অ্যালেসসিও রোমানিওলি : ব্যয়বহুল জুয়া না মিলানের নতুন “চীনের প্রাচীর”?

 

৮৩ মিলিয়ন ইউরো। যেকোন ট্রান্সফার উইন্ডোতেই যেকোন ক্লাবের জন্য খরচ করার বেশ বড় একটা অ্যামাউন্ট। এই পরিমাণ টাকা কোন ক্লাব খরচ করে সাধারণত? গত কয়েকবছরের ধারা বিবেচনা করলে ইউরোপের প্রায় সব বড় ক্লাবই ৮৩ মিলিওনের আশেপাশেই খরচ করে। কিন্তু তাই বলে এসি মিলান ইউরোপের অন্যতম বড় ক্লাব হওয়া সত্ত্বেও ৮৩ মিলিয়ন খরচ করছে খেলোয়াড় কিনার জন্য, সেটা হজম করাটা একটু কষ্টকর।

এবার তাই-ই করেছে মিলান। ব্রাজিলিয়ান স্ট্রাইকার লুইজ আদ্রিয়ানো, কলম্বিয়ান স্ট্রাইকার কার্লোস বাক্কা, ইতালিয়ান অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার অ্যান্দ্রেয়া বার্তোলাচ্চি ও হোসে মাউরি – নতুন যৌথ মালিক থাইল্যান্ডের ব্যবসায়ী বি তায়েচানবুল আসার পর থেকে আবার আগের মত টাকা খসাতে শুরু করেছে মিলানও। সর্বশেষ তারা শত্রুশিবির এএস রোমা থেকে ২৫ মিলিয়ন ইউরো দিয়ে কিনেছে ইতালিয়ান সেন্টারব্যাক অ্যালেসসিও রোমানিওলিকে। হ্যাঁ, ভুল পড়েননি, ২৫ মিলিয়ন ইউরোই। আর রোমানিওলির বয়স?

২০ বছর।

একে ত খরচ করছে ২৫ মিলিয়ন ইউরো, যে পরিমাণ টাকা তারা শেষ কবে খরচ করেছিল হয়ত নিজেরাও সেভাবে বলতে পারবে না, আর সেটাও আবার খরচ করছে এমন একজনের উপর যাকে ডিফেন্ডারদের কথা বিবেচনা করলে একপ্রকার বাচ্চাই বলা চলে, কারণ একজন ডিফেন্ডারের ক্যারিয়ারের সেরা সময় থাকে সাধারণত ২৮ বছর বয়সের পরে। না, ভিরমি খাবেন না, মিলান এই তরুণের পিছনেই এত টাকা ঢালছে।

কে এই অ্যালেসসিও রোমানিওলি? আর তার মধ্যে এমন কি আছে যার জন্য মিলানের মত কিপ্টে ক্লাবও একেবারে ২৫ মিলিয়ন ইউরো দেওয়ার জন্য রাজী হয়ে গেল?

এএস রোমার অ্যাকাডেমি প্রোডাক্ট এই রোমানিওলি। রোমার কিংবদন্তী উইঙ্গার ব্রুনো কন্তি সর্বপ্রথম রোমানিওলির মধ্যে প্রতিভার ঝলক দেখতে পান, তাকে নিয়ে আসেন রোমার অ্যাকাডেমিতে, নয় বছর বয়সে। পরে সাবেক রোমা কোচ জেদানেক জেমান তাকে ১৭ বছর বয়সেই ফার্স্ট টিমে সুযোগ করে দেন, এই মিলানের বিপক্ষেই প্রথম ম্যাচ খেলতে নামেন রোমানিওলি। তখন রোমায় খেলা আরেক তরুণ সেন্টারব্যাক মার্ক্যুইনহোস আর এই রোমানিওলি, এই দুইজনকে নিয়ে রোমার সেন্ট্রাল ডিফেন্সের স্বপ্ন দেখেছিলেন জেমান – যে স্বপ্ন তার আর পূরণ হয়নি, ২০১৩ সালে চলে যেতে হয় জেমানকে ছাঁটাই হয়ে, মার্ক্যুইনহোসকে বিশাল অঙ্কের বিনিময়ে কিনে নেয় ফরাসী ক্লাব পিএসজি। নতুন কোচ রুডি গার্সিয়ার অধীনে অতটা কলকে পাননি রোমানিওলি, গত মৌসুমে তাকে ধারে পাঠানো হয় সাম্পদোরিয়াতে। এবং এখানেই ক্যারিয়ারের সত্যিকারের উন্নতি শুরু হতে থাকে রোমানিওলির।

hi-res-5d93f5a8a7f7383aa615599b928d0de8_crop_exact

সাম্পদোরিয়ায় গত মৌসুমে কোচ ছিলেন সিনিসা মিহায়লোভিচ। যিনি কিনা এখন মিলানের কোচ। প্যাটার্নটা বুঝতে পারছেন ত?

