ইকার ক্যাসিয়াস : জন্মদিনে স্প্যানিশ ওয়ালের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য

ইকার ক্যাসিয়াস : জন্মদিনে স্প্যানিশ ওয়ালের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য

::: মঈনুদ্দিন বিপ্লব :::

ইকার ক্যাসিয়াস যদি ফুটবল না খেলতো তাহলে ফুটবলের প্রতি এতো ভালো লাগা, ভালবাসা জন্মাতো কিনা আমার জানা নেই। কিন্তু ইকারের জন্য এখনও ফুটবল এতো ভালোবাসি।
.
ছোট বেলা থেকেই ব্রাজিলের সাপোর্ট করে আসছি, তখন স্পেন, মাদ্রিদ ও ইকার ক্যাসিয়াস আমার কাছে অজানা ছিলো। চিনতাম শুধু ব্রাজিল ও ব্রাজিলের কয়েকটা প্লেয়ার কে। তখন কাকা ছিলো আমার প্রথম প্রছন্দের প্লেয়ার। রোনাল্ডো, রোনালদিনহো, দিদা তাদের ভালো লাগতো।
.
২০০৮ সালের ইউরো কাপের সেমিফাইনাল, স্পেন বনাম ইতালি ও জার্মানী বনাম তুরস্ক। স্পেন বনাম ইতালির খেলাটা ছিলো প্রথম সেমি ফাইনাল, আমাদের এলাকার ২৭ নং লাইনে প্রতিদিন দেওয়ালে পেপার লাগাতো তখন নিয়মিত পেপার পড়তাম। তখন চোখ পড়ে জার্মানী বনাম তুরস্কের খেলার হেড লাইন টা। তখন পাশের কলামে দেখালাম ইতালিকে টাইব্রেকারের হারিয়ে ফাইনালে স্পেন। তখন সেমি ফাইনালের নায়ক হয়ে যান ক্যাসিয়াস। ইতালির ২ টা পেনাল্টি শর্ট ঠেকিয়ে দলকে জেতান ইকার ক্যাসিয়াস। তখন নজর কারে আমার। স্পেন-জার্মানীর ইউরো ফাইনাল ম্যাচ টি দেখলাম। ওই ম্যাচে অসাধারণ অনেক গুলো সেভ দেয় ইকার ক্যাসিয়াস। ফাইনালে ১-০ তে জয় পায় স্পেন। তখন ই প্রথম বার ক্যাসিয়াসের হাত ধরে স্পেন ইউরো কাপ জিতে এটা জানতে পারলাম।
.
তারপর আবার হারিয়ে বসলাম ইকার ক্যাসিয়াস কে। আবার সেই ব্রাজিল, কাকা, রবিনহো, রোনালদো, মেসি তাদের নিয়ে মাততে থাকি। ছোট কাল থেকেই খেলা প্রেমিক ছিলাম তো তাই একটু পেপার পড়ে ফুটবল খেলার আপডেট নেওয়ার বদ অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেল। রিকার্ডো কাকার ফ্যান ছিলাম, পেপার পড়ে জানতে পারলাম এসি মিলান থেকে রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দিয়েছে কাকা। তখন থেকেই কাকার জন্য রিয়াল মাদ্রিদের পেপার পড়ুয়া সাপোর্টার হয়ে গেলাম।
.
২০১০ বিশ্বকাপ, আবারো নজরের আসে ইকার ক্যাসিয়াস, হারিয়ে যাওয়া জিনিস ফিরে পেলাম। বিশ্বকাপের খোঁজ- খবর, ফিকচার ও পুরানো ইতিহাস জানার জন্য কিনলাম ২ টা ম্যাগাজিন। ২ টা ম্যাগাজিনে ইকার ক্যাসিয়াস কে অনেক প্রশংসনীয় কথা বার্তা পড়লাম। অনেক কিছু জানতে পারলাম। পড়ে অনেক ভালো লাগলো। তারমধ্যে দেখি রিয়াল মাদ্রিদে গোলকিপার ইকার ক্যাসিয়াস। সোনায় সোহাগা। মনের অজান্তেই আমার প্রিয় খেলোয়াড় হয়ে গেল। আমি ফ্যান হয়ে গেলাম ইকার ক্যাসিয়াস এর। ব্রাজিলের পাশাপাশি ক্লাব ফুটবলে রিয়াল মাদ্রিদের খেলা দেখার অভ্যাস করে ফেললাম। ২০১০ সালের পর থেকেই ক্লাব ফুটবল গুলো রেগুলার দেখা শুরু করে দিলাম।
.
