আর্সেনাল লিজেন্ড : নোয়ানকো কানু

::::: আহসানুল হক :::::

নাইজেরিয়ার ওয়েরি শহরে পথে ঘাটে ফুটবল খেলে পেশাদার ফুটবলার হবার স্বপ্ন দেখা এক কিশোরের অসাধারন স্বপ্নযাত্রার গল্প এটি। কানু নামের এক অস্বাভাবিক ঢ্যাঙ্গা পায়ের অধিকারী বালক, ক্যারিয়ার শুরু হয় নাইজেরিয় ক্লাব ফেডারেশন ওয়ার্ক্স এ।

১৯৯৩ এর অ-১৭ বিশ্বকাপে তার দুর্দান্ত পার্ফর্মেন্স অনেক বড় বড় ক্লাবের নজর কাড়তে সক্ষম হয়। তাকে সাইন করাতে সক্ষম হয় ডাচ জায়ান্ট আয়াক্স আমস্টারডাম। ১৯৯৩ সালেই ডাচ লীগে আয়াক্সের হয়ে অভিষেক। ফ্রন্টলাইন এর একাধিক পজিশনে স্বচ্ছন্দ এই স্ট্রাইকার ধীরে ধীরে সারা বিশ্বের কাছে নিজেকে পরিচিত করতে শুরু করেন। আয়াক্স এর হয়ে সব ধরনের প্রতিযোগিতায় ৭১ ম্যাচে ২৭ গোল করেন তিনি। যার মধ্যে অধিকাংশই ছিল বদলী হিসেবে। ১৯৯৫ সালের চ্যাম্পিয়ন্স লীগ ফাইনালে এসি মিলান কে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হবার ম্যাচেও মাঠে নেমেছিলেন বদলী হিসেবে। এর মাঝে কনিষ্ঠতম অধিনায়ক হিসেবে জাতীয় দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন ১৯৯৪ এর বিশ্বকাপে। জাতীয় দলের অধিনায়ক ছিলেন ২০১০ পর্যন্ত।

আয়াক্সের সাথে চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ের পর সতীর্থ ফিনিডি জর্জের সাথে
আয়াক্সের সাথে চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ের পর সতীর্থ ফিনিডি জর্জের সাথে

১৯৯৬ এর গ্রীষ্মে নাইজেরিয়াকে জেতান অলিম্পিক স্বর্ণপদক। সেমিফাইনালে পরাক্রমশালী ব্রাজিলকে হারানোর পথে অন্তিম সময়ে করেন জোড়া গোল, ২-৩ গোলে পিছিয়ে থাকা নাইজেরিয়া যেতে ৪-৩ গোলে। সেই বছরের আফ্রিকান ফুটবলার অফ দ্য ইয়ার ও নির্বাচিত হন কানু। একই বছর অায়াক্স থেকে ৪.৭ মিলিওন ডলার মূল্যের ট্রান্সফার ফি তে যোগ দেন ইতালীয় দল ইন্টার মিলান এ। কিন্তু সহসাই মাঠে নামা হয়নি তার.. ইন্টার এ একটি মেডিক্যাল রিপোর্ট এ ধরা পড়ে তার হৃদপিন্ডে গুরুতর সমস্যা। হুমকির মুখে পড়ে তার ক্যারিয়ার।

ইন্টারে থাকার সময় - সতীর্থ রোনালদোর সাথে
ইন্টারে থাকার সময় – সতীর্থ রোনালদোর সাথে

