আন্দ্রিই শেভচেঙ্কো : ইউক্রেইন ফুটবলের মুকুটহীন সম্রাট

আন্দ্রিই শেভচেঙ্কো : ইউক্রেইন ফুটবলের মুকুটহীন সম্রাট

A person who makes a substantive yet unrecognized contribution; a person whose bravery is unknown
or unacknowledged.

ফুটবল ইতিহাসের সামান্য কজন আনসাং হিরোর একজনও বটে এই মহানায়ক! একজন গ্রেট ফুটবলার হয়েও জাতীয় দলের ঝুলিতে কোনো ট্রফি নেই.. এটা শুনতেও খারাপ লাগে। ফুটবল ইতিহাস ঘেঁটে দেখুন, এমন অনেক গ্রেট গ্রেট ফুটবলার ছিলেন যারা জাতীয় দলের হয়ে কিছুই জিততে পারেন নি।

ইউনাইটেড লেজেন্ড রায়ান গিগস, লাইবেরিয়ার জর্জ উইয়াহ, আয়ারল্যান্ড এর জর্জ বেস্ট, ইংল্যান্ডের ডেভিড বেকহ্যাম, পর্তুগালের লুই ফিগো কিংবা আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসি…. এরকম শত শত উদাহরণ আছে ফুটবলে। কিন্তু এরা ট্রফি না জিতেও কেড়ে নিয়ে কোটি ফুটবল প্রেমীর মন।

আপনাদের আজ আমি ফুটবল ইতিহাসের একজন আনসাং হিরো,একজন সাহসী যোদ্ধা আর ট্রফি না জিতেও দেশের হয়ে মহানায়ক খেতাব পাওয়া একজন বীরের গল্প শুনাবো। তার নাম শুনে চোখ কপালে উঠলে বা চোখ উপচে কোটর থেকে বেরিয়েও আসতে পারে,হয়ত অনেকের কাছে তার নামটাই অজানা। ফুটবলের এত এত মহারথীর ভিড়ে তার নামটি হয়ত ম্লান হয়েই থাকবে কিন্তু তিনি ইউক্রেনের ফুটবল ইতিহাসের একটি স্বর্ণখচিত নাম।

আন্দ্রেই মিকোলাইয়োভিচ শেভচেঙ্কো ( Андрі́й Микола́йович Шевче́нко )

সাতটি দেশ আর দুইটি সাগরের বৃহৎ এক সীমানা নিয়ে তৈরী ইউরোপের দ্বিতীয় বৃহত্তম রাষ্ট্র ইউক্রেন। একসময় সোভিয়েত ইউনিয়নের “রুটির ঝুড়ি” বলা হত এই ইউক্রেনকে। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদ আর আন্তর্জাতিক রেষারেষির খপ্পরে পড়ে সেই নাম আর ধারা একসময় খুইয়ে বসে তারা। ১৯৯১ সালের ২৪ আগস্ট সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে বের হয়ে স্বাধীনতা ঘোষণা করে ইউক্রেন৷
কিন্তু তাতে কি হবে! দেশীয় অন্তঃকোন্দল আর আমেরিকা-রাশিয়া দ্বন্দ্বের যাঁতাকলে পড়ে আজও ইউক্রেন পিষ্ট হয়েই যাচ্ছে। ইউক্রেনেরই এক কৃষিসমৃদ্ধ নগরী কিয়েত রাজ্যের ইয়োহোটিন রেয়ন নামে এক ছোট্ট নাম না জানা অঞ্চলে ১৯৭৬ সালের ২৯ শে সেপ্টেম্বর জন্ম নেন আন্দ্রেই শেভচেঙ্কো। মিকোলা হিরোভিচ শেভচেঙ্কো নামের এক অভিজাত রাশিয়ান মিলিটারি বংশে জন্ম নেন তিনি। ১৯৭৯ সালে তার পুরো পরিবার কায়েভের পাশ্ববর্তী নগরী অবলনে চলে যায়। ১৯৮৬ সালে মাত্র ৯ বছর বয়সেই অলেক্সেন্দ্রো স্পিতে কোভের অধীনে একটি ফুটবল একডেমিতে নিজের নাম লিখান আর সেখানে প্রথম সারির ফুটবলার হিসাবে নির্বাচিত হয়ে যান। কিন্তু চেরনবিল নিউক্লিয়ার দুর্ঘটনার দরুণ ফুটবল একাডেমিটিকে শহর থেকে সরিয়ে নেয়া হয়। ছোটবেলা থেকেই একজন ভাল বক্সার ছিলেন শেভচেঙ্কো,ইউক্রেইন জুনিয়র বক্সারদের একজন ছিলেন তিনি। কিন্তু ফুটবল যার প্রতিটি শিরা-উপশিরায় সে কি আর ফুটবল উপেক্ষা করে অন্য খেলায় মত্ত হতে পারে!

