই। নিজেকে প্রমাণ করার জন্য এরচেয়ে বড় মঞ্চ আর কোথায় পাবেন তিনি? 

ফ্রান্সের গ্যালারি কেঁপে ওঠে হঠাৎ গর্জনে। বুকটা ধ্বক করে ওঠে এদেরের। বিপজ্জনকভাবে বল নিয়ে পর্তুগালের রক্ষণে ঢুকে যাচ্ছেন অলিভিয়ের জিরু। 

এক মুহুর্তে এদেরের স্বপ্ন যেন ভেঙে পড়তে চায়। নির্ধারিত সময়ের খুব বেশি বাকি নেই আর, এখন গোল হজম করলে পরিশোধ করা কষ্টকর হয়ে যাবে। আবারো কি ফিরতে হবে খালি হাতে? ২০০৪ এর ফাইনালে উঠেও গ্রীসের কাছে হারায় হয়নি সেবার। দূর্দান্ত ২০০৬ বিশ্বকাপেও হয়নি, আটকে যেতে হয়েছিল সেমিফাইনালে, এই ফ্রান্সের সাথেই। হয়নি ২০০৮ ইউরোতেও। ২০১০ বিশ্বকাপে, ২০১২ ইউরোতে, হয়নি ২০১৪ বিশ্বকাপেও। এবারও কি মরীচিকার মত মিলিয়ে যাবে অধরা স্বপ্নটি?

গর্জন মিলিয়ে যায় হঠাৎ করেই। রক্ষণের পুরোনো প্রহরী পেপের নিখুঁত ট্যাকল। বল চলে আসে মাঝমাঠে।

হাফ ছাড়তে গিয়েও এদেরের দম আটকে আসে আবার। সান্তোস বসে পড়েছিলেন, এবার রোনালদোর সাথে ছোট একটি আলোচনা সেরেই হাতের ইশারায় ডাকছেন তাকে। 

‘এবার মাঠে নামতে হবে তোমাকে।’

এক

হতাশায় মাঠেই বসে পড়তে ইচ্ছে করছে এদেরের। খেলার আর অল্প সময় বাকি, অতিরিক্ত সময় প্রায় শেষদিকে। অথচ ফ্রান্সের আক্রমণ সামলাতে রীতিমত বেগ পেতে হচ্ছে পেপে, ফন্টেকে।

রক্ষণে ব্যস্ত তাদের মাঝমাঠের খেলোয়াড়রাও। আক্রমণ সাহায্য পাচ্ছে না সেড্রিক-গেরেরোর। 

একবার ভাবেন এদের, টাইব্রেকার পর্যন্ত গেলেও সুযোগ থাকে একটা। ভাবনাটা আসতেই তিনি একবার সাইডলাইনে তাকান। সান্তোসের চেহারাই বলে দিচ্ছে মনের ভিতর দিয়ে কী ঝড় বয়ে যাচ্ছে তার। পাশে দাঁড়িয়ে একের পর এক নির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছেন রোনালদো।

“জয়সূচক গোলটি তোমার পা থেকেই আসবে, এদের”

অতিরিক্ত সময়ের বিরতিতে বলা রোনালদোর কথাটি মনে পড়ে যায় এদেরের। মনে হতেই আবার যেন বিশ্বাস ফিরে পান তিনি। বিড়বিড় করে নিজেকেই শোনান, ’আজ হতেই হবে’।

বলতে বলতেই তিনি দেখেন, মাঝমাঠে বলের দখল হারিয়েছেন গ্রিজম্যান। ওঁত পেতে থাকা মুতিনহো সাথে সাথেই পাস বাড়িয়ে দেন কারভালহোর দিকে, তিনিও দেরি না করে বল ঠেলে দেন কারেসমার পায়ে। আবার মুতিনহো। একবার পজিশন দেখে নিয়ে তিনি পাস দেন এদেরকে। 

ফ্রান্সের সেন্টারব্যাক কসিয়েলনি লেগে আছেন একেবারে গায়ের সাথে।

সুযোগটা হুট করেই দেখতে পান এদের। বলের দখলে সুবিধা করতে না পেরে কখন যেন সরে গিয়েছেন কশিয়েলনি, এদের একেবারেই অরক্ষিত, খালি জায়গায়। গোলপোস্ট এখনো প্রায় ২৫ মিটার দূরে, কিন্তু সিদ্ধান্ত নিতে এক সেকেন্ড দেরি করলেন না তিনি।

এদের শট নিলেন।

দুই   

সাইডলাইনে দাঁড়িয়ে সান্তোস ভাবেন, বয়স হয়েছে তার। এই স্নায়ুর চাপ নিতে মনের সাথে রীতিমত যুদ্ধই করতে হচ্ছে তাকে।

