অঘটন ? নাকি আরেকটি সফল উপাখ্যানের শুরু ?

ব্র্যাডম্যানের দেশের বিশ্বকাপের পঞ্চম ম্যাচ। তাতে মুখোমুখি ওয়েস্ট ইন্ডিজ আর আয়ারল্যান্ড । ২০০৭ এ প্রথম বিশ্বকাপ খেলার পর থেকে ক্রিকেট বিশ্বকে নিয়মিত চমকে দেওয়া যেন রীতিতে পরিণত হয়েছে আইরিশদের জন্যে । আর তারই ধারাবাহিকতায় ধুঁকতে থাকা ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলকে নিয়ে আজ আইরিশরা রিতিমত হেলাফেলা করল । ৩০৫ রানের টার্গেটটাকে চুমু খেল আইরিশ আভিজাত্যে , পুরো ইনিংস দারুন আধিপত্য বিস্তার করে । তবে জাত ক্রিকেট রোমান্টিক হলে আপনার খুব একটা ভড়কে যাবার কথা নয় । কারণ আমার ব্যক্তিগত মত হলো, ক্রিকেট মাঠে আইরিশদের নিবেদন আর পেশাদারিত্ব পাকিস্তান, জিম্বাবুয়ে আর বাংলাদেশের মত দলগুলোর জন্যে রীতিমত ঈর্ষাদায়ক ।একটা প্রশ্ন খুব মনে বাজছে । ম