আরেকবার জয় হবে জার্মান ফুটবলের?

আরেকবার জয় হবে জার্মান ফুটবলের?
::: তানভীর হক তূর্য :::
ফেরেঙ্ক পুসকাস, ইয়োহান ক্রুইফ, লিওনেল মেসি…. ফুটবল ইতিহাসে তিন প্রজন্মের তিন কালজয়ী ফুটবল প্রতিভার নাম।
 
গোলের পর গোল উপহার দেওয়া, মায়াবী সব মূহুর্তের কারিগর, ইতিহাসের বাঁক বদলে দেওয়া এই তিন খেলোয়াড়ের কারোরই পেলে আর ম্যারাডোনার মত ইতিহাস শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করা হয় নি।
 
বলা ভালো, সেটা অর্জন করতে দেওয়া হয় নি।
 
ইতিহাস শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের শেষ ধাপটি থেকে তিনজনকেই ছিটকে দিয়েছে স্রেফ একটি দল….
 
জার্মানি।
 
হুমমম… জার্মানি ই।
 
যাদের কে ২০০৬ সাল এর আগ পর্যন্ত বলা হত জার্মান মেশিন।
 
যে মেশিনের তলায় একে একে পিষ্ট হয়েছে ১৯৫৪ তে পুসকাসের ‘ম্যাজিকাল ম্যাগিয়ার্স ‘, ১৯৭৪ এ ক্রুইফের টোটাল ফুটবল উপহার দেওয়া ‘ ড্রিমটিম’, ২০১৪ তে মেসির জাদুর কাঠি তে সাধারণ থেকে অসাধারণ দলে পরিণত হওয়া আর্জেন্টিনা’র বিশ্বকাপ স্বপ্ন।
 
নিজ দেশে বসা ২০০৬ বিশ্বকাপ নিয়ে জার্মান দের মাতামাতি ছিল দেখার মত। পুরো দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল একটাই স্লোগান “ভিয়ার ফারেন নাখ বার্লিন” (আমরা বার্লিন যাচ্ছি)। সেবার যান্ত্রিক খেলার তকমা ঝেড়ে চোখ ধাঁধানো আক্রমণাত্মক খেলাও উপহার দিচ্ছিল জার্মান রা।
 
তবে ফাবিও গ্রোসো’র বাম পায়ের রঙধনু শট আর আলেসসান্দ্রো দেল পিয়েরোর ঠান্ডা মাথার ফিনিশিং সেমিফাইনালেই শেষ করে দেয় জার্মান দের স্বপ্ন।
পরে তাদের দু:খ বাড়িয়ে বার্লিন এর ফাইনালে বিশ্বকাপটাও জিতে নেয় ইতালি।
 
তবে সে ব্যর্থতাকে জেগে ওঠার ডাক হিসেবেই নেয় জার্মান রা।
আরেকবার জয় হবে জার্মান ফুটবলের?
কোচ ইউর্গেন ক্লিন্সম্যানের অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করার দায়িত্ব চাপানো হয় ২ বছর ধরে তার সুযোগ্য সহকারী হিসেবে কাজ করা জোয়াকিম লো কে
 
বুন্দেসলিগার প্রতিটি ক্লাবে যুব একাডেমি খোলা বাধ্যতামূলক করা হয়। পুরো দেশ ছেঁকে তুলে আনা তরুণ প্রতিভা দের নিয়ে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার সুফলই এখন ভোগ করছে জার্মানি।
 
এখনকার জার্মান দলে খেলা টনি ক্রুস, এমরে চান, সান্দ্রো ওয়াগনার, ম্যাটস হামেলস বায়ার্ন একাডেমি…. ম্যানুয়াল নয়্যার, মেসুত ওজিল, জুলিয়ান ড্রাক্সলার, লেরয় সানে, ইলকায় গুন্দোয়ান, ম্যাক্স মেয়ার শালকে একাডেমীর খেলোয়াড়।
 
বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে জার্মানির পারফরম্যান্স বরাবরই নজরকাড়া থাকে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। চেক প্রজাতন্ত্র, নরওয়ে, উত্তর আয়ারল্যান্ড, আজারবাইজান, সান ম্যারিনো নিয়ে গড়া সহজ গ্রুপে সবাইকে উড়িয়ে দিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে জার্মানি। এই যাত্রায় নিরঙ্কুশ প্রাধাণ্য বিস্তার করে জার্মানি জিতেছে ১০ ম্যাচের সবগুলোই… গোল করেছে ৪৩ টি, হজম করেছে মাত্র ৪ টি।
 
সহজ গ্রুপে পড়ায় কোচের সুযোগ ছিল দল নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করার এবং জোয়াকিম লো তা করেছেনও।
 
১০ ম্যাচে দলে ডেকেছেন মোট ৪১ জনকে, তার মধ্যে ৩৭ জনই কিছু কিছু সময়ের জন্য মাঠে ছিলেন।
 
গোলদাতার বৈচিত্র‍্যও প্রমাণ করে জার্মানি দল হিসেবে কতটা পরিণত ও তাদের টিম কেমিস্ট্রি কতটা দুর্দান্ত।
 
সর্বোচ্চ ৫ গোল টমাস মুলার ও সান্দ্রো ওয়াগনারের, ৩ টি করে গোল করেছেন জুলিয়ান ড্রাক্সলার, সার্জ ন্যাব্রি, টিমো ওয়ারনার, লিওন গোরেৎজকা।
 
মেসুত ওজিল, জুলিয়ান ব্র‍্যান্ডট, এমরে চান, অ্যান্দ্রে শুরলে রা তো গোল পেয়েছেনই, ২ টি করে গোল দিয়েছেন দুই ফুলব্যাক জশুয়া কিমিচ আর জোনাস হেক্টরও।
 
ও হ্যাঁ, ডর্টমুন্ড তারকা মারকো রয়েস কে ছাড়াই পুরো বাছাইপর্ব খেলেছে জার্মান রা।
 
জোয়াশিম লো র পছন্দের ফরমেশন হল ৪-২-৩-১… মাঝমাঠ দিয়ে পাসের পসরা সাজিয়ে প্রতিপক্ষের রক্ষণদূর্গ ভাঙা, উইং দিয়ে দ্রুতগতির কাউন্টার অ্যাটাক, সেটপিস কাজে লাগানোর দক্ষতা…. সম্ভাব্য সকল উপায়েই জার্মানরা গোল আদায় করতে জানে। গত বিশ্বকাপের ফাইনালের কথাই ধরা যাক। ১১৩ মিনিট সমান সমানে লড়ে যাওয়া ক্লান্ত আর্জেন্টাইন ডিফেন্স ভেঙে লেফট উইং থেকে উড়ে আসা আন্দ্রে শুরলের ক্রস কে প্রায় হাফ চান্স থেকে গোলে রুপান্তর করেছিলেন মারিও গোটজে।
 
 
গোলবারে ম্যানুয়াল নয়্যারের জায়গা পাকাই ছিলো। কিন্তু পায়ের চোটের জন্য গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকেই মাঠের বাইরে এই বায়ার্ন তারকা। অনুশীলনে ফিরলেও ম্যাচ ফিটনেস কতখানি সেটা জানতে হয়ত আর মাসখানিক লাগবে। এর মধ্যে বার্সেলোনার হয়ে দুর্দান্ত এক মৌসুম কাটানো মার্ক আন্দ্রে টার স্টেগেন জার্মানির গোলবারের নিচে থিতু হয়ে গেছেন। আছেন বায়ার লেভারকুসেনের বার্নড লেনোও। পিএসজি এর কেভিন ট্র‍্যাপ ও খেলেছেন সাম্প্রতিক কয়েকটি প্রীতি ম্যাচে।
 
মানুয়েল নয়্যার ফিট থাকলে রাশিয়াগামী বিমানের টিকিট মিলবে হয়ত নয়্যার, টার স্টেগেন আর লেনোরই। ২-৩ মৌসুম ধরে ধারাবাহিক পারফর্ম করা হফেনহেইমের অলিভার বাউমান আর শালকের রাল্ফ ফারম্যান কে আফসোস করতে হবে ভুল সময়ে জন্মাবার জন্য।
 