রোনালদোর প্রতি একটা কৃতজ্ঞতা অনুভব করেন তিনি মন থেকে। সেকেন্ড হাফের পর থেকেই তার কাজটি অনেক সহজ করে দিচ্ছে তারই প্রিয় ছাত্র। সান্তোসকে খুব ভালো বুঝেন তিনি, তার অনেক নির্দেশনা এখন মুখে উচ্চারণও করতে হচ্ছে না, রোনালদো পৌছে দিচ্ছেন সতীর্থদের কাছে।

দলটির দায়িত্ব এক অর্থে ভাঙা অবস্থাতেই পেয়েছিলেন তিনি। তিলে তিলে তিনি সবাইকে এক সুতোয় গেঁথেছেন। শিখিয়েছেন কিভাবে দল হিসেবে খেলতে হয়। দিনের পর দিন তিনি কষ্ট করে গেছেন আজকের রাতটির জন্য। ঈশ্বর, আজকের রাতটি শুধু। 

এই মুহুর্তে তার চোখের সামনেই বল, হঠাৎ করেই বল হারিয়েছেন গ্রিজম্যান। মুতিনহো-কারভালহো-কারেসমার পা ঘুড়ে বল এখন এদেরের কাছে, তিনি দেখলেন, কসিয়েলনি সরে গেছেন। 

তার পৃথিবী নিস্তব্ধ হয়ে গেল, দৃষ্টি আটকে গেল একটি পায়ের দিকে। এদের কি তার মনের নির্দেশনা পড়তে পারবেন?

এদের শট নিলেন।

তিন

অনেকদিন ধরে জমানো টাকায় ফ্রান্সে এসেছেন পঞ্চাশোর্ধ হোয়াও মার্টিন। লিসবনে একটি ট্রাক চালান তিনি। সামান্য যা আয় করেন, তা থেকেই অল্প অল্প করে জমিয়েছেন আজকের রাতটির জন্য।

অতিরিক্ত সময়ের শেষভাগের খেলা শুরু হতে যাচ্ছে, বিরতি শেষ প্রায়। রোনালদোকে দেখেন তিনি সবার মধ্যে। সতীর্থরা ঘিরে দাঁড়িয়ে শুনছেন তার কথা। একসময় মাঠে ফুটবলাররা ছাড়া আর কেউ থাকেন না। বুকের ভিতর যেন হাতুড়ির ঘা পড়তে থাকে মার্টিনের। তার মনে হয়, বুকের ধুকপুক আওয়াজ লিসবনে স্ত্রী মার্থার কানেও পৌছে যাবে।

আপার গ্যালারিতে বসে যখন দেখেছিলেন রোনালদোকে আহত অবস্থায় মাঠ ছেড়ে উঠে যেতে, আশা ছেড়েই দিয়েছিলেন মার্টিন। খুব রাগ হচ্ছিলো পায়েতের উপর। এভাবে কেউ ট্যাকল করে?

গর্বের মূহুর্তে


লিসবনের রাতটির কথা মনে পড়ে যায় মার্টিনের। সেদিনও গ্যালারিতেই ছিলেন তিনি, সোনালি প্রজন্মের ফিগো-রুই কস্তা-পলেতায় স্বপ্নের পাল উড়িয়ে দেখতে চেয়েছিলেন শিরোপা। সেদিন হয়নি। আজও কি ফিরে যেতে হবে শুন্য হাতে?

ঈশ্বর, আর কবে?

মার্টিন জানেন, এটাই তার শেষ সুযোগ। আরেকটি ফাইনাল পর্তুগাল খেলতেই পারে, সেটি মাঠে বসে দেখার মত টাকা তিনি এই জীবনে আবার জমাতে পারবেন না। ক্লান্ত কন্ঠে ফরাসীদের গর্জনের সাথে পাল্লা দিয়ে গলা চড়িয়ে তিনি উজ্জীবিত করার চেষ্টা করতে থাকেন দলকে। ঈশ্বর, আর কবে?

হঠাৎই তিনি দেখলেন, লম্বা স্ট্রাইকারটা ছিটকে পিছনে ফেলেছেন ফ্রান্সের একজন ডিফেন্ডারকে। গোলপোস্ট এখনো অনেক দূরে, কিন্তু মার্টিনের মনে হলো, ছেলেটা মনে হয় গোলে শট নিবে। 

ঈশ্বর, আজই কি?

