অ্যান্দ্রে সিলভা – পর্তুগালের নতুন স্ট্রাইক ভরসা

পর্তুগালের স্ট্রাইকারভাগ্য সেরকম সুপ্রসন্ন ছিল – এ কথাটা পর্তুগালের পাঁড় ভক্তও কখনও বলবেন বলে মনে হয়না। নাহয় সেই শতাব্দীর শুরু থেকে এখন পর্যন্ত হেলদের পোস্টিগা, নুনো গোমেজ, পেদ্রো পলেতা, হুগো আলমেইদার মত সেই ঘুরেফিরে দুটো-তিনটে নামই পর্তুগালের স্ট্রাইকার হিসেবে ঘুরত না এতটা সময় ধরে। অনেক সময়ে সংকটাপন্ন অবস্থায় দেখা যায় সেই ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকেই টার্গেটম্যানের ভূমিকা পালন করতে হচ্ছে, যিনি কিনা আসলে একজন উইঙ্গার। স্ট্রাইকারের জন্য পর্তুগালের এত হাহাকার শেষ হল বলে – চলে এসেছেন এফসি পোর্তোর তরুণ তুর্কি আন্দ্রে সিলভা।

পোর্তোর মূল স্ট্রাইকার এখন এই তরুণই
পোর্তোর মূল স্ট্রাইকার এখন এই তরুণই

কে এই অ্যান্দ্রে সিলভা? ২০১১ সালে পোর্তোর যুবদলে যোগ দেওয়া এই তরুণ ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন কিন্তু উইঙ্গার ও সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার হিসেবেই। মিডফিল্ডার হিসেবেও তুখোড় ছিলেন, এতটাই যে সতীর্থরা তাঁর ডাকনাম “ডেকো” দিয়ে দিয়েছিল! ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত ইউয়েফা অনুর্ধ্ব-১৯ ইউরোতে পাঁচ গোল করে পর্তুগালকে প্রতিযোগিতার ফাইনালে তুলার পেছনে সিলভার হাত ছিল অনেক। ২০১৫ তে ফিফা অনুর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপে করেন আরও চার গোল। পর্তুগালের হয়ে অনুর্ধ্ব-২১ অভিষেকে আলবেনিয়ার বিপক্ষে করেছেন হ্যাটট্রিক। পর্তুগালের হয়ে অনুর্ধ্ব-১৯,২০,২১ দলের হয়ে মোট ৩৭ ম্যাচে ২৮ গোল করেছেন তিনি। পর্তুগালের মূল দলে রোনালদোদের সতীর্থ হয়েও যেন আরও ক্ষুরধার সিলভা। এর মধ্যেই জাতীয় দলের হয়ে পাঁচ ম্যাচে করে ফেলেছেন চার গোল, যার মধ্যে ফারো আইল্যান্ডের বিপক্ষে একটি হ্যাটট্রিকও রয়েছে, যে হ্যাটট্রিক তাঁকে পর্তুগালের ইতিহাসের সবচেয়ে কমবয়সী হ্যাটট্রিককারী হিসেবে ইতিহাসের পাতায় নাম লিখিয়েছে। পর্তুগাল কোচ ফার্নান্দো সান্তোস জাতীয় দলে এই অ্যান্দ্রে সিলভাকে নিয়ে এসেছেন দেখেই আজ ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো আবার নিজের পরিচিত উইং পজিশনে ফেরত গেছেন।

পোর্তোর মূল দলের এক অবিচ্ছেদ্য নাম হয়ে গিয়েছেন অ্যান্দ্রে সিলভা। গত মৌসুমে পোর্তোর ‘বি’ দলের হয়ে দ্বিতীয় বিভাগের সেরা খেলোয়াড় হওয়া অ্যান্দ্রে সিলভা স্বভাবতই তাই ডাক পেয়েছেন পোর্তোর মূল একাদশে। এবং এখন পর্যন্ত ২১ ম্যাচে ৮ গোল করে কোচ নুনো এসপিরিতো সান্তোর আস্থার ভালোই প্রতিদান দিচ্ছেন, তাঁর জন্য বেঞ্চ গরম করতে হয় এখন ক্যামেরুনের অভিজ্ঞ স্ট্রাইকার ভিনসেন্ট আবুবকর কে।

