ইংল্যান্ড : ইতিহাস গড়বে, না ইতিহাসের গর্ভে!

ইংল্যান্ড : ইতিহাস গড়বে, না ইতিহাসের গর্ভে!
ছোটবেলায়, মানে সিক্স সেভেন এ পড়াকালীন সময়ে ইন্টারনেট এত সহজলভ্য ছিলো না। ডিশ হাতের নাগালে থাকলেও শুধু ফুটবল দেখবো, এইরকম কর্তৃত্বও বাসায় ছিলো না। ভরসা ছিলো প্রথম আলোর খেলার পাতা আর রবিবারের স্টেডিয়াম এর চার পাতা। তাতে বেশির ভাগ সময়েই দেখতাম, বিদেশি লিগ গুলার মধ্যে শুধু ইংল্যান্ড এর ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের খবরই থাকতো ১২ আনা।
 
আর্সেনাল জিতেছে মানেই থিয়েরি অঁরির গোল, লিভারপুল মানে গোলস্কোরার মাইকেল ওয়েন বা স্টিভেন জেরার্ড, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড এর জয় মানেই স্কোরার অবধারিত ভাবেই রুড ভ্যান নিস্টলরয়। বুঝতাম, এইটাই সবচেয়ে জনপ্রিয় লিগ, নাইলে খেলার পাতায় এত নিয়মিত নিউজ আসত না।
 
বিশ্বকাপ আসলেই দেখতাম, ইংলিশ দলটাকে নিয়ে ব্যাপক হইচই… অন্তত ২০০৬ আর ২০১০ বিশ্বকাপের টিম নিয়ে ব্যাপক হাইপ ছিলো।
ডিফেন্সে রিও ফার্ডিনান্ড, জন টেরি, অ্যাশলি কোল…. মিডফিল্ডে জেরার্ড-ল্যাম্পার্ড-বেকহ্যাম, স্ট্রাইক এ ওয়েইন রুনি, মাইকেল ওয়েন… প্রিমিয়ার লিগে পারফরমেন্স বিচার করলে অনায়াসে এই টিমের সেমিফাইনাল পর্যন্ত যাওয়ার কথা।
ইংল্যান্ড : ইতিহাস গড়বে, না ইতিহাসের গর্ভে!
তারকাখচিত সেই ইংল্যান্ড দল
কিন্তু অতিরিক্ত হাইপ নিয়েও ২০০৬ এ কোয়ার্টার ফাইনালে পর্তুগাল এর কাছে টাইব্রেকারে হার, ২০১০ এ জার্মানির কাছে ৪-১ গোলে নাকানিচুবানি খাওয়া ইংলিশ মিডিয়ার উৎসাহে জল ঢেলে দেয়। তাই ২০১৪ তে বেশ নীরব ছিল তারা। তাতেও তাদের ভরাডুবি হয়… গ্রুপে কোস্টারিকা, উরুগুয়ে, ইতালির পেছনে থেকে চতুর্থ হয়ে বাড়ি ফেরে তারা।
 
তবে ২০১৮ এর বিশ্বকাপ বাছাই এর পারফরমেন্স এ ইংল্যান্ড আশাবাদী হতে পারে এবার। মিডিয়ার অতটা চাপ নেই, ফেভারিট এর তালিকায় নাম নাই, কোচ গ্যারেথ সাউথগেট এর উপরও কেউ প্রত্যাশার পাহাড় চাপিয়ে দেয়নাই, যেটা ছিল পূর্বসূরি গোরান এরিকসন (২০০৬), ফ্যাবিও ক্যাপেলো (২০১০) কিংবা রয় হজসন (২০১৪) এর উপর।
 
গ্যারেথ সাউথগেট তার টিমকে নিজের স্টাইলে ছকে বেঁধে খেলাচ্ছেন। ইংল্যান্ড ও এই স্টাইলে মানিয়ে নিয়েছে সেটা বাছাইপর্ব এর পারফরমেন্সে প্রমাণিত। যদিও স্লোভাকিয়া, স্লোভেনিয়া, স্কটল্যান্ড, লিথুয়ানিয়া, মাল্টা কে নিয়ে গড়া সহজ গ্রুপে ছিল তারা, তাও পুরো বাছাইপর্বতে ১০ ম্যাচে মাত্র ৩ গোল হজম করাই প্রমাণ করে তারা রক্ষণের দিক দিয়ে যথেষ্ট উন্নতি করেছে। পুরো ইউরোপিয়ান কোয়ালিফাইং এ তাদের চেয়ে কম গোল আর কেউ খায় নাই, স্পেনও ৩ গোল হজম করেছে।
 
কেমন হতে পারে রাশিয়াগামী ইংল্যান্ড দল?
 
