আমরা খেলার সাথে ব্যবসা মেশাই না

অনেকেই হয়তো শিরোনামের প্রথম অংশ পড়েই বাকি অশটুকু, “ডট ডট ডট মেশাই না..” ধরেই পুরো খবরে ক্লিক করেছেন। কেউ হয়তো, পুরনো কাসুন্দি ঘেটে এতোটাই বিরক্ত যে প্রথম লাইনের পর অবধারিত ভাবে দ্বিতীয় লাইনের আগমন আঁচ করতে পেরেই পরের পাতায় চোখ বুলিয়েছেন।

সে যাই হোক, যা পড়েছেন তাই। দ্বিতীয় বারে ভুল পড়েননি। আর খেলার সাথে শাপে-নেউলের  সম্পর্ক না থাকলে বিষয়টা আপনার মাথায়ও খেলে যাওয়ার কথা।

এইতো কয়দিন আগের কথা। সাহারার সাথে চুক্তি বাতিলের পর অনেকের কাছেই পাওয়া গেলো স্বস্তির নিঃশ্বাস। আর বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের স্পন্সর থাকাকালীন যত পৃষ্ঠা ফেসবুক খেলা নিয়ে না লেখা হয়েছে, তার চেয়ে বরং এই বিষয়টাই কোন কোন সময় প্রাধান্য পেয়েছে বেশী। “তবে কি সত্যিই আমরা ভারতী দালাল হয়ে গেলাম?” অথচ জার্সির গায়ের নামটা যে ১৪ মিলিয়ন ডলারে কেনা- সে কথা উহ্যই থেকে যায়। অদূর ভবিষ্যতে বড় সড় ধরনের মিরাকেল না ঘটলে এই টাকার অর্ধেকটাও যে আর কোন  জার্সি স্পন্সর থেকে পাওয়া যাবে না সে কথা হলফ করেই বলা চলে। খেলায় অবশ্যই আবেগের যায়গা আছে, কিন্তু সেই আবেগ যেন খেলার উন্নতিতে বাধার কারন হয়ে না দাঁড়ায় সে দিকে খেয়াল রাখার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব কিন্তু সমর্থকদেরই! টাকা যে ব্যয় হয় সাকিব-মাশরাফিদের পেছনেই, সে কথা ভুলে যাওয়াটা একেবারেই অনুচিত। আরেকটা কথা না বললেই নয়, ক্রিকেট খেলুড়ে খুব কম দেশেরই জার্সিতে নিজের দেশের নাম লেখা থাকে (আইসির টুর্নামেন্ট ছাড়া)।

খেলাধুলার সর্বোচ্চ ক্ষেত্রে ছোট কিন্তু জনবহুল এই দেশের সাফল্য একেবারে নেই বললেই চলে। তবে অবস্থার উন্নতি হয়েছে অনেক। কি ফুটবল, কি ক্রিকেট। এমনকি গলফও আকর্ষণ কেড়ে নিচ্ছে তার দেশ সেরা বিজ্ঞাপন সিদ্দিকুর এর কল্যানে। তবে কোন এক যায়গায় আমাদের সমর্থক গোষ্ঠীরা উন্নত হতে গিয়েও হতে পারেনি।

শুধু সমর্থকদের ওপর এক তরফা দোষ দিয়ে গেলে এর চেয়ে বড় অন্যায় আর কিছু হবে না। দোষ কি বিসিবিও এড়াতে পারে? গত বিশ্বাকপেও  বিসিবির কেনা মাত্র ২০০ পিস জার্সি “কিনে” নিয়ে অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড দাপিয়ে এসেছে সোনার ছেলেরা। অথচ এই জার্সির বাজার যে চড়া থেকে দিন দিন চড়াতর হচ্ছে দেশের বাজারে- সে ব্যাপারে কোন সুদূরপ্রসারী চিন্তা তো দুরেই থাক, কান্ডজ্ঞানহীনতার সাফল্যে জর্জরিত হয়েছে বিসিবি! একই জার্সির কম করে হলেও ১৪ রকমের কোয়ালিটিতে ছেয়েছিল রাস্তাঘাট। জার্সি প্রস্তুতকারী  প্রতিষ্ঠানের সাথে নুন্যতম একটি চুক্তির মাধ্যমে, বিক্রি হওয়া হাজার হাজার বাংলাদেশের জার্সির “পেতে পারত” লভ্যাংশটুকু এক অর্থে দানই করেছে বিসবি।

