আলেসসান্দ্রো দেল পিয়েরো : এক জেন্টলম্যান

আলেসসান্দ্রো দেল পিয়েরো : এক জেন্টলম্যান

৩৫মিটার দূর থেকে ফ্রি কিক।সামনে ৪জন প্লেয়ার।গোল বারে গোল রক্ষক প্রস্তুত।কিন্তু সবাইকে হত ভম্ব করে দিয়ে গোল।গোল রক্ষকের তাকিয়ে থাকা ছাড়া কিছু করার নেই।না,আমি মেসি,রোনালদিনহো,বা বেকহামের মত প্লেয়ারদের কথা বলছিনা।আমি বলছি ফুটবেল বিশ্বের ফ্রি কিক স্পেশালিষ্ট এর কথা।
আমি বলছি এমন একজন কিংবদন্তির কথা,যিনি কিনা ফ্রিক কিক নেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিলেই দর্শক রা ধরে নিতো,এই বুঝি নিশ্চিত গোল। ফুটবল বিশ্বে অনেক কিংবদন্তি আছে,যারা একেক জন একেক ধরনের খেলার ষ্টাইলের জন্য বিখ্যাত।কিন্তু ফুটবল বিশ্বে ফ্রি কিক স্পেশালিষ্ট হিসেবে যাকে সবাই মনে রাখবে তিনি হলে আলেসান্দ্রো দেল পিয়েরো। ইতালীর ফুটবলের রাজপুত্র হিসেবে খ্যাত আলেসান্দ্রো দেল পিয়েরো। আলেসান্দ্রো দেল পিয়েরো সাবেক ইতালীয়ান জাতীয় দলের ফুটবলার।জুভেন্টাস এবং জাতীয় দলের আক্রমন ভাগের অন্যতম ভরসা হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন।তবে ফুটবল বিশ্বে ফ্রি কিক দক্ষতার কারনে আজীবন বেচে থাকবেন এই কিংবদন্তি। ১৯৭৪ সালে ৯নভেম্বর ইতালীর কনগ্লিয়ানোতে বৈদ্যুতিক মিস্ত্রি গিনো এবং তার স্ত্রী ব্রুনার ঘর আলো করে পৃথিবীতে আসেন ১ফুটফুটে পুত্র সন্তান।নাম রাখা হয় আলেসান্দ্রো দেল পিয়েরো।স্যান ভেন্ডেমিয়ানোর এক ছোট গ্রামে বেড়ে উঠছিলেন দেল পিয়েরো।
তার বড় ভাই স্টেফানো তখন মোটামুটি ভালো ফুটবলার ছিলেন।তাই ভাইয়ের খেলার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে ফুটবলার হওয়ার ইচ্ছে মনে পোষন করা শুরু করেন। বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন,ফুটবল মাঠে কোন প্লেয়ারের কাজটা কঠিন।বাবা ভাবনায় ছিলো গোল রক্ষক।তাই গোল রক্ষকের কথা বললেন বাবা।ছেলেও গোল রক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখা শুরু করলো।
বাড়ির পেছনের উঠনে দেল পেয়েরো তার অন্য দুই বন্ধুর সাথে নিয়মিত ফুটবল খেলতেন।৩জনেরই লক্ষ্য ছিলো ইতালী জাতীয় দলের হয়ে খেলা।
স্থানীয় যুব দলে প্রথম ফুটবল জীবন শুরু করেন আলেসান্দ্রো দেল পিয়েরো।যদিও তখন একজন গোল রক্ষক হিসেবেই এলাকায় সবার কাছে পরিচিতি লাভ করেন দেল পিয়েরো।কিন্তু বাড়িতে তার প্র্যাক্টিস এবং খেলার ধরন দেখে,তার বড় ভাই স্টেফানো তাকে আক্রমন ভাগে খেলার জন্য উপদেশ দিয়েছিলো।তখন যুব দলে গোল রক্ষকের পাশাপাশি আক্রমন ভাগেও মাঝে মাঝে খেলতেন দেল পিয়েরো।এর পরে অবশ্য আর কখনো গোল রক্ষকের দায়িত্ব পালন করেননি দেল পিয়েরো।নিজেকে আক্রমন ভাগের প্লেয়ার হিসেবে তৈরিতে ব্যাস্ত ছিলেন। ১৯৮৮সালে ১৩বছর বয়সে নিজের ফুটবল শৈলীর মাধ্যমে পোডোভার যুব দলে জায়গা করে নেন তিনি।