ডিফেন্স এর দুই ফুলব্যাক হিসেবে ডানে বায়ার্ন এর জশুয়া কিমিচ আর কোলোনের জোনাস হেক্টর এর জায়গা পাকা। চোট আঘাত না থাকলে তারাই মূল একাদশে খেলবেন। ডানে বিকল্প হিসেবে থাকবেন লেভারকুসেনের বেঞ্জামিন হেনরিকস, বামে হার্থা বার্লিন এর মারভিন প্ল্যাটেনহার্ট।
 
সেন্ট্রাল ডিফেন্স এ কাকে খেলাবেন সে নিয়ে কোচ লো পড়তে পারেন মধুর সমস্যায়।
 
ম্যাটস হামেলস, জেরোম বোয়াটেং, শকোদ্রান মুস্তাফি, আন্তোনিও রুডিগার, বেনেডিক্ট হুভেডেস, নিকোলাস সুলে, ম্যাথিয়াস জিন্টার….. মানসম্মত সেন্টারব্যাকের অভাব নেই জার্মান দলে।
 
তবে বায়ার্ন জুটি হামেলস- বোয়াটেং ই সম্ভবত কোচের প্রথম পছন্দ হবেন। নিজেদের গোল ঠেকানোর পাশাপাশি প্রতিপক্ষের গোলের রাস্তাটাও ভালোই চেনেন দুজনেই। ক্লাব দলের হয়ে তো বটেই জার্মানির হয়েও মাঝে মধ্যেই সেটপিস থেকে গোল দিতে দেখা যায় দুজনকেই।
 
সবদিক দিয়েই বেশ পারফেক্ট জার্মানির দুর্বলতা যদি কিছুটা থেকে থাকে সেটা ডিফেন্সিভ মিডফিল্ড এ শারীরিক ভাবে শক্তিশালী, প্রতিপক্ষের আক্রমণ তাদের অর্ধেই নষ্ট করতে পারেন এমন একজন খেলোয়াড় এর অভাব।
 
খুব সম্ভব টনি ক্রুস আর স্যামি খেদিরা খেলবেন ডিফেন্সিভ মিড এ। ক্রুস ডেস্ট্রয়ার নন, বরং পিরলোর মত ত্রেকার্তিস্তা রোলে খেলেন। রিয়াল মাদ্রিদে তার পেছনে কাসেমিরোর মত একজন আদর্শ ডেস্ট্রয়ার খেলেন বলেই ক্রুস নিশ্চিন্তে মাঝমাঠ থেকে খেলা তৈরী করতে পারেন, ডিফেন্স চেরা থ্রু দিতে পারেন।
 
সুযোগমত উপরে উঠে বক্সের আশপাশ থেকে শুট করতে পারেন। জার্মান জাতীয় দলে কাসেমিরোর রোল টা খুব সম্ভব সামি খেদিরা কেই পালন করতে হবে।
 
বায়ার্ন এর সেবাস্টিয়ান রুডির মাঝে ডেস্ট্রয়ার এর গুণ আছে, তার ইন্টারসেপশন পাওয়ারও যথেষ্ট ভালো, কিন্তু তারকাখচিত বায়ার্ন দলে তিনি নিয়মিত খেলার সুযোগই পান না। এমরে চানেরও ভালো সম্ভাবনা ছিল, কিন্তু ধারাবাহিকতার অভাবে দলে নিজের কার্যকারিতা প্রমাণ করতে পারেন নি।
 
অ্যাটাকিং মিডফিল্ড এ প্রথম পছন্দ আর্সেনাল তারকা মেসুত ওজিল। এই সিজনে আর্সেনাল এর হয়ে ৪ গোল করেছেন তিনি, সাথে অ্যাসিস্ট আছে ৮ টি। তবে ওজিল যে খেলাটা গড়ে দেন সেটার প্রমাণ, প্রিমিয়ার লিগে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ কি পাস তার (৭৬টি)। উপরে আছেন শুধু ম্যানচেস্টার সিটির কেভিন ডি ব্রুইনিয়া ( ৮৮টি)।
 