আর কথা বাড়াবো না, এখন ইকার ক্যাসিয়াস এর একটা উক্তি দিয়ে শুরু করি।
যদি তুমি একটা ম্যাচে ১০ টা অসাধারণ সেভ করো এবং ১ টা গোল খেয়ে যাও তাহলে সবাই তোমার ওই গোল খাওয়াটাই দেখবে, তখন সেভ গুলো দেখবে না।
গোলকিপিং কাজটা কি সবচেয়ে কঠিন? অনেকের কাছে এটাই মনে হতে পারে। কেউ কেউ মনে করে গোলকিপাররা মাঠের অন্যান্যদের মত গুরুত্বই পায়না। অথচ তাদের উপরই ম্যাচের ভাগ্যের অনেকাংশ নির্ভর করে। সেরকমই একজন গোলকিপার আছেন পৃথিবীতে যিনি এই কঠিন কাজটা করেই হয়েছেন শ্রেষ্ঠ। কিছু লোকের কাছে বর্তমানে কোন গুরুত্ব না পেলেও তাকে মনে রাখবে অসংখ্য ভক্ত। কারণ তিনি ইকার ক্যাসিয়াস।
.
১৯৮১ এর ২০ শে মে মাদ্রিদ শহরে জোসে লুইজ ক্যাসিয়াসের ঘর আলো করে আসে ইকার ক্যাসিয়াস। বাবা-মা ইকারকে নিয়ে নাভালাক্রুজে চলে আসেন। ছোটববেলা থেকে ইকার বাসকিউ এ ছিলেন। কিন্তু সে মাদ্রিদকেই তার হোমটাউন ভাবতো। ক্যাসিয়াসের উনাই নামে ৭ বছরের ছোট ভাই আছে। তাই ১৯৯০ সালে নিজের প্রিয় শহরের রিয়াল মাদ্রিদ ইউথ একাডেমি লা ফ্যাব্রিকা তে ক্যারিয়ার শুরু করেন। ২৭ শে নভেম্বর, ১৯৯৭। রিয়াল মাদ্রিদের ইয়ুথ অ্যাকাডেমি “লা ফ্যাব্রিকা” থেকে ১৬ বছর বয়সী এক কিশোরকে স্কোয়াডে রাখা হয়। স্টারটিং ইলেভেনে না থাকলেও রোজেনবর্গের বিপক্ষে চ্যাম্পিয়নস লীগের ম্যাচটিতে প্রথমবারের মত রিয়াল মাদ্রিদের টিম শিটে তার নাম ওঠে। প্রাথমিক পদক্ষেপটা সেখান থেকেই, নিজের ড্রিম টিমে অনুপ্রবেশ।
কিন্তু সাবস্টিটিউট হিসেবে চান্স পান ১৯৯৮-৯৯ মৌসুমে। ২০০০ সালে ইকার কোচের ১ম চয়েস এর মধ্যে থেকে চ্যাম্পিয়নস লীগ খেলেন। সবচেয়ে কম ১৯ বছর বয়সে ইকারের অভিষেক হয় চ্যাম্পিয়নস লীগে। এবং এটি ফাইনাল ম্যাচ ছিলো। (উল্লেখ্য এর ৪ দিন আগে ইকারের জন্মদিন ছিলো)। ৩-০ তে মাদ্রিদ ৮ম বারের মতো জেতে চ্যাম্পিয়নস লীগ, এবং ইকার ক্যাসিয়াস জেতেন জীবনের প্রথম।
.
২০০১-২ মৌসুমে খারাপ পারফরমেন্স এর কারণে ইকার ক্যাসিয়াস ১ম একাদশে জায়গা হারান। কিন্তু ২০০২ চ্যাম্পিয়নস লীগের ফাইনালে সিজার সাঞ্চেজ এর ইঞ্জুরিতে সাব হিসেবে নামেন ক্যাসিয়াস। অতিমানবীয় কিছু সেভ করে আবারো কোচের নজরে আসেন ক্যাসিয়াস এবং মাদ্রিদ লেভারকুজেন এর সাথে ২-১ এ জিতে ৯ম বারের মত শিরোপা ঘরে তোলে।

ইকার ক্যাসিয়াস : জন্মদিনে স্প্যানিশ ওয়ালের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য
gollachhut.com

.
