হারিয়ে যাওয়া এক নক্ষত্র : আলেক্সান্দ্রে পাতো

হারিয়ে যাওয়া এক নক্ষত্র : আলেক্সান্দ্রে পাতো
আলেক্সান্দ্রে রদ্রিগেজ দ্যা সিলভা। নাম টা পরিচিত মনে হচ্ছে? নামটা খুব পরিচিতই। ব্রাজিলের নাগরিক অথবা ব্রাজিল ভক্তদের এক দীর্ঘশ্বাসের প্রতিশব্দ এই নামটি। বিশ্বজনীন ফুটবল ভক্তদের জন্যেও নামটা হতাশার বাণী শোনায়। আলেক্সান্দ্রে রদ্রিগেজ দ্যা সিলভা কে সবাই চেনে আলেক্সান্দ্রে পাতো নামে। ব্রাজিলের এক হারিয়ে যাওয়া নক্ষত্র।
 
১৯৮৯ সালের ২রা সেপ্টেম্বর জন্ম নেওয়া ৫ ফুট ১১ ইঞ্চি উচ্চতার এই স্ট্রাইকার কে ভাবা হতো রোনালদোর পর ব্রাজিলের ৯ নাম্বার জার্সি গায়ে চড়ানোর জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত খেলোয়াড়। অথচ সময়ের পরিক্রমায় আজ তার নামটিও উচ্চারিত হয়না কোথাও। মাত্র ২৮ বছর বয়সে লাইমলাইটের বাইরে চলে গেছেন। ইনজুরি তাকে নিয়ে গেছে বাইরে।
 
মাত্র ৬ বছর বয়সে ব্রাজিলের ক্লাব ইন্টারন্যাসিওনালের ইয়ুথ টিমে খেলা শুরু করেন পাতো। প্রতিভা আর গতির কারণে দ্রুতই মন জিতে নেন কোচদের। মাত্র ১৬ বছর বয়সেই ইন্টারন্যাসিওনালের মূল দলে খেলার জন্য ডাক পান তিনি। অভিষেক ম্যাচে পালমেইরাসের বিপক্ষে মাঠে নামার প্রথম মিনিটেই গোল দিয়ে শুরু হয় তার অবিস্মরণীয় যাত্রা। এবং ২০০৬ সালে ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপেও খেলেন পাতো। পেলের রেকর্ড ভেঙে দিয়ে সবচেয়ে কম বয়সে এই টুর্নামেন্ট খেলার রেকর্ড করে ফেলেন তিনি।
হারিয়ে যাওয়া এক নক্ষত্র : আলেক্সান্দ্রে পাতো
রোনালদোর উত্তরসূরি ভাবা হত পাতোকেই
 
২০০৭ সালেই সেই সময়ের ইতালিয়ান জায়ান্ট এসি মিলান কিনে নেয় তাকে। ২০০৭-০৮ মৌসুমে এসি মিলানের হয়ে ৯ গোল এবং পরের মৌসুমেই ১৮ গোল করে হয়ে যান সেই বছর এসি মিলানের সর্বোচ্চ গোলদাতা। ২০০৯ সালে জিতে নেন সিরি’আর সেরা উদীয়মান খেলোয়াড়ের পুরস্কার।
 
এই পর্যন্ত ছিল স্বপ্নযাত্রা। এরপরই শুরু হয় ইনজুরির সাথে যুদ্ধ। যে যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত পরাজিত নামটি আলেক্সান্দ্রে পাতো। ২০০৯-১০ মৌসুমেই পরপর দুইবার হ্যামস্ট্রিং ইনজুরিতে পড়ে মাত্র ২০ ম্যাচ খেলার সুযোগ পান তিনি। পরের মৌসুমে প্রথম দুই ম্যাচ খেলে আবারো পড়েন হ্যামস্ট্রিং ইনজুরি তে। ভক্ত এবং টিম ম্যানেজমেন্টের হতাশা বাড়তে বাড়তে ২০১৩ সালে তাকে এসি মিলান বিক্রি করে দেয় ব্রাজিলিয়ান ক্লাব করিন্থিয়ান্সের কাছে। সেই বছরেই এসি মিলানের প্রেসিডেন্ট সিলভিও বেরলুসকোনির মেয়ে বারবারা বেরলুসকোনির সঙ্গে আড়াই বছরে প্রেমের অবসান ঘটে পাতোর।
 
