ইউরো টিম প্রিভিউ : বেলজিয়াম

নিজেদের ইতিহাসের পঞ্চমবারের মত ইউরো খেলতে আসছে এবার হট ফেভারিট বেলজিয়াম। পাঁচবার খেললেও ইউরোতে বেলজিয়ামের সর্বোচ্চ সাফল্য বলতে সেই ১৯৮০ ইউরোতে রানার্সআপ হওয়া, পশ্চিম জার্মানির কাছে হেরে রানার্সআপ হয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছিল সেবার জ্যাঁ মারি ফ্যাফ-মিশেল প্র্যুডহোমের বেলজিয়ামকে। বেলজিয়ামের এই প্রজন্মকে বলা হয় তাদের ইতিহাসের স্বর্ণালী প্রজন্ম, ডিফেন্স থেকে অ্যাটাক – সবদিকেই প্রতিভার ছড়াছড়ি। এবারের বেলজিয়াম দল কি পারবে এই প্রতিভাধর দলকে নিয়ে ইউরোতে নিজেদের সর্বোচ্চ সাফল্য অর্জন করতে? পারবে চ্যাম্পিয়ন হতে? গ্রুপ ‘ই’ তে থাকা বেলজিয়ামের গ্রুপটা কিন্তু সহজ নয় মোটেও। এখানে যেমন রয়েছে ইতালির মত পরাশক্তি, আবার আয়ারল্যান্ড-সুইডেনের মত পোড় খাওয়া অভিজ্ঞ দলও আছে।
Belgium-ranked-number-1-by-FIFA-lrg-1449154801 (1)

গতকাল কোচ মার্ক উইলমটস শিরোপা জয়ের লক্ষ্যেই ২৪ সদস্যের বেলজিয়াম দল ঘোষণা করেছেন। দেখে নেওয়া যাক দলটি একনজরে –

 

  • গোলরক্ষক

থিবো কোর্তয় (চেলসি)

সিমোন মিনিওলেই (লিভারপুল)

জ্যাঁ-ফ্র্যাঙ্কোয়াঁ জিলেই (মেকেলেন)

 

  • ডিফেন্ডার

ইয়ান ভার্টঙ্ঘেন (টটেনহ্যাম হটস্পার)

টোবি অল্ডারওয়াইরেল্ড (টটেনহ্যাম হটস্পার)

থমাস ভারমায়েলেন (বার্সেলোনা)

জেইসন ডেনায়ের (গ্যালাতাসারাই)

নিকোলাস লমবায়ের্টস (জেনিত সেইন্ট পিটসবার্গ)

থমাস মিউনিয়ের (ক্লাব ব্রুজে)

দেদ্রিক বোয়্যাটা (সেল্টিক)

জর্ডান লুকাকু (উস্টেন্ড)

বিয়র্ন এঙ্গেলস (ক্লাব ব্রুজে)

 

  • মিডফিল্ডার

মুসা ডেম্বেলে (টটেনহ্যাম হটস্পার)

মারুয়ান ফালাইনি (ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড)

রাজ্জা নাইঙ্গোলান (এএস রোমা)

এইক্সেল উইটসেল (জেনিত সেইন্ট পিটসবার্গ)

কেভিন ডে ব্রুইনিয়া (ম্যানচেস্টার সিটি)

ইডেন হ্যাজার্ড (চেলসি)

ইয়ানিক ফেরেইরা-কারাসকো (অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ)

ড্রাইস মার্টেন্স (নাপোলি)

 

  • স্ট্রাইকার

ক্রিস্টিয়ান বেনটেকে (লিভারপুল)

ডিভক অরিগি (লিভারপুল)

রোমেলু লুকাকু (এভারটন)

মিচি বাতশুয়াই (অলিম্পিক মার্শেই)

 

 

  • উল্লেখযোগ্য যারা বাদ পড়লেন

ভিনসেন্ট কম্পানি (সেন্টারব্যাক, ম্যানচেস্টার সিটি)

নাসের চ্যাডলি (মিডফিল্ডার, টটেনহ্যাম হটস্পার)

থরগান হ্যাজার্ড (মিডফিল্ডার, বরিশিয়া মনশেনগ্ল্যাডবাখ)

স্টিভেন ডিফোর (মিডফিল্ডার, আন্ডারলেখট)