কিন্তু লড়াকু এই মানুষটি হাল ছাড়েন নি। সেই বছরেরই নভেম্বর এ তার হৃদপিন্ডের ভালভ প্রতিস্থাপন করা হয় অস্ত্রপচার এর মাধ্যমে। যার ফলশ্রুতিতে মাঠের বাইরে থাকতে হয় ১৯৯৭ এর এপ্রিল পর্যন্ত। পরবর্তিতে একাধিক সাক্ষাৎকারে কানু তার জীবনের এই সময়টাকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন। হতাশাজনক সময়টিতে ধর্মচর্চার মাধ্যমেই নিজের মানসিক দৃঢ়তা ধরে রাখতে সক্ষম হন কানু। এ সময়ের অভিজ্ঞতার ফলশ্রুতিতেই পরবর্তিতে কানু গড়ে তোলেন তার বিখ্যাত “কানু হার্ট ফাউন্ডেশন”.. যার মাধ্যমে আফ্রিকার প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর হৃদরোগ বা হৃদপিন্ডের সমস্যার সমাধানে কাজ করা হয়। কানু আফ্রিকা জুড়েই তার জনহিতকর কাজের জন্য পরিচিতমুখ।

article-0-00724E521000044C-996_634x559

১৯৯৯ এর জানুয়ারির শেষে ১২ ম্যাচ এবং এক গোল-এর ইন্টার ক্যারিয়ার এর সমাপ্তি ঘটিয়ে ৪.১৫ মিলিওন পাউন্ড ট্রান্সফার ফি’তে যোগ দেন আর্সেনাল-এ, নিকোলাস আনেলকার শূন্যস্থান পূরণে। গানার্সদের হয়ে অভিষেক হয় এফএ কাপে শেফিল্ড ইউনাইটেড এর বিপক্ষে, যেখানে মার্ক ওভারমাস এর জয়সূচক গোলে অ্যাসিস্ট করেন কানু। কিন্তু তিনি ভুলবশত ফেয়ার প্লে রুল আগ্রাহ্য করেছিলেন এবং ম্যাচশেষে আর্সেনাল ম্যানেজার দুঃখপ্রকাশের পাশাপাশি রিম্যাচ এর প্রস্তাব করেছিলেন। আর্সেনাল ওই ম্যাচটিও জিতে নেয় ২-১ গোলে।

শুরুর দিকে দলে মানিয়ে নিতে ঝামেলা হচ্ছিল, মাঠে “অসাড় হাবভাব” এর কারনে সমর্থকদের কাছেও খুব একটা উৎসাহ পাচ্ছিলেন না। কিন্তু পরিস্থিতির নিজের অনুকূলে নিতে বেশি সময় নেননি। দলে তার অবদান স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হওয়ার পাশাপাশি তার মুচকি হাসিটিও হাইবুরির দর্শকদের হৃদয়ে স্থান করে নিতে থাকে। টার্গেট ম্যান হিসেবে খেলতে পারতেন আবার একটু ডিপ রোলেও সমান স্বচ্ছন্দ ছিলেন। ডিফেন্ডারদের চোখের পলকে হতবুদ্ধি করা বা আঁটসাট জায়গা থেকেও বল সহজে বের করে আনার সহজাত ক্ষমতা ছিল।

বেশ কিছু অসাধারণ গোলও করছিলেন তিনি। মিডলসবোরো এর সাথে ৬-১ গোলে জয়ের পথে মোহনীয় হিল-ফ্লিক এ করা গোলটি অথবা নর্থ লন্ডন ডার্বি তে লুক ইয়ং কে ছিটকে ফেলে জোরাল শটে ইয়ান ওয়াকার কে পরাস্ত করা গোলটির কথা মনে পড়বে। তবে সব কিছুকে ছাপিয়ে যাবে চেলসির সাথে ১৯৯৯ এ স্ট্যামফোর্ড ব্রিজে তার অবিস্বরনীয় পার্ফমেন্স। ২-০ গোলে পিছিয়ে থাকা আর্সেনালকে বলতে গেলে একাই জিতিয়েছিলেন শেষ ১৭ মিনিটে প্রায় অতিমানবীয় এক হ্যাট্রিক করে। যেখানে তার তৃতীয় গোলটা ছিল প্রিমিয়ার লীগের সেরা গোলের তালিকায় থাকার যোগ্য…

মাঠের বাম প্রান্তে প্রতিপক্ষ থেকে বল ছিনিয়ে এনে আগুয়ান গোলকিপার কে কাটিয়ে প্রায় শুন্য ডিগ্রী কোন থেকে গোল করেন যখন আরো দুই জন ডিফেন্ডার ব্লক করবার মত জায়গায় ছিল!!!! তাদের মাথার ওপর দিয়ে হালকা বাঁকানো শটে টপ কর্নারে ফিনিশ!! ধারাভাষ্যকারের উত্তেজিত আর মুগ্ধ কণ্ঠ… “Kan-u believe it.”

