অমানুষ রোনালদো আর অ্যালেগ্রির ভুল পরিকল্পনা : প্রথম লেগে মাদ্রিদের জয়

অমানুষ রোনালদো আর অ্যালেগ্রির ভুল পরিকল্পনা : প্রথম লেগে মাদ্রিদের জয়

চ্যাম্পিয়নস লিগের কোয়ার্টার ফাইনালের প্রথম লেগে আজ জুভেন্টাসের তুরিনে জুভেন্টাসকে ৩-০ গোলে হারিয়ে দিয়ে সেমিফাইনালে এক পা দিয়েই রাখলো রিয়াল মাদ্রিদ। জোড়া গোল করে মাদ্রিদের এই জয়ে সবচেয়ে বড় রসদ জুগিয়েছেন দলের সবচেয়ে বড় সুপারস্টার ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, বাকী গোলটা ব্রাজিলিয়ান লেফটব্যাক মার্সেলোর। দ্বিতীয় লেগে এখন মাদ্রিদের মাঠে গিয়ে মাদ্রিদকে অন্ততপক্ষে চার গোলের ব্যবধানে হারাতে হবে জুভেন্টাসের, যা মোটামুটি অসম্ভবই বলা চলে। তার উপর এই লেগে লাল কার্ড খেয়ে মাঠের বাইরে চলে গিয়েছেন জুভেন্টাসের হয়ে খেলা আর্জেন্টিনার তরুণ স্ট্রাইকার পাওলো ডিবালা, ফলে দ্বিতীয় লেগে জুভেন্টাসকে তর্কযোগ্যভাবে সবচেয়ে বড় অস্ত্রটি রেখেই তারপর লড়তে নামতে হবে। ওদিকে টানা হলুদ কার্ড খাওয়ার অপরাধে পরবর্তী ম্যাচ খেলতে পারবেন না রিয়াল মাদ্রিদের অধিনায়ক, সেন্টারব্যাক সার্জিও রামোসও।

কিন্তু গত ছয় বছর ধরে ইতালির চ্যাম্পিয়ন দলকে আবারও কিভাবে প্রথম লেগে তাদের মাঠে গিয়েই এত সহজে হারিয়ে আসলো রিয়াল মাদ্রিদ? একটু মন দিয়ে খেলা দেখলেই বোঝা যাবে জুভেন্টাসের সমস্যা কি কি হয়েছে গোটা ম্যাচে!

দুই দলই ৪-৪-২ ফর্মেশানে ম্যাচ শুরু করে। দুই দলের মূল একাদশ ছিল অনেকটা এরকম –

অমানুষ রোনালদো আর অ্যালেগ্রির ভুল পরিকল্পনা : প্রথম লেগে মাদ্রিদের জয়
রিয়াল মাদ্রিদ একাদশ
অমানুষ রোনালদো আর অ্যালেগ্রির ভুল পরিকল্পনা : প্রথম লেগে মাদ্রিদের জয়
জুভেন্টাস একাদশ