জাকারিয়া বাক্কালি (মিডফিল্ডার, ভ্যালেন্সিয়া)

ইউরি টিয়েলেমানস (মিডফিল্ডার, আন্ডারলেখট)

কেভিন মিরালাস (মিডফিল্ডার, এভারটন)

লরেন দেপোইট্রে (স্ট্রাইকার, জেন্ট)

আদনান ইয়ানুজাই (মিডফিল্ডার, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড)

ইনজুরির কারণে খেলা হচ্ছেনা নিয়মিত অধিনায়ক ভিনসেন্ট কম্পানির
ইনজুরির কারণে খেলা হচ্ছেনা নিয়মিত অধিনায়ক ভিনসেন্ট কম্পানির

 

দলে অনুপস্থিত থাকছেন নিয়মিত অধিনায়ক, ম্যানচেস্টার সিটির সেন্টারব্যাক ভিনসেন্ট কম্পানি। উরুর ইনজুরির কারণে চার মাস মাঠের বাইরে থাকতে হচ্ছে তাঁকে, ফলে ইউরো ত বটেই, পেপ গার্দিওলার অধীনে ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে প্রথম কিছু ম্যাচও খেলতে পারবেন না তিনি। তাঁর পরিবর্তে গ্যালাতাসারাইয়ের সেন্টারব্যাক জেইসন ডেনায়েরের উপর ভরসা রাখছেন কোচ মার্ক উইলমটস।

 

কম্পানির অনুপস্থিতে এবার বেলজিয়ামকে নেতৃত্ব দেবেন ইডেন হ্যাজার্ড
কম্পানির অনুপস্থিতে এবার বেলজিয়ামকে নেতৃত্ব দেবেন ইডেন হ্যাজার্ড

তারকার হাট বসা এই দলে সুপারস্টার রয়েছেন একের পর একজন। আছেন চেলসির উইঙ্গার ইডেন হ্যাজার্ড, যিনি এবার কম্পানির অনুপস্থিতিতে বেলজিয়ামকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, আছেন ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে অসাধারণ মৌসুম কাটানো, ৪০ ম্যাচে ১৬ গোল করা কেভিন ডে ব্রুইনিয়া। পুরো মৌসুম চেলসির হয়ে জঘন্য কাটানোর পর মৌসুমশেষে ফর্ম ফিরে পাওয়া হ্যাজার্ড অধিনায়ক হয়ে কিরকম প্রভাব ফেলতে পারেন সেটা দেখার বিষয়। এভারটনের হয়ে ভালো মৌসুম কাটানো, ৪০ ম্যাচে ২৫ গোল করা রোমেলু লুকাকুও রয়েছেন সুপারস্টারের তালিকায়। টটেনহ্যামের মুসা ডেম্বেলে কিংবা রোমার রাজ্জা নাইঙ্গোলানও নিজেদের ভূমিকায় অত্যন্ত পারদর্শী, অসাধারণ মৌসুম কাটিয়ে এসেছেন তাঁরাও – নিজ নিজ ক্লাবের হয়ে।
দলে চমক বলতে সেরকম কিছু নেই। তবে ভিনসেন্ট কম্পানির অনুপস্থিতিতে কোচ মার্ক উইলমটস যে জেইসন ডেনায়েরের মত প্রতিশ্রুতিশীল কিন্তু অনভিজ্ঞ একজনের উপর আস্থা রাখছেন – চমক বলা যেতে পারে এটাকেই। চমক বলা যেতে পারে বার্সেলোনার সেন্টারব্যাক থমাস ভারমায়েলেনের ডাক পাওয়াটাও। বেলজিয়ামের অভিজ্ঞ এই সেনানী এই মৌসুমে বার্সেলোনার হয়ে খেলেছেন মাত্র ৬ ম্যাচ। অন্য কোন দল হলে মিরালাস, চ্যাডলি, বাক্কালি, থরগান হ্যাজার্ড, ইয়ানুজাই – এদের অনুপস্থিতি অনেক বেশী চোখে পড়ত ; পড়ছে না কেবলমাত্র দলটা বেলজিয়াম বলেই। কারণ তাঁদের বাদ দিয়ে যাদের দলে নেওয়া হয়েছে তাঁরাও যথেষ্ট অভিজ্ঞ ও কার্যকরী।

