আর্সেনিও এরিকো : দুই দেশের চোখের মণি যিনি

আর্সেনিও এরিকো : দুই দেশের চোখের মণি যিনি
ইন্দিপেন্দিয়েন্তে তখন আর্জেন্টিনার ক্লাব ফুটবলে এক অপ্রতিরোধ্য শক্তি। লিগ জেতার পথে দুর্দমনীয় গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে তারা, আর লিগজয়ের এই মিশনের সর্বাগ্রে রয়েছেন এক প্যারাগুইয়ান স্ট্রাইকার, আর্সেনিও এরিকো। লিগে চল্লিশটা মত গোল করা হয়ে গিয়েছে তাঁর, শিরোপা হাতের মুঠোতেই বলা যায়। এই সময়ে বিখ্যাত সিগারেট কোম্পানি “সিগারিইও ৪৩” ঘোষণা দিলো লিগে যে খেলোয়াড় কাঁটায় কাঁটায় ৪৩টা গোল করতে পারবেন তাঁকে একটা বিরাট অর্থমূল্য দ্বারা পুরষ্কৃত করা হবে। তবে শর্ত হল ৪৩ এর বেশীও গোল করা যাবেনা, কমও করা যাবেনা। লিগজয় নিশ্চিত ভেবেই এবার আর্সেনিও এরিকো পুরষ্কারটা পাওয়ার জন্য নাটকীয়তা শুরু করলেন। লিগে তাঁর গোল তখন ৪৩টিই, তাই টাকাটা পাওয়ার জন্য ইচ্ছা করে গোলের সুযোগ নষ্ট করতে থাকলেন, কিংবা গোলমুখে গোল করার সুবর্ণ সুযোগ থাকলেও বল পাস করতে থাকলেন সতীর্থদের!
এহেন কার্যকলাপে ইন্দিপেন্দিয়েন্তে কিংবা আর্জেন্টিনা, কেউই কিন্তু এরিকোর প্রতি বিরক্ত হয়নি। হবেই বা কেন, নিজের ক্লাবের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম খেলোয়াড়ের উপর রাগ করলে চলে? এমনকি নিজেদের দলে খেলানোর জন্য ১৯৩৮ বিশ্বকাপের আগে আগে আর্জেন্টিনার ফুটবল ফেডারেশান আর্সেনিও এরিকো কে অনেক টাকাপয়সা এবং নাগরিকত্ব দিতে চাইলেও নিজ দেশ প্যারাগুয়েকে নিজের মন থেকে বের করতে পারেননি এরিকো, খেলেননি আর্জেন্টিনার হয়ে। তৎকালীন যুদ্ধবিধ্বস্ত প্যারাগুয়ের হয়ে অফিসিয়াল কোন ম্যাচই খেলা হয়নি তাঁর যদিও, কিন্তু তাতেও নিজের জন্মভূমির প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করে অন্য দেশের হয়ে খেলতে যাননি তিনি। তবে তাঁর এই সিদ্ধান্তে আর্জেন্টিনার মানুষ কেউ কিন্তু তাঁর উপর ক্ষিপ্ত হয়নি। আজ পর্যন্ত প্যারাগুয়ে ও আর্জেন্টিনা, দুই দেশের মানুষই এরিকোর আনুগত্যের প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করে।
একটু পেছনে যাওয়া যাক, ১৯৩২ সালে তেলসমৃদ্ধ অঞ্চল গ্র্যান চ্যাকো অধিকার করার জন্য যুদ্ধে লিপ্ত হল প্যারাগুয়ে ও বলিভিয়া, আরেকটূ ভালো করে বললে প্যারাগুয়ের তেল কোম্পানি রয়্যাল ডাচ শেল আর বলিভিয়ার তেল কোম্পানি স্ট্যান্ডার্ড অয়েল। যুদ্ধে প্যারাগুয়ের প্রত্যেক কিশোর, তরুণ, যুবাদের উপর দায়িত্ব বর্তালো দেশের হয়ে অস্ত্র ধরার জন্য। অনেক প্যারাগুইয়ান খেলোয়াড় এই সময়ে ফুটবল ছেড়ে যুদ্ধে যোগ দেন, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন অরেলিও গঞ্জালেস, প্যারাগুয়ের ইতিহাসের দ্বিতীয় সেরা খেলোয়াড় মানা হয় যাকে।
