অ্যালিসন বেকার : ব্রাজিলের হাতে গোলরক্ষকদের লিওনেল মেসি?

অ্যালিসন বেকার : ব্রাজিলের হাতে গোলরক্ষকদের লিওনেল মেসি?

শিরোনামটা পড়ে ম্যানুয়েল নয়্যার, জিয়ানলুইজি বুফন কিংবা ডেভিড ডা হেয়ার মত গোলরক্ষকরা ভ্রু কুঁচকাতেই পারেন। কিন্তু তাতে এএস রোমার সাবেক কোচ রবার্তো নেগ্রিসোলোর বয়েই গেছে! ভদ্রলোক যে ঘোষণা করেই দিয়েছেন তাঁর সাবেক ক্লাবের বর্তমান ব্রাজিলিয়ান গোলরক্ষক অ্যালিসন বেকার এখনকার সময়ের শ্রেষ্ঠ গোলরক্ষক, গোলরক্ষকদের লিওনেল মেসি!

কে এই অ্যালিসন বেকার? চট করে দেখে নেওয়া যাক। অ্যালিসন বেকার ব্রাজিল জাতীয় দলের এক নাম্বার গোলরক্ষক, কোচ তিতের প্রথম পছন্দ তিনি। ব্রাজিলিয়ান ক্লাব ইন্টারন্যাসিওনাল থেকে ২০১৬ সালে ইতালিয়ান ক্লাব এএস রোমায় যোগ দেওয়া এই গোলরক্ষক গত দুই বছর ধরে নিজেকে ব্রাজিল দলের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গড়ে তুলেছেন।

প্রতিযোগিতা শব্দটার সাথে অ্যালিসন বেকার এর পরিচিতি আজকে থেকে নয়। ব্রাজিলিয়ান ক্লাব ইন্তারন্যাসিওনালে থাকার সময় থেকেই ক্লাবের নাম্বার ওয়ান গোলরক্ষক হবার জন্য তাঁকে প্রতিযোগিতা করতে হত কিংবদন্তী ব্রাজিল গোলরক্ষক দিদা’র সাথে। সেখান থেকে দিদাকে হটিয়ে অ্যালিসনের ইন্তারন্যাসিওনালের নাম্বার ওয়ান গোলরক্ষক হবার পেছনের অধ্যবসায়টা তখন চোখ এড়ায়নি ইতালিয়ান ক্লাব এএস রোমার। ৭.৫ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে ইন্তারন্যাসিওনাল থেকে এএস রোমাতে আসেন তিনি।

রোমাতে এসেও সেই একই প্রতিযোগিতায় পড়েন তিনি। এবারের প্রতিপক্ষ পোলিশ গোলরক্ষক ওজিয়েইক শোয়েজনি। আর্সেনাল থেকে ধারে সেই মৌসুমে শোয়েজনিকে নিয়ে এসেছিল রোমা, তিনিই ছিলেন ক্লাবের প্রথম পছন্দের গোলরক্ষক। রোমাতে প্রথম মৌসুমটা বেঞ্চে কাটলেও অ্যালিসন বেকার এর মতে সেটা তাঁর জন্য একরকম শাপে বরই ছিল। গর্ভবতী স্ত্রীকে বেশী সময় দিতে পেরেছিলেন তিনি, সাথে শোয়েজনির মত গোলরক্ষকের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখতেও পেরেছিলেন অ্যালিসন বেকার। কিন্তু অ্যালিসন এটাও স্বীকার করেন, রোমায় দ্বিতীয় মৌসুমটাও যদি তাঁকে বেঞ্চে বসে কাটাতে হত, তাহলে তিনি ক্লাব বদল করতেন।

সেটা করতে হয়নি যদিও। গত মৌসুম শেষে রোমা থেকে ইন্টার মিলানে পাড়ি জমান কোচ লুসিয়ানো স্প্যালেত্তি, আর গোলরক্ষক ওজিয়েইক শোয়েজনিকে জুভেন্টাস নিয়ে যায় কিংবদন্তী গোলরক্ষক জিয়ানলুইজি বুফনের ব্যাকআপ হিসেবে। ফলে রোমার নতুন কোচ ইউসেবিও ডি ফ্র্যানসেস্কোর নতুন নাম্বার গোলরক্ষক হন অ্যালিসন বেকার। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে।