এদের শট নিলেন।

চার

ব্রাহার সেন্ট্রাল মার্কেট স্কয়ারে গিজগিজে ভিড়। বিরাট একটি স্ক্রিনে ফাইনাল দেখানো হচ্ছে।

বাবার কাঁধে চড়ে স্কয়ারে এসেছে চার বছরের ছোট্ট আন্দ্রে। সবার হাতে-মুখে লাল সবুজ রঙ দেখে বাবার কাছে আবদার করায়, তার গালেও এঁকে দেয়া হয়েছে পতাকা।

কী চলছিল তখন তাদের মনে?

আইসক্রিম খেতে খেতে স্ক্রিনে তাকায় আন্দ্রে। দূর থেকে কিছুই বুঝতে পারে না সে। তবে এই উৎসবমুখর মানুষদের দেখতে খুবই ভালো লাগছে তার। কিন্তু এখন কেমন গুমোট চারপাশ, সবাই চুপচাপ হয়ে আছে।

আন্দ্রে বুঝে, কিছু একটা হতে চলেছে। উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়তে চায় তার ছোট্ট শরীরেও। বাবার কপালে হাত রেখে সে বুঝতে পারে, বাবা ঘামছেন। পরমুহুর্তেই সে মানুষের গর্জন শুনতে পায়, সম্মিলিত গর্জন বাড়তে থাকে পারদে। তার মাঝেই সে বাবার চিৎকার শুনতে পায় “এদের, শট নাও!” সব শোরগোল স্তব্ধ হয়ে যায় এক মুহুর্তের জন্য।

আন্দ্রের মনে হয়, বড় হয়ে স্ক্রিনের এই মানুষটার মতই ফুটবলার হবে সে একদিন।

পাঁচ

হুগো লরিস দেখলেন, মাঝমাঠে বল হারিয়েছেন গ্রিজম্যান। তখনো বিপজ্জনক ভাবছিলেন না, কিন্তু মুহুর্তেই মাঝমাঠে কয়েকজনের পা ঘুড়ে বল চলে এসেছে এদেরের পায়ে।

মাথার ভিতর একবার বিপদ সংকেত বেজে উঠে লরিসের। ক্রমাগত আক্রমণে থাকায় ফ্রান্সের ডিফেন্স লাইন অনেক উপরে। তার মধ্যেই এগিয়ে আসছেন এদের, তাকে মার্কিং এ রেখেছেন কসিয়েলনি।

লরিস ভাবেন, এদের আরেকটু এগোবেন। এবং তখনই তিনি দেখতে পান, কসিয়েলনিও তার মতোই ভাবছেন; মার্কিং এ সুবিধা হচ্ছে না বুঝে সরে গেছেন তিনি, লাইন পিছিয়ে আনার চেষ্টা করছেন ফ্রান্সের ডিফেন্ডাররা। তিনি প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। খুব সম্ভবত আক্রমনটা আসবে বা প্রান্ত থেকে – একটা থ্রু বল, কারেসমা উঠে আসছেন সেদিক দিয়ে। চকিতে একবার ডান প্রান্তও দেখে নিলেন লরিস। নাহ, ওদিক থেকে আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ। নানি এখনো উঠে আসতে পারেননি, আর তাকে পাস বাড়ানোর পথটাও বন্ধ করে রেখেছেন মাতুইদি। নিজেই কি শট নিবেন? এখনো প্রায় ২৫ মিটার দূরে এদের। নাহ, আরেকটু এগুবেন বোধহয়। তবে কিছুই আসলে বলা যায় না। তিনি গোলপোস্টের মাঝেই থাকার সিদ্ধান্ত নিলেন।

লরিস ভাবেন, এখনো কিছু সেকেন্ড সময় বোধহয় আছে। ভাবতে ভাবতেই তিনি হতভম্ভ হয়ে দেখলেন, এতদূর থেকেও, এদের শট নিলেন।

……………………………………….

“…দ্য স্ট্রাইকার হু রেয়ারলি স্কোরস হ্যাস স্কোরড মেইবি দ্যা বিগেস্ট গোল ইন দ্যা হিস্টরি অফ দ্যা পর্তুগাল ন্যাশনাল টিম…”