রোমা থেকে রোমানিওলির মত একটা raw gem কে ঘষেমেজে সিরি আ এর অন্যতম সেরা ডিফেন্ডারে পরিণত করেন মিহায়লোভিচ। মিহায়লোভিচ নিজে তাঁর খেলোয়াড়ি জীবনের প্রথমদিকে ছিলেন সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার, পরে পজিশান চেঞ্জ করে ডিফেন্ডার হয়ে যান। রোমানিওলির ক্ষেত্রেও কিন্তু জিনিসটা যথেষ্টই প্রাসঙ্গিক। রোমার অ্যাকাডেমিতে প্রথম কয়েক বছর সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার হিসেবেই খেলেছেন রোমানিওলি, পরে অ্যাকাডেমীতে সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার না থাকার দরুন ডিফেন্সে শিফট করেন তিনি। আর এটাই হয়েছে এখন পর্যন্ত রোমানিওলির ক্যারিয়ারের অন্যতম প্লাসপয়েন্ট, আগে মিডফিল্ডে খেলার জন্য রোমানিওলির অন-দ্য-বল ট্যাকটিকাল বোঝাপড়াটা অন্যান্য গড়পড়তা সেন্টারব্যাকের তুলনায় অনেক পরিপক্ক, ঠিক তাঁর বর্তমান কোচ মিহায়লোভিচের মত। এ কারণেই বোধহয় মিহায়লোভিচ-রোমানিওলি গুরু-শিষ্যের মধ্যে বোঝাপড়াটাও এত ভালো! এবং এ কারণেই নিজে মিলানে এসেই ক্লাব প্রেসিডেন্ট সিলভিও বার্লুসকোনির কাছে অ্যালেসসিও রোমানিওলিকে নিজে থেকেই চেয়েছেন সিনিসা মিহায়লোভিচ।

Mihajlovic-e1433455659848

রোমানিওলিতে মিহায়লোভিচ কতটা মুগ্ধ সেটা বোঝা যায় মিহায়লোভিচের একটা উক্তিতেই – “অ্যালেসসিও হল ইতালির নতুন নেস্তা, কিন্তু নেস্তার থেকে ট্যাকটিক্যালি ভালো।” মিহায়লোভিচ নিজে নেস্তার ডিফেন্সিভ পার্টনার ছিলেন লাজিওতে, যে দলটা ১৯৯৯ সালে কাপ উইনার্স কাপ জেতে, তাই মিহায়লোভিচের এই কথা যথেষ্ট গুরুত্ব বহন করে বৈকি!

এখন পর্যন্ত রোমানিওলির পারফরম্যান্স বিবেচনা করলে বর্তমানে মিলানের অন্যান্য ডিফেন্ডার অ্যালেক্স, ক্রিস্টিয়ান জাপাতা, ক্রিস্টিয়ান জাক্কার্ডো, গ্যাব্রিয়েল প্যালেত্তা, ফিলিপ্পে মেক্সেসের তুলনায় অনেক বেশী ডিফেন্সিভলি সলিড এই রোমানিওলি। সেটা ইন্টারসেপশানের ক্ষেত্রেই হোক, বা ট্যাকলিং এর ক্ষেত্রে হোক। গত মৌসুমে খেলেছেনও অনেক ম্যাচ, তাই সিরি আ তে এর মধ্যেই অন্যতম সেরা ডিফেন্ডার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছেন তিনি। আবার গত কয়েক মৌসুম ধরেই মিলানের ডিফেন্ডারদের মধ্যে Aerial Duel এ সমস্যা প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে। রোমানিওলি নিজেও ছয় ফিট মত লম্বা – আর ডিফেন্ড করার সময়ে তাঁর উচ্চতার প্রতি ইঞ্চি ইঞ্চির সুবিধা খুব ভালোভাবেই নিতে জানেন তিনি। তাই বলা যেতে পারে মিলান তাদের ডিফেন্সের এই সমস্যাটার সমাধান বেশ ভালোভাবেই করছে।

hi-res-56d8be50dfdd5e36150306e9312d22a4_crop_north

একসময়ে এই মিলানে বিশ্ববিখ্যাত ডিফেন্ডাররা খেলে গেছেন। পাওলো মালদিনি থেকে শুরু করে আলেসসান্দ্রো নেস্তা, আলেসসান্দ্রো কোস্টাকুর্টা, ফ্র্যাঙ্কো বারেসি, ইয়াপ স্ট্যাম, জিয়ানলুকা জামব্রোত্তা – সবাই একেকটা মিলান রূপকথার অংশ। রোমানিওলি কি এখন এই লিস্টের অংশ হবেন না জাক্কার্ডো-জাপাতা-অ্যালেক্স-সিলভেস্ট্রে দের কাতারে নাম লেখাবেন সেটা সময়ই বলে দেবে।

মূলত বাঁ পায়ের এই খেলোয়াড় মিলানে এসেই ১৩ নম্বর জার্সি নিয়েছেন। যে ১৩ নম্বর জার্সিকে মিলান রূপকথার অংশ করে দিয়েছেন রোমানিওলির মতই আরেক বাঁ পায়ের ইতালিয়ান সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার।

xAk6i

আলেসসান্দ্রো নেস্তা

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

4 × one =