আরেকটি রত্ন পেয়ে গেছে শ্রীলঙ্কা!

ক্যারিয়ারের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিকে ৩৬৫ পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছিলেন স্যার গ্যারি সোবার্স। সম্ভবত ক্রিকেটের সবচেয়ে বিখ্যাত ‘প্রথম সেঞ্চুরি’। ২১ বছর বয়সে খেলা সেই ইনিংস টেস্টের সর্বোচ্চ ইনিংস হয়ে টিকে ছিল ৩৬ বছর। আজ স্যার গ্যারির জন্মদিনেই একজন প্রথম সেঞ্চুরিতে করলেন ১৬৯। এবং অপরাজিত। কালকে আরও বড় করতে পারেন ইনিংস। সেই ২১ বছর বয়সেই। হোয়াট আ ট্রিবিউট!

ট্রিবিউট না কচু! সেটা আমরা বানাতে পারি, আর কী! এই ছেলেটি হয়ত জানেও না, আজ স্যার গ্যারির জন্মদিন ছিল বা ২১ বছর বয়সে গ্যারির সেই কীর্তি। আজ সকালে সে যখন উইকেটে গিয়েছিল, ৬ রানে ২ উইকেট হারিয়ে কাঁপছে দল। অস্ট্রেলিয়ার চেয়ে তখনও পিছিয়ে ৮০ রানে। দুরূহ উইকেট, তার চেয়েও দুরূহ পারিপাশ্বির্কতা। গতি আর সুইংয়ে নাকাল করে ছাড়ছেন মিচেল স্টার্ক। হেইজেলউডের নিখুঁত লাইন-লেংথ, ফণা তোলার অপেক্ষায় স্পিনাররা। স্যার গ্যারি নয়, এই ছেলেটির মাথায় থাকার কথা অস্ট্রেলিয়ান বোলিং। নিজের ব্যাটিং। দলকে উদ্ধার করা। চাপ। টেস্টে ক্রিকেটে নিজের ছাপ রাখা।

কিংবা আসলে তার মাথায় কিছুই ছিল না! চাপ-টাপ থাকার প্রমাণ তো ছিল না ব্যাটিংয়ে! একদিকে উইকেটে পড়েছে, আরেকপাশে তিনি খেলে গেছেন শট। শুরুতে প্রতি আক্রমণে ভড়কে দিয়েছেন অস্ট্রেলিয়াকে। এরপর আস্তে আস্তে গড়েছেন ইনিংস। দলকে বিপর্যয় থেকে উদ্ধার করেছেন, এরপর নিয়ে গেছেন শক্ত অবস্থানে। বৃষ্টির ছোবলে আগেই যখন শেষ হলো দিনের খেলা, নামের পাশে অপরাজিত ১৬৯। একাই করেছেন দলের প্রায় ৬০ শতাংশ রান!

পরিণত ইনিংসটি ভুল বোঝাতে পারে, সত্যি বলবে তার চেহারাটাই। যেখানে এখনও কৈশরের ছাপ। মনে হবে, মাত্রই যেন স্কুল থেকে বেরিয়ে এসেছেন! আদতেই স্কুল ছেড়েছেন, বেশিদিন হয়নি। শ্রীলঙ্কার আরও অনেক গ্রেটের মতো এই ছেলেটিও স্কুল ক্রিকেটের ফসল। প্রিন্স অব ওয়েলস স্কুলের হয়ে খেলে ২০১৩ সালে নির্বাচিত হয়েছিলেন শ্রীলঙ্কার ‘স্কুল ক্রিকেটার অব দা ইয়ার”। পরের বছর দেশকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে।

ওপরে উঠেছেন যেন চলন্ত সিড়িতে চেপে। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক গত বছরের জানুয়ারিতে। অক্টোবরেই টেস্ট দলে ডাক! প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে এমন কোনো পারফরম্যান্স ছিল না। ১৬ ম্যাচে তখন ছিল মোটে একটি সেঞ্চুরি ও ফিফটি। নির্বাচকেরা তবু তাকে দলে নিয়েছিলেন প্রতিভায় বাজী রেখে। জয়াবর্ধনে-সাঙ্গাকারা উত্তর যুগে ব্যাটিংয়ের ভবিষ্যত সেনানীর সন্ধানে।

গত অক্টোবরে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে টেস্ট অভিষেকও হয়ে যায়। এরপর খেলে এসেছেন নিউ জিল্যান্ডে, খেলে এলেন ইংল্যান্ডে। প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন বারবার, কিন্ত বড় ইনিংস আসছিল না। আগের ৬ টেস্টে ৮ বার ২৫ স্পর্শ করে পঞ্চাশ পর্যন্ত যেতে পেরেছেন মাত্র একবার। দারুণ শুরু, চটকদার সব শট খেলে হুট করেই আউট হয়ে ফিরছিলেন।

অবশেষে প্রতিভা, সামর্থ, সম্ভাবনা সব এসে মিলল এক বিন্দুতে। সোজা ব্যাটে খেলা বরাবরই তার শক্তি। এদিন খেলেছেন দারুণ কিছু পুল-কাট। স্পিনে ইচ্ছেমতো সুইপ। দৃষ্টিননন্দন সব ফ্লিক। সেঞ্চুরি ছুঁয়েছেন ছক্কায়। মুগ্ধতা ছড়িয়ছেন সেঞ্চুরির পরও। তরুণ-অনভিজ্ঞ একজন, মাইলফলক ছুঁয়েই কাজ শেষ হয়েছে মনে করতেই পারতেন। কিন্তু এই ছেলেটি এরপরও টেনে নিয়েছেন দলকে। পাল্লেকেলের ২২ গজে লিখলেন দারুণ এক মহাকাব্য।

শুরু থেকেই শ্রীলঙ্কা তাকে ব্যাটিং অর্ডারে জায়গা দিয়েছে কুমার সাঙ্গাকারার শূন্য করে যাওয়া তিন নম্বরে। নিউ জিল্যান্ডে তো ইনিংস ওপেনও করেছেন। তরুণ একজন ব্যাটসম্যানকে এত বড় দায়িত্ব দেওয়াই প্রমাণ করে, তার সামর্থে কতটা আস্থা দলের।

সাঙ্গাকারার মতো তিনিও উইকেটকিপার ব্যাটসম্যান। যদিও এখন কিপিং করতে হচ্ছে না। তবে আজ ব্যাটিং দিয়েই মনে করিয়ে দিয়েছেন সাঙ্গাকারাকে। ডানহাতি বলে ও ব্যাটিংয়ের ধরণে যদিও তাকে দেখে বেশি মনে পড়বে হয়ত মাহেলাকেই। শ্রীলঙ্কার সাবেকরা তাকে দেখছেন ভবিষ্যত গ্রেট হিসেবে। বেসিক টেকনিক এত ভালো যে কোচ গ্রাহাম ফোর্ড বলছেন, বয়সভিত্তিক পর্যায়ে কোচরা ছেলটিকে নিয়ে অসাধারণ কাজ করেছেন। ফোর্ড ভবিষ্যতের ছক আঁকছেন তাকে কেন্দ্র করেই।

২২ গজের বিচরণ তাকে কোথায় নিয়ে যাবে, সেটা নির্ধারণ করবে সময়। আপাতত বলা যায়, আরেকটি রত্ন পেয়ে গেছে শ্রীলঙ্কা!

কুসল মেন্ডিস। হয়ত অনেক অর্জনের পথে যাত্রা হলো শুরু…!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

four + 3 =