এরপর শুধুই ইতিহাস গড়ার পালা। ২০০৭-৮ সিজনে অসামান্য পারফরমেন্স করে মাদ্রিদকে লীগ শিরোপা জিতাতে সাহায্য করেন ক্যাসিয়াস। এরপর ক্যাসিয়াসকে মাদ্রিদ কন্ট্রাক্ট রিনিউ করতে বলে। ১১৩ মিলিয়ন ইউরোর বাই আউট ক্লজে ২০১৭ সাল পর্যন্ত কন্ট্রাক্ট করেন ক্যাসিয়াস!
.
২০০৯ সালে মাত্র ২৭ বছর বয়সে ৪৫৪ ম্যচ খেলে ফেলেন ইকার ক্যাসিয়াস। যা মাদ্রিদে গোলকিপার হিসেবে সর্বোচ্চ।
.
গ্রীষ্মট্রান্সফার উইন্ডোতে ম্যানচেস্টার সিটি ক্যাসিয়াসকে বিস্ময়কর ১২৯ মিলিয়ন ইউরো অফার করে। কিন্তু ক্যাসিয়াস বলেন,”আমি আমার ছোট বেলার ক্লাব ছেড়ে যেতে চাই না”(উল্লেখ্য, এখন পর্যন্ত সবচেয়ে দামী গোলকিপার এডারসন)।
২০০৯-১০ সিজনে(৪ অক্টোবর) সেভিয়ার সাথে ক্যাসিয়াস তার ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা সেভটি করেন। ম্যাচের পর ইংলিশ গোলকিপার Gordon Banks বলেন,
Casillas’ reflexes are incredible. If he continues to play this well he will become one of the best goalkeepers in the history of the game.”
ইউরোপা প্রেস পত্রিকায় বলা হয় “স্পেনের ২য় পপুলার স্পোর্টস ম্যান হচ্ছে ক্যাসিয়াস। ”
.
২০০৯-২০১০ সিজনে খেলে রাউল মাদ্রিদ থেকে শাল্কেতে পারি জমান এবং ২০১০-১১ সিজনে ইকার রিয়াল মাদ্রিদের ক্যাপটেন্সি পান।
.
২০১১-১২ সিজনে ইকার ক্যাসিয়াস IFFHS এর বেস্ট গোলকিপারের এওয়ার্ড পান। এই পুরস্কারটি ৪ বার জিয়ানলুইজি বুফন, ক্যাসিয়াস ও ন্যূয়ার ছাড়া কেউ পাননি। কিন্তু ইকার ৫ বার পেয়েছে।
.
২০১২ সালের ২২ শে জানুয়ারি ক্যাসিয়াস মাদ্রিদের হয়ে ৬০০ তম ম্যাচ খেলেন। এই সিজনেই ক্যাসিয়াস তার ক্যারিয়ারের ৫ম লা লীগা এবং ক্যাপ্টেন হিসেবে ১ম লীগ জেতেন।
.
এরপর ইকার ক্যাসিয়াস ইঞ্জুরিতে পড়ায় তখনকার কোচ হোসে মৌরিনহো সেভিয়া থেকে দিয়েগো লোপেজকে মাদ্রিদে নিয়ে আসে।
লোপেজের বিশ্রামের প্রযোজন হলে মৌ আদানকে খেলাতো, যদিও ক্যাসিয়াস ইঞ্জুরি থেকে ব্যাক করেছিলো। অর্থাৎ মৌরিনহো বিশ্বসেরা এই গোলকিপারকে থার্ড গোল কিপারে পরিণত করেন।

.