গোলবারে থাকবেন থিবো কোর্তোয়
গোলবারে থাকবেন থিবো কোর্তোয়

এবার দেখা যাক বেলজিয়ামের মূল একাদশটা কিরকম হতে পারে। চেলসিতে এই মৌসুমে নিজের জায়গাটা সেরকম নিশ্চিত না হলেও বেলজিয়ামের গোলবার থিবো কোর্তয়ই যে সামলাচ্ছেন, সে কথা বলেই দেওয়া যায়। কোর্তয়ের ব্যাকআপ হিসেবে দলে আছেন লিভারপুলের গোলরক্ষক সিমোন মিনিওলেই। অধিনায়ক ভিনসেন্ট কম্পানির ইনজুরি একরকম শাপে বর হয়েই এসেছে বেলজিয়ামের জন্য। এই মৌসুমে টটেনহ্যাম হটস্পারের হয়ে দুর্দান্ত খেলা বেলজিয়ান সেন্টারব্যাক জুটি টোবি অল্ডারওয়াইরেল্ড ও ইয়ান ভার্টঙ্ঘেনকে ডিফেন্সের মাঝখানে খেলাতে পারবেন তাহলে কোচ মার্ক উইলমটস। যেখানে কম্পানি থাকলে অল্ডারওয়াইরেল্ডকে রাইটব্যাক হিসেবে খেলতে হত। কিন্তু ঝামেলা হল বেলজিয়ামের এই দলে আবার অভিজ্ঞ রাইটব্যাক বলতে গেলে কেউই নেই। শুধু রাইটব্যাক বললে ভুল হবে, বিগত কয়েকবছরের ধারা বজায় রেখে বেলজিয়ামের এই দলেও কোন ভালো স্পেশালিস্ট ফুলব্যাক নেই। ঘুরেফিরে সেই অল্ডারওয়াইরেল্ড, ভারমায়েলেন, ডেনায়ের, ভার্টঙ্ঘেন, লমবায়ের্টস – এদেরকেই কাজ চালানো ফুলব্যাক হিসেবে মূল একাদশে খেলানো হয় ; যারা কি না নিজ নিজ ক্লাবে সেন্টারব্যাকের ভূমিকা অত্যন্ত ভালোভাবে পালন করেন। দলে ডাক পাননি রাইটব্যাক লুইস পেদ্রো কাভান্দা কিংবা গুইলাউমে জিলেইয়ের কেউই। তারা যে বিশেষ ভালো কোন রাইটব্যাক – তাও কিন্তু না। ফলে রাইটব্যাকে যদি যথারীতি কোচ মার্ক উইলমটস টোবি অল্ডারওয়াইরেল্ডকে খেলান, সেক্ষেত্রে সেন্টারব্যাকে ইয়ান ভার্টঙ্ঘেনের সাথে জুটি বাঁধবেন নিকোলাস লমবায়ের্টস বা জেইসন ডেনায়েরের মধ্যে যেকোন একজন। ইউরো বাছাইপর্বে বেলজিয়ামের ডিফেন্সের লাইনআপ দেখলেই বোঝা যায়, শুধুমাত্র দুইজন স্পেশালিস্ট রাইটব্যাক ও লেফটব্যাকের অভাবে অল্ডারওয়াইরেল্ড, কম্পানি, ভার্টঙ্ঘেন, ভারমায়েলেন, লুকাকু, মিউনিয়ের, লমবায়ের্টস, ডেনায়ের – ঘুরেফিরে এদেরকেই বিভিন্ন পজিশানে খেলতে হয়। একদিন ভারমায়েলেন সেন্টারব্যাকে খেলেন, ত আরেকদিন লেফটব্যাকে। একই সমস্যা হয় ভার্টঙ্ঘেন, লমবায়ের্টস ও লুকাকুর ক্ষেত্রেও। কারণ তারা চারজনই বলতে গেলে বামপায়ের খেলোয়াড়। ফলে কাজ চালানো লেফটব্যাক তাঁদের মধ্যে থেকেই কেউ একজন হন সবসময়।

বেলজিয়াম ডিফেন্স
বেলজিয়াম ডিফেন্স

আবার ওদিকে ডিফেন্সে ডানপায়ের খেলোয়াড় বলতে আছেন অল্ডারওয়াইরেল্ড, ডেনায়ের, মিউনিয়ের এরা। ফলে এদেরকে দিয়েই হয় রাইটব্যাক, নয় সেন্ট্রাল ডিফেন্সের ডানদিকের পজিশানের কাজ চালাতে হয়। তাও মোটামুটি অল্ডারওয়াইরেল্ড, ডেনায়ের, ভার্টঙ্ঘেন, ভারমায়েলেন – এই চারজনই খেলবেন বলা যায়।

