আন্দ্রেয়া পিরলো : আদর্শ ইতালিয়ান মিডফিল্ডের মানদণ্ড যে মায়েস্ত্রো

আন্দ্রেয়া পিরলো : আদর্শ ইতালিয়ান মিডফিল্ডের মানদণ্ড যে মায়েস্ত্রো

আন্দ্রেয়া পিরলো, এক মায়েস্ত্রোর নাম। টুকটাক ফুটবল সেই শতাব্দীর শুরু থেকে দেখা শুরু হলেও বলতে বাধা নেই, মোটামুটি খেলার নিয়মকানুন বুঝে ও খেলাটা নিয়ে যুক্তিযুক্ত কারণে এক্সাইটেড হয়ে খেলাটা দেখা শুরু করেছিলাম সেই ২০০৬ বিশ্বকাপ থেকে। আর সদ্য ফুটবলের সবকিছু বোঝা সেই কিশোরটিকে সেই ফুটবল বিশ্বকাপ দিয়েছিলও দু’হাত ভরে।

জিদানের ঢুস, মাতেরাজ্জির অভিনয়, প্রথম ম্যাচেই কোস্টারিকার বিপক্ষে ফিলিপ লামের দূরপাল্লার শটের সেই গোল, ক্যাম্বিয়াসোর কান্না, পেকারম্যানের পাগলাটে খেলোয়াড় বদল, সেমিফাইনালে জার্মানির বিপক্ষে দুর্ধর্ষ কাউন্টারে দেল পিয়েরোর সেই গোল, ফাইনালে জিদানের পানেনকা পেনাল্টি, পুরো ব্রাজিল দলের বিপক্ষে জিনেদিন জিদানের ছড়ি ঘোরানো, দ্বিতীয় রাউন্ডে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে শেষমুহুর্তে টট্টির সেই পেনাল্টি, কিংবা সেমিফাইনালে জার্মানির বিপক্ষে ১১৮ মিনিটে ফ্যাবিও গ্রোসোর সেই গোল – চিরস্মরণীয় হতে থাকা মুহূর্তগুলোর কমতি ছিল না সেই বিশ্বকাপে। ফুটবল মানেই গোলের খেলা, আর যে গোল করতে পারবে সেই সবচেয়ে ভালো খেলোয়াড় – ২০০৬ বিশ্বকাপের আগে আর দশজনের মত আমারও এই ধারণা ছিল।

এই ধারণার আমূল পরিবর্তন আনে এই ২০০৬ বিশ্বকাপ। আর এনেছিল বলেই মোটামুটি বুঝতে পেরেছিলাম ইতালির বিশ্বকাপজয়ী সেই দলে আপাতদৃষ্টিতে বয়স্ক বলে মনে হওয়া খাটো গড়নের লম্বা চুলের এক মিডফিল্ডারের ভূমিকা কিরকম গুরুত্বপূর্ণ ছিল! কিভাবে তিনি চুপচাপ মিডফিল্ডে বসে থেকে পুরো দলের খেলার গতিপথ নির্ধারণ করে দিতেন! সেই বিশ্বকাপে ইতালির প্রথম গোলটাও এসেছিল তাঁর পা থেকেই। ঘানার বিপক্ষে দূরপাল্লার দুর্দান্ত এক শটে দলকে এগিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। তারপরে দেখলাম যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে তাঁর নেওয়া মাপা ফ্রি-কিকটা। যে ফ্রি-কিক থেকে গোল করার জন্য কোনরকমে মাথাটা একটু লাগালেই হত ; যে কাজটা নিপুণতার সাথে করেছিলেন আলবার্তো জিলার্দিনো।

তবে আমার আশ্চর্য হবার ষোলকলা পূর্ণ হয়েছিল ইতালি-জার্মানি সেমিফাইনাল ম্যাচটায়, যে ম্যাচে ১১৮ মিনিট পর্যন্ত দু’দলই গোলশূণ্য ছিল। পরে ফ্যাবিও গ্রোসোর গোলে শেষ মুহূর্তে এক গোলের লিড পায় ইতালিয়ানরা (যদিও পরে দেল পিয়েরো আরেকটি গোল করে জার্মান কফিনে শেষ পেরেকটা ঠুকে দেন)। ফ্যাবিও গ্রোসোর সেই গোলটা, কিংবা সেই গোলটার পরে অবিশ্বাসের ভঙ্গীতে গ্রোসোর মাথা নাড়িয়ে নাড়িয়ে উদযাপন করাটা ফুটবল ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছে। কিন্তু কতজনেরই বা মনে আছে, ঐরকম স্নায়ুক্ষয়ী মুহূর্তে গ্রোসোকে ডিফেন্সচেরা পাসটা দিয়েছিলেনও সেই ছোটখাট গড়নের মিডফিল্ডারটাই? ওরকম শেষ মুহূর্তের উত্তেজনা দমন করে ঠান্ডা মাথায় ঐরকম ডিফেন্সকে এলোমেলো করে দেওয়া পাসটা কোন বাচ্চামানুষের কাজ হতে পারেনা।

