আগের মিলান, এই সিজনের মিলান

সিরি-আতে মিলান এখন পর্যন্ত ২ নাম্বারে। অথচ গতবারের স্কোয়াড আর এবারের স্কোয়াডের মধ্যে খুব বেশি পার্থক্য নাই। শুধু মিডে ব্যাকআপ হিসেবে পাসালিচ আর মাতি ফারনান্দেয, এটাকে লাপাদুলা আর ডিফেন্সে গুস্তাভো গোমেয(যদিও তাদের বেসির ভাগ সময় বেঞ্চই গরম করতে হয়েছে)। কিন্তু পারফর্মেন্সে আকাশ-পাতাল তফাত। আগের তিন সিজনে মিলানের পজিশন ছিল যথাক্রমে ৮,১০ এবং ৭ এ। অথচ চোখের পলকে এইবার টাইটেল কন্টেন্ডার এর মত ফাইট দিচ্ছে। বর্তমানে মিলান ৪ পয়েন্ট পিছিয়ে ২ এ আছে।

বর্তমানে মিলানের দায়িত্বে আছেন ভিঞ্চেনযো মন্তেয়া আরগুয়েব্লি সিরি-আ বোদ্ধাদের মতে যিনি ফিওরেন্টিনাকে জুভেন্টাসের পর ১২-১৫ সালের ২য় সেরা ফুটবল খেলিয়েছেন। এই সময় ফিওরেন্তিনা অনেকের মতে সিরি-আর সেরা পজেশন বেজড আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলেছে। সিরি-আয় মিলান যেহেতু আক্রমণাত্মক ফুটবলের জুন বিখ্যাত, তাই তাকেই মিলান ম্যানেজমেন্ট নিয়োগ দিয়েছেন যাতে মিলানকে তিনি মিহাইওভিচ এর রেখে যাওয়া রক্ষণাত্মক দর্শন থেকে বের করে আনতে পারেন।

বর্তমানে মন্তেয়া তার নিজস্ব স্টাইলে প্লেয়ারদের সুট করানর চেষ্টা করছেন। মিহাইওভিচ এর আমলে মিলান প্রচণ্ড মাত্রায় যেহেতু রক্ষণাত্মক স্টাইলে অভভস্ত হয়ে পরেছিল তাই তিনি একেবারে গোঁড়া থেকে প্লেয়ারদের মানসিকতায় পরিবরতন আনার চেষ্টা করছেন যার কারনে সিজনের একেবারে শুরুতে আমরা দেখেছি যে কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্লেয়াররা অস্বস্তিতে পরেছে যার কারনে ম্যাচগুলোর ফল মিলানের পক্ষে আসেনি। কিন্তু আস্তে আস্তে প্লেয়াররা অভ্যস্ত হয়েছে যার ফলে সর্বশেষ ১০ ম্যাচে ৮ জয়,১ হার আর ১ ড্র।

মিলানের নতুন সিস্টেমঃ
গত সিজনে মিহা মিলানকে ৪-৪-২ ডায়মন্ড ফরমেশনে খেলিয়েছেন যেটা কখনও কখনও ফ্লাট ৪-৪-২ এ বা সিচুয়েশন বুঝে ৪-৫-১ এ সুইচ করত। কিন্তু এবার মন্তেয়া নিয়মিত দলকে ৪-৩-৩ এ খেলিয়ে যাচ্ছেন।

milan-1

১ম ছবিতে দেখা যাচ্ছে এই ফরমেশনে বেশির ভাগ ম্যাচে মিলান স্টার্ট করেছে এই একাদশ নিয়েই। গোলবারে ১৭ বছরের দনারুমা, ব্যাক ফোরে আবাতে, রমানিওলি, পালেত্তা আর ডি সিলিও। মিডে ১৮ বছরের ম্যানুয়েল লোকাতেল্লি, ইউরাজ কুচকা আর জিয়াকোমো বোনাভেঞ্চুরা। আর তাদের সামনে ছিল বাক্কা, নিয়াং আর লিভারপুল থেকে আসা সুসো।