সমস্যা আছে আরও।  সময়ের সাথে সাথে অবকাঠামোগত উন্নয়নও স্পন্সর আকৃষ্ট করার মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। গত পাকিস্থান সিরিজেও গরিবিয়ানা ব্রডকাস্টিং কোয়ালিটি হতাশ করেছে। গত ৮ বছরে টিভির স্ক্রলে থাকা স্কোরবোর্ডের রঙ বদলায়নি। প্লেয়ারদের ছবি যেন বিভীষিকা। মনে পড়ে ১০ বছর আগে ভিজিএ ক্যামেরা দিয়ে তোলা ছবি গুলো এর চেয়ে খুব একটা খারাপ হতো না। রিভিউ এর সময় নষ্ট করা সময় গুলো ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখা গেলেও, গ্রাফিক্সের মারাত্মক রকম সেকেলে কাজ একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। সেক্ষেত্রে প্রশ্ন কিন্তু থেকেই যায়, জিটিভি কি আসলেও ততোটা পরিপক্ক হয়েছে, যতটা হলে সারা বিশ্বে ইন্টারন্যাশনাল ম্যাচ ছড়িয়ে দিতে পারে? আর সুন্দরী আরজেকে দিয়ে নয়, প্রি আর পোস্ট ম্যাচ প্রোগ্রাম গুলো হোস্ট করার জন্য এখনই গড়ে তোলা দরকার যোগ্য অ্যাংকর। সাথে সম্ভব হলে দু-একজন ধারা ভাষ্যকার।

এতো গেলো সম্প্রচারের গাফিলতির ধারা বিবরনি। ১৬ কোটি দেশের মানুষের বিশেষ করে ক্রিকেট পাগল মানুষের জন্য বরাদ্দ “সুবিশাল” ২৫ হাজারী স্টেডিয়ামের কথা না বললে এতো বড় রচনা লেখাই বৃথা। ২০১১ বিশ্বকাপে ঘোল পালটে মিরপুর শেরে বাংলা স্টেডীয়াম যে রূপ লাবণ্য লাভ করেছিল, তার প্রায় অনেকটাই যথাযথ পরিচর্যার অভাবে ধ্বংসের পথে। টয়লেট থেকে শুরু করে ১২০ টাকায় এক “পিরিচ” খিচুড়ি কিনে খাওয়া আগা-গোঁড়া পুরোটাই চরম অব্যবস্থাপনার স্বার্থক  কাব্য। আর স্টেডিয়ামের আসন সংখ্যা তো রীতিমত লজ্জাজনক ব্যাপার। সাথে টিকেট ডিস্ট্রিউবিশন নীতি আর মহামতি ইউসিবি ব্যাংক…। টয়লেট আর খাওয়া যদি হয় ব্যর্থতার অনুকাব্য, তবে টিকেট বিসিবির বিক্রির রঙ ঢং ব্যর্থতার  মহা মহাকাব্য। ওদিকে স্টেডিয়ামে বাঁশের অতিরিক্ত ব্যভার মাঝে মাঝে ধন্দেই ফেলে দেয়, “মাছে ভাতে বাঙালী তো, নাকি বাঁশে ভাতে বাঙালী?”। আন্তর্জাতিক মঞ্চে এই জিনিসের ব্যবহারটা কমিয়ে আনা খুব জরুরী। মাঠের পাশের বিলবোর্ড এর অবিন্যস্ততা শুধু মাত্র দৃষ্টিকটুই নয় অগোছালো মাঠের উৎকৃষ্ট উদাহরণও বটে। সাইট স্ক্রিন গুলো ডিজিটাল করা এখন  সময়েরই দাবি।

মাঠের খেলায় তো উন্নতি চোখে পড়ার মতই, সাথে এই খেলাকেই পুঁজি করে যদি দেশের নাম বিশ্ববাজারে উজ্জ্বল করার ইচ্ছাও কেউ পোষণ না করে সেটা হয় এক কথায় হতাশার। পৃথিবী সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, যেতে হবে আমাদেরও। সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে, কাজে প্রফেশনালিজমের ছাপ রেখে  সচেষ্ট হতে হবে কর্তা ব্যক্তিদের।

খেলাকে আর হেলা ফেলার কাতারে রাখেন না রাগী হেডমাস্টারও। সময় এসেছে বদলাবার। বিশ্ব দরবারে মাথা উচু করে দাঁড়াবার। এ খেলাই পারে বদলাতে আমাদের পরিচয় ঠিকানা। শুরু করতে হবে এখনই। বয়স তো হয়ে গেলো ৪৪, এখন না করলে কখন?

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

nineteen + sixteen =