ক্লাব ক্যারিয়ারঃ
Calcio B লীগ ক্যারিয়ারঃ
১৯৯১-৯২ সালে ১৬বছর বয়সে পোডোভার মূল দলে জায়গা করে নেন দেল পিয়েরো।এর পরবর্তী বছর ১৭বছর বয়সে ইতালীয়ান B লীগে মেসিনার বিপক্ষে পোডোভার হয়ে অভিষেক ঘটে দেল পিয়েরোর।যেখানে তিনি রবার্তো পুতোলির পরিবর্তে মাঠে নামেন।১৯৯২ সালে নভেম্বরে আলেসান্দ্রো দেল পিয়েরো পেশাদার ফুটবলে টারানার বিপক্ষে তার প্রথম গোল করেন।যেখানে তার দল ৫-০ গোলে জয় লাভ করে।
Calcio A লীগ ক্যারিয়ারঃ
১৯৯৩ সালে পোডোভা থেকে ২.৮মিলিয়নের বিনিময়ে জুভেন্টাসের সাথে চুক্তিবদ্ধ হন দেল পিয়েরো।১৯৯৩-২০১২ সাল পর্যন্ত জুভেন্টাসের হয়ে ১৯মৌসুম খেলেন তিনি।জুভেন্টাসের সাথে চুক্তি বদ্ধ হওয়ার পর জুভেন্টাসের অনুর্ধ্ব ২০ দলকে ১৯৯৪ সালে torneo di viareggio এবং scudetto ট্রপি জিততে সাহায্য করেন।
১৯৯৪ সালের সেপ্টেম্বরে জুভেন্টাসের মূল টিমের হয়ে রেগিনার বিপক্ষে অভিষেক ঘটে আলেসান্দ্রো দেল পিয়েরোর।পরের ম্যাচেই পারমার বিপক্ষে হ্যাট্রিক করে ফুটবলে নিজ রাজত্বের আভাস দেওয়া শুরু করেন।প্রথম মৌসুমে যুব দল,লীগ এবং উয়েফা কাপে মোট ১৪ম্যাচে ৫গোল করেন।ঐ মৌসুমেই জুভেন্টাস কোপা ইতালীয়ার ফাইনালে প্রতিপক্ষ পারমাকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়।ঐ টুর্নামেন্ট এ দেল পিয়েরোর পারফর্ম ছিলো চোখে পড়ার মত।১৯৯৫-৯৬ মৌসুমে দেল পিয়েরো Calcio A তে ৬গোলের পাশাপাশি ১০এসিস্ট করার মাধ্যমে দলকে লীগে দ্বিতীয় হতে সাহায্য করেন।
১৯৯৫-৯৬ মৌসুমে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন লীগে জুভেন্টাস চ্যাম্পিয়ন হয়।দেল পিয়েরো ঐ চ্যাম্পিয়ন লীগ টুর্নামেন্ট এ ৬গোল করেন এবং দ্বিতীয় সর্বোচ্চ স্কোরার হওয়ার গৌরব অর্জন করেন।১৯৯৬ সালের ইন্টারন্যাশনাল কাপ এবং উয়েফা সুপার কাপের ফাইনালে গোল করে দলকে চ্যাম্পিয়ন হতে সাহায্য করেন।ঐ মৌসুমে ২১গোল করেন আলেসান্দ্রো দেল পিয়েরো।এর পরে কখনো পেছনে তাকাতে হয়নি আলেসান্দ্রোকে।জুভেন্টাসের হয়ে ২০১২সাল পর্যন্ত খেলেন দেল পিয়েরো।মাঝে একবার জুভেন্টাস মাদ্রিদকে দুই লেগেই হারায় ইউসিএলে। যেটা ছিল সম্পূর্নই ‘দেল পিয়েরো শো’। প্রথম লেগে আমাউরির বাড়ানো বলে ডি বক্সের বাইরে থেকে শট মেরে গোল করেন তিনি। আর বার্নাবুতে তিনি প্রথম গোল বক্সের বাইরে থেকে বা পায়ের শটে ও ২য় গোল করেন ডান পায়ের এক দর্শনীয় ফ্রি-কিকে। তার খেলায় মুগ্ধ হয়ে সেদিন মাদ্রিদ ফ্যানরাও স্টেডিয়ামে পিন্তুরিচ্চিওকে স্ট্যান্ডিং অভেশন দেয়। মাদ্রিদ লিজেন্ড ইকার ক্যাসিয়াস বলেন…………

“You can draw another Monalisa but you can not find another Del Piero.”