২য় ছবিতে দেখা যাচ্ছে একেবারে গোলকিক থেকে একেবারে নিচ থেকে কিভাবে মিলানের খেলা শুরু হয়। সেন্টার ব্যাক দুজন বক্সের দুই পাশে থাকে, যার ফলে ডি সিলিও আর আবাতে কিছুটা উপরে উঠে থাকে যার কারনে দোনারুমা ফ্রিকুয়েন্টলি দুই স্টপারকে বল ডিস্ট্রিবিউট করতে পারে অপনেন্টের অ্যাটাকের দুই প্লেয়ার উপরে উঠলে। এসময় লাকতেল্লি কিছুটা নেমে ডি-বক্সের নিচে কিছুটা ত্রিভুজাকৃতির সৃষ্টি করে অপনেন্টের প্লেয়ারদের কিছুটা স্ক্যাটারড করে দেয় যাতে প্রেসিং এর প্রেশারটা দুই স্টপার থেকে রিলিজ হয়ে যায়। মন্তেয়ার এই কৌশল এপ্লাইএর মুল কুশলী মিলানের মেইন স্টপার রমানিওলি যে এই সিজনে ৮৭% সফল হারে গড়ে প্রায় প্রতি ম্যাচে ৫৩ টি পাস খেলেছেন। যার ফলে এরকম নিচে থেকে মিলানের অ্যাটাক করা সহজ হচ্ছে।

milan-2

৩য় ছবিতে অপনেন্ট যখন মিলানের হাফে অ্যাটাক করছে তখন প্রতিটি প্লেয়ারের পজিশন দেখাচ্ছে। তখন ব্যাক এর ৪ জন এক সমান্তরালে হয়ে যায় যাতে বক্সে কম্প্যাক্টনেস বাড়ে। লাকতেল্লি একেবারে বক্সের ঠিক ওপরে পজিশন নেয় সেই সাথে কুচকা আর বোনা সামনের লেয়ারে থাকে(অনেকটা ত্রিভুজের তিন মাথা)। ফলে অপনেন্ট এর অ্যাটাকের প্লেয়ারদের সামনে একটা তিন লেয়ারের ডিফেন্স তৈরি হয় যার কারণে ডিফেন্সে বড় কোন নাম যুক্ত না হলেও এই সিজনে মিলানের ডিফেন্স গতবারের ভঙ্গুর দশা অনেকটাই কাটিয়ে উঠেছে।

milan-3

পরের ছবিতে দেখা যাচ্ছে বাক্কা আর সুসো বল পায়ে থাকা প্লেয়ারদের চার্জ করছে। এসময় অপনেন্ট সামনে পাস দেয়ার পথ না থাকায় ব্যাক পাস দিতে বাধ্য হয়। লিভারপুলে থাকতে যে সুসো অনেকটা আলসে হিসেবে পরিচিত ছিল এই সিজনে তার এরকম নিচে নেমে বল চার্জ করা সত্যিই অনেক ইম্প্রেসিভ। মন্তেয়ার ফিলসফিতে বর্তমানে আক্রমনের সাথে ডিফেন্সেও সে অনেক ইফেক্টীভ। সেই সাথে নিয়াঙ্গের ফ্লেয়ার কে কাজে লাগিয়ে বল হারানোর সাথে সাথে ডিরেক্টলি তাকে পাস দেওয়ার ফলে মিলান এবার প্রচুর কাউন্টারেও খেলতে পারছে(ইন্টার মাচ)। অবশ্য এই ট্যাঁকনিকে মিলান এবার অতটা সফল নয় কারন এক বোনা ছাড়া মিলানের খুব ভাল বল প্লেয়ার নেই এবং বল ডিস্ট্রিবিউটীঙ্গে লাকতেল্লি অনভিজ্ঞ।

