আর্সেন ওয়েঙ্গার এর সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি : আর্সেনাল ইনভিন্সিবলস

আর্সেন ওয়েঙ্গার এর সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি : আর্সেনাল ইনভিন্সিবলস
২২ বছর ধরে আর্সেনালের দায়িত্বে থাকার পর আর্সেনালের ম্যানেজারের পদ থেকে ইস্তফা দিতে যাচ্ছেন আর্সেন ওয়েঙ্গার, এই মৌসুম শেষে। আধুনিক ফুটবলের অন্যতম প্রধান এই কাণ্ডারি আর্সেনালের হয়ে অনেক কিছুই করেছেন, তবে খুব সম্ভবত ওয়েঙ্গার এর সবচেয়ে বড় কীর্তি হল ২০০৩-০৪ মৌসুমে লিগে পুরো মৌসুম অপরাজিত থেকে লিগ শিরোপা জয় করা। কিভাবে সম্ভব করেছিলেন সেটা ওয়েঙ্গার? আসুন দেখি!
২০০৩-০৪ মৌসুমে আর্সেনাল প্রিমিয়ার লিগ জেতার পাশাপাশি একটা অনন্য কীর্তি করে যেটা প্রিমিয়ার লিগে এখন পর্যন্ত যেকোন ইংলিশ দলের একমাত্র কীর্তি – পুরো মৌসুম অপরাজিত বা ইনভিন্সিবলস থাকা। তবে প্রিমিয়ার লিগের বাইরে সম্পূর্ণ ইংলিশ প্রথম বিভাগ ফুটবলের কথা যদি চিন্তা করা হয় তাহলে এই কীর্তি আরও একটা দলের আছে, সেটা হল প্রেস্টন নর্থ এন্ড, ১৮৮৮-১৮৮৯ মৌসুমে তারা গোটা মৌসুম অপরাজিত থেকে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। কিন্তু তখন লিগ হত ১২ দল নিয়ে, ম্যাচ খেলা লাগত ২২ টা। কিন্তু এখন প্রিমিয়ার লিগ হয় ২০ দল নিয়ে, প্রত্যেক দলকে খেলতে হয় ৩৮টা করে ম্যাচ। তাই আর্সেনালের রেকর্ডটা প্রেস্টন নর্থ এন্ডের থেকেও আরও বেশী মহিমান্বিত। ৩৮ ম্যাচের মধ্যে ২৮ ম্যাচ জয় আর বাকী দশ ম্যাচ ড্র করা আর্সেনাল গোটা মৌসুম খেলেছিল অসাধারণ ফুটবল। জেতার জন্য নেতিবাচক ফুটবলের শরণাপন্ন হয়নি তারা একবারও। আর্সেন ওয়েঙ্গার এর ট্যাকটিক্যাল মস্তিষ্কের সর্বোচ্চ উপযোগিতা ফুটবল বিশ্ব সেবারই দেখেছিল।
তবে এর মধ্যেও কথা আছে। ২০০১-০২ মৌসুমেও আর্সেনাল লিগ জিতেছিল, জিতেছিল এফএ কাপ। সেবারও গোটা মৌসুমে একরকম অপরাজিতই ছিল তারা। ঘরের বাইরের মাঠগুলোতে অপরাজিত থাকা আর্সেনাল ইতিহাসের প্রথম দল হয়েছিল সেই ২০০১-০২ মৌসুমে, যারা কিনা ঘরের বাইরের একটা মাঠেও হারেনি। কিন্তু ঘরের মাঠে একটা ম্যাচ হেরেছিল দেখে সেবার “ইনভিন্সিবলস” তকমা গায়ে লাগেনি তাঁদের। কিন্তু তাতে আর্সেনালের বিশেষ কোন ক্ষতিবৃদ্ধি হয়নি। মৌসুম শেষে ঠিকই লিগ আর এফএ কাপের ডাবল জয় করেছিল তারা। সেই মৌসুম শেষ হবার দুই মৌসুম পর তারা ঠিকই “ইনভিন্সিবলস” হয়। আর সেটা হয় ২০০৩-০৪ মৌসুমে।
দেখে নেওয়া যাক আর্সেনালের মূল দলটা কিরকম ছিল –
আর্সেনাল পুরো মৌসুমই মোটামুটি ৪-৪-২ ফর্মেশানেই খেলেছিল। দুইদিকে দুই ফুলব্যাক, মাঝে দুইজন সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার, দুই সেন্ট্রাল ডিফেন্ডারের সামনে দুইজন সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার, তাঁদের দুইপাশে দুই ওয়াইড মিডফিল্ডার আর সামনে দুই স্ট্রাইকার। দেখা যাক কার ভূমিকা এখানে কিরকম ছিল!