এর মধ্যে প্যারাগুইয়ান রেড ক্রস সিদ্ধান্ত নিল একটা ফুটবল দল গঠন করার, যেই দলের কাজ হবে প্যারাগুয়েসহ আশেপাশের বিভিন্ন দেশে প্রদর্শনী ম্যাচ খেলা, সেই ম্যাচগুলো থেকে প্রাপ্ত অর্থ বলিভিয়া ও প্যারাগুয়ে উভয় দেশকে দেওয়া হবে যুদ্ধকালীন সহায়তা হিসেবে। তখন আর্সেনিও এরিকোর বয়স মাত্র ১৭, নাসিওনালের হয়ে খেলে মাত্র নাম কামানো শুরু করেছেন। এরিকো নজরে পড়লেন রেড ক্রসের, রেড ক্রস সিদ্ধান্ত নিলো আর্সেনিও এরিকো কে দলে রাখার, ফলে তাঁকে আর সরাসরি যুদ্ধের ময়দানে অবতীর্ণ হতে হল না।
আর্সেনিও এরিকো : দুই দেশের চোখের মণি যিনি
প্যারাগুইয়ান রেড ক্রস ফুটবল টিম কাগজে কলমে বেশ শক্তিশালীই ছিল, উরুগুয়ে আর আর্জেন্টিনার নামীদামী সব দলের বিপক্ষে ২৫টা ম্যাচ খেলে তারা মাত্র ৭টি ম্যাচ হারে। এই দলের হয়ে খেলতে গিয়েই আর্সেনিও এরিকো নজরে পড়েন ইন্দিপেন্দিয়েন্তে, রিভারপ্লেট, বোকা জুনিয়র্স সহ আর্জেন্টিনার নামীদামী সব ক্লাবের। প্রথমে রিভার প্লেট আর্সেনিও এরিকো কে নিজেদের দলে আনতে চাইলেও পারেনি, যেই সুযোগটা নেয় ইন্দিপেন্দিয়েন্তে। এরিকোকে দলে নেওয়ার জন্য ইন্দিপেন্দিয়েন্তে এতটাই মরিয়া ছিল যে শত্রুশিবির বোকা জুনিয়র্সের ড্রেসিংরুমে গিয়ে এরিকোর সাথে চুক্তি সংক্রান্ত কথাবার্তা বলে আসে ইন্দিপেন্দিয়েন্তের একটি প্রতিনিধি দল। পরে ১২ হাজার পেসো’র বিনিময়ে ইন্দিপেন্দিয়েন্তেতে যোগ দেন এরিকো, সাইনিং ফি বাবদ ৫০০ পেসো এরিকো রেড ক্রসের ফান্ডে দান করে দেন, যা কিনা তাঁকে প্রথম থেকেই ইন্দিপেন্দিয়েন্তের ফ্যান ফেভারিট খেলোয়াড় হিসেবে পরিণত করে।
তের বছর ইন্দিপেন্দিয়েন্তেতে খেলে ৩২৫ ম্যাচে ২৯৫ গোল করা আর্সেনিও এরিকো এখনও আর্জেন্টাইন লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতা। দুর্দান্ত টেকনিকাল স্কিলের অধিকারী এরিকোর একটা বড় গুণ ছিল বিশাল বিশাল লাফ দিয়ে হেডে গোলা করা, যা তাঁকে “রেড জাম্পার” হিসেবে জনপ্রিয় করে তোলে ইন্দিপেন্দিয়েন্তের সমর্থকদের কাছ থেকে। এখনকার “স্করপিওন কিক” টাও কিন্তু এরিকোরই সৃষ্টি। ১৯৩৭ থেকে ১৯৩৯ টানা তিন মৌসুম চল্লিশোর্ধ্ব গোল করেছিলেন এরিকো, ইন্দিপেন্দিয়েন্তেকে জিতিয়েছেন তিনবার প্রিমেরা ডিভিশান। কিংবদন্তী রিয়াল মাদ্রিদ স্ট্রাইকার অ্যালফ্রেডো ডি স্টেফানো তাঁকে নিজের আইডল মানেন, এতেই বোঝা যায় এরিকোর অবস্থান কতটা উঁচুতে!
আজ এই মহান স্ট্রাইকারের জন্মদিন। শুভ জন্মদিন, আর্সেনিও এরিকো!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

seventeen − nine =