আসছেন ব্যাটি

অমর হয়ে থাকতে দারুণ কোনো কীর্তি গড়া জরুরী? ম্যালকম ন্যাশকে জিজ্ঞেস করুন। সাবেক এই বাঁহাতি স্পিনার বলবেন, কীর্তির ‘শিকার’ হলেও চলবে! প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে যতোই হাজারের কাছাকাছি উইকেট থাকুক, স্যার গ্যারির কাছে ওভারে ছয় ছক্কা হজম না করলে একজন ম্যালকম ন্যাশকে কজন মনে রাখতেন? কজন জানতেন তার নাম!

গ্যারেথ ব্যাটির ব্যাপারটিও খানিকটা একইরকম। ৭ টেস্টে ১১ উইকেট। এই পরিসংখ্যান যতটা বলছে, তার চেয়েও সাদামাটা ছিল তার বোলিং। বোলিংয়ে না পড়েছে স্কিলের প্রতিফলন, না ছিল ধার, না ছিল টার্ন। বাবুরাম সাপুড়ের সাপের চেয়েও নির্বিষ। তবু ব্যাটিকে মনে রেখেছি। রেখেছেন হয়ত আরও অনেকেই। নাহ, তার ওভারে কেউ ছয় ছক্কা মারেনি বা তেমন কিছু হয়নি। তবে একজনের দুটি মাইলফলক মুহূর্তটির শিকার হয়ে এই অফ স্পিনার “বেঁচে” আছেন ক্রিকেটে।

সম্ভবত টেস্ট ইতিহাসের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ‘সিঙ্গেল’ হয়েছিল ব্যাটির বলেই। ২০০৪ সালের ১২ এপ্রিল, অ্যান্টিগার রিক্রিয়েশন গ্রাউন্ডে ব্যাটিকে সুইপ করে একটি রান নিয়ে ৪০০ স্পর্শ করেছিলেন লারা। কমেন্টেটর (সম্ভবত বব উইলিস) বলেছিলেন, “পারহ্যাপস দা মোস্ট সিগনিফিকেন্ট সিঙ্গেল এভার ইন দা হিস্ট্রি অফ টেস্ট ম্যাচ ক্রিকেট।”

এই মাইলফলকের খানিক আগে, লারা নিজের রেকর্ড পুনরুদ্ধার করেছিলেন। ১০ বছর আগে যে রিক্রিয়েশন গ্রাউন্ডে ৩৭৫ রানের ইতিহাস গড়েছিলেন, সেখানেই ম্যাথু হেইডেনের ৩৮০ ছাড়িয়ে আবার নিজের করে নিয়েছিলেন রেকর্ড। সেই মুহূর্তটির জন্যও লারা বেছে নিয়েছিলেন ব্যাটিকেই। ৩৭৪ থেকে ব্যাটিকে মাথার ওপর দিয়ে গ্যালারিতে আছড়ে ছুঁয়েছিলেন হেইডেনকে, পরের বলেই সুইপ করে চার মেরে নতুন রেকর্ড !কমেন্ট্রিবক্সে ইয়ান বিশপ বললেন, “দা ওয়ার্ল্ড রেকর্ড হ্যাজ ফলেন ওয়ান্স অ্যাগেন টু ব্রায়ান চার্লস লারা…”।

যতবার ভিডিওতে এই দুটি মুহূর্ত দেখবেন, ততবার দেখবেন ব্যাটিকেও। যতবার পড়বেন, রেকর্ড গড়ার মুহূর্তটিতে আসবে ব্যাটির নাম। কার বলে হয়েছিল রেকর্ড? বারবারই বলবেন, শুনবেন ব্যাটির নাম। বলা যায়, ব্যাটির টেস্ট ক্যারিয়ারের একমাত্র ‘কীর্তি!’

সেই তিনি আসছেন বাংলাদেশ। আবার! ১৩ বছর আগে ব্যাটির টেস্ট অভিষেক চোখের সামনেই দেখেছিলাম। ভার্সিটিতে তখন ফার্স্ট ইয়ারে, ফ্রেন্ডদের সঙ্গে খেলা দেখতে গিয়েছি বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে। মনে আছে, ফোর্থ ডেতে দারুণ খেলছিলেন সুমন ভাই। হান্নান সরকারের সঙ্গে ভালো একটা জুটি। হুট করে ব্যাটির একটা নিরীহ বলেই সুমন ভাই ক্যাচ দিলেন স্লিপে, ট্রেসকোথিকের হাতে। আমাদের সে কী মন খারাপ!