২০১২-১৩ মৌসুমে মৌরিনহো মাদ্রিদ ত্যাগ করেন। এরপর ডন কার্লো আনচেলোত্তি আসলেন রিয়ালের কোচ হিসেবে। কিন্তু ইকার সেই বেঞ্চড ই থেকে গেলেন। চ্যাম্পিয়নস লীগের গ্রুপ পর্বের ম্যাচে দীর্ঘ ২৩৮ দিন পর ক্যাসিয়াসকে খেলতে নামালেন আনচেলোত্তি। আনচেলোত্তি ক্যাসিয়াসকে উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লীগ এবং কোপা দেল রে খেলাতে লাগলেন। যেখানে ক্যাপ্টেন ব্যান্ড ছিলো এই ইকারের হাতেই। এই ১৩-১৪ মৌসুমেই ইকার করলেন আরেক অসামান্য রেকর্ড। দীর্ঘ ৯৬২ মিনিট কোন গোল হজম না করার রেকর্ড। এই সিজনেই ইকারের নেতৃতবে কোপা দেল রে এবং চ্যাম্পিয়নস লীগ জিতে রিয়াল মাদ্রিদ।
.
২০১৪ সালের ২০ ডিসেম্বর মাদ্রিদের হয়ে ফিফা ক্লাব ওয়ার্লড কাপ জেতেন ক্যাসিয়াস এবং এটি ছিলো তার ক্যারিয়ারের ৭০০ তম ম্যাচ। মাদ্রিদের হয়ে ৭২৫ টি অফিসিয়াল ম্যাচ খেলেন ইকার ক্যাসিয়াস ৩২৫+ টির বেশি ম্যাচ তিনি ক্লিনশীট রাখেন। চ্যাম্পিয়নস লীগে এখন পর্যন্ত সব থেকে বেশি মেবি ৫৭/৫৮ টি ম্যাচ ক্লিনশীটের রেকর্ড তার ই দখলে।
.
রিয়ালের গোলপোস্ট, বার্নাব্যুর ঘাস আর ইকার ক্যাসিয়াস – এ সম্পর্কে কথা বললে ফিল্মের পরিচালকরাও বিষণ্ণ হয়ে পড়বে!
২০০১৫ সালে প্রাণ প্রিয় ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদ ছেড়ে এফ.সি পোর্তোতে পাড়ি জমান ইকার ক্যাসিয়াস।
যাবার সময় মাদ্রিদের প্রতি বিদায়ী বক্তব্যঃ “আজ আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন দিন । আজ আমি এখানে এসেছি রিয়াল মাদ্রিদ এবং মাদ্রিদিস্তাদের বিদায় জানাতে। ২৫ বছর ধরে আমি রিয়াল মাদ্রিদে কাটিয়েছি । রিয়াল মাদ্রিদ আমাকে শুধু ভাল গোলকিপার হতে শেখায় নি, একজনভাল মানুষ হতেও শিখিয়েছে ।”
“আমার দীর্ঘপথ চলায় আমার ভাল এবং খারাপ সময়ে সবাইকে আমি পাশে পেয়েছি।যেসব কোচকে আমি এখন পর্যন্ত পেয়েছি তাদের সবাইকে ধন্যবাদ দিতে চাই ।তাদের কাছ থেকে আমি অনেক কিছু শিখেছি।”
“আমি একজন ভাল গোলকিপার হিসেবে মানুষের মনে বেঁচে থাকতে চাই না । বরং একজন ভাল মানুষ হিসেবে সবার মাঝে থাকতে চাই । আমার চলার পথে আমার পাশে থাকা আমার পরিবার,সতীর্থদের প্রতিআমি কৃতজ্ঞ । পোর্তো ক্লাব আমার প্রতি আস্থা রেখেছে তাই পোর্তোর প্রতি ধন্যবাদ জানাই ।”
“একটা কথা মনে রাখবেন । আমি যেখানেই যাই না কেন সবসময় আমি বলব ‘আলা মাদ্রিদ’ ।”
.
(উল্লেখ্য চলতি সিজনে এফ সি পোর্তোর হয়ে ৩১ ম্যাচ মাত্র ১৯ টি গোল কন্সিড করেন এবং ১৮ টি ম্যাচে ক্লিনশীট রাখেন।)
.