গোলবারের নিচে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের শীর্ষস্থানীয় কোন ক্লাবের গোলরক্ষক নেই, কেননা তাদের মূল গোলরক্ষক ইংলিশ নন। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, ম্যানচেস্টার সিটি, লিভারপুল, আর্সেনাল, টটেনহ্যাম হটস্পার কোন ক্লাবেরই মূল গোলরক্ষক তো বটেই, দ্বিতীয় গোলরক্ষকও ইংলিশ নন।
 
তবে এভারটন এর জর্ডান পিকফোর্ড আছেন। মৌসুম এর প্রথম ভাগ দু:স্বপ্নের মত কাটলেও দ্বিতীয় ভাগে এসে নিজেকে খুঁজে পেয়েছেন। গত মৌসুমেও স্যান্ডারল্যান্ডের হয়ে তিনি খেলেছিলেন দুর্দান্ত। মৌসুমের প্রথমদিকে টটেনহ্যামের সাথে ৩-০, ম্যানচেস্টার সিটির সাথে ৪-০, আর্সেনাল এর কাছে ৫-২ ব্যবধানে উড়ে গিয়ে রেলিগেশন জোনে আছড়ে পড়া এভারটন গত ছয় ম্যাচের কোনটাতেই একটার বেশি গোল খায় নি, উপরন্তু ২ টা ক্লিন শিট পেয়েছে। এখন এভারটনের নয়ে থাকার পিছনে পিকফোর্ডের ভূমিকা যথেষ্ট।
 
এরপর গোলে ইংল্যান্ডের ভরসা হতে পারেন স্টোক সিটির জ্যাক বাটল্যান্ড। এখনকার ইংলিশ স্কোয়াডে বাটল্যান্ডই ২৫ ম্যাচ খেলে সবচেয়ে অভিজ্ঞ গোলকিপার এবং কোচের পছন্দও বটে। বড় ইঞ্জুরি তে না পড়লে রাশিয়াগামী প্লেনে ওঠাটা তার নিশ্চিতই।
 
এবারের প্রিমিয়ার লিগের সবচেয়ে বড় চমক বলা যায় বার্নলি কে। বড় সব নাম পেছনে ফেলে তাদের অবস্থান সাতে। কোচ শন ডাইচ এর “গোল দিতে পারি না পারি, গোল খাবো না” নীতি বাস্তবায়নে গোলবারে সারপ্রাইজ প্যাকেজ হয়ে এসেছেন গোলকিপার নিক পোপ। নিয়মিত গোলকিপার টম হিটনের পুরো মৌসুম ইনজুরির কারণে মাঠের বাইরে, তাই সেই সু্যোগ কাজে লাগিয়ে পোপ এমনই পারফর্ম করছেন, হিটন ফিরলেও প্রথম পছন্দ হবেন কি না সেটা এখন সংশয়ের ব্যাপার।
 
মনে করিয়ে দেই, বাছাইপর্ব এর শুরুর দিকে ইংল্যান্ড এর গোলবার সামলানো জো হার্ট এই মৌসুমে ম্যানচেস্টার সিটি থেকে ধারে খেলছেন ওয়েস্টহ্যামে। পারফরমেন্স এর অবস্থা এতই খারাপ যে ওয়েস্টহ্যাম একাদশেই আদ্রিয়ান এর কাছে জায়গা হারিয়েছেন। পিকফোর্ড, পোপ কিংবা বাটল্যান্ডের ইঞ্জুরিতেই তার কপাল খুলতে পারে, নচেৎ নয়।
 
আগেই বলেছি, ইংলিশ রক্ষণভাগের পারফরমেন্স ছিল এবার বাছাইপর্ব এর সেরা।
 
রাইট ব্যাকে ম্যানচেস্টার সিটির কাইল ওয়াকারের জায়গা পাকা, লেফট ব্যাকে ড্যানি রোজেরও তাই। উভয়েই আক্রমণাত্মক ফুলব্যাক, ক্লাবেও পরীক্ষিত পারফর্মার। দুজনের ক্লাব সিটি আর টটেনহ্যামেরও মুলকথা আক্রমণ। দুজনেই ওভারল্যাপিং করে বক্সে বিরতিহীন ক্রস করতে যেমন দক্ষ, তেমনি রক্ষণের সময়েও গতি দিয়ে ফলব্যাক করতে সিদ্ধহস্ত। ফুলব্যাক পজিশন দুটিতে ব্যাক আপ নিয়েও ইংল্যান্ড নিশ্চিন্ত থাকতে পারে, টটেনহ্যামের কিয়েরান ট্রিপ্পিয়ের আর সাউদাম্পটনের রায়ান বারট্রান্ড যথেষ্ট ভালো বিকল্প। ঠেকায় পড়লে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের অ্যাশলি ইয়াংও কাজ চালাতে পারবেন।
 