৪-৩-৩ ফর্মেশানে মিডফিল্ডার তিনজনের মধ্যে রোমার রাজ্জা নাইঙ্গোলান আর জেনিত সেইন্ট পিটসবার্গের এইক্সেল উইটসেলের খেলা নিশ্চিতই বলা চলে। আর কোচ মার্ক উইলমটস মোটামুটি বলেই দিয়েছেন অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার হিসেবে তিনি চান ম্যানচেস্টার সিটির কেভিন ডে ব্রুইনিয়াকে।

নাইঙ্গোলান-উইটসেল-ডে ব্রুইনিয়া ; বেলজিয়ামের মিডফিল্ড হতে পারে এমনটাই
নাইঙ্গোলান-উইটসেল-ডে ব্রুইনিয়া ; বেলজিয়ামের মিডফিল্ড হতে পারে এমনটাই

 

অ্যাটাকার তিনজনের মধ্যে একজন থাকছেন চেলসির ইডেন হ্যাজার্ড, উইঙ্গার হিসেবে। লিভারপুলের দুই স্ট্রাইকারের একজন ডিভক অরিগি মাত্র ইনজুরি থেকে ফিরেছেন, আর আরেক স্ট্রাইকার ক্রিস্টিয়ান বেনটেকে ক্লাবেও অতটা নিয়মিত নন এখন, ফলে সেন্টার ফরোয়ার্ড হিসেবে মূল একাদশে জায়গা পেতে পারেন এভারটনের হয়ে ভালো মৌসুম কাটানো স্ট্রাইকার রোমেলু লুকাকু। তাঁর সাথে জায়গা নিয়ে লড়াই হবে মার্শেইয়ের হয়ে দুর্দান্ত মৌসুম কাটানো স্ট্রাইকার মিচি বাতশুয়াইর। আরেক উইঙ্গার হিসেবে নাপোলিতে খেলা ড্রাইস মার্টেন্স, অথবা অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের ইয়ানিক-ফেরেইরা কারাসকো খেলবেন।

বেলজিয়ামের ফরোয়ার্ড লাইনআপ
বেলজিয়ামের ফরোয়ার্ড লাইনআপ

আবার এদিকে কোচ মার্ক উইলমটস ইঙ্গিত দিয়েছেন, এইবার ইউরোতে বেলজিয়ামের মূল একাদশে দুই স্ট্রাইকার খেলাতে পারেন তিনি, এবং স্ট্রাইকারের পেছনে নাম্বার টেন রোলে দেখতে চান কেভিন ডি ব্রুইনিয়া কে। সেক্ষেত্রে সবসময় ৪-৩-৩ ফর্মেশানে খেলা বেলজিয়ামের ফর্মেশান পালটে হয়ে যেতে পারে ৪-৪-২ ডায়মন্ড বা ৪-১-৩-২। তখন অল্ডারওয়াইরেল্ড, ডেনায়ের, ভার্টঙ্ঘেন, ভার্মায়েলেনের ডিফেন্সের সামনে ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবে থাকবেন এইক্সেল উইটসেল, অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার কেভিন ডে ব্রুইনিয়ার বামপাশে ইডেন হ্যাজার্ড ও ডানদিকে চলে আসতে পারেন ফেরেইরা কারাসকো বা রাজ্জা নাইঙ্গোলানের কেউ। দুই স্ট্রাইকার হিসেবে ফর্মে থাকা দুই স্ট্রাইকার লুকাকু ও বাতশুয়াই খেলতে পারেন।

বেলজিয়ামের সম্ভাব্য একাদশ
বেলজিয়ামের সম্ভাব্য একাদশ

কোন ফর্মেশান, কে কিরকম খেলবেন, কে কে খেলবেন কিভাবে খেলবেন, তা জানতে নাহয় ১৩ জুনের জন্যই অপেক্ষা করা যাক, যখন বেলজিয়াম তাঁদের প্রথম ম্যাচ খেলবে এবারের ইউরোতে!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

twenty + six =