আর্সেনাল এর জয় নিশ্চিত হবার পাশাপাশি ক্লাবের ইতিহাসেও নিজের স্থান করে নেন পাকাপাকি ভাবে। ওই একই বছর আবারও হন আফ্রিকান ফুটবলার অফ দ্য ইয়ার। আর্সেনাল এর হয়ে সেই মৌসুমে ৫০ ম্যাচে করেন ১৭ গোল। ২০০১ এর আগস্ট এ ফুলহ্যাম এর ৭ মিলিওন পাউন্ড এর বিড রিজেক্ট করে আর্সেনাল। তবে আর্সেনাল এ কানুর ভূমিকাটি হয়ে পড়ে মুলত বদলী স্ট্রাইকার এর। অঁরি যে ছিলেন!

20-Everton-1-1-Arsenal-07-01-2004

…এর পরেও আর্সেনাল এর হয়ে ২০০১-০২ সালে জেতেন (লীগ/এফএ কাপ) ডাবল, ২০০২-০৩ এ জেতেন এফএ কাপ আর তার আর্সেনাল ক্যারিয়ারের শেষ মৌসুমে জেতেন ইনভিন্সিবল। পাঁচ বছরের আর্সেনাল ক্যারিয়ারে ১৯৭ ম্যাচে (যার অর্ধেকই বদলী হিসেবে) করেন ৪৪ গোল। পরিসংখ্যানের সাধ্য নেই এই স্ট্রাইকারের মহিমা বোঝায়। ২০০৮ সালের একটি জরিপে আর্সেনাল সমর্থকদের ভোটে ক্লাবের ইতিহাসের ১৩ তম সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হয়েছেন  ২০০৪ সালে আর্সেনাল এর সাথে চুক্তি শেষ হলে ফ্রি ট্রান্সফার এ যোগ দেন ওয়েস্টব্রম এ। বয়সের ছাপ পড়তে শুরু করলেও যথেষ্ট কার্যকরই ছিলেন। নিজের সাবেক ক্লাব আর্সেনাল কে হারানোর পথে গোল করেন ওয়েস্টব্রমের হয়ে ২০০৫-০৬ এ। ২০০৬ সালে এমিরেটস স্টেডিয়াম এর উদ্বোধনী ম্যাচে অতিথি খেলোয়ার হিসেবে অংশ নেন, যা কিনা ছিল ডেনিস বার্গক্যাম্প এর বিদায়ী ম্যাচ।২০০৬-০৭ এ আবার ফ্রি এজেন্ট হিসেবে যোগ দেন পোর্টসমাউথ এ। সেখানেই শেষ হয় তার বর্নাঢ্য ফুটবল ক্যারিয়ার।

এক নজরে তার অর্জনসমূহ:

# Nigerian Premier League (1): 1992–93

# Ajax – Eredivisie (3): 1993–94 , 1994–95 ,1995–96UEFA Champions League (1): 1994–95UEFA Super Cup (1): 1995Intercontinental Cup (1): 1995

# Internazionale – UEFA Cup (1): 1997–98

# Arsenal – Premier League (2): 2001–02 , 2003–04FA Cup (2): 2001–02 , 2002–03FA Community Shield : 1999

# Portsmouth FA Cup(1) : 2007–08

# Nigeria: FIFA U-17 World Cup: 1993Olympic Gold Medal: 1996Afro-Asian Cup of Nations : 19952000 African Cup of Nations : Runners-up

# Individual: African Footballer of the Year: 1996, 1999BBC African Footballer of the Year: 1997,1999

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

6 − 3 =