করিন্থিয়ান্সের হয়ে প্রথম ম্যাচে প্রথম টাচেই গোল দিয়ে বসেন পাতো। আবারো ব্রাজিলিয়ানদের আশার পালে হাওয়া লাগে। হয়তো ঘরের মাঠে তার ক্যারিয়ারের পুনর্জন্ম হতে পারে। কিন্তু তিনি আর কখনওই আগের ফর্মে ফিরতে পারেন নি। বারবার ইনজুরি বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এরপর সাও পাওলো তে ২ বছর লোনে খেলে ৩৮ গোল করেন ৯৫ ম্যাচে। ২০১৬ সালের জানুয়ারি তে চেলসিতে লোনে আসার সময়েও অনেকে আশা করেছিল এবার হয়তো ফিরবেন আসল পাতো। কিন্তু তিনি আর কখনওই আগের ফর্মে ফিরতে পারেন নি। বারবার ইনজুরি বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এরপর ভিয়ারিয়াল হয়ে অবশেষে চাইনিজ লীগের দল তিয়ানজিং কোয়ানজিয়াং এ যোগ দেন তিনি।
 
পাতো এক্ষেত্রে সাবেক ক্লাব এসি মিলানের উপরেও দায় চাপান কিছুটা। মিলানে জোর করে ২০ দিনের ট্রেনিং ৭ দিনে করানো হয় বলেও দাবি করেন তিনি, আর সেই কারণেই হয়তো এত টা ইনজুরি প্রবণ হয়ে গেছেন তিনি। এথলেটিক ট্রেইনার মাত্তেও বিসোফির ধারণাও পাতোর মতোই। পাতোর মাসল গ্রোথের কারণে তার হাঁটু এবং অস্থিসন্ধি গুলো তার ভার বহনে বারবার সমস্যায় পড়ছিল। তাই মাত্তেও মতামত ছিল পাতো কে রোনালদো দ্যা ফেনোমেনোনের মত করে যেন ট্রেনিং করানো হয়,কারণ রোনাদোরও হাঁটু আর অস্থিসন্ধি ভারসাম্য রক্ষায় সমস্যায় পড়তো। পাতোর ইনজুরির কাছে ভালনারেবল হয়ে যাওয়ার পেছনে মিলানের ট্রেনিং রীতিনীতির অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই।
হারিয়ে যাওয়া এক নক্ষত্র : আলেক্সান্দ্রে পাতো
 
ব্রাজিলের হয়ে ২০০৮ সালেই মাঠে নামেন এই স্ট্রাইকার। ২০০৯ সালে ফিফা কনফেডারেশন কাপজয়ী ব্রাজিল দলের সদস্যা ছিলেন। ২০১১ সালে কোপা আমেরিকাও খেলেছেন। ২০০৮ সালের অলিম্পিকে ব্রোন্জ মেডেল এবং ২০১২ সালের অলিম্পিকে সিলভার মেডেল পান এই তারকা। ফর্ম টা ধরে রাখতে পারলে তিনি ২০১৪ ব্রাজিল বিশ্বকাপেও থাকতে পারতেন মূল ভরসা হয়ে। ২০১০ বিশ্বকাপে গ্যালারি তে ব্রাজিলের পতাকা উড়িয়ে ২০১৪ বিশ্বকাপে আসার বার্তা দেওয়া পাতোর জায়গাই হয়নি ২০১৪ বিশ্বকাপের ব্রাজিল দলে। ফ্রেড এবং জো এর মতো এভারেজ স্ট্যান্ডার্ডের খেলোয়াড় নিয়ে ঘরের মাঠে খেলতে নামে ব্রাজিল। পাতো ফিট থাকলে সবার চেয়ে অনেক এগিয়ে থাকতে পারতেন। ২০১৮ বিশ্বকাপেও ইনফর্ম পাতোর মত একজন ফিনিশারের অভাব টের পায় ব্রাজিল। গ্যাব্রিয়েল জেসুসের মিস গুলো বারবার হাহাকার তুলে দেয় ব্রাজিল সমর্থক দের মনে – কেন একজন জাত ফিনিশার উঠে আসছে না। অথচ কোটি কোটি ব্রাজিলিয়ান কে স্বপ্ন দেখানো আলেক্সান্দ্রে পাতো তখন চাইনিজ লীগের ক্লাব তিয়ানজিং কোয়ানজিয়ানের ১০ নাম্বার জার্সি গায়ে দিয়ে নিজেকে হারিয়ে খুঁজে চলেছেন মাত্র ২৮ বছর বয়সে। প্রতিভার কি নিদারুণ অপচয়। এভাবে এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের পতন হলো ফুটবল ইতিহাসে।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

thirteen − 6 =