এদেরের সামনে ধু ধু প্রান্তর, এদেরের সামনে বিশ্বভ্রম্মান্ডের শেষ প্রান্ত যেন। তিনি ছুটছেন, তাকে কেউ স্পর্শ করতে পারছে না। হোয়াও মারিও তাকে বাঁধতে চাইলেন আলিঙ্গনে, তাকে ফাঁকি দিয়ে এদের ছুটতে থাকেন। কারেসমা পিছেই রইলেন, শুয়ে পড়া মারিওকে ছাড়িয়ে এদেরের সামনে ধু ধু প্রান্তর, তার সামনে বিশ্বভ্রম্মান্ডের শেষ প্রান্ত যেন। মুতিনহো এলেন, এলেন গেরেরো, কারভালহো। কেউ তাকে আটকাতে পারছেন না আলিঙ্গনে। এদের ছুটেই চলেছেন। পুরো ম্যাচ রক্ষণকে নিশ্ছিদ্র করে রাখা পেপে-ফন্টে, এদেরকে আটকাতে পারলেন না তারাও। এদের ছুটে গেলেন দুই হাত বাড়িয়ে রাখা দলের সহকারী কোচ ইলিদিও ভ্যালের কাছে।

কেন এদের যেতে চাইছিলেন তার আলিঙ্গনে?

আমরা জেনেছি, এদেরকে কি বলে অনুপ্রাণিত করেছিলেন দলনেতা, আমরা জেনেছি, কি বলে অনুপ্রাণিত করেছিলেন প্রধান সেনাপতি। আমরা জানতে পারিনি, কি বলে তাকে অনুপ্রাণিত করেছিলেন ইলিদিও ভ্যালে, কেন এদের যেতে চাইছিলেন তার আলিঙ্গনে।

গ্যালারিতে তখন এক অদ্ভুত দৃশ্য। পর্তুগিজরা কাঁদছেন, সবার চোখে পানি। অদ্ভুত, যুগ যুগ ধরে সাত সমদ্রের অযুত নিযুত জলরাশি প্রবল পরাক্রমে শাসন করে যাওয়া পর্তুগিজরা, অহংকার নিয়ে জাতীয় সঙ্গীতে “আমরা সমুদ্রের বীর” গাওয়া পর্তুগিজরা, সীমাহীন জলরাশির ওপারকে আবিষ্কারের নেশায় মত্ত পর্তুগিজরা আজ চোখের দু’ফোঁটা নোনা জলকে শাসন করতে পারছেন না। অপার সমুদ্রের হাজারো প্রমত্ত ঝড় সামলানো পর্তুগিজরা আজ হৃদয়ের ঝড় সামলাতে পারছেন না। সমর্থকদের একাংশ তখন পাগলের মত ছুটে আসছে লোয়ার লেভেলে, একটু কাছ থেকে তারা দেখতে চান তাদের স্বপ্নপূরণের নায়ককে।


এদের পৌছুতে পারেননি প্রৌঢ় ভ্যালের কাছে। তার আগেই তিনি বাঁধা পড়ে যান বেঞ্চ থেকে ছুটে আসা সতীর্থদের আলিঙ্গনে।

বিজয়ের নায়ক

পরিশিষ্ট

“ধন্যবাদ এই মানুষটিকে, আমাদের কোচকে, তাকে ছাড়া কিছুই সম্ভব হত না। ধন্যবাদ খেলোয়াড়দের, ধন্যবাদ স্টাফদের, ধন্যবাদ প্রত্যেককে যারা আমাদের জন্য কাজ করেছেন। কেউ বিশ্বাস করেনি আমরা পারবো, কিন্তু আমরা পেরেছি। আমি তিন-চারবার কেঁদেছি আনন্দে। কোন চ্যাম্পিয়নস ট্রফি নয়, কোন ব্যক্তিগত অর্জন নয়, আমার সন্তানের জীবনের শপথ এই মুহুর্তটি আমার জীবনের সবচেয়ে আনন্দের মুহুর্ত। কোচ, আমাদের উপর বিশ্বাস রাখার জন্য আবারো ধন্যবাদ। আজ আমরা পর্তুগালের ইতিহাসের অংশ।”

ইউরোপ শ্রেষ্ঠত্বের আসনে

ম্যাচ শেষে ড্রেসিং রুমে বলা রোনালদোর কথাগুলো মনে পড়তেই এদের একবার তাকালেন রোনালদোর দিকে। বিকারহীন মানুষটি কানে হেডফোন লাগিয়ে চোখ বন্ধ করে আছেন। বাকি সবাইই জানালা দিয়ে তাকিয়ে আছেন বাইরে। পর্তুগালের আকাশসীমায় প্রবেশ করেছে তাদের উড়োজাহাজ, দুই পাশে তাদের এসকোর্ট করে নিয়ে যাচ্ছে পর্তুগাল বিমানবাহিনীর দুটো যুদ্ধবিমান।

পর্তুগালের নীল আকাশে যুদ্ধবিমান দুটির ছড়িয়ে দেয়া লাল-সবুজ রঙ কত সুন্দর ভাবেই না ফুটে উঠেছে!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

14 + 14 =