মোট ৭০৫ম্যাচে ৩৪৬গোল করে ইতালীর ফুটবলারদের মধ্যে ২য় সর্বোচ্চ স্কোরারের আসন নিজের দখলে নেন এই ফুটবল কিংবদন্তী।এবং জুভেন্টাসের অলটাইম টপ স্কোরারের আসন দখল করেন।ক্লাবের হয়ে দেল পিয়েরোর সিজন এবং গোল এর পরিসংখ্যান —
ক্লাব পাডোভা—
বছর ম্যাচ গোল
১৯৯১-৯২ ৪ ১
১৯৯২-৯৩ ১০ ১
ক্লাব-জুভেন্টাস
১৯৯৩-৯৪ ১৪ ৫
১৯৯৪-৯৫ ৫০ ১১
১৯৯৫-৯৬ ৪৩ ১৩
১৯৯৬-৯৭ ৩৫ ১৫
১৯৯৭-৯৮ ৪৭ ৩২
১৯৯৮-৯৯ ১৪ ৩
১৯৯৯-২০০০ ৪৫ ১২
২০০০-০১ ৩৩ ৯
২০০১-০২ ৪৬ ২১
২০০২-০৩ ৩৮ ২৩
২০০৩-০৪ ৩১ ১৪
২০০৪-০৫ ৪১ ১৭
২০০৫-০৬ ৪৫ ২০
২০০৬-০৭ ৩৭ ২৩
২০০৭-০৮ ৪১ ২৪
২০০৮-০৯ ৪৩ ২১
২০০৯-১০ ২৯ ১১
২০১০-১১ ৪৫ ১১
২০১১-১২ ২৮ ৫
ক্লাবের হয়ে দেল পিয়েরো লীগ এ ৭০৫ম্যাচ খেলেন।এছাড়া আরো কিছু ফ্রেন্ডলি ও চ্যারিটি ম্যাচ খেলেছিলেন তিনি।
২০০৬-০৭ সিজনে জুভেন্টাস রেলিগেশনে পড়ে Calcio B লীগে নেমে গেলেও ক্লাব ছাড়েন নি দেল পিয়েরো।অনেক ক্লাবের অফার ফিরিয়ে দিয়ে দলে থেকে যাওয়ার মাধ্যমে ক্লাবের প্রতি অন্য ভালোবাসার প্রমান দেন এই ফুটবল লিজেন্ড।২০০৬ এর বিশ্বকাপের পর আসে জুভেন্টাসের সবচেয়ে কালো অধ্যায়। ম্যাচ ফিক্সিং কেলেঙ্কারিতে দল চলে যায় সেরি বি তে। তখন ইব্রা, ক্যানাভারো, এমারসন, ভিয়েরা সহ আরও অনেক নামী দামী খেলোয়াড়েরা ক্লাব ছাড়েন। তবুও রয়ে যান কয়েকজন। তাদের মধ্যে দেল পিয়েরো অন্যতম। যখন তাকে জিজ্ঞেস করা হয় তার থাকার কারণ কি? তিনি জবাব দেন ……………
“A Gentleman never leaves his Old Lady.”

আন্তার্জাতিক ফুটবল ক্যারিয়ারঃ
আলেসান্দ্রো তাঁর আন্তর্জাতিক পর্যায়ের ফুটবল ক্যারিয়ার শুরু করেন ইতালীর অনুর্ধ্ব ২১এর হয়ে।১৯৯৫ সালে ইউরোপিয়ান অনুর্ধ্ব ২১ চ্যাম্পিয়নশিপ এর কোয়াটার ফাইনালে তার অভিষেক হয়।পরবর্তীতে অনুর্ধ্ব ২১ এর হয়ে ১২ম্যাচে ৩গোল করেন দেল পিয়েরো।
১৯৯৫ সালে তিনি ইতালীর মূল দলে জায়গা পান।১৯৯৬ এর ইউরোর কোয়ালিফাইং ম্যাচে এস্তোনিয়ার বিপক্ষে অভিষিক্ত হন।ঐ ইউরোর কোয়ালিফাইং ম্যাচে লিথুয়ানিয়ার বিপক্ষে প্রথম নিজের আন্তর্জাতিক গোল করেন দেল পিয়েরো।১৯৯৬ সালের ইউরো টুর্নামেন্ট এ রাশিয়ার বিপক্ষে প্রথম নিজের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় খেলতে নামেন এই কিংবদন্তি।ইতালীর হয়ে বিশ্বকাপে অংশগ্রহন করেন ১৯৯৮সালে।ঐ বছরই ইতালীর সেরা ফুটবলার হিসেবে নির্বাচিত হন।
২০০০সালে ইতালীর হয়ে ইউরো প্রতিযোগীতায় অংশগ্রহন করেন।ইতালী অবশ্য ঐ টুর্নামেন্ট এ রানার আপ হয়।
