আবারও ইংল্যান্ড-ওয়েস্ট ইন্ডিজ

মাইক হেনড্রিক বল ডেলিভারির আগেই অফ স্টাম্পের বাইরে চলে এসেছিলেন ভিভ। যেন বোলারকে নির্দেশ দিচ্ছেন, ‘বলটা এই জায়গা মতোই কর!’ হেনড্রিকও সম্মোহিতের মতো করলেন মিডল স্টাম্পে ফুল টস। ভিভের ফ্লিক, এফোর্টলেস। মিড উইকেট দিয়ে ছক্কা। কমেন্ট্রি বক্সে রিচি বেনোর সাধারণ ভাষায় অসাধারণ উচ্চারণ, ‘অ্যান্ড হি ফিনিশড ইট অফ নাইসলি উইথ আ সিক্স…ইটস আ ট্রিমেন্ডাস শট।” কিংবদন্তী হয়ে ওঠা একটি শট!

১৫৭ বলে ১৩৮, ১১ চার ও ৩ ছয়। আপাতদৃষ্টিতে খুব ঝড়ো কিছু নয়। কিন্তু যারা জানেন, শুধু তারাই জানেন, কতটা দাপুটে, খুনে, প্রতিপক্ষকে বিধ্বস্ত করে দেওয়া একটি ইনিংস! ওয়ানডে ইতিহাসের অন্যতম সেরা ইনিংস। উইজডেনের বিচারে (২০০২ পর্যন্ত) সর্বকালের দ্বিতীয় সেরা ওয়ানডে ইনিংস। কিং ভিভ!

কিংবা নামই ছিল যার কিং… কলিস কিং। ৯৯ বলে ৪ উইকেট পড়ার পর নেমে ৬৬ বলে ৮৬ রানের তান্ডব। ওয়ানডে ক্যারিয়ারে কিংয়ের একমাত্র ফিফটি!

২৮৭ রান তাড়ায় বয়কট-ব্রিয়ারলির শম্বুক গতির শুরু। দু অঙ্ক ছুঁতেই বয়কটের ১৭ ওভার লাগিয়ে ফেলা! এবং সেই ‘রোমাঞ্চকর’ ক্যাচ মিস!

বয়কটের তুলে দেওয়া লোপ্পা ক্যাচ হাতে জমাতে পারলেন না ক্লাইভ লয়েড। কিংবদন্তী চালু হয়ে গেল, বয়কটকে টিকিয়ে রাখতে ইচ্ছে করেই ক্যাচ ছেড়েছেন লয়েড! পরে ভিভ বলেছিলেন, ‘লয়েড বয়কটের ক্যাচ ছাড়ায় আমাদের কোনো দুর্ভাবনা হয়নি।” আর লয়েড স্বয়ং পরে বলেছেন, ‘অনেকেই বলে আমি ইচ্ছে করে ছেড়েছি বয়কটকে টিকিয়ে রাখতে। আসলে তা সত্যি নয়। তবে সেটা করলেও খারাপ কৌশল হতো না! ওরা যেভাবে ব্যাট করছিল, তাতে সারাদিন ব্যাট করে গেলেও আমার সমস্যা ছিল না!”

১৩০ বলে ৬৪ ব্রিয়ারলি, ১০৫ বলে ৫৭ বয়কট। প্রায় ৩৮ ওভারে ১২৯ রানের উদ্বোধনী জুটি। রান-বলের টানাপোড়েন মেটাতে এরপরই হুড়মুড় করে ভেঙে পড়া ইনিংস।

‘বিগ বার্ড’ জোয়েল গার্নার। ৬ ফুট ৮ ইঞ্চি উচ্চতা, আরও লম্বা হাত। সাইটস্ক্রিণের ওপর থেকে ডেলিভারি হওয়া নিখুঁত, বিষাক্ত সব ইয়র্কার। জবাবহীন ব্যাটসম্যান। ১১ বলের স্পেলে ৪ রান দিয়ে ৫ উইকেট। ২ বার অন হ্যাটট্রিক!

‘ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়া’ ফাইনাল বললেই চোখের সামনে ভাসে এসব টুকরো টুকরো ছবি। ১৯৭৯ বিশ্বকাপ ফাইনাল। ওয়েস্ট ইন্ডিজের অনায়াস জয়, শেষ পর্যন্ত এক তরফা ম্যাচ। তারপরও কত কত ধ্রুপদি মুহূর্ত!

কিংবা ২০০৪ আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি ফাইনাল। ইতিহাসে ঠাঁই করে নেওয়া কোনো ইনিংস বা কীর্তি নেই। কিন্তু রোমাঞ্চকর এক ম্যাচ, নখ কামড়ানো ফিনিশিং। ২১৮ রান তাড়ায় ১৪৭ রানেই নেই ৮ উইকেট। নবম উইকেটে কোর্টনি ব্রাউন ও ইয়ান ব্র্যাডশর ৭১ রানের অবিচ্ছিন্ন জুটি অসাধারণ জয়। ওভালের আলো-আধারিতে ক্যারিবিয়ানদের জয়োৎসব। অধিনায়ক ব্রায়ান লারার একমাত্র বড় শিরোপা।

বিশ্ব আসরে ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়ার ফাইনাল এই দুটিই। দুটিরই ছিল মনে রাখার মত ভিন্ন স্বাদ। এবার ক্রিকেটের নবতম সংস্করণে পুরোনো লড়াই। একবার মনে হয়, ওয়েস্ট ইন্ডিজ জিতুক। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের রঙ, উৎসব, খ্যাপাটে, বুনো ব্যাপারটা ক্যারিবিয়ানরা হৃদয়ে ধারণ করে। উপভোগের মন্ত্র কপট বাকে মুখে তুলে জানাতে হয় না তাদের, ক্রিকেট এবং জীবন-যাপনে নিত্য বুঝিয়ে দেয়।

আবার ভাবি, ইংল্যান্ডই জিতুক। এই বদলে যাওয়া ইংল্যান্ড, নিজেদের চিরায়ত ঘরানাকে ছুঁড়ে ফেলার দু:সাহস দেখানো ইংল্যান্ড, সাহসী-ভয়ডরহীন-আক্রমণাত্মক-সুন্দর ক্রিকেটের ইংল্যান্ড শিরোপা জিতে আরও উৎসাহিত হোক। অন্য অনেকের জন্যও যেটি হতে পারে অনুকরণীয়!

শেষ পর্যন্ত অবশ্য কারও জয়-হারেই সমস্যা নেই। চাওয়া বরং ওই টুকরো টুকরো ছবি গুলো থাকুক। ৭৯ বিশ্বকাপের মতো যুগ যুগ পরেও যেন ফ্রেমগুলো লোকের চোখে ভাসে, অমর হয়ে থাকে। একটা জমজমাট, রোমাঞ্চকর ম্যাচ হোক। দাঁতগুলো হোক নেইলকাটার, হাতের নখ সাবাড় হোক। চুলে টান লাগুক, কপালের কোণায় ঘাম জমুক। হৃদস্পন্দন থমকে যাক মাঝেমধ্যেই। ফাইনালটা মনে গেঁথে থাকুক!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

three × two =