আন্দ্রেয়া পিরলো : আদর্শ ইতালিয়ান মিডফিল্ডের মানদণ্ড যে মায়েস্ত্রো

আন্দ্রেয়া পিরলো যে কিরকম ঠান্ডা মাথার জাদুকর, সেটা তাঁর একটা কথা থেকেই বোঝা যায়। ২০০৬ বিশ্বকাপে জিদানের ফ্রান্সের বিপক্ষে ফাইনালে খেলতে নামার আগে তাঁর প্রস্তুতি সম্পর্কে শুনতে চান? “আমি সেরকম কোন প্রস্তুতিই নিইনি সেদিন, ফাইনালের দিন বিকেলটা ঘুমিয়ে কাটালাম, তারপর কিছুক্ষণ প্লে-স্টেশন খেলে ফাইনাল খেলতে চলে গেলাম”… পরের ইতিহাসটা আসা করি বিজ্ঞ পাঠককে আর বলে দিতে হবে না।

ইতালিয় মিডফিল্ডকে প্রায় দেড় যুগ ধরে স্থবিরতা দেওয়ার মূল কারিগর তিনি – আন্দ্রেয়া পিরলো। আজকে তাকে নিয়ে হঠাৎ লিখতে বসার কারণ হল গতকালকে এই মহান মিডফিল্ডার নিজের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের ইতি টেনেছেন। অবসান হয়েছে একটি যুগের। আমার মত আরো শত শত এ যুগের ছেলেমেয়েদের শৈশবের একটা অংশ থেমে গিয়েছে গতকালকে।

যুগে যুগে এরকম ফুটবল শিল্পী ইতালিয়ান জাতীয় দলকে ধন্য করেছেন। সান্দ্রো মাজোলা থেকে শুরু করে জিয়ান্নি রিভেরা, জিয়ানকার্লো অ্যান্তোইনোনি, মার্কো তারদেল্লি, দিমেত্রিও আলবার্তিনি – ইতালিয়ান ফুটবলে এরকম মিডফিল্ড শিল্পীর অভাব কখনই হয়নি। তবে এই অ্যান্দ্রেয়া পিরলো এর অবস্থান অবশ্যই সবার থেকে উপরে।

একটা ফুটবল ম্যাচ জেতার জন্য সেন্ট্রাল মিডফিল্ডের গুরুত্ব কতটুকু, তা বোধকরি আর নতুন করে বলা লাগবেনা। এই সেন্ট্রাল মিডফিল্ডারের ভূমিকাটাকেই আরো অন্য স্তরে নিয়ে গেছেন আন্দ্রেয়া পিরলো এর মত কিছু বুদ্ধিদীপ্ত ফুটবলাররা। সেন্ট্রাল মিডফিল্ডারদের মধ্যেই কিছু কিছু খেলোয়াড় এমন আছেন যারা একেবারে সেন্ট্রাল ডিফেন্ডারদের সাথে একই লাইনে থেকে মিডফিল্ড থেকে অনবরত নিখুঁত পাস প্রদানের মাধ্যমে খেলার গতিপথ নির্ধারণ করে দেন। এদের বলা হয় “Deep Lying Playmaker” । অর্থাৎ প্রথাগত প্লেমেকারদের কাজই করবেন তারা, কিন্তু আরো পেছন থেকে। এই ভূমিকাটারই অন্যতম পুরোধা হলেন এই আন্দ্রেয়া পিরলো। এই পজিশানে কিছুদিন আগ পর্যন্তও আন্দ্রেয়া পিরলো এর পাশাপাশি একই সময়ে বিশ্বসেরা দুইজন খেলোয়াড় খেলে গেছেন – স্পেইনের জাভি হার্নান্দেজ ও জাবি আলোনসো। এখনকার খেলোয়াড়দের মধ্যে ইংল্যান্ডের মাইকেল ক্যারিককে এই ভূমিকার একজন খেলোয়াড় বলা যেতে পারে।