গোলরক্ষক : জেন্স লেম্যান (জার্মানি)
রাইটব্যাক : লরেন (ক্যামেরুন)
সেন্টারব্যাক : সল ক্যাম্পবেল (ইংল্যান্ড)
সেন্টারব্যাক : কোলো ত্যুরে (আইভোরি কোস্ট)
লেফটব্যাক : অ্যাশলি কোল (ইংল্যান্ড)
রাইট মিডফিল্ডার : ফ্রেডি লিউংবার্গ (সুইডেন)
সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার : জিলবার্টো সিলভা (ব্রাজিল)
সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার : প্যাট্রিক ভিয়েরা (ফ্রান্স)
লেফট মিডফিল্ডার : রবার্ট পিরেস (ফ্রান্স)
রাইট ফরোয়ার্ড : ডেনিস বার্গক্যাম্প (নেদারল্যান্ডস)
লেফট ফরোয়ার্ড : থিয়েরি অঁরি (ফ্রান্স)
মোটামুটি আর্সেনালের ইনভিন্সিবল মৌসুমে এরাই ছিলেন সদা উপস্থিত। তবে বিকল্প খেলোয়াড় হিসেবে কিংবদন্তী সেন্টারব্যাক মার্টিন কেওন, নাইজেরিয়ান স্ট্রাইকার নোয়ানকো কানু, ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড এডু, ইংলিশ উইঙ্গার রে পার্লার, স্প্যানিশ উইঙ্গার হোসে আন্তোনিও রেয়েস, ফরাসী স্ট্রাইকার সিলভান উইলটর্ড, ফরাসী লেফটব্যাক গ্যেল ক্লিশি এদের ভূমিকাও ছিল উল্লেখযোগ্য।
গোলরক্ষক থেকে শুরু করা যাক। জার্মান গোলরক্ষক জেন্স লেম্যান নিজ মহিমায় ভাস্বর সবসময়েই, একটু পাগলাটে ধরণের এই গোলরক্ষক সে সময়ে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গোলরক্ষক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, ছিলেন অলিভার কান পরবর্তী যুগে জার্মানির গোলবারের অন্যতম ভরসাও। ডিফেন্সের চারজন ছিলেন মূলত ক্যামেরুনিয়ান রাইটব্যাক লরেন, ইংলিশ সেন্টারব্যাক সল ক্যাম্পবেল, আইভোরিয়ান সেন্টারব্যাক কোলো ত্যুরে ও ইংলিশ লেফটব্যাক অ্যাশলি কোল। একটা চমকপ্রদ তথ্য দেওয়া যায় এখানে, শুধুমাত্র ক্যাম্পবেল ছাড়া কেউই এদের মধ্যে জাত ডিফেন্ডার ছিলেন না, আর্সেন ওয়েঙ্গার তাদেরকে ডিফেন্ডার বানিয়েছিলেন। লেফটব্যাক অ্যাশলি কোল আর্সেনালের অ্যাকাডেমির স্ট্রাইকার ছিলেন, কোলো ত্যুরে কে কেনা হয়েছিল ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবে, লরেন কে যখন রিয়াল মায়োর্কা থেকে কেনা হয় তিনিও তখন সেন্ট্রাল মিডফিল্ডারই ছিলেন। ফলে বল পায়ে তাঁদের ক্ষমতা প্রশ্নাতীত ছিল – সফল পাস দেওয়ার ক্ষমতা, ডিফেন্স থেকে আক্রমণ রচনা করার ক্ষমতা ইত্যাদি। শুধুমাত্র ট্যাকল ইন্টারসেপশানের মধ্যেই তাঁদের ক্ষমতা সীমাবদ্ধ ছিল না। এদের মধ্যে দুই ফুলব্যাক লরেন আর অ্যাশলি কোল ফুটবল পিচের বেশ উপরে অবস্থান করতেন, দুইপাশের অনেক উপরে থাকতেন। সল ক্যাম্পবেলের ভূমিকাটা ছিল একেবারে প্রথাগত সুইপারের মত, যত যাই হোক না কেন (শুধুমাত্র আর্সেনাল কর্নার পেলে হেড করার জন্য উপরে উঠে যাওয়া ছাড়া) লেম্যানকে ছেড়ে কখনই উপরে উঠে যেতেন না তিনি। তার সেন্টারব্যাক সঙ্গী কোলো