৪-৪-২ তে খেললেও মাঝে মাঝেই রিয়াল মাদ্রিদের ফর্মেশানে বেশ কয়েকজনের বিশেষ কিছু ভূমিকা ছিল। লুকা মডরিচকে ডানদিকের মিডফিল্ডার হিসেবে খেলানো হলেও তিনি যেহেতু মাঝেই ভালো খেলেন, তাকে মাঝে আসার সুযোগটা করে দিচ্ছিলেন মাদ্রিদ রাইটব্যাক দানি কারভাহাল। কারভাহাল নিজে পুরো ডানপ্রান্ত দৌড়ে বেড়িয়েছেন, ফলে মডরিচ চাইলেই মাঝ থেকে নিজের স্বাভাবিক খেলা চালাতে পেরেছেন। ওদিকে ইসকোর পজিশন মাঠের বামপ্রান্তের মিডফিল্ডার হিসেবে দেখানো হলেও তাকে মোটামুটি স্বাধীন ভূমিকায় (ফ্রি রোল) খেলতে দেওয়া হয়েছিল, তিনি ক্রমাগত ম্যাচের পরিস্থিতি অনুযায়ী মাঠের বামদিকেও খেলেছেন, আবার রোনালদো আর বেনজেমাকে সামনে রেখে নিজে সেন্ট্রাল অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার হিসেবেও খেলেছেন। বামদিকে রোনালদো আর মার্সেলোর সাথে বেশ সমন্বয় করে খেলেছেন, ফলে জুভেন্টাসের ডানদিকে মাঝে মাঝেই সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছিল। এর জ্বলন্ত প্রমাণ হল ম্যাচের প্রথম গোল। তিন মিনিটেই বামদিক থেকে জুভেন্টাস রাইটব্যাক মাত্তিয়া ডি শিলিওকে বোকা বানিয়ে ডি-বক্সে মাটিঘেঁষা ক্রস পাঠান ইসকো, ডি-বক্সে ক্ষুধার্ত গোলশিকারীর মত ওঁত পেতে থাকা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর তাতে গোল করতে সমস্যা হয়নি মোটেও। তাও জুভেন্টাস চাইলে গোলটা আটকাতে পারত, তা সম্ভব হয়নি রক্ষণাত্মক ভুলের কারণে। ডিবক্সে রোনালদো একরকম ফাঁকাই দাঁড়িয়েছিলেন, ডিফেন্ডার আন্দ্রেয়া বারজাগলি ঠিকঠাকমত রোনালদো কে মার্ক করতে পারেননি, ফলে যা হবার তাই-ই হয়েছে। দুই সেন্টারব্যাক কিয়েল্লিনি আর বারজাগলির মধ্যে যোগাযোগ ও সমন্বয়ের ঘাটতিও দেখা গেছে এই মুহূর্তে। ৩৩ বছর বয়সে নিজের খেলার স্টাইল নতুন করে সৃষ্টি করা এই রোনালদোকে আটকানোর সামর্থ্য ছিল না বারজাগলির।

নিষেধাজ্ঞার খড়্গে পড়ে এই ম্যাচ খেলতে না পারা জুভেন্টাসের বসনিয়ান সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার মিরালেম পিয়ানিচের জায়গায় এ ম্যাচে কোচ ম্যাসিমিলিয়ানো অ্যালেগ্রি নামিয়েছিলেন তরুণ উরুগুইয়ান সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার রড্রিগো বেন্তাঙ্কুরকে। তাকে খেলাতে গিয়ে বেঞ্চে বসে থাকতে হয়েছে পোড় খাওয়া ফরাসী ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার ব্লেইজ মাতুইদিকে। বেন্তাঙ্কুরকে নিয় একরকম বাজিই খেলেছিলেন অ্যালেগ্রি। যদিও প্রথমার্ধে হলুদ কার্ড খেয়ে বড় মঞ্চে নিজের অনভিজ্ঞতাকেই প্রকাশ করেছেন বেন্তাঙ্কুর, যদিও পরবর্তীতে পুরো ম্যাচ ভালোই খেলেছেন। জুভেন্টাসের দুই সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার স্যামি খেদিরা আর রড্রিগো বেন্তাঙ্কুর মিডফিল্ডে বেশ এগিয়ে এসে অবস্থান নিতে চেয়েছিলেন রিয়াল মাদ্রিদের স্বাভাবিক খেলার ব্যাঘাত ঘটানোর জন্য ও সামনে থাকা রোনালদো যাতে পাস না পান তা নিশ্চিত করার জন্য। কিন্তু এইখানে অসাধারণ এক ট্যাকটিকসের খেলায় মাদ্রিদ কোচ জিনেদিন জিদান হারিয়ে দিয়েছেন জুভেন্টাস কোচ ম্যাসিমিলিয়ানো অ্যালেগ্রিকে। জুভেন্টাসের পাস মাস্টার মিরালেম পিয়ানিচ না থাকার পূর্ণ সুবিধা নিয়েছেন জিদান এক্ষেত্রে, নিজের দুই পাস মাস্টার ইসকো আর ক্রুসকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন মাঝমাঠে খেদিরা আর বেন্তাঙ্কুরকে নিজের জায়গা থেকে সরানোর জন্য, চতুর পাস আদান-প্রদান ও মুভমেন্টের মাধ্যমে। ক্রুস আর ইসকো পুরোটা ম্যাচ মোটামুটি কাছাকাছি অবস্থানে থেকেই খেলে গেছেন, ফলে দুইজনের মধ্যে এই কাজ করার জন্য সমন্বয়টা হয়েছে অনেক ভালো। মূলত এখানেই অ্যালেগ্রি হার মেনেছেন।