milan-4

৫ এবং ৬ নাম্বার ছবিতে দেখা যাচ্ছে যখন অপনেন্ট একেবারে তাদের বক্স থেকে খেলা শুরু করে তখন প্লেয়ারদের রোল কিরকম থাকে। সুসো আর নিয়াং দুই অ্যাডভান্স মিডফিল্ডারের সাথে এসে ফরমেশনকে অনেকটা ৪-১-৪-১ রুপ দান করে(মন্তেয়ার এই সুইচটা আমার খুব প্রিয়)। এই সময় বাক্কার নিচে থাকা চারজন এর মধ্যে দুইজন বা তিন জন প্রেস করে আর বাকি যে বা যারা থাকে সে চার্জ করে। স্পেসিয়ালি আমার অব্জারভিং হচ্ছে বাকি দুইজন বা একজন পাস যাতে দিতে না পারে সেই পথ বন্ধ করে রাখে যেহেতু টেক অনে তারা খুব একটা ভাল না। এক্ষেত্রে সুসো আর নিয়াংকে অনেক সতরক থাকতে হয় বিশেষ করে পজিশনিঙে যাতে লাকতেল্লি আর ব্যাক লাইন এক্সপোজ না হয়ে যায়। এখন পর্যন্ত মন্তেয়ার এই কৌশল প্রয়োগে প্লেয়াররা ১০০ পেয়েছে আমি বলবনা তবে ভুলের পরিমান টলারেবল।

milan-5

milan-6

ফরমেশনের ফেজ চেঞ্জিং এও মন্তেয়া দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। বিশেষ করে এই সিজনে অ্যাড হওয়া পাসালিচকে যখন তিনি মুল একাদশে সুযোগ দিয়েছেন। এই প্লেয়ারটি খুব কম জায়গায় ড্রিবলিঙে ওস্তাদ। আবার সে ডি সিলিওর সাথে অনেক সময় ডিপ ফ্লাঙ্কেও সুইচ করে(সব শেষ ফোটো)। ফলে প্রেসিঙের সময় লং পাস না খেলে ডিপ থেকেই সর্ট পাশে খেলা বিল্ড করা যায়। ফ্লাঙ্কে যখন পাসালিচ কিছুটা ডিপে নামে তখন ডি সিলিও আচমকা উপরে উঠে যাতে নিয়াং কিছুটা বাক্কার সাথে এসোসিয়েট হওয়ার সুযোগ পায়। আর ফরমেশন হয়ে যায় আনকনভেনশনাল ৪-৪-২(আবার ফরমেশন সুইচ!!)। এই ট্যাঁকটিকেল ইম্প্রভাইজেশনের ফলে অপনেন্ট এর প্রেসিঙে বল হারিয়ে এবার মিলানের গোল খাওয়ার সংখ্যা এবার অনেক কম। যেটা মিলানের আক্রমণাত্মক দর্শনে এক নতুন মাত্রা দান করেছে।

milan-7

এখন পর্যন্ত হয়ত বলা যাবেনা যে মিলান ৯০ এর দশকে ফিরে গেছে কিন্তু বাস্তবতার বিচারে মিলান এখন পর্যন্ত সফল অন্তত রিবীল্ড প্রসেসে। স্টার প্লেয়ারের বদলে মন্তেয়া চেষ্টা করছেন ইয়াং প্লেয়ারদের উপর ভরসা রাখতে। এবং ইয়াং প্লেয়াররা তার ভরসার প্রতিদানও দিয়েছেন বেশ ভালভাবেই। এখন পর্যন্ত ইউরোপের টপ ৫ লীগে মিলান এর প্লেয়ারদের এভারেজ বয়স সবচে কম ছিল। অলরেডি এই দলটা জুভদের হারানোর মাধ্যমে নিজেদের সামর্থ্যের ঝলকও দেখিয়েছে। এই ধারাবাহিকতার পাশাপাশি জানুয়ারিতে তিনটা ভাল সাইনিং হলে বলাই যায় সামনের সিজনে ইউরোপে মিলান বেশ সদর্পেই হাজির হবে। কে জানে হয়ত ইতালির চ্যাম্পিয়ন হয়েই। 🙂
#Forza_Milan

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

9 + 11 =