সেন্টারেও মানসম্মত ডিফেন্ডার এর অভাব নেই। জন স্টোনস, গ্যারি কাহিল, মাইকেল কিন, ফিল জোন্স, ক্রিস স্মলিং…. এরা তো আছেনই। সাম্প্রতিক প্রীতি ম্যাচগুলোতে ডাক পেয়েছেন এই সিজনে ভালো খেলা বার্নলির জেমস তারকোস্কি, সোয়ানসির আলফি মওসন, লিস্টারের হ্যারি ম্যাগুইরে।
 
এদের নিয়ে গড়া ডিফেন্স ভাঙতে যে কোন দলকেই গলদঘর্ম হতে হবে।
 
মিডফিল্ড-এও ইংল্যান্ড এর ফায়ারপাওয়ারের অভাব নেই। বিশেষ করে উইং এ। আছেন এই সিজনে লিগে ১৫ গোল করে দুর্ধর্ষ ফর্ম এ থাকা রাহিম স্টারলিং, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের জেসে লিনগার্ড এর গোল সংখ্যা ৮… আছেন ডেলে আল্লির মত ভার্সেটাইল এটাকিং মিডফিল্ডার, খেলতে পারেন ডানে, বামে, মাঝে সবখানেই। ক্লাব সতীর্থ হ্যারি কেইন এর সাথে তার বোঝাপড়াও চোখে পড়ার মত। অ্যালেক্স অক্সলেড চেম্বারলেন, এডাম লাল্লানা, ফ্যাবিয়ান ডেলফ, এশলি ইয়াং কে নিয়ে গড়া বেঞ্চের গভীরতাও যথেষ্ট।
ইংল্যান্ড : ইতিহাস গড়বে, না ইতিহাসের গর্ভে!
মিডফিল্ড এ ইংল্যান্ড সবচেয়ে বড় দুর্বলতা, তাদের মানসম্মত ডেস্ট্রয়ার হোল্ডিং মিডফিল্ডার নাই। এরিক ডায়ার, জর্ডান হেন্ডারসন কে জোর করে হোল্ডিং মিডে খেলানো হচ্ছে বটে, তবে শারীরিকভাবে তারা ফ্রান্স, জার্মানি, পর্তুগাল কিংবা স্পেনের ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারদের তুলনায় অনেক পেছনে। হাই প্রেসিং, উইং নির্ভর ইংলিশরা গতিশীল কাউন্টার এটাকে গোল খেয়ে বসতে পারে ভালো ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার এর অভাবে।
 
ইংলিশ স্ট্রাইকার দের নিয়ে তেমন কিছু বলার নেই। হ্যারি কেইন প্রমাণিত নাম্বার নাইন। দীর্ঘমেয়াদী ইঞ্জুরির পর কেইন কতটা কার্যকর থাকবে, সেটার ওপর নির্ভর করছে বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড কতদুর যাবে। জেমি ভারডির দুর্ভাগ্য সে কেইন এর পজিশনে খেলে। তবে সদ্য ইঞ্জুরি ফেরত কেইন এর চেয়ে ফর্মে থাকা ফিট ভারডি কেও কোচ বেছে নিতে পারেন। বদলি হিসেবে তরুণ তুর্কি মারকাস রাশফোর্ড, ড্যানি ওয়েলব্যাকও হতে পারেন তুরুপের তাস।
 
বাছাইপর্ব তে ইংল্যান্ড এর গোলস্কোরিং পারফরমেন্স অতটা ভালো ছিল না। ১০ ম্যাচে ১৮ গোল। ভালো দিক হল, কেবল হ্যারি কেনই ৫ গোল পেয়েছেন।
 
আর ঘুরে ফিরে গোল করেছেন সবাই। অ্যাডাম লাল্লানা, ড্যানিয়েল স্টারিজ ২ টি করে গোল করেছেন। গোল পেয়েছেন অ্যালেক্স অক্সলেড চেম্বারলেন, গ্যারি কাহিল, মার্কাস রাশফোর্ড, রায়ান বারট্রান্ড, এরিক ডায়ার, জেমি ভারডিও।
 
 
সবকিছু মিলিয়ে সময়ই বলে দেবে, তরুণ ইংলিশ সেনানী রা নতুন ইতিহাস গড়বে, না কি পূর্বসূরি দের মত বিলীন হয়ে যাবে ইতিহাসের গর্ভে…
মূল ঃ তানভীর হক তূর্য

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

11 + eight =