মিডফিল্ডে খেদিরা, বেন্তাঙ্কুর, ডি শিলিও, ডগলাস কস্টা প্রভৃতি খেলোয়াড়দের দিয়ে জুভেন্টাস যে ব্লক বানিয়েছিলো মাদ্রিদের মাঝমাঠের পাস আদান-প্রদানের খেলাটাকে ব্যাহত করার জন্য, জিদান এক্ষেত্রে ক্রুস-ক্যাসেমিরো-ইসকোকে ব্যবহার করে প্রায় সময়ই সম্পূর্ণ ব্লকটাকে মাঠের মধ্যখান থেকে নিজেদের বামদিকে নিয়ে যাচ্ছিলেন, ফলে সামনে এগোনোর জন্য অনেক জায়গা ফাঁকা পেয়েছেন মাদ্রিদ রাইটব্যাক দানি কারভাহাল, যে সুযোগের সদ্ব্যবহারও করেছেন তিনি অসাধারণভাবে। মাঝে মাঝেই জুভেন্টাস ক্যাসেমিরোর উপরে চড়াও হচ্ছিল তাঁর কাছ থেকে বল কেড়ে নিয়ে আক্রমণে যাওয়ার জন্য, কিন্তু ক্যাসেমিরোর পিছে রামোস-ভ্যারেনের দেওয়াল থাকায় সেসব আক্রমণ অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়েছে। আর যদিও কখনো কখনো জুভেন্টাস এক্ষেত্রে সফলতা পেয়ে বল নিয়ে আক্রমণ করতে পেরেছে, বিশেষত স্যামি খেদিরা প্রায় সময়ই রিয়াল মাদ্রিদের ডিফেন্স ও মিডফিল্ডের মধ্যেকার ফাঁকটা কাজে লাগিয়ে আক্রমণে উঠে যাচ্ছিলেন, কিন্তু তাও তারা গোল করতে পারেনি গোলবারের সামনে দুই স্ট্রাইকার গঞ্জালো হিগুয়াইন আর পাওলো ডিবালার হতাশাজনক পারফরম্যান্সের কারণে।

অমানুষ রোনালদো আর অ্যালেগ্রির ভুল পরিকল্পনা : প্রথম লেগে মাদ্রিদের জয়
এই গোল আটকায় সাধ্য কার?