জাতীয় দলের হয়ে বিশ্বকাপ জেতার স্বপ্নটা সব ফুটবলারই নিজ মনে লালন করেন।আলেসান্দ্রো দেল পিয়েরোও এর বিপরীত ছিলেন না।আর বিশ্বকাপ নামের সোনার হরিনটা তার হাতে ধরা দেয় ২০০৬ সালে।২০০৬ বিশ্বকাপ জয়ের মাধ্যমে প্রায় সর্বজয়ীদের তালিকায় নাম লেখান আলেসান্দ্রো দেল পিয়েরো।
জাতীয় দলের হয়ে দেল পিয়েরো ইতালীর চতুর্থ সর্বোচ্চ গোলের মালিক।জাতীয় দলের হয়ে তিনি ৯১ম্যাচে ২৭গোল করেন।বিশ্বকাপে তিনি ১২ম্যাচে ২গোল করেন।
দেল পিয়েরোর ইতালী জাতীয় দল এর হয়ে ম্যাচ এবং গোল——
বছর ম্যাচ গোল
১৯৯৫ ৭ ১
১৯৯৬ ৪ ২
১৯৯৭ ৬ ৪
১৯৯৮ ৮ ৩
১৯৯৯ ২ ০
২০০০ ১৩ ৪
২০০১ ৬ ৩
২০০২ ১১ ৫
২০০৩ ৪ ২
২০০৪ ৬ ১
২০০৫ ৪ ০
২০০৬ ৯ ২
২০০৭ ৫ ০
২০০৮ ৬ ০
জাতীয় দলের হয়ে ৯১ ম্যাচে ২৭ গোল
ফুটবল কিংবদন্তি পেলে তার সেরা ১০০ফুটবল কিংবদন্তির তালিকায় আলেসান্দ্রো দেল পিয়েরোকে স্থান দিয়েছেন।
ব্রাজিলিয়ান আরেক ফুটবল কিংবদন্তি রোনালদিনহো, আলেসান্দ্রো দেল পিয়েরোকে নিজের আদর্শ হিসেবে মানেন।
আন্তর্জাতিক অর্জনঃ
১/২০০৬ বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন।
২/২০০২ ইউরোপীয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ এ রানার আপ।
ব্যাক্তিগত অর্জনঃ
১/ESM এর টিম অফ দ্যা ইয়ার ১৯৯৫-৯৬,১৯৯৬-৯৭,১৯৯৭-৯৮ এ জায়গা করে নেওয়া।
২/১৯৯৬ সালের ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপে মোস্ট ভ্যালুয়েবল প্লেয়ারের গৌরব অর্জন।
৩/ফিফা ১০০তে জায়গা করে নেওয়া।
৪/প্রিসকো ন্যাশনাল এওয়ার্ড -২০০৬।
৫/ইতালীর সেরা ক্রিড়াবিদ-২০০৬।
৬/জেন্টলম্যান সিলভার কাপ-২০০৬।
৭/গোল্ডেন ফুট এওয়ার্ড -২০০৬।
৮/TELEGATTO এর সেরা ক্রিড়াবিদ-২০০৭।
৯/সর্বকালের সেরা ১০০ক্রীড়াবিদ দের মধ্যে ৬০তম।
১০/২০১০ সালের স্পোর্টসম্যান অফ দ্যা গোল্ডেন এওয়ার্ড।
এছাড়া আরো অসংখ্য অর্জন নিজের অর্জনের ঝুড়িতে জমা করেছেন এই জীবন্ত কিংবদন্তি।
অবসরঃ
২০১৫সালের অক্টোবর এ প্রফেশনাল ফুটবল থেকে অবসর গ্রহন করেন আলেসান্দ্রো দেল পিয়েরো।।আপাতত নিজেকে প্রফেশনাল কোচ হিসেবে প্রস্তত করতে ব্যাস্ত সময় পার করছেন এই জীবন্ত কিংবদন্তি ফুটবলার। সেরা সবাই হতে পারে,কিন্তু সেরাদের সেরার কাতারে জায়গা করে নেওয়াটা সবচেয়ে বড় ব্যাপার।আলেসান্দ্রো দেল পিয়েরো ইতিহাসের সেরা ১০০ ফুটবলার এর মধ্যে জায়গা করে নিয়েছেন।বারবার প্রমান করেছেন নিজেকে।
আলেসান্দ্রো দেল পিয়েরো আজীবন বেচে থাকবেন ফুটবল প্রেমীদের মনে।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

17 + 8 =