ক্লাব ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসর ইউয়েফা ইউরোপিয়ান কম্পিটিশনের টপ গোলস্কোরারের তালিকা করলে আন্দ্রেই শেভচেঙ্কোর (৬৭ গোল) নামও আসবে।

ওলে ব্লখিন আর ইগোর বেলানভের পরে তৃতীয় ইউক্রেনিয়ান হিসাবে ২০০৪ সালে ফিফা প্লেয়ারদের সবচেয়ে মর্যাদাজনক খেতাব ব্যালন ডি’ অর জেতেন।

২০০৩ এ মিলানের হয়ে জেতেন ক্লাব ফুটবলে ইউরোপের সবচেয়ে ট্রফি ইউয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লীগ। এছাড়াও ২০০৫ এবং ২০০৮ সালে যথাক্রমে মিলান আর চেলসির হয়ে দুবার রানার্স আপও হন।

২০০৬ বিশ্বকাপে তার নেতৃত্বেই ইউক্রেন প্রথম এবং শেষবারের মত ফিফা বিশ্বকাপ খেলার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলো এবং তার অসাধারণ নৈপুণ্যে সেবার বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালেও ঠাঁই করে নিয়ে ফুটবল বিশ্বকে অবাক করে দিয়েছিলো ইউক্রেন। এমনকি ২০১২ সালে ইউক্রেনের ইউরো স্কোয়াডেও নাম ছিল শেভচেঙ্কোর।

২০১২ সালের ২৮ শে জুলাই ফুটবলকে বিদায় জানিয়ে রাজনীতিতে যোগদান করেন শেভচেঙ্কো। ইউক্রেনীয় বিধানসভা নির্বাচনে সেবারই প্রথম্বারের মত মনোনীত হন তবে তার দল সেবার নির্বাচনে হেরে যায়।

ক্যারিয়ারঃ

ডায়নামো কিয়েভঃ

শেভচেঙ্কোর ক্লাব ক্যারিয়ারের শুরুটা হয় ১৯৮৬ সালে ডায়নামো কিয়েভ থেকে। ড্রিবলিং টেস্টে ফেইল করেও কিয়েভের স্কাউটদের নজরে পড়েন তিনি। প্রায় ৪ বছর পরে এই শেভচেঙ্কোই ডায়নামো কিয়েভের অনুদ্ধ-১৪ এর একটি টুর্নামেন্ট এর টপ স্কোরার হয়ে তৎকালীন লিভারপুল ফুটবলার ইয়ান রাশের থেকে একজোড়া বুট পুরষ্কার
পান। এই ডায়নামো কিয়েভের হয়েই চ্যাম্পিয়নস লীগের রোড ম্যাচে বার্সেলোনা আর রিয়াল মাদ্রিদের মত জায়ান্টদের বিপক্ষে তিন তিনটি হ্যাট্রিক করেন তিনি যার মধ্যে দুইটি ছিল মাদ্রিদের বিপক্ষে।

