ইউরো টিম প্রিভিউ : জার্মানি

বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানি ইউরোর ক্ষেত্রেও যথেষ্ট পরাক্রমশালী একটি দল। যেকোন টুর্নামেন্টেই সম্ভাব্য শিরোপাজয়ীর তালিকা করা হলে তাঁর মধ্যে জার্মানির নাম আসতে বাধ্য। চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানি ইউরোপিয়ান প্রতিযোগিতা জিতেছে মোট তিনবার, ১১বার অংশ নিয়ে রানার্সআপও হয়েছে তিনবার। শেষবার ইউরোর শিরোপার কাছাকাছি এসেছিল তারা ২০০৮ ইউরোতে, ফার্নান্দো টরেসের দুর্দান্ত স্পেইনের কাছে ফাইনালে ১-০ গোলে হেরে শিরোপা-স্বপ্ন বিসর্জন দিতে হয় তাঁদের। স্পেইন তারপরে জিতেছে আরও একটি ইউরো, ও দুই ইউরোর মাঝে জিতেছে ২০১০ বিশ্বকাপও। এখন জার্মানিও কি স্পেইনের মত বিশ্বকাপ জয়ের পর ইউরো জিতে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের কথা আবার মনে করিয়ে দিবে সবাইকে? পারবে কি ২০১৪ বিশ্বকাপের পর ২০১৬ ইউরো জিতে ফ্রান্স ও স্পেইনের পর বিশ্বকাপ ও ইউরোর ‘ডাবল’ পরপর জেতার কৃতিত্ব দেখাতে? দেখার অপেক্ষা সেটারই।

২০১৪ এর বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা
২০১৪ এর বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা

গ্রুপ সি তে এইবার জার্মানির গ্রুপসঙ্গী আন্দ্রিই ইয়ারমোলেঙ্কো-ইয়েভহেন কোনোপ্লাইয়াঙ্কার ইউক্রেইন, রবার্ট লেফান্ডোফস্কির পোল্যান্ড ও কাইল ল্যাফার্টি-স্টিভেন ডেভিসের নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড। কোচ জোয়াকিম লো এরইমধ্যে ২৩ সদস্যের জার্মান স্কোয়াড ঘোষণা করে দিয়েছেন, দেখা যাক কে কে ডাক পেলেন।

 

  • গোলরক্ষক

ম্যানুয়েল নয়্যার (বায়ার্ন মিউনিখ)

বার্নড লেনো (বেয়ার লেভারক্যুজেন)

মার্ক-আন্দ্রে টের স্টেগেন (বার্সেলোনা)

 

গোলবারে থাকছেন ম্যানুয়েল নয়্যার
গোলবারে থাকছেন ম্যানুয়েল নয়্যার
  • ডিফেন্ডার

ম্যাটস হামেলস (বায়ার্ন মিউনিখ)

শকোদ্রান মুস্তাফি (ভ্যালেন্সিয়া)

বেনেডিক্ট হুভেডেস (শালকে ০৪)

জেরোম বোয়াটেং (বায়ার্ন মিউনিখ)

জোনাথান তাহ (ডিফেন্ডার, বেয়ার লেভারক্যুজেন)

জোনাস হেক্টর (কোলন)

এমরে চ্যান (লিভারপুল)

জোশুয়া কিমিচ (বায়ার্ন মিউনিখ)

ডিফেন্স হতে পারে অনেকটা এরকম
ডিফেন্স হতে পারে অনেকটা এরকম

 

  • মিডফিল্ডার

বাস্তিয়ান শোয়াইনস্টাইগার (ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড)

টোনি ক্রুস (রিয়াল মাদ্রিদ)

স্যামি খেদিরা (জুভেন্টাস)

মেসুত ওয়েজিল (আর্সেনাল)

জুলিয়ান ড্র্যাক্সলার (ভলফসবুর্গ)

জুলিয়ান ভাইগল (বরুশিয়া ডর্টমুন্ড)

লেরয় সানে (শালকে ০৪)

আন্দ্রে শুরলা (ভলফসবুর্গ)

মারিও গোতসা (বায়ার্ন মিউনিখ)
mesut-ozil-germany-player-of-the-year-2015-1452786579-800

 

  • স্ট্রাইকার

লুকাস পোডোলস্কি (গ্যালাতাসারাই)

মারিও গোমেজ (বেসিকতাস)

টমাস মুলার (বায়ার্ন মিউনিখ)

 

  • উল্লেখযোগ্য যারা বাদ পড়লেন

কেল্ভিন ট্র্যাপ (গোলরক্ষক, প্যারিস সেইন্ট জার্মেই)

লোরিস ক্যারিয়াস (গোলরক্ষক, লিভারপুল)

আন্তোনিও রুডিগার (এএস রোমা)

ইলকায় গুন্ডোগান (মিডফিল্ডার, ম্যানচেস্টার সিটি)

