আন্তোনিও ভ্যালেন্সিয়া – প্রিমিয়ার লিগের সেরা রাইটব্যাক না সেরা হবার পথে?

আন্তোনিও ভ্যালেন্সিয়া - প্রিমিয়ার লিগের সেরা রাইটব্যাক না সেরা হবার পথে?

সাল ২০০৯। পৃথিবীর সেরা খেলোয়াড় তখন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো বলে একজন পর্তুগিজ উইঙ্গার। আর বিশ্বের প্রত্যেকটা সেরা খেলোয়াড়কে দলে নেওয়ার জন্য রিয়াল মাদ্রিদের টানাটানি তো নতুন কিছু নয়, তাই স্বাভাবিকভাবেই রোনালদো নজরে আসলো তাদের। আসলো বলাটা ভুল হবে, কারণ তাঁর আরও এক মৌসুম আগে থেকেই ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে দলে চাচ্ছিলো রিয়াল মাদ্রিদ। ওদিকে রিয়াল মাদ্রিদ থেকে ডাচ উইঙ্গার আরিয়ান রবেন আর লিওঁ থেকে ফরাসী স্ট্রাইকার করিম বেনজেমা চলে আসবেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে, দলবদলের বাজারে জোর গুঞ্জন ছিল এটাই। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো রিয়াল মাদ্রিদে পাড়ি জমালেন ঠিকই, বিশ্বরেকর্ড ট্রান্সফার ফি দিয়ে, কিন্তু তাঁর পরিবর্ত হিসেবে স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন দলে যাকে আনলেন – চোখ কপালে উঠে গেল সবার তাঁকে দেখে। ৮০ মিলিয়ন পাউন্ড দিয়ে রোনালদোকে বিক্রি করে তাঁর জায়গায় উইগান অ্যাথলেটিক থেকে ১৬ মিলিয়ন পাউন্ডের বিনিময়ে আনা হল ইকুয়েডোরিয়ান উইঙ্গার আন্তোনিও ভ্যালেন্সিয়া কে।

ফার্গুসন গেলেন, তাঁর জায়গায় ডেভিড ময়েস আসলেন। ময়েস গেলেন, আসলেন লুই ভ্যান হাল। ভ্যান হালের পর ইউনাইটেডের দায়িত্বে এখন আছেন হোসে মরিনহো। মাঝে কেটে গেছে আটটা বছর। রোনালদোর রেখে যাওয়া শূণ্যতা ভ্যালেন্সিয়াকে দিয়ে পূরণ হবে, এই মনোবাসনা ইউনাইটেড ফ্যানদের মধ্যে থাকলেও আস্তে আস্তে বোঝা গেল আসলে সেটা হবার হয়। মাঝে এক মৌসুমে ভ্যালেন্সিয়াকে উজ্জীবিত করার জন্য ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের কিংবদন্তী ৭ নাম্বার জার্সিটা দেওয়া হলেও এক মৌসুম পরেই সেই জার্সির ওজন সইতে না পেরে নিজের প্রিয় ২৫ নাম্বার জার্সিতেই ফেরত যান আন্তোনিও ভ্যালেন্সিয়া। এই আট বছরে ইউনাইটেডে উইঙ্গার হিসেবে এসেছেন, চলে গিয়েছেন আরও অনেকে। অ্যানহেল ডি মারিয়া থেকে শুরু করে আদনান ইয়ানুজাই, বেবে থেকে শুরু করে উইলফ্রিয়েড জাহা, শিনজি কাগাওয়া থেকে শুরু করে মেমফিস ডিপাই – ভ্যালেন্সিয়ার পরে ইউনাইটেডে এসেও টিকতে পারেননি তাদের কেউই। টিকে গেছেন আন্তোনিও ভ্যালেন্সিয়া।

কিন্তু কিভাবে সেটা?

প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে বের হয়ে আসবে ইকুয়েডোরিয়ান এই উইঙ্গারের চূড়ান্ত অধ্যবসায় ও হার না মানা মানসিকতার কথা। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর ব্যাটনটা না নিতে পারলেও আস্তে আস্তে চুপিসারে গত দুই মৌসুম ধরে আরেক ইউনাইটেড কিংবদন্তীর ব্যাটনটা নিজের করে নিচ্ছেন আন্তোনিও ভ্যালেন্সিয়া এই পরিশ্রম, অধ্যবসায় ও হার-না-মানা মানসিকতার কারণেই। কারণ, ইউনাইটেডের সাবেক কিংবদন্তী রাইটব্যাক গ্যারি নেভিলের যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে এই দুই মৌসুমে নিজেকে প্রায় প্রতিষ্ঠিতই করে ফেলেছেন আন্তোনিও ভ্যালেন্সিয়া!