১৯৯৭ সালে মাত্র ১৬ বছর বয়সে ক্যাসিয়াসের আন্তর্জাতিক অভিষেক হয়। সেবারের Under 17 FIFA World Championship এ স্পেন তৃতীয় স্থান লাভ করে। ২ বছর পর স্পেন UEFA Youth Championship এবং UEFA-CAF Meridian Cup জিতে। ২০০০ সালের ৩রা জুন এ স্পেন মেইন দলে ক্যাসিয়াসের আন্তর্জাতিক অভিষেক হয়। ২০০২ সালের বিশ্বকাপে ২য় পছন্দ হিসেবে থাকলেও স্যান্টিয়াগো ক্যানিজারেস এর ইঞ্জুরী তাকে একমাত্র পছন্দ বানিয়ে দেয়। টপ ১৬ রাউন্ডে আয়ারল্যান্ড এর সাথে পেনাল্টি শুটআউটে ২টি পেনাল্টি সেইভ করার কারণে তিনি ‘সেইন্ট ইকার’ উপাধি পান। দক্ষিন কোরিয়ার সাথে তার একটি সেইভ ফিফা’র সর্বকালের টপ টেন সেইভ এর একটি। এরপর ক্যাসিয়াসের জন্য কেটেছে স্বর্ণযুগ। ২০০৪ ইউরো, ২০০৬ বিশ্বকাপে তেমন সাফল্য না পেলেও এরপর থেকে তিনি যেন অপ্রতিরোধ্য হয়ে যান। ২০০৮ ইউরো, ২০১০ বিশ্বকাপ, ২০১২ ইউরো জয় করে তিনি স্পেনকে তুলে নেন এক অবিস্মরণীয় উচ্চতায়। ফিফা র‍্যাংকিং এ স্পেন উঠে আসে ১ নম্বরে। সাথে সাথে ক্যাসিয়াস হয়ে যান পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গোলরক্ষক।
.
৩ জুন, ২০০০ সালে সুইডেনের বিপক্ষে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অভিষেক ঘটার পর তিনিই স্প্যানিশ ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি অ্যাপিয়ারেন্স পাওয়া খেলোয়াড়।
.
ইউরো ২০০৪ এ স্পেনের খেলা ৮ ম্যাচের সবগুলোতেই ফার্স্ট চয়েস হিসেবে খেলেন। পুরো টুর্নামেন্টে মাত্র ৪ গোল কন্সিড করেন।
২০০৬ বিশ্বকাপে দুর্ভাগ্যক্রমে জিদানের ফ্রান্সের কাছে নক আউট রাউন্ডে ৩-১ এ হেরে বিদায় নিতে হয় লা রোজাদের। এর পর স্প্যানিশ তারকা ফুটবলার রাউল এর পরিবর্তে প্রথমবারের মত অধিনায়কের দায়িত্ব পান ক্যাসিয়াস।
.
২০০৮ ইয়োরো। কোয়ার্টার ফাইনালে টাইব্রেকারে ডি রসি আর ডি নাতালের পেনাল্টি শট ঠেকিয়ে ইতালি কে টপকে সেমিফাইনালে উঠান স্পেনকে। ফাইনালে ১ম গোলকিপার হিসেবে ক্যাপ্টেন হয়ে জার্মানিকে ১-০ গোলে হারিয়ে ইতিহাসে জায়গা করে নেন ক্যাসিয়াস। স্পেনের দীর্ঘ ৪৪ বছরের আন্তর্জাতিক শিরোপা খরার অবসান ঘটান।
.
২০০৮ এর অক্টোবর মাসে টানা ৭৮০ মিনিট গোল হজম না করে পেপে রেইনার রেকর্ড ভেংগে দেন ইকার।
২০০৮ সালের ব্যলন ডি অর কন্টেস্ট এ রোনালদো, মেসি আর তোরেস এর পর স্থান(৪ র্থ) করে নিয়েছিলেন ক্যাসিয়াস। যা ম্যানুয়াল নয়্যার ব্যতীত অন্য কোন গোলকিপার পারেন নি। একই বছর IFFH ক্যাসিয়াসকে সর্বোকালের সেরা গোলকিপারের তালিকায় অলিভার খান কে পেছনে ফেলে ৩য় স্থান নির্বাচিত করেন।
.
২০০৯ সালে এস্তোনিয়ার বিপক্ষে ক্লিন শীট রেখে ক্লিনশিট এর সংখ্যা ৫৭ করেন এবং ইন্টারন্যাশনাল ক্লিনশিট এ জুবিজারেতা কে পেছনে ফেলে স্পেন এর সর্বোচ্চ ক্লিনশিটের রেকর্ড করেন।
২০১০ বিশ্বকাপ। পুরো টুর্নামেন্টে ৭ ম্যাচে মাত্র ২ গোল কন্সিড করে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হন সেইন্ট ইকার। টুর্নামেন্টের অল স্টার একাদশে নিজের নাম লিখিয়ে নেন। ফাইনালে ইনিয়েস্তার গোলের পর সবাই ছুটে গিয়ে জয় উদযাপনে ব্যস্ত, ইকার তখন ডি বক্সে হাঁটু গেড়ে বসা! চোখ দিয়ে আবেগ ঝরছে। ইতিহাসের সর্বপ্রথম বিশ্বজয়ী গোলকিপিং অধিনায়ক।
.