এখনকার অন্যান্য খেলোয়াড়দের মধ্যে ক্রোয়েশিয়ার লুকা মডরিচ, জার্মানির জুলিয়ান ভাইগেল, বসনিয়ার মিরালেম পিয়ানিচ ও স্পেইনের বোর্হা ভ্যালেরোকে মোটামুটি এই পজিশানের খেলোয়াড় বলা যেতে পারে। এ ধরণের মিডফিল্ডারদের আবার ডিফেন্স/ট্যাকল/ইন্টারসেপ্ট করার দায়িত্ব নেই। তারা শুধু চোখ বন্ধ করে সঠিক পাসের ফুলঝুরিতে আক্রমণ শানাবে, এটাই তাদের প্রধানতম দায়িত্ব। হিসাব করে দেখুন, প্রায় প্রত্যেকটা বিশ্বজয়ী দলেই মিডফিল্ড থেকে এরকম একটা করে আক্রমণের কলকাঠি নাড়ানো একজন করে পাস মাস্টার আছেন। অ্যান্দ্রেয়া পিরলো এর উপর ভর করে ইতালি জিতেছিল একটা বিশ্বকাপ। উঠেছিল ২০১২ ইউরোর ফাইনালে, ২০১৩ কনফেডে হয়েছিল তৃতীয়। এই আন্দ্রেয়া পিরলো কে কেন্দ্র করেই কার্লো অ্যানচেলত্তির বিশ্বসেরা এসি মিলান দল জিতেছিল দুটো চ্যাম্পিয়নস লিগ, দুটো লিগ। উঠেছিল আরেকটা চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালেও, মহাকাব্যিক যে ফাইনালে এসি মিলান লিভারপুলের কাছে হেরে যায়। সেই লিভারপুল দলেও ছিলেন জাবি আলোনসো নামের এক রেজিস্টা। পরে আন্দ্রেয়া পিরলো জুভেন্টাসের হয়েও টানা তিনটা লিগ জিতেন, একবার দলকে নিয়ে যান চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালেও।

বুঝতেই পারছেন, যে দলেই খেলেন না কেন, আন্দ্রেয়া পিরলো এর ভূমিকা প্রত্যেকটা দলেই সর্বাধিক ছিল। সেটা ইতালি জাতীয় দল হোক বা এসি মিলান ; কিংবা জুভেন্টাস। একটা দলই তাঁর গুরুত্বটা বুঝতে পারেনি, তারা হল মিলানেরই আরেক দল – ইন্টার মিলান। ক্যারিয়ারের শুরুতে দ্বিতীয় স্ট্রাইকার হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করা আন্দ্রেয়া পিরলো ক্যারিয়ারের প্রথম বছরগুলোতে অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার, এমনকি উইঙ্গার হিসেবেও খেলেছেন। ইন্টার মিলানে এই অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার বা উইঙ্গার হিসেবে ব্যর্থ আন্দ্রেয়া পিরলো তাই বার বার ধারে খেলতে যেতেন অন্য ক্লাবে। পরে ইন্টার মিলান তাকে বিক্রিই করে দেয়। সতীর্থ হিসেবে ব্রাজিলিয়ান রোনালদো, ছোটবেলার নায়ক রবার্তো ব্যাজিও, ফ্রান্সের হয়ে তখন সদ্য বিশ্বকাপজয়ী ইয়ুরি জুরকায়েফকে পাওয়ার পরেও শুধুমাত্র ভুল পজিশনে খেলতেন। এই কারণে আন্দ্রেয়া পিরলো নামক কুঁড়িটার প্রস্ফুটিত হবার সাক্ষী ইন্টার হতে পারেনি।

অবশ্য সেই মৌসুমে মাঠের বাইরেও অনেক ঝড়-ঝাপ্টা সামাল দিতে হচ্ছিলো ইন্টারকে – এক মৌসুমে চার-চারবার কোচ বদল হয় তাদের। জিজি সিমোনি, লুসিয়ানো ক্যাস্তেলিনির পাশাপাশি সে মৌসুমে ইন্টারকে কোচিং করিয়েছিলেন আন্দ্রেয়া পিরলো এর সাবেক ব্রেসিয়া কোচ মির্সেয়া লুসেচকু আর রয় হজসন (যিনি পরবর্তীতে লিভারপুল, ইংল্যান্ড, ফুলহ্যামের মত দলের ম্যানেজার হন)। রয় হজসন যে ম্যানেজার হিসেবে সবসময়েই মধ্যমানের ছিলেন। ইন্টারে নেওয়া তাঁর দুটো সিদ্ধান্ত থেকেই তা জানা যায়। একটা কাহিনী তো সবার জানা – ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তী লেফটব্যাক রবার্তো কার্লোসকে তিনি ইন্টারের হয়ে লেফট উইঙ্গার হিসেবে খেলাতে চেয়েছিলেন। কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন কার্লোসের মধ্যে লেফটব্যাক হবার গুণাবলি নেই (যদিও এই কাহিনীকে কেন্দ্র করে কার্লোস রিয়াল মাদ্রিদে পাড়ি জমান, যেখানে তিনি নিজেকে সময়ের সেরা লেফটব্যাক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন)।