সেবার বাংলাদেশ সফরে পরই ইংল্যান্ডের ছিল শ্রীলঙ্কা সফর। সেজন্যই ব্যাটিকে বাজিয়ে দেখা হয়েছিল। শ্রীলঙ্কায় ৩ টেস্ট খেলেও কিছু করতে পারেননি। পরে লারার হাতে ধোলাই হলেন। লারার ৪০০ রানের ১৩০ রানই (মাত্র ১৬১ বলে) ছিল ব্যাটির বলে! স্বাভাবিক ভাবেই জায়গা হারালেন দলে। ২০০৫ সালে বাংলাদেশ গেল ইংল্যান্ড সফরে। আবার ডাক পড়ল ব্যাটির। সিরিজের পর আবার বাদ।

সেটাই ছিল শেষ। এরপরও কাউন্টিতে পারফর্ম করে গেছেন। তবে টেস্ট দলে আসার মত নজরকাড়া কিছু করতে পারেননি কখনোই। বয়সও বেড়েছে। ব্যাটি ক্রমেই সরে গেছেন টেস্ট দল থেকে দূরে। তার ক্যারিয়ারের এপিটাফ লেখার কথাও হয়ত কেউ ভাবেননি। ব্যর্থ হয়ে হারিয়ে যাওয়াদের কথা কে ভাবে!

সেই ব্যাটি আবার টেস্ট দলে, আবার আসবেন বাংলাদেশে! এই কাউন্টি মৌসুমে পারফরম্যান্স খুব আহামরি নয়। নেওয়া হয়েছে মূলত আসছে ভারত সফরের স্পিন বিকল্পের ভাবনায়। সে জন্যই বাংলাদেশে মাত্র ২ টেস্টের জন্যই ইংল্যান্ডের ১৭ জনের স্কোয়াড, সেখানে চার-চারজন স্পিনার। তার মানে, ব্যাটির সামনে হাতছানি আরও বড় কিছুর। বাংলাদেশে টেস্ট খেলতে পারলে, ভালো করলে হয়ত টিকিট মিবে ভঅরত সফরের!

বাংলাদেশ সিরিজের প্রথম টেস্টের আগেই পা রাখবেন চল্লিসে। টেস্ট তো বহুদূর, কাউন্টিতে আর কতদিন খেলবেন, খারাপ করলেই সারের সঙ্গে কন্ট্র্যাক্টে টানাটানি পড়বে, হয়ত এসবই ভাবছিলেন। সেই তার অপেক্ষায় এখন টেস্ট রোমাঞ্চ!

বোঝাই যাচ্ছে, উপমহাদেশে স্রেফ এই দুটি সিরিজের জন্যই সাময়িক ভাবনা। তার পরও তো সুযোগ! হয়ত কিছুই করতে পারবেন না, হয়ত দারুণ কিছু করবেন। তবে সেসব পরে। এই যে ফিরে আসা, এই গল্পগুলোই দারুণ! লারার রেকর্ড গড়া মুহূর্তের বোলার হিসেবে নয়, শেষবেলায় ব্যাটির সুযোগ, নিজেই কোনো কীর্তি গড়ে স্মরণীয় হয়ে থাকার!

(শুরুতে ন্যাশের কথা বলছিলাম। পিটুনি হজম করে বি(কু)খ্যাত হওয়ার নেশা চেপে গিয়েছিল ন্যাশের। সোবার্সের কাছে ছয় ছক্কা হজমের পর আরও একবার এক ওভারে দিয়েছিলেন ৩৪ রান। এক ওভারে পাঁচ ছক্কা ও একটি চার মেরেছিলেন ফ্রাঙ্ক হেইস। একবার ৩৬ ও আরেকবার ৩৪ রান দেওয়ার (কু)কীর্তি প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে আর কারও নেই)।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

nine + twelve =