ত্যুরেকে আবার আর্সেন ওয়েঙ্গার হালকা পাতলা উপরে উঠার লাইসেন্সটা দিয়েছিলেন। ক্যারিয়ারের শুরুতে ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার ছিলেন বলেই কিনা, মাঝে মাঝেই সল ক্যাম্পবেলের পাশ থেকে উঠে গিয়ে ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারের জায়গায় চলে যেতেন তিনি। তখনই উঠতেন যখন উপর থেকে প্যাট্রিক ভিয়েরা তাঁর সেন্ট্রাল মিডফিল্ডের জায়গা ছেড়ে আরও উপরে উঠে যেতেন আক্রমণে যোগ দেওয়ার জন্য।
আর্সেন ওয়েঙ্গার এর সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি : আর্সেনাল ইনভিন্সিবলস
এবার আসা যাক মিডফিল্ডে। দুই সেন্ট্রাল মিডফিল্ডারের মধ্যে ব্রাজিলিয়ান সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার জিলবার্তো সিলভার ভূমিকা ছিল দুই সেন্টারব্যাক ত্যুরে আর ক্যাম্পবেলের মধ্যে থেকে আক্রমণ রচনা করা। তার সেন্ট্রাল মিডফিল্ড সঙ্গী প্যাট্রিক ভিয়েরা আবার তার থেকে বেশী সাহসী ছিলেন আক্রমণের ক্ষেত্রে, মাঝে মাঝেই উপরে উঠে যেতেন আক্রমণে অংশ নেওয়ার জন্য, তাঁকে সেই লাইসেন্সটা দিয়েছিলেন ওয়েঙ্গার – এখন ইয়ায়া ত্যুরে যেভাবে খেলেন আরকি। তাই তাঁকে কোনোভাবেই আদর্শ ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার বা ডেস্ট্রয়্যার বলা যাবেনা, বরং ভিয়েরার ভূমিকাটা ছিল অনেকটা বক্স-টু-বক্স মিডফিল্ডারের। আজকের ইয়ায়া ত্যুরে এই প্যাট্রিক ভিয়েরাকেই আদর্শ মানতেন। দুইপাশে দুই ওয়াইড মিডফিল্ডার হিসেবে ছিলেন ডানদিকে ফ্রেডি লিউংবার্গ আর বামদিকে রবার্ট পিরেস। তখন ওয়াইড মিডফিল্ডার বা উইঙ্গারকে সেরকম মাঝে আসার লাইসেন্স দেওয়া হত না, বিশেষত ৪-৪-২ ফর্মেশানে। কিন্তু এখানেই ওয়েঙ্গার তার দুই ওয়াইড মিডফিল্ডারকে সেই অনুমতিটা দিয়েছিলেন, মাঝে আসার। পিরেস আর লিউংবার্গ যখনই মাঝে চলে আসতেন সেই জায়গাটা কভার দেওয়ার জন্য বামদিকে অ্যাশলি কোল আর ডানদিকে লরেন উঠে যেতেন, নাহয় বামদিকে থিয়েরি অঁরি চলে যেতেন।
এবার আসা যাক দুই স্ট্রাইকারের ব্যাপারে। দুই স্ট্রাইকারের মধ্যে নেদারল্যান্ডের ডেনিস বার্গক্যাম্প প্রায়ই নিচে নেমে আসতেন খেলা বানিয়ে দেওয়ার জন্য, প্লেমেকার হয়ে যেতেন, জিলবার্তো সিলভার সাথে আক্রমণ রচনা করতেন প্রায়ই। অঁরির আবার অতটা নিচে নেমে যাওয়ার স্বভাব ছিলনা। তবে তার বামদিকে উইঙ্গার হয়ে যাওয়ার স্বভাব ছিল, আর এভাবে অঁরি যখন বামদিকে চলে আসতেন তখন বামদিক থেকে পিরেস ডিবক্সে চলে আসতেন। ফলে দেখা যেত আর্সেনালের ৪-৪-২ ফর্মেশান প্রায়ই ৪-২-৩-১ হয়ে যাচ্ছে যেখানে উপরে স্ট্রাইকার হিসেবে থাকা থিয়েরি অঁরির অবস্থানটা থাকত একটু বামদিকে। আর ক্যারিয়ারের শুরুতে লেফট উইঙ্গার ছিলেন বলেই কি না, বামদিকে চলে আসতে অঁরির কোন সমস্যাই হত না!