আরেকটা সিদ্ধান্ত ছিল এই আন্দ্রেয়া পিরলো কে নিয়ে। হজসনের মতে আন্দ্রেয়া পিরলো এর মিডফিল্ডার হবার গুণাবলি ছিল না, তাই তিনি আন্দ্রেয়া পিরলো কে অনেক কম খেলাতেন। পরবর্তীতে যার কারণে আন্দ্রেয়া পিরলোকে ইন্টার বিক্রি করে দেয়। এমনকি আন্দ্রেয়া পিরলো এর নামটাও হজসন ঠিকমত উচ্চারণ করতে পারতেন না – ডাকতেন ‘পিরলা’ বলে। ইতালিয়ান ভাষায় যে শব্দের অর্থ পুং জননাঙ্গের অগ্রভাগ!

ইন্টার থেকে ব্রেসিয়ায় ধারে খেলার সময় পিরলোর ক্যারিয়ারে এক উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসে। তখন ইতালিয়ান ক্লাবটার ম্যানেজার ছিলেন কার্লো মাজোনে। যে মাজোনে আরেক ইতালিয়ান কিংবদন্তী ফ্র্যান্সেসকো টট্টির ক্যারিয়ার গঠনে রেখেছিলেন সবচেয়ে বড় ভূমিকা। ব্রেসিয়ায় তখন ম্যাজোনের অধীনে খেলতেন এক সুপারস্টার, রবার্তো ব্যাজিও যার নাম। সাধারণত ট্রেকোয়ার্টিস্টা বা আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডার হিসেবে খেলা রবার্তো ব্যাজিওকে বসিয়ে অ্যান্দ্রেয়া পিরলোকে খেলানোর সাহস ম্যাজোনের ছিলোনা। কিন্তু পিরলোর সঠিক পাস দেওয়ার ক্ষমতা ও দূরপাল্লার পাস দেওয়ার ক্ষমতা সম্বন্ধে ম্যাজোনে ভালোই অবগত ছিলেন। কিন্তু ব্যাজিওর পজিশানে তো পিরলোকে খেলানো যায়না। তবে উপায়?

ম্যাজোনের মাথায় এক অসাধারণ আইডিয়া আসলো। পিরলোকে নিয়ে আসলেন একদম সেন্ট্রাল মিডফিল্ডে। যেখান থেকে পিরলো তাঁর অসাধারণ বুদ্ধি ও দূরদর্শিতাকে কাজে লাগিয়ে তাঁর সঠিক পাস দেওয়ার প্রবণতাটার সদ্ব্যবহার করতে পারবেন। কারণ অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার বা ট্রেকোয়ার্টিস্টা হিসেবে খেলা মানে মাঠের অনেক সামনে খেলা, একেবারে স্ট্রাইকারদের পেছনে। যেখানে দূরপাল্লার পাস দেওয়ার সেরকম সুযোগ বা জায়গা কোনোটাই নেই। শুরু হল পিরলোর ক্যারিয়ারের এক নতুন অধ্যায় ; যে পজিশানে খেলে এরপর পিরলো বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড় হয়েছেন। পরবর্তীতে ইন্টার মিলানের নগরপ্রতিদ্বন্দ্বী এসি মিলানের কোচ কার্লো অ্যানচেলত্তি পিরলোর এই সুপ্ত প্রতিভাকে বিকশিত করার মানসে ৯.৬ মিলিয়ন পাউন্ডের বিনিময়ে এসি মিলানে নিয়ে আসেন পিরলোকে। বাকী ইতিহাস মোটামুটি সবার জানা।