২০১১ সালের ১৫ই নভেম্বর ক্যাসিয়াস স্পেনের হয়ে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার কৃতিত্ব পান।
২০১২ ইউরো। ইতালির ডি নাতালে এবং ফ্রান্সের জিরুদের গোল বাদে আর কোনো গোল ইকারের গ্লাভস ফাঁকি দিয়ে জালে জড়াতে পারেনি। ফাইনালের আগে আরেক কিংবদন্তী গোলকিপার, জিয়ালুইজি বুফনের বক্তব্য ক্যাসিয়াসের উপরঃ
“সত্যি বলতে সে কতটা ভালো তা বলার জন্য আমার বেশি শব্দচয়ন ব্যবহার করা লাগবে না, সেটা সবাইকে বলার জন্য তাঁর ফলাফল গুলোই আছে সবার সামনে। একজনের পক্ষে যতকিছু জেতা সম্ভব, সে তার সবগুলোই জিতেছে এবং এই লেভেলেই সে ধারাবাহিকভাবে অনেক বছর ধরেই আছে, যা একজন গোলকিপারের জন্য সম্ভবত সবচাইতে কঠিন জিনিস। স্পেইন প্রায় কখনই গোল হজম করে না এবং ক্যাসিয়াস সেটার প্রধান কারন।”
.
২০১২’র ইউরো জিতেই ইয়রো-বিশ্বকাপ-ইউরো জেতার এক অসাধ্য রেকর্ড অর্জন করেন সেইন্ট ইকার। ২০১২ সালের ১লা জুলাই স্পেনের হয়ে প্রথম কোন প্লেয়ার হিসেবে ১০০ তম ম্যাচ জিতেন। এরপর ক্যাসিয়াস ৫০৯ মিনিটের ক্লিনশিট এর এক রেকর্ড করেন। অতপর ৮১৭ মিনিট ক্লিনশিটের আরেক অসামান্য রেকর্ড করেন।
২০১৪ বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বের ১ম ম্যাচে নেদারল্যান্ডস এর সাথে ৫ গোল হজম করে। এটা ছিলো তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে খারাপ পারফরমেন্সের একটি। প্রথম রাউন্ড থেকে বিদায় নিয়ে বিশ্বকাপ স্বপ্ন শেষ হয়ে যায়।
.
২০১৬ সালে জাতীয় দলের হয়ে ১৬৭ টি ম্যাচ খেলার রেকর্ড অর্জন করেন এবং জাতীয় দলের হয়ে ১০০ টি ম্যাচ ক্লিনশীট রাখার রেকর্ড টি ও তার নিজের করে নেন। মাত্র ৬৯ টি গোল কন্সিড করেন। ১০০+ খেলা যেকোন গোল কিপারের চেয়ে কম।
.
২০০৮ থেকে ২০১২ পর্যন্ত টানা ৫ বার IFFH বেস্ট গোলকিপার নির্বাচিত হন ক্যাসিয়াস। যা গিয়ানলুইগি বুফনের ৪ বারের রেকর্ডকে ভেঙে দেয় (তারপর টানা ৪ বার ন্যূয়ার জিতে এই পুরষ্কার টি)। টানা ৫ বার ফিফা বিশ্ব একাদশে গোলকিপার হিসেবে যায়গা পাওয়া একমাত্র প্লেয়ারও ইকার ক্যাসিয়াস।

  • সম্মাননা
    ক্লাব
    রিয়াল মাদ্রিদ
    লা লিগা: ২০০০-০১, ২০০২-০৩, ২০০৬-০৭, ২০০৭-০৮, ২০১১-১২
    কোপা দেল রে: ২০১০-১১, ২০১৩-১৪
    স্পেনীয় সুপার কাপ: ২০০১, ২০০৩, ২০০৮, ২০১২
    উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লীগ: ১৯৯৯-২০০০, ২০০১-০২, ২০১৩-১৪
    উয়েফা সুপার কাপ: ২০০২
    ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপ: ২০০২
    এফ. সি পোর্তোঃ
    কলনিয়া কাপঃ ২০১৫

পর্তুগীজ প্রিমেইরা লীগাঃ ২০১৭-১৮
.