মার্কো রয়েস (মিডফিল্ডার, বরুশিয়া ডর্টমুন্ড)

রন রবার্ট জিইলার (গোলরক্ষক, লেস্তার সিটি)

রোমান ভাইডেনফেলার (গোলরক্ষক, বরুশিয়া ডর্টমুন্ড)

সেবাস্তিয়ান রুডি (ডিফেন্ডার, ১৮৯৯ হফেনহাইম)

ম্যাথিয়াস জিন্টার (ডিফেন্ডার, বরুশিয়া ডর্টমুন্ড)

ক্রিস্টোফার ক্রেইমার (মিডফিল্ডার, বেয়ার লেভারক্যুজেন)

জুলিয়ান ব্র্যান্ট (মিডফিল্ডার, বেয়ার লেভারক্যুজেন)

সিডনি স্যাম (মিডফিল্ডার, শালকে ০৪)

প্যাট্রিক হারম্যান (মিডফিল্ডার, বরুশিয়া মনশেনগ্ল্যাডবাখ)

করিম বেলারাবি (মিডফিল্ডার, বেয়ার লেভারক্যুজেন)

কেভিন ভল্যান্ড (স্ট্রাইকার, বেয়ার লেভারক্যুজেন)

ম্যাক্স ক্রুজ (স্ট্রাইকার, ভলফসবুর্গ)

কেভিন গ্রসক্রেউতজ (মিডফিল্ডার, ভিএফবি স্টুটগার্ট)

পার মার্টেস্যাকার (ডিফেন্ডার, আর্সেনাল)

এরিক ডার্ম (ডিফেন্ডার, বরুশিয়া ডর্টমুন্ড)

ইনজুরির কারণে আবার বাদ পড়েছেন মার্কো রয়েস
ইনজুরির কারণে আবার বাদ পড়েছেন মার্কো রয়েস

জাতীয় দল থেকে ফিলিপ লাম, পার মার্টেস্যাকার, মিরোস্লাভ ক্লোসার মত তারকাদের অবসর নেওয়ার ফলে গত বিশ্বকাপের থেকে এইবারের জার্মানির মূল একাদশে বেশ ভালো কিছু পরিবর্তন আসবে। জার্মানির ফুলব্যাক পজিশানে এমনিতেই আগে থেকেই সবসময় সমস্যা থাকে কিছু, তাঁর উপর ফিলিপ লামের মত একজন দুর্দান্ত নেতার না থাকা জার্মানি দলটাকে ভোগাবে বেশ। তাঁর এবং মার্টেস্যাকারের অবসরের কারণে এবারে মোটামুটি একটা নতুন জার্মান ডিফেন্স দেখা যাবে। যদিও কোচ জোয়াকিম লো এখনো ঠিক করে উঠতে পারেননি দলকে কোন ফর্মেশানে খেলাবেন, ৪-৩-৩, ৪-২-৩-১, ৩-৫-২, ৩-৪-৩ প্রত্যেকটা ফর্মেশানেই বিশ্বকাপের পর বিভিন্ন ম্যাচে তিনি খেলিয়েছেন জার্মানদের। সেন্ট্রাল ডিফেন্সে ঘুরেফিরে খেলে গেছেন ম্যাটস হামেলস, জেরোম বোয়াটেং, শকোদ্রান মুস্তাফি, বেনেডিক্ট হুভেডেস, জোনাথান তাহ, জোশুয়া কিমিচরা। ৪ জন ডিফেন্সে খেললে লেফটব্যাকে কোলনের নির্ভরযোগ্য জোনাস হেক্টরের খেলাটা নিশ্চিত। জোনাস হেক্টরকে আনকোরা ফুটবল ভক্তরা অনেকে না চিনলেও এফসি কোলনের হয়ে এবার মাঠ কাঁপিয়ে লিভারপুলের মত দলের নজরে চলে এসেছেন ২৭ বছর বয়সী এই লেফটব্যাক। ফিলিপ লাম চলে যাওয়াতে সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়েছে রাইটব্যাক পজিশানটায়। ঘুরেফিরে আন্তোনিও রুডিগার, এমরে চ্যান, সেবাস্তিয়েন রুডি, শকোদ্রান মুস্তাফি, ম্যাথিয়াস জিন্টার এদেরকে খেলিয়েছেন রাইটব্যাক হিসেবে জোয়াকিম লো, যদিও ক্লাবে এদের কেউই রাইটব্যাক হিসেবে খেলেন না, প্রত্যেকেই হয় সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার, নয় প্রথাগত সেন্টারব্যাক। গত বিশ্বকাপে আলজেরিয়া ম্যাচে রাইটব্যাক পজিশানে শকোদ্রান মুস্তাফির বারবার খাবি খাওয়া মূলত জার্মানির এই পজিশানে ফিলিপ লাম চলে যাওয়ার পর সৃষ্ট দৈন্যতাই প্রকাশ করে। মূল স্কোয়াডে জিন্টার, রুডি ডাক না পাওয়ায় রাইটব্যাক হিসেবে খেলতে পারেন লিভারপুলের সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার এমরে চ্যান। সেন্টারব্যাক হিসেবে খেলার সম্ভাবনা সবচাইতে বেশী বায়ার্নের দুই ডিফেন্ডার ম্যাটস হামেলস ও জেরোম বোয়াটেংয়ের। মাত্রই বরুশিয়া ডর্টমুন্ড থেকে শত্রুশিবির বায়ার্নে নাম লেখানো ম্যাটস হামেলস হয়তো এই টুর্নামেন্টের মধ্যেই ভবিষ্যৎ সেন্টারব্যাক-সঙ্গীর সাথে খেলে নিজেকে অভ্যস্থ করে নেবেন। যদিও তাঁদের জায়গা পাওয়ার জন্য যথেষ্ট লড়াই করতে হবে ভ্যালেন্সিয়ার শকোদ্রান মুস্তাফি, বেয়ার লেভারক্যুজেনের জোনাথান তাহ, বায়ার্নের জোশুয়া কিমিচদের সাথে। ইনজুরির কারণে দল থেকে শেষমুহূর্তে বাদ পড়েছেন এএস রোমার হয়ে দুর্দান্ত মৌসুম কাটানো সেন্টারব্যাক আন্তোনিও রুডিগার।