মেসুত ওজিলের পরবর্তী সময়ে জার্মান মিডফিল্ড এর দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত হচ্ছেন জুলিয়ান ড্রাক্সলার। ফিফা কনফেডারেশন কাপে বড় তারকাবিহীন জার্মানি দলের প্রাণভোমরা হয়ে ছিলেন এই পিএসজি মিডফিল্ডার। এক গোলের পাশাপাশি দুই এসিস্ট, সাথে জার্মান মিডফিল্ড এ তার দাপুটে পারফরমেন্স মিলিয়ে তিনি হন টুর্নামেন্ট এর সেরা খেলোয়াড়।
 
আরো আছে শালকে থেকে এই মৌসুম শেষে বায়ার্ন মিউনিখে যোগ দিতে যাওয়া লিওন গোরেৎজকা। কনফেডারেশন কাপে তিন গোল করেছিলেন তিনি, এই সিজনে শালকের হয়েও করেছেন ৪ গোল আর ৫ এসিস্ট।
 
রাইট উইং এ ইঞ্জুরিতে না পড়লে থমাস মুলারের খেলা নিশ্চিত। লিগে ৮ গোল করা মুলারের বিশ্বকাপ ফর্ম অসাধারণ। আগের দুই বিশ্বকাপে সমান ৫ টি করে ১০ গোল করা মুলারের লক্ষ্য হবে ৬ গোল করে স্বদেশী মিরোস্লাভ ক্লোসার ১৫ গোলের রেকর্ড ভেঙে দেওয়া।
 
লেফট উইং এ ম্যান সিটির হয়ে অসাধারণ মৌসুম কাটানো লেরয় সানের খেলার সম্ভাবনাই বেশি। এই সিজনে ৯ গোল, ১২ এসিস্ট করা সানে গতি, ড্রিবলিং, দূরপাল্লার নিখুঁত শট, সুযোগ সন্ধানী ফিনিশিং দিয়ে হতে পারেন যে কোন প্রতিপক্ষের মাথাব্যথার কারণ।
 
উইং এ বিকল্প হিসেবে লো এর হাতে থাকছেন লেভারকুসেন এর দুইজন জুলিয়ান ব্র‍্যান্ডট-কেভিন ফোল্যান্ড, ডর্টমুন্ড এর তিনজন মার্কো রয়েস- মারিও গোটশে-আন্দ্রে শুরলে, আয়াক্সের আমিন ইউনেস। কনফেডারেশনস কাপে তিন গোল করা মনশেনগ্লাডবাখের লার্স স্টিন্ডলকেও উপেক্ষা করার উপায় নেই।
 
ফরওয়ার্ড হিসেবে কোচ লো এর প্রথম পছন্দ র‍্যাসেনবলস্পোর্ত লিপজিগ এর টিমো ওয়ার্নার। চলতি মৌসুমে বুন্দেসলিগায় ১১ গোল, ৭ অ্যাসিস্ট করে নিজের ফর্ম এর প্রমাণ দিয়ে রেখেছেন তিনি এর মধ্যেই।
 
তবে রবার্ট লেভানডফস্কি’র বিকল্প হিসেবে নেমে বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে ১১ গোল করে ফেলেছেন সান্দ্রো ওয়াগনারও। তিনিও থাকবেন রাশিয়াগামী দলে। অভিজ্ঞতার ভাঁড়ার উজাড় করে দিতে আছেন বর্ষীয়ান মারিও গোমেজ। এই মৌসুমের পারফরমেন্স হিসাব করলে হফেনহেইমের সারপ্রাইজ প্যাকেজ জুটি মার্ক উথ (১৪ গোল)- সার্জ ন্যাব্রি (১০ গোল) জায়গা পেতে পারেন। এর মাঝে ন্যাব্রি আবার জার্মানির হয়ে অভিষেকে হ্যাটট্রিকের রেকর্ড করেছেন গত নভেম্বরে।
 
সব মিলিয়ে বরাবরের মতই জার্মানি এবারও হট ফেভারিট বিশ্বকাপ জয়ের জন্য। তারুণ্যদীপ্ত ধারাবাহিক জার্মান রা শিরোপা ধরে রাখতে পারবে কি না সেটার উত্তর মিলবে জুলাই এর ১৫ তারিখ, মস্কো’র লুঝনিকি স্টেডিয়ামে।

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

16 + 19 =