এরপর থেকে ক্যারিয়ারে যে যে দলেই খেলেছেন, পাশে একজন রগচটা ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারকে নিয়ে জিতেছেন বলতে গেলে সবকিছু। বিশ্বকাপ থেকে শুরু করে লিগ, কাপ, চ্যাম্পিয়নস লিগ ; সব। এসি মিলানে যতদিন ছিলেন, পাশে এই রগচটা ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারের ভূমিকা পালন করেছেন জেনারো গাত্তুসো বা মাসিমো আমব্রোসিনি। ইতালিয়ান জাতীয় দলের ক্ষেত্রেও এই দুইজনই ছিলেন। পরে গাত্তুসোর জায়গায় এই পজিশানটা চলে যায় এএস রোমার ড্যানিয়েলে ডি রসির দখলে। জুভেন্টাসে আসার পর আবার পাশে পেয়েছেন আর্তুরো ভিদালকে ; যাদের মূল কাজই ছিল প্রতিপক্ষের পা থেকে ট্যাকল করে বল কেড়ে নেওয়ার মাধ্যমে পিরলোকে দেওয়া। যাতে পিরলো খেলাটা গড়ে দিতে পারেন, কারণ পিরলো নিজে কখনই ট্যাকল করা পছন্দ করতেন না। পাশে কখনো গাত্তুসো, কখনো ডি রসি, কখনো ভিদালকে নিয়েই যুগে যুগে প্রতিপক্ষের উপর ছড়ি ঘুরিয়েছেন পিরলো। পিরলোর দর্শন ছিল সোজাসাপ্টা – নিজে যেমন খেলব, আরেকজনকেও খেলতে দেব। আমি যদি তাঁর থেকে ভালো করি আমার বুদ্ধিদীপ্ততার মাধ্যমেই ভালো খেলবো, সেটার জন্য তাঁর কাছ থেকে বল কেড়ে নেওয়ার দরকার নেই।

আন্দ্রেয়া পিরলো : আদর্শ ইতালিয়ান মিডফিল্ডের মানদণ্ড যে মায়েস্ত্রো
এসি মিলানে পিরলো

এসি মিলানে দশ বছরে সম্ভাব্য সবকিছু জেতার পর মিলানের মনে হল আন্দ্রেয়া পিরলো এর ভান্ডারে আর কিছু নেই, যার কারণে মিলান উপকৃত হতে পারে। এই সিদ্ধান্তটা খুব সম্ভবত মিলানের আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম বড় ভুল ছিল, কেননা ৩১ বছর বয়সী “ফুরিয়ে যাওয়া” এই আন্দ্রেয়া পিরলো কে তখন ফ্রি তে দলে নিয়ে আসে লিগে খাবি খেতে থাকা প্রতিদ্বন্দ্বী জুভেন্টাস। আন্দ্রেয়া পিরলো কে কেন্দ্র করে জুভেন্টাসের তৎকালীন কোচ আন্তোনিও কন্তে রচনা করেন রণপরিকল্পনা। পরে জুভেন্টাসের হয়ে আন্দ্রেয়া পিরলো আরো তিনটি লিগ শিরোপা জেতেন, জুভেন্টাসকে একবার নিয়ে যান চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনাল পর্যন্ত – ভাবা যায়?

আন্দ্রেয়া পিরলো : আদর্শ ইতালিয়ান মিডফিল্ডের মানদণ্ড যে মায়েস্ত্রো
জুভেন্টাসের পিরলো

নিজেকে সবসময় আনন্দের ফেরিওয়ালা হিসেবেই দেখেছেন আন্দ্রেয়া পিরলো। যে ফেরিওয়ালার কাজই হল আনন্দ ছড়ানোর। আর সেই আনন্দ তিনি ছড়াতেন যেকোন গোলদাতাকে গোলে সহায়তা করার মাধ্যমে। নিজে কখনই গতিশীল কোন ফুটবলার ছিলেন না যিনি নিজের গতি দিয়ে প্রতিপক্ষকে ছিটকে ফেলবেন, আবার কখনই আদর্শ শক্তিশালী কোন ট্যাকলারও ছিলেন না যিনি প্রতিপক্ষের পা থেকে নিমেষে ট্যাকল করে বল কেড়ে নেবেন। তাই আধুনিক যুগের গতিশীল ফুটবলের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য আন্দ্রেয়া পিরলো শুধুমাত্র নিজের বুদ্ধিমত্তাকেই কাজে লাগিয়েছেন, আর কাজে লাগিয়েছেন নিজের নিখুঁত পাস দেওয়ার ক্ষমতাকে – যে ক্ষমতাটা ২০১১ পরবর্তী সময়ে তাঁর দাড়ির মতই স্টাইলিশ আর কুল – এবং অবশ্যই, চিরযৌবনা!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

sixteen + 13 =