ক্লাবজীবনে এক মৌসুমে বেঞ্চে বসে থাকা লাগলেও সেটা তাঁর জাতীয় দলের ক্যারিয়ারে কোন প্রভাব ফেলেনি। দুঙ্গার আমলে ব্রাজিল দলে অভিষিক্ত অ্যালিসন বেকার এর উপর চোখ বন্ধ করে ভরসা করে রেখে গিয়েছেন নতুন ব্রাজিল কোচ তিতে। যদিও ব্রাজিল জাতীয় দলেও অ্যালিসনের যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী এসে গিয়েছেন, ম্যানচেস্টার সিটির ব্রাজিলিয়ান গোলরক্ষক এডারসন মোরায়েস। যুগে যুগে আউটফিল্ডে একের পর এক প্রতিভা উপহার দেওয়া ব্রাজিল দলে কখনই ভালো গোলরক্ষকের এত ভিড় ছিলনা যা কিনা এখন আছে। হিসাব করে দেখেন, শেষ কোন বিশ্বকাপে ব্রাজিল একাধিক বিশ্বমানের গোলরক্ষক নিয়ে গিয়েছিল? ১৯৯০ তে ছিল তাফারেল, ১৯৯৪ তেও সেই তাফারেল, ১৯৯৮ তে তাফারেলের সাথে উঠতি দিদা, ২০০২ সালে দিদা, ২০০৬ সালে দিদার সাথে উঠতি হুলিও সেজার, ২০১০ আর ২০১৪ তে হুলিও সেজার। এবারই ২০১৮ এর বিশ্বকাপে দুইজন বিশ্বমানের গোলরক্ষককে ফর্মের তুঙ্গে একই সাথে পাচ্ছে ব্রাজিল – অ্যালিসন বেকার আর এডারসন মোরায়েস।

এই মৌসুমে অ্যালিসন বেকার নিজেকে অবিশ্বাস্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। বর্তমান সময়ের সেরা কিছু গোলরক্ষক – ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের ডেভিড ডা হেয়া, বার্সেলোনার মার্ক অ্যান্দ্রে টের-স্টেগেন, অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের ইয়ান ওবলাক, চেলসির থিবো কোর্তোয়া – এদের সাথে তুলনামূলক একটা বিশ্লেষণেই বোঝা যাবে এই মৌসুমে অ্যালিসন বেকার কে নিয়ে কেন এত মাতামাতি হচ্ছে!

এই মৌসুমে লিগে শুধুমাত্র ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের ডেভিড ডা হেয়ার সেইভ (৮৫) অ্যালিসন বেকার (৮২) এর থেকে বেশী। গোলপোস্ট থেকে অ্যালিসনের সফল পাস দেওয়ার হার (৮২%) যেকোনো মিডফিল্ডারকে লজ্জায় ফেলে দিতে বাধ্য, গোলরক্ষকদের কথা নাহয় বাদই দিলাম। যদিও তালিকার অন্যান্য গোলরক্ষকদের তুলনায় অ্যালিসন বেকার ক্লিন শিট (পুরো ম্যাচে গোল না খেয়ে থাকা) রেখেছেন সবচাইতে কম, যদিও এর পিছনে রোমার তুলনামূলক সাধারণ মানের ডিফেন্সের দোষই বেশী। সফল পাস দেওয়ার ক্ষমতা, অন্যান্য গোলরক্ষকদের চেয়ে লং বল সফলভাবে খেলার ক্ষমতা তাঁকে এক অসাধারণ সুইপার কিপার হিসেবে গড়ে তুলেছে।

অ্যালিসন বেকার : ব্রাজিলের হাতে গোলরক্ষকদের লিওনেল মেসি?

অ্যালিসন বেকার এর সবচেয়ে বড় গুণ তিনি গোলরক্ষক হলেও স্ট্রাইকারদের মানসিকতা বুঝতে পারেন। ডিবক্সের মধ্যে এমনভাবে নিজেকে অবস্থান করেন, যাতে সর্বোচ্চ পরিমাণ জায়গা কভার করে থাকা যায়। ডিবক্সে বল যখন যে অবস্থায় থাকে সেই অনুযায়ী তিনি নিজের অবস্থান ক্রমাগত এমনভাবে পরিবর্তন করেন যাতে সর্বোচ্চ পরিমাণ জায়গা দখল করে থাকা যায়। এই সপ্তাহে রোমা বনাম নাপোলি ম্যাচটার দিকেই লক্ষ্য করে দেখুন না, রোমা ৪-২ গোলে জিতলেও অ্যালিসন না থাকলে আরও কয়েকটা গোল রোমা অনায়াসেই খেতে পারত, এই ম্যাচে ব্রাজিলিয়ান এই গোলরক্ষক একাই সেভ করেছেন ১২টা!

লিভারপুল, রিয়াল মাদ্রিদ, প্যারিস সেইন্ট জার্মেইয়ের মত বেশ কিছু ক্লাব আগ্রহী অ্যালিসনের প্রতি। বিশেষ করে লিভারপুল। সামনের মৌসুমে রোমা যদি চ্যাম্পিয়নস লিগে জায়গা করে না নিতে পারে তবে তারা তাদের সেরা কিছু খেলোয়াড় বিক্রি করে দিতে হতে পারে, সেক্ষেত্রে অ্যালিসন বেকার এর ক্লাব ছাড়ার সম্ভাবনা সর্বাধিক। ওদিকে ক্লাবের দুই গোলরক্ষক লরিস ক্যারিয়াস আর সিমোন মিনিওলেতের প্রতি বিরক্ত লিভারপুল কোচ ইউর্গেন ক্লপ অ্যালিসন বেকার কে পাওয়ার জন্য বেশ ভালোভাবেই চেষ্টা করবেন এবার!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

one × 2 =