বল যখন প্রতিপক্ষের পায়ে থাকত, তখন অত বেশী প্রেসিং করত না আর্সেনাল, যদিও উপর থেকেই প্রত্যেকটা খেলোয়াড়ই হালকাপাতলা প্রেস করত, কিন্তু অবশ্যই, এখনকার খেলোয়াড়দের মত অত বেশী না। বল প্রতিপক্ষের পায়ে থাকলে অঁরি উপরে বামদিকে চলে যেতেন, একটা সেন্টারব্যাক আর প্রতিপক্ষ রাইটব্যাককে ব্যস্ত রাখতেন, আর নিচে নেমে যেতেন বার্গক্যাম্প। চারজন ডিফেন্ডারের সামনে চারজন মিডফিল্ডার থাকতেন, বিশেষত দুইজন সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার তখন সবকিছু ভুলে নিজেদের কাছে বল পজেশান না আসা পর্যন্ত চারজন ডিফেন্ডারের ঢাল হিসেবে কাজ করতেন। ফলে দেখা যেত প্রতিপক্ষ সেই জমাটবাঁধা মাঝখানটা ভেদ করে আক্রমণ করতে পারত না, লং বল খেলতে চাইত, ফলে শেষ পর্যন্ত আর্সেনালের পায়েই বল চলে যেত। বেশী প্রেস না করে বরং আর্সেনালের টার্গেট থাকত বল ফিরে পাওয়ার সাথে সাথে দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাকে যাওয়ার। আর এই কাউন্টার করার জন্য আর্সেনালের ব্রহ্মাস্ত্র ছিলেন অঁরি আর বার্গক্যাম্প। তাই তারা বেশি নামতেন না, বিশেষত অঁরি তো নামতেনই না। ডিফেন্স থেকে মিডফিল্ডের যোগাযোগ হিসেবে কাজ করতেন জিলবার্তো সিলভা, আর প্যাট্রিক ভিয়েরার কাজ ছিল ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারের কাজের পাশাপাশি সেন্ট্রাল মিডফিল্ড থেকে উপরে উঠে আক্রমণে নেওয়া।
আর্সেন ওয়েঙ্গার এর সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি : আর্সেনাল ইনভিন্সিবলস
আর্সেনাল আক্রমণে যখন যেত তখন বামদিকে দেখা যেত তিনজন খেলোয়াড় সবসময়েই থাকত – কোল, পিরেস আর অঁরি। আর ডানদিকে থাকতেন লরেন আর লিউংবার্গ। অঁরি, পিরেস আর কোলের সমন্বয়ে আর্সেনালের বামদিকটা বিশ্বের অন্যতম ত্রাস সৃষ্টিকারী উইং হিসেবে পরিচিত ছিল। আক্রমণে যাবার সময়ে আর্সেনালের একটা বৈশিষ্ট্য ছিল, শুধুমাত্র অঁরি কিংবা বার্গক্যাম্পই নন, পিরেস, লিউংবার্গ থেকে শুরু করে প্যাট্রিক ভিয়েরা কিংবা অ্যাশলি কোল পর্যন্ত সবাই ডিবক্স বরাবর দৌড় দিতেন। আবার মাঝে মাঝে দেখা যেত প্যাট্রিক ভিয়েরা কিংবা অ্যাশলি কোল কে উপরে উঠার সুযোগ করে দিয়ে বার্গক্যাম্প নিজে নিচে নেমে যেতেন। ফলে প্রতিপক্ষরা দ্বিধায় থাকতেন সবসময় যে কে ডিবক্সের দিকে দৌড়ে আসছেন আর কে আসছেন না। আবার প্রতিপক্ষকে দ্বিধায় ফেলার জন্য পিরেস আর লিউংবার্গ প্রায়ই উইং বদলাতেন, পিরেস চলে যেতেন ডান উইংয়ে, তার জায়গায় ডান উইংয়ে চলে আসতেন লিউংবার্গ।
মূলত আর্সেনালের অপরাজিত দলটার রেসিপি ছিল এটাই ; যার মূল খেলোয়াড় ছিলেন অবশ্যই ফরাসী কিংবদন্তী থিয়েরি অঁরি। আর গোটা স্কোয়াড আর্সেন ওয়েঙ্গার এর ট্যাকটিকস অনেক ভালোভাবে বুঝেছিল, সবাই সবার দায়িত্ব ভালোভাবে জানতেন। তাই মাঠের মধ্যে ওয়েঙ্গার এর ট্যাকটিক্সের প্রতিফলনও সফলভাবে ঘটত।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

13 + eight =