তবে ভ্যালেন্সিয়ার এই পরিবর্তনটা যে সেই ফার্গুসনই শুরু করে দিয়ে যাননি – সেটা কিন্তু বলা যাচ্ছেনা। কিংবদন্তী রাইটব্যাক গ্যারি নেভিলের অবসরের পর রাফায়েল ডা সিলভা আর ফিল জোনস, কখনোবা ক্রিস স্মলিং – এদেরকে দিয়েই রাইটব্যাকের কাজটা চালিয়ে নিচ্ছিলেন ফার্গুসন। এবং এটাও বুঝেছিলেন এদের কারোর পক্ষেই নেভিলের মত পারফর্ম করা সম্ভব নয়। তাই তখন রাইট উইঙ্গার হিসেবে খেলা আন্তোনিও ভ্যালেন্সিয়া কে ফার্গুসন বললেন রক্ষণের দিকে একটু বেশী গুরুত্ব দিয়ে খেলতে। কারণ রাইটব্যাক নিখুঁত না তখন ইউনাইটেডের। রাইটব্যাকের দোষ ঢাকার জন্য ফার্গুসন প্রায়ই ভ্যালেন্সিয়াকে বলতেন নিচে নেমে ডিফেন্স করার জন্য, উইঙ্গারের ভূমিকা পালন করার পাশাপাশি।

আন্তোনিও ভ্যালেন্সিয়া - প্রিমিয়ার লিগের সেরা রাইটব্যাক না সেরা হবার পথে?

ফার্গুসন গেলেন, এলেন ময়েস। ময়েসের অধীনে রাইট উইঙ্গার হিসেবে স্কোয়াড প্লেয়ার হয়ে থাকলেও ভ্যালেন্সিয়াকে উইঙ্গার থেকে নামিয়ে এনে ৩-৪-৩ বা ৩-৫-২ ফর্মেশানে রাইট উইংব্যাক হিসেবে খেলানো শুরু করলেন লুই ভ্যান হাল। অ্যানহেল ডি মারিয়া বা মেমফিস ডিপাইয়ের মত উইঙ্গার হিসেবে ড্রিবলে অসম্ভব পটু যে ভ্যালেন্সিয়া নন, ফার্গুসনের মত লুই ভ্যান হালও সেটা বুঝেছিলেন বোধকরি। ভ্যালেন্সিয়ার খেলার মূল বৈশিষ্ট্যই হল গায়ের জোর, গতি আর ক্ষিপ্রতা। আর নিখুঁত ক্রস দিতে পারার ক্ষমতা, ডি-বক্সে অনবরত ডান পা দিয়ে ক্রস ফেলতে পারার প্রবণতা। আর ইঞ্জিনের মত মাঠের ডানপ্রান্তে অনবরত উঠানামা করতে পারার ক্ষমতা তো আছেই। ফলে আস্তে আস্তে রাইট উইঙ্গার থেকে রাইট উইংব্যাক, রাইট উইংব্যাক থেকে পুরোদস্তুর রাইটব্যাক হয়ে গ্যারি নেভিলের অভাব মেটাচ্ছেন আন্তোনিও ভ্যালেন্সিয়া, অবিরত, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের হয়ে! এমনই ভালো খেলছেন, তাঁর বর্তমান কোচ হোসে মরিনহো তো বলেই দিয়েছেন, বিশ্বের সেরা রাইটব্যাক এখন ভ্যালেন্সিয়াই! ফুলব্যাক, যিনি কিনা আগে উইঙ্গার হবার কারণে আক্রমণও করতে পারেন বেশ ভালো, এবং প্রয়োজন হলেই নিচে নেমে এসে ডিফেন্ড করতে পারেন – এমন খেলোয়াড়ই তো মরিনহোর সারাজীবন পছন্দ ছিল! ভ্যালেন্সিয়াকে তিনি বিশ্বের সেরা রাইটব্যাক বলবেন নাই-ই বা কেন! ডেভিড ডা হেয়া আর ইনজুরিমুক্ত পল পগবার পর এই আন্তোনিও ভ্যালেন্সিয়াই এখন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের মূল একাদশের অবিচ্ছেদ্য অংশ!

শারীরিক শক্তি ও ক্ষিপ্রতার কারণে প্রতিপক্ষ লেফট উইঙ্গার/মিডফিল্ডার/উইংব্যাক/ফুলব্যাকদের সহজেই বোকা বানাতে পারা ভ্যালেন্সিয়ার প্রিমিয়ার লিগে সেরা রাইটব্যাক হবার দৌড়ে সবচেয়ে বড় বাধা বোধহয় নগরপ্রতিদ্বন্দ্বী ম্যানচেস্টার সিটির ইংলিশ রাইটব্যাক কাইল ওয়াকার। কিন্তু যেভাবে নিজের খেলাকে আস্তে আস্তে উন্নত করছেন ভ্যালেন্সিয়া, সেরা রাইটব্যাক হতে মনেহয় আর বেশী দেরী নেই তাঁর!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

seventeen − fifteen =