এসি মিলান

“When I was a child, it was my dream to be a professional footballer. When I was 14 I visited Milan’s San Siro stadium and remember thinking how unbelievable it was. From then onwards I vowed that one day I would be playing there – and I am very proud that I achieved this and also for everything else I have managed to achieve in football”
—-Andriy Shevchenko

শেভচেঙ্কোর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে স্বর্ণালী সময় অতিবাহিত হয় এসি মিলানে। ১৯৯৯ সালে ২৫ মিলিয়ন ট্রান্সফার ফি তে মিলানে যোগদান করেন এই ইউক্রেন ফরোয়ার্ড। ওই বছরের আগস্টেই লেচ্চের বিপক্ষে ২-২ গোলের ড্র দিয়ে মিলানের হয়ে অভিষিক্ত হন তিনি । ২০০৩-০৪ সিজনে মিলানকে চ্যাম্পিয়ন্স লীগ জেতাতে মূখ্য ভূমিকা পালন করেন তিনি, উইনিং পেনল্টিটা এসেছিল তার পা থেকেই। ওই বছরেই মিলানের হয়ে ৩২ ম্যাচে ২৪ গোল করে টপ স্কোরার হন। ইতিহাসের পঞ্চম প্লেয়ার হিসাবে এক ম্যাচে চার গোল করার রেকর্ড গড়েন,যদিও পরে লিও মেসি ২০১১-১২ সিজনে পাঁচ গোল করে সেই রেকর্ড ভেঙে দেন বেয়ার লেভারকুসেনের বিপক্ষে। ২০০৬ সালের ৮ ফেব্রুয়ারী গানার নর্‌দালের পরে এসি মিলানের ইতিহাসের সেকেন্ড টপ গোল স্কোরার হন আন্দ্রেই শেভচেঙ্কো। মিলানের হয়ে ২৯৬ ম্যাচে ১৭৫ গোল করে সে বছরই মিলান থেকে চেলসিতে যোগদান করেন শেভচেঙ্কো।

চেলসি

২০০৬ এর ২৮ মে ৩০.৮ মিলিয়নের বিনিময়ে চেলসিতে যোগদান করেন শেভচেঙ্কো। হোসে মৌরিনহোর অধীনে ৭ নাম্বার জার্সিতে লিভারপুলের বিপক্ষে অভিষেক হয় তার।

চেলসিতে থাকতেই তিনি গার্ড মুলারের রেকর্ড ভেঙে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের টপ স্কোরার হন (৫৭ গোল)।

২০০৮-০৯ সিজনের পরেই শেভচেঙ্কোর ফুটবল ক্যারিয়ারে অন্ধকার অধ্যায়ের সূচনা হয়। ওই সিজনে ২৬ টি লীগ ম্যাচ খেলে মাত্র ২ গোল করতে সক্ষম হন তিনি, এর ফলে নিয়মিত একাদশে নিজের জায়গা হারান তিনি।

“In England everyone puts a lot of pressure on you when you have cost a lot of money”
—-Andriy Shevchenko

২০০৯-১০ সিজনে তৎকালীন চেলসি কোচ কার্লো আনচেলাত্তি তাকে চেলসি থেকে বিক্রয় করে দেবার সিদ্ধান্ত নেন।

২০০৯ সালে শৈশবের ক্লাব ডায়নামো কিয়েভের সাথে আবারো চুক্তি করেন আন্দ্রেই শেভচেঙ্কো। দুই বছরের চুক্তিতে কিয়েভে ফিরে এসেই গোল দিয়ে নিজের জাত চেনান এই ক্লাসি স্ট্রাইকার। ওই সিজনের চ্যাম্পিয়ন্স লীগেই সাবেক নগর প্রতিদ্বন্দ্বী ইন্টার মিলানের বিপক্ষে গোল করেন তিনি। ২০১০-১১ সিজনে ইউসিএলে আয়াক্সের বিপক্ষে পেনাল্টিতে গোল করেন শেভচেঙ্কো। ২০১২ সালের ২৮ শে জুলাই ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন তিনি!

আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার

দেশের হয়ে ১১১ টি ম্যাচে ৪৮ টি গোল করেছেন আন্দ্রেই শেভচেঙ্কো। তিনি ইউক্রেনের জাতীয় বীরের খেতাব পান মূলত ২০০৬ বিশ্বকাপে নেতৃত্ব দিয়ে দলকে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছে দেবার জন্যে কাণ্ডারির ভূমিকা পালন করার জন্যে।

“There is a great responsibility on the team to perform well, because our supporters and the whole of the country are expecting us to do just that”
—Shevchenko

২০০৬ বিশ্বকাপের কোয়ালিফাইং রাউন্ডে তিনি দেশের হয়ে ৬ টি গোল করে তিনিই মূলত দলকে বিশ্বকাপের চুড়ান্ত পর্বে তুলেছিলেন। ২০১২ সালের ইউরোই ছিল শেভচেঙ্কোর জন্যে দেশের হয়ে সর্বশেষ আর চুড়ান্ত স্মরণীয় অধ্যায়। তার জোড়া হেডারে সুইডেনকে গ্রুপ স্টেজে ২-১ গোলে হারায় ইউক্রেন। কিন্তু ইংল্যান্ডের কাছে ১-০ গোলের শোচনীয় পরাজয়ের পরে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানান শেভচেঙ্কো। এমনকি ওই বছরের নভেম্বরে ইউক্রেন ফুটবল ফেডারেশন কতৃক প্রস্তাবকৃত প্রধান কোচের পদে দায়িত্বকে ফিরিয়ে দেন তিনি!

রাজনৈতিক জীবন

২০১২ সালে সব ধরনের ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দেবার পরে ইউক্রেনের ডেমোক্রেটিভ পার্টিতে যোগদান করেন শেভচেঙ্কো। ওই বছরেই ইউক্রেনের বিধানসভা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে তার পার্টি। যদিও ভোটে হেরে দ্বতীয় অবস্থানে থেকেই নির্বাচন শেষ করা লাগে তার দলকে।

রাজনীতিতে তার একটি বিখ্যাত উক্তি কখনোই ভোলার নয়ঃ

“This is the world I understand, the world I want to stay in.

ব্যক্তিগত জীবন

২০০৪ সালে আমেরিকান মডেল ক্রিস্টো পেজিকের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন আন্দ্রেই শেভচেঙ্কো। ক্রিশিয়ান,আলেক্সেন্ডার,গ্যাব্রিয়েল এবং জর্ডান নামে চারজন সন্তানের জনক ।

২০০৫ সালে এসওএস চিলড্রেন ভিলেজ চ্যারিটির একজন এম্বাসেডর হন তিনি। তাছাড়া অনাথদের শিশুদের উদ্দেশ্যে একটি ফাউন্ডেশনও প্রতিষ্ঠা করেন শেভচেঙ্কো।

ইএ স্পোর্টস এর ফিফা গেমের কাভারে ২০০৫ সালে নিজের জায়গা করে নেন শেভচেঙ্কো। এছাড়াও ফিফা-১৪ ভিডিও গেমের আল্টিমেট টিম লেজেন্ড লিস্টেও জায়গা করে নেন শেভচেঙ্কো।

ইউক্রেনের সর্বকালের সেরা ফুটবলার ত বটেই গোটা ফুটবল বিশ্বের হাতে গোণা কয়েকটি নক্ষত্রের মধ্যেই তিনি জ্বলবেন স্বমহিমায় যতদিন থাকবে ১২০ গজের এই ফুটবল, যতদিন রবে আমার-আপনার মত কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমী!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

twelve + 20 =