অ্যান্দ্রে সিলভার খেলা পর্যালোচনা করলে যা বোঝা যায়, একজন পারফেক্ট “নাম্বার নাইন” হবার প্রায় সব গুণাবলীই তাঁর আছে। অতটা শক্তিশালী স্ট্রাইকার না হলেও কিভাবে গতি ও ক্ষিপ্রতা দিয়ে মার্কার ডিফেন্ডারকে ছিটকে ফেলে গোলমুখে এগোনো যায় সেটা সিলভা ভালোই পারেন। ছোট বয়সে সেন্ট্রাল অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার হিসেবে খেলার ফলে যা হয়, তিনি অ্যাটাকিং লাইনআপের যেকোনো পজিশানেই খেলতে স্বচ্ছন্দ, টেকনিক্যালি দুর্দান্ত। তবে সবচেয়ে অসাধারণ যে গুণটা আছে তাঁর, তা হল একটা স্ট্রাইকার হিসেবে সঠিক সময়ে সঠিক জায়গায় থাকতে পারার প্রবণতাটা। খেলার পরিস্থিতি বুঝে ঠান্ডা মাথায় যেকোন গোলমুখী সুযোগ গোলে রূপান্তরিত করার অন্তর্নিহিত ক্ষমতাটা তাঁর আছে। তাঁর খেলার স্টাইল পজেশান-নির্ভর ফুটবলের জন্য অনেক কার্যকরী, কারণ দল বল হারালে তিনি প্রায়ই মিডফিল্ডে নেমে পজেশান উদ্ধার করার চেষ্টা চালিয়ে যান। পাসিংয়ে স্বচ্ছন্দ এই স্ট্রাইকার সতীর্থদের দিয়ে গোল করানোর ক্ষেত্রেও অনেক পটু। ফলে ট্রেডিশনাল টার্গেটম্যানের কাতারে ফেলা যাবেনা তাঁকে মোটেও। শারীরিকভাবে সেরকম বড় না হলেও স্ট্রাইকার হিসেবে তাঁর অনন্য  আরেক গুণ হচ্ছে তাঁর হেডিংয়ে দক্ষতা। ছয়ফুটি স্ট্রাইকার হবার কারণে অন্যান্য স্ট্রাইকারদের চেয়ে তিনি বেশ উঁচুতে লাফ দিয়ে বল হেড করতে পারেন। বিপক্ষ দলের ফুলব্যাক ও সেন্টারব্যাকের মধ্যে হাফ স্পেইসগুলো সুন্দরভাবে কাজে লাগাতে পারার কারণে ৪-৩-৩ কিংবা ৪-৪-২ যেকোন ফর্মেশানেই স্বচ্ছন্দ তিনি। পর্তুগালের স্ট্রাইকিং দুর্দশার জন্য পর্তুগীজ সমর্থকেরা তাঁকে আউট-অ্যান্ড-আউট সেন্টার ফরোয়ার্ড হিসেবে দেখতে চাইলেও একজন স্ট্রাইকার হিসেবে তাঁর ক্রসিং সামর্থ্যও দেখার মত।

Portugal v Andorra - FIFA 2018 World Cup Qualifier

তরুণ বিধায় এখনো খেলার অনেক দিকই রপ্ত করা বাকী আছে তাঁর। যেমন তাঁর সবচেয়ে বড় ত্রুটি হল তাঁর অধারাবাহিকতা। তাঁর ম্যাচপ্রতি গোল অনুপাত সন্তোষজনক হলেও প্রায়ই দেখা যায় ম্যাচের পর ম্যাচ গোলখরায় থাকেন তিনি, যেটা যেকোন স্ট্রাইকারের জন্যই খারাপ একটা দিক। আবার গোলখরার পরেই কিছু ম্যাচ এত বেশী ভালো খেলবেন যে গোলখরার কথা আর কারোর মনেই থাকবেনা!

মাত্র ৫০০ পাউন্ডে দলে নিয়ে আসা এই স্ট্রাইকারের উপর ৬০ মিলিয়ন ইউরোর প্রাইসট্যাগ এর মধ্যেই ঝুলিয়ে দিয়েছে এফসি পোর্তো। তবুও এই তরুণ স্ট্রাইকারের প্রতি আগ্রহী আর্সেনাল, জুভেন্টাস, অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের মত দলগুলো।

এখন রোনালদোর কাঁধের পাহাড়সম ভরের ভার কি এই অ্যান্দ্রে সিলভা নিতে পারবেন? উত্তরটা সময়ের কাছেই তোলা থাক!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

12 − twelve =