• জাতীয় দল
স্পেন
ফিফা বিশ্বকাপ: ২০১০
উয়েফা ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ: ২০০৮, ২০১২
স্পেন অনূর্ধ্ব ২০
ফিফা বিশ্ব যুব চ্যাম্পিয়নশিপ: ১৯৯৯
স্পেন অনূর্ধ্ব ১৬
উয়েফা অনূর্ধ্ব ১৬ চ্যাম্পিয়নশিপ: ১৯৯৭

  • ব্যাক্তিগত
    ব্রাভো অ্যাওয়ার্ড: ২০০০
    লা লিগা সেরা গোলরক্ষক: ২০০৯, ২০১২
    বিবিভিএ ফেয়ার প্লে অ্যাওয়ার্ড: ২০১২-১৩
    জামোরা ট্রফি: ২০০৭-০৮
    ইউরোপ সেরা গোলরক্ষক: ২০১০
    আইএফএফএইচএস বিশ্বসেরা গোলরক্ষক: ২০০৮, ২০০৯, ২০১০, ২০১১, ২০১২
    ফিফা/ফিফপ্রো বিশ্বসেরা গোলরক্ষক: ২০০৮, ২০০৯, ২০১০, ২০১১, ২০১২
    ফিফা/ফিফপ্রো বিশ্ব একাদশ: ২০০৮, ২০০৯, ২০১০, ২০১১, ২০১২
    ফিফা বিশ্বকাপ গোল্ডেন গ্লোভস: ২০১০
    ফিফা বিশ্বকাপ অল স্টার দল: ২০১০
    উয়েফা ইউরো টুর্নামেন্ট সেরা একাদশ: ২০০৮, ২০১২
    উয়েফা বর্ষসেরা দল: ২০০৭, ২০০৮, ২০০৯, ২০১০, ২০১১, ২০১২
    ইএসএম বর্ষসেরা দল: ২০০৮
    .
    যদি ২০১৩ সালে ফাইনালে ব্রাজিলের সাথে কনফেডারেশন কাপ না হারতো তাহলে একমাত্র প্লেয়ার হিসেবে ক্যারিয়ারে যতো গুলো টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ করেছেন সব কয়টি কাপ জিতার রেকর্ড অর্জন করতেন।
    .
    ২০০৯ সালে স্পেনের স্পোর্টস জার্নালিস্ট সারা কারবোনেরো এর সাথে ক্যাসিয়াসের রিলেশন হয়। ২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসেএক পুত্র সন্তানের জন্ম দেন ক্যাসিয়াস। নাম রাখেন মারটিন ক্যাসিয়াস কারবোনেরো এবং ২০১৬ সালে ২য় সন্তান লুকাসের বাবা হন।
    রিয়াল মাদ্রিদ ও স্পেইনের এর সর্বকালের সেরা গোলকিপারের নাম শুনলে প্রথমেই সবার মুখে একটা নামই আসবে। সেইন্ট ইকার। ইকার ক্যাসিয়াস ফার্নান্দেজ। ফুটবলকে প্রত্যেক লিজেন্ড কিছু না কিছু দিয়ে যায় যা সারা বিশ্ব বছরের পর বছর মনে রাখে। ইকার ক্যাসিয়াস সেই লিজেন্ডদেরই একজন। যিনি ফুটবলকে রোমাঞ্চিত করেছেন। নিয়ে গেছেন আরো এক ধাপ এগিয়ে। একজন ভালো খেলোয়াড়ের পাশাপাশি তিনি একজন অসম্ভব ভালো মানুষ। তিনি কখনো অভিযুক্ত হননি। সরল পথ অবলম্বনের মাধ্যমে দুনিয়াতে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছেন। তিনি সবসময় ফুটবল অনুরাগীদের হৃদয়ে ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন।
    ইকার ক্যাসিয়াস ফারনান্দেজ – দ্যা স্প্যানিশ ওয়াল।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

one × two =