এদিকে ইনজুরির কারণে ম্যানচেস্টার সিটির মিডফিল্ডার ইলকায় গুন্ডোগানের না থাকার কারণে দুইজন সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার হিসেবে খেলতে পারেন রিয়াল মাদ্রিদের টোনি ক্রুস, সাথে খেলবেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বাস্তিয়ান শোয়াইনস্টাইগার কিংবা জুভেন্টাসের স্যামি খেদিরার যেকোন একজন। ব্যাকআপ হিসেবে আছেন এই মৌসুমে বরুশিয়া ডর্টমুন্ডের হয়ে দুর্দান্ত খেলে লাইমলাইটে উঠে আসা তরুণ সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার জুলিয়ান ভাইগলও। সামনের তিনজন অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার হিসেবে খেলার সম্ভাবনা সবচাইতে বেশী দুই বায়ার্ন সতীর্থ মারিও গোতসা ও টমাস মুলার, এবং আর্সেনালের মেসুত ওয়েজিলের। কিংবদন্তী স্ট্রাইকার মিরোস্লাভ ক্লোসা না থাকার কারণে আউট-অ্যান্ড-আউট সেন্টার ফরোয়ার্ড নেই এই জার্মান দলে সেরকম, যে একজন আছেন সেই মারিও গোমেজও ধারাবাহিক নন, আবার তুর্কি ক্লাব বেসিকতাসে নাম লেখানোর ফলে একটু দূরেও চলে গেছেন তিনি। ফলে স্ট্রাইকে মারিও গোমেজ, মারিও গোতসা, টমাস মুলার কিংবা অ্যান্দ্রে শুরলার যেকোন একজন খেলবেন। টমাস মুলারের জাতীয় দলের হয়ে গোল করার হার, তাঁর দুর্দান্ত টিম-প্লে এবং অফ-দ্য-বল মুভমেন্টের কথা মাথায় রাখলে তাঁকেই স্ট্রাইকিং পজিশানে দেখতে পাবার সম্ভাবনা সবচাইতে বেশী। অ্যাটাকিং মিডফিল্ডে জায়গা পাওয়ার জন্য আরও লড়াই হবে শালকে ০৪ এর তরুণ উইঙ্গার লেরয় সানে ও ভলফসবুর্গের জুলিয়ান ড্র্যাক্সলারের মধ্যে। ইউরো শুরুর মাত্র কিছুদিন আগে ইনজুরির কারণে শেষমুহূর্তে বাদ পড়েছেন মার্কো রয়েস। ফলে গত বিশ্বকাপের মত এই ইউরোতেও জার্মানি দলের সঙ্গী হতে পারছেন না দুর্ভাগা রয়েস। লেফট উইংয়ে তাঁর অনুপস্থিতি জার্মানিকে ভালোই ভোগানোর ক্ষমতা রাখে।

1453623_Torquay_United

দলে নেওয়া হয়নি কেভিন গ্রসক্রেউতজ, রোমান ভাইডেনফেলার, ক্রিস্টোফার ক্রেইমার কিংবা কেভন ভল্যান্ডের মত তারকাদেরও।

লাম-মার্টেস্যাকার-ক্লোসা পরবর্তী যুগে জার্মানি কি পারবে পূর্বসূরিদের দেখানো পথ অনুসরণ করে জার্মানিকে চতুর্থ ইউরো জয়ের আনন্দে ভাসাতে? জানার জন্য অপেক্ষা করতে হবে আর দুই-একদিন!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

two × five =