গঞ্জালো হিগুয়াইনের খারাপ খেলা নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। উনি খারাপ খেলবেন এটা সূর্য পূর্ব দিকে ওঠার মতই স্বাভাবিক। তবে হতাশ করেছেন পাওলো ডিবালা। এমনিতেই আর্জেন্টিনা কোচ হোর্হে সাম্পাওলি একরকম ঘোষণাই দিয়ে রেখেছেন বিশ্বকাপ দলে জায়গা নাও হতে পারে “নতুন মেসি” খ্যাত এই জুভেন্টাস স্ট্রাইকারের, কেননা দুইজনের খেলার স্টাইলে রয়েছে অস্বাভাবিক মিল। কিন্তু ডিবালা হতাশ করেছেন অন্য কারণে। গত চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে এই রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষেই প্রথমার্ধেই একটা হলুদ কার্ড খেয়ে প্রচণ্ড নার্ভাস হয়ে গিয়ে বাকী সময়টা অনেক গা বাঁচিয়ে খেলেছিলেন তিনি, ফলে হাফটাইমে ড্রেসিংরুমে ক্ষিপ্ত হয়েছিলেন ডিবালার তৎকালীন জুভ সতীর্থ ব্রাজিলিয়ান রাইটব্যাক দানি আলভেস আর ইতালিয়ান সেন্টারব্যাক লিওনার্দো বোনুচ্চি। হাতাহাতিও হতে লেগেছিল, যদি না আন্দ্রেয়া বারজাগলি এসে না থামাতেন। পরে অনেকটা এই ঘটনার জন্যই ক্লাব ছাড়েন আলভেস আর বোনুচ্চি (আলভেস এখন পিএসজিতে, বোনুচ্চি মিলানে) বলে শোনা যায়। আজকেও ম্যাচে হলুদ কার্ড একটা খেয়ে পুনরায় নার্ভাস হয়ে পড়েন ডিবালা, তবে এবার আরও এক কাঠি সরেস হয়ে অপরিপক্কতার চূড়ান্ত নিদর্শন দেখিয়ে লাল কার্ড খেয়ে বসেন তিনি। বড় ম্যাচে স্নায়ু শক্ত না রাখতে পারার এই দুর্বলতা তাকে ভোগাবে, এ কথা বলাই যায়। আজকেই তাঁর কাছে সুযোগ ছিল অসাধারণ খেলে আর্জেন্টিনার কোচ হোর্হে সাম্পাওলিকে দেখিয়ে দেওয়ার যে না – তিনিও পারেন আর্জেন্টিনার আশা ভরসার প্রতীক হতে। কিন্তু না, এই এক লাল কার্ড খুব সম্ভবত আর্জেন্টিনার হয়ে রাশিয়া বিশ্বকাপ খেলাতেও লালবাতি জ্বালিয়ে দিল ডিবালার!

অমানুষ রোনালদো আর অ্যালেগ্রির ভুল পরিকল্পনা : প্রথম লেগে মাদ্রিদের জয়

আর সবশেষে বলতে হয় রোনালদোর কথা। ম্যাচে জুভেন্টাসের খেলোয়াড় বা কোচ যদি এসব ছোটখাট ভুল নাও করতেন, তাও হয়ত রিয়াল মাদ্রিদ একই ব্যবধানে জিতত। আর তা জিতত শুধুমাত্র একটা মানুষের কল্যাণে। তিনি ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। ৩৩ বছর বয়সে এসেই সেই একই ক্ষুধা, নিজেকে ভেঙ্গে গড়ার চেষ্টা, প্রতিনিয়ত নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়া – এ কোন স্বাভাবিক মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। জুভেন্টাস স্টেডিয়ামের হাজার হাজার সমর্থক আজকে দাঁড়িয়ে ম্যাচ শেষে রোনালদো কে অভিবাদন এমনি এমনি জানাননি। চ্যাম্পিয়নস লিগে নিজের অন্যতম সেরা ম্যাচটা আজকেই খেলেছেন রোনালদো, নিজের ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা গোলটাও হয়তোবা আজকেই করেছেন। যে গোলটার  মাহাত্ম্য এতটাই ছিল, জুভেন্টাসের সব মনোবল, ঘুরে দাঁড়ানোর ইচ্ছা, সকল চেষ্টার বাঁধ – এই এক গোলই শেষ করে দেয়। চ্যাম্পিয়নস লিগে এই নিয়ে টানা দশ ম্যাচ গোল করলেন তিনি। এই দুই গোলে চ্যাম্পিয়নস লিগে তাঁর গোল দাঁড়ালো ১১৯টা। এই নিয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগে জুভেন্টাসের বিপক্ষে নয়টা গোল করলেন তিনি। এই প্রতিযোগিতায় অন্য কেউ একটা নির্দিষ্ট প্রতিপক্ষের বিপক্ষে এর থেকে বেশী গোল করেনি!

সেমিফাইনালের পরিকল্পনা শুরু করেই দিতে পারেন এখন জিদান!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

4 × two =