অস্ট্রেলিয়াকে ক্ষমা করা কঠিনই হবে!

অস্ট্রেলিয়ার সফর স্থগিত করা নিয়ে একটি ম্যারাথন লেখা। পড়তেও ম্যারাথন দৌড়ানোর মত স্ট্যামিনা লাগবে। কাজেই, পড়লে নিজ দায়িত্বে!
………………..
গত কয়েকদিনের ঘটনাপ্রবাহে সিদ্ধান্তটি অবধারিতই ছিল। একেকটা দিন গড়াচ্ছিল আর একে একে নিভছিল আশার দেউটি। তারপরও মনের কোনো একটা কোণে আশার সলতে নিশ্চয়ই জ্বলছিল। নইলে নিশ্চিত ব্যাপারটি জানার পরও এমন হতাশার স্রোতধারা মনে কেন বইবে!
নিরাপত্তা নিয়ে সফর বাতিল ক্রিকেটে নতুন কিছু নয়। পাকিস্তানের কথা বাদই থাকল। বিশ্বকাপের মতো আসরে পর্যন্ত হয়েছে। ১৯৯৬ সালের জানুয়ারিতে কলম্বোয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বোমা হামলা করল এলটিটিই। পরের মাসে বিশ্বকাপের ম্যাচ খেলতে কলম্বো যায়নি অস্ট্রেলিয়া ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ২০০৩ বিশ্বকাপে কেনিয়ায় যায়নি নিউ জিল্যান্ড, রবার্ট মুগাবে সরকারের সঙ্গে ঝামেলার কারণে জিম্বাবুয়েতে যায়নি ইংল্যান্ড।
তবে এবার বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যেটা হলো, সেটা ‘এক্সট্রা অর্ডিনারি।’ আগে যেসব দেশে সফর বাতিল হয়েছে, সেসব দেশের সঙ্গে আমাদের প্রেক্ষাপটকে মেলানো যাবে না কোনো ভাবেই। অস্ট্রেলিয়ার সফর বাতিল ছিল বিণামেঘে বজ্রপাত। গত শনিবার অস্ট্রেলিয়া যখন নিরাপত্তার ঝুঁকিতে সফর পেছানোর কথা জানালো, শুধু বাংলাদেশ নয়, আমি নিশ্চিত, চমকে গিয়েছিল পুরো ক্রিকেট বিশ্বই। বাংলাদেশে এই সময়ে নিরাপত্তার ঝুঁকি? কিভাবে সম্ভব! প্রশ্ন আর বিস্ময়টা প্রায় সবাইকেই ছুয়েঁ যাওয়ার কথা।
‘দেশে জঙ্গি আছে’, ‘জঙ্গি নেই’, ‘অমুক আছে, তমুক নেই’, ‘এটা হয়, ওটা হয় না’…আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা-নেত্রীদের অনেক কথার উদাহরণ টেনে অনেকে বলতে পারেন যে সমস্যা আমরা তৈরি করেছি। কিন্তু আপনি প্রকাশে স্বীকার করেন আর নাই করেন, অস্ট্রেলিয়া সফর পেছানোর সময় বাংলাদেশের যা অবস্থা, এতটা শান্ত ও স্থিতিশীল পরিস্থিতি গত কয়েক বছরে ছিল কিনা সন্দেহ। অস্ট্রেলিয়া যেভাবে সফর পেছাল, ‘আউট অব দা ব্লু’ টার্মটার জন্ম এইসব মুহূর্তের জন্যই।
নিজের কথা বলতে পারি, আমি ছুটিতে ছিলাম। আর ছুটিতে বাড়ী গেলে ক্রিকেটের বাইরে থাকার চেষ্টা করি, ফেসবুকেও ঢু মারি কদাচিৎ। গোটা দুনিয়া জানার পর সম্ভবত আমি জেনেছি, এবং বিশ্বাস করিনি। অনেক পরে, খবরটি স্বচক্ষে দেখে তবেই বিশ্বাস হয়েছে। আমি চমকে গেছি, আরও অনেককে চমকে যেতে দেখেছি। তবে যেহেতু অস্ট্রেলিয়া, জানি তারা কতটা প্রফেশনাল, কাজেই জানতাম, কারণ অবশ্যই আছে। এজন্যই জানার ও বোঝার অপেক্ষায় ছিলাম।
ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার নিরাপত্তা পরিদর্শক দল বাংলাদেশে আসার পর বিসিবি যে তৎপরতা দেখিয়েছে, সেটাকে অসাধারণ ও অবিশ্বাস্য বললেও কম বলা হয়। মাত্র কয়েক ঘন্টার নোটিশে এবং দেড়দিনের মধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, র‌্যাব, পুলিশ, এনএসআই, ডিজিএফআই সহ সব নিরাপত্তা সংস্থা, এমনকি প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠক করিয়ে দেওয়া হয়েছে। বোর্ড প্রেসিডেন্ট প্রধানমন্ত্রীর খুব কাছের মানুষ বলেই এত দ্রুত এতসব সম্ভব হয়েছে। বোর্ড প্রধান বলেছেনও যে প্রধানমন্ত্রী সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন পুরো প্রক্রিয়ায়।
সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ বা হুমকির কথা জানায়নি অস্ট্রেলিয়া। সেটা না জানানোর অধিকার তাদের আছে। যতদূর শোনা গেছে, বাংলাদেশে স্থায়ী অস্ট্রেলিয়ান ও নিউ জিল্যান্ড্যাররা প্রতিবছর একটি অনুশ্ঠানে মিলিত হয়, ‘গ্লিটার বল।’ সেই অনুষ্ঠানে হামলার কোনো পরিকল্পনা হয়ত ছিল। ২৬ বছর ধরে চলে আসা সেই অনুষ্ঠান বাতিলও করা হয়েছে এবার। তার পরও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ব্যাপারটি দেখা হয়েছে। সবগুলো নিরাপত্তা সংস্থার প্রধানরা ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার প্রতিনিধি দলকে অভয় দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা উপদেষ্টা নিজে বলেছেন, “আমি দায়িত্ব নিচ্ছি, আপনাদের কোনো সমস্যা হবে না।”
গুলশানে ইতালিয়ান নাগরিক হত্যার পর চিত্র অবশ্যই কিছুটা পাল্টেছে। অস্ট্রেলিয়ার শঙ্কিত হওয়ার কারণও আছে। তবে সেই শঙ্কাটা এমন উচ্চতা ছোঁয়ার কোনো কারণ নেই যে সফর বাতিল করতে হবে! বিশ্বের কোনো দেশে বিদেশী মারা যায় না? বাংলাদেশে বরং কমই হয়। দক্ষিণ আফ্রিকায় যে পরিমাণ বাংলাদেশীকে খুন করা হয়, সেটিকে বিবেচনায় নিলে তো ওই দেশের ধারে কাছে আমাদের ক্রিকেট দলের যাওয়ার কথা নয়! ভারতে হয় না এসব?
অস্ট্রেলিয়া সরকারের ‘গ্লোবাল টেরর ইনডেক্স’-এ ভারত ৬ নম্বরে, বাংলাদেশ ২৩ নম্বরে। তাহলে কি ভারতে ক্রিকেট হবে না? বলার অপেক্ষা রাখে না, এই মুহূর্তে অস্ট্রেলিয়ার ভারত সফর থাকলে সেটা নিয়ে ‘টু’ শব্দটি করত না ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া। বিসিসিআইয়ের প্রভাব ও অর্থের কাছে পাত্তা পেত না নিরাপত্তার শঙ্কা।
ঘটনাপ্রবাহ হয়ত ক্রিকেটের সীমানা ছাড়িয়ে গেছে। অস্ট্রেলিয়ার হঠাৎ সফর পেছানো আর তাতের নিরাপত্তা পরিদর্শক দল এখানে থাকতেই বিদেশী নাগরিক হত্যার লিংক আপ চাইলে করা যায়, আতালিয়ান নাগরিক খুন হলো, তারা অ্যালার্ট জারি করল নাম করল যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্য-কানাডা, আন্তর্জাতিক রাজনীতি বা অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কূটচাল থাকতে পারে, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট রাজনীতির খেল হতে পারে। বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দলকে পাকিস্তানে পাঠানো বা বিশ্ব ক্রিকেটের তিন মোড়লের কোনো সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ হতে পারে, বিসিবিকে ‘শিক্ষা’ দেওয়ার ব্যাপার থাকতে পারে। এসব সত্যি হোক বা না হোক, সবকিছুর পরও, নিরাপত্তার ঝুঁকিতে বাংলাদেশে কোনো দল ক্রিকেট খেলতে আসতে পারছে না, এই মুহূর্তে সেটা মানতে পারছি না, পারব না।
১৯৯৮ সালে দেশের প্রায় পুরোটা যখন বন্যায় ডুবে, তখন আইসিসির সহযোগি দেশ বাংলাদেশ নক আউট বিশ্বকাপের আসর আয়োজন করেছে দারুণ সফল ভাবে। গত নির্বাচনকে ঘিরে বিএনপি-জামাতের নৈরাজ্যের সময়টায় বাংলাদেশ থেকে ওয়ার্ল্ড টি-টোয়েন্টি চলে যায় যায় বলে অবস্থা। সেখান থেকে বাংলাদেশ ঠিকই সফল ভাবে আয়োজন করেছে। অনেক বেশি হুমকি ছিল তখন, পরিস্থিতি ছিল বহুগুণে খারাপ। তারপরও ২৪টি দলকে একসঙ্গে অভূতপূর্ব নিরাপত্তা দিয়েছে বাংলাদেশ। এবারও একটি অস্ট্রেলিয়া দলকে নিরাপত্তা দিতে না পারার কারণ নেই।
বিসিবি প্রধান মঙ্গলবার সন্ধ্যায় আমাদের বলেছেন, “অস্ট্রেলিয়াকে যে নিরাপত্তার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, বিশ্বের আর কোনো দেশে কখনোই কোনো দলকে তেমন কিছুর প্রস্তাব দেওয়া হয়নি। এরপর আমাদের আর কিছু করার নেই।” আসলেই এরপর আর কিছু করার ছিল না নেই। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার নিরাপত্তা দলটির প্রধান ছিলেন যিনি, শন ক্যারল, নেহায়তই স্রেফ একটি বোর্ডের নিরাপত্তা উপদেষ্টা। এবং এটা বিশ্বকাপ বা কোনো আইসিসি ইভেন্টও না। তারপরও রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সব ব্যক্তির সঙ্গে বৈঠকের সম্মান ক্যারলকে দেওয়া হয়েছিল। আমি বাজী ধরে বলতে পারি, আর কোনো দেশে এটা সম্ভব হত না। এত দ্রুত তো নয়ই। আমাদের বোর্ড প্রেসিডেন্ট প্রধানমন্ত্রীর খুব ঘনিষ্ঠ বলেই এটা সম্ভব হয়েছিল। তবুও অস্ট্রেলিয়াকে বোঝানো গেল না। কিংবা তারা বুঝেও বুঝতে চাইল না।
বোর্ড প্রেসিডেন্ট বলেছিলেন, এরপরও অস্ট্রেলিয়া না এলে সেটি নিরাপত্তার কারণে নয়, অন্য কিছু আছে। আসলেই হয়ত সেটিই। অবশ্যই অন্য কিছু আছে।
ক্রিকেট তো আর যুদ্ধ নয়। অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে এখন যুদ্ধ বা লড়াইয়েরও কিছু নেই। অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে খেলতেও হবে। সুযোগ খুঁজতে হবে তাদের এদেশে আনার। আগামী জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে হওয়ার কথা অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট বিশ্বকাপ। সেটি নিয়েও এখন শঙ্কার কারণ আছে। ক্রিকেট কূটনীতি তাই চালিয়েই যেতে হবে।
তবে আপাতত…যেটা হয়েছে, সেটা কোনো ভাবেই হতে পারে না। অস্ট্রেলিয়া যেটা করেছে সেটা কোনো ভাবেই তারা করতে পারে না। যেটা আমরা মানতে বাধ্য হচ্ছি, সেটা কোনোভাবেই মানতে পারছি না। কোনো ভাবেই, কোনো যুক্তিতে, কোনো হিসাব-বিবেচনাতেই এখনকার বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের ক্রিকেট এটা ডিজার্ভ করে না।
এটা শুধু বাংলাদেশ ক্রিকেটের ব্যাপার নয়। নিরাপত্তা ঝুঁকির ধুয়া তুলে বাংলাদেশে না আসা মানে আমার দেশ এবং দেশের মানুষদের অপমান করা। ছোটো করা। শুধু ক্রিকেট সাংবাদিক নয়, এই দেশের একজন সাধারণ নাগরিক হিসবে আমি প্রচণ্ড অপমানিত বোধ করেছি, করছি। খুব বাজে, তিক্ত অনুভূতি এটা।
সবকিছুই হয়ত আবার স্বাভাবিক হবে। তবে বরাবরই সফল আয়োজক হিসেবে বাংলাদেশের যে খ্যাতি, সেটায় কলঙ্কের দাগ লাগিয়ে দেওয়ার জন্য অস্ট্রেলিয়াকে ক্ষমা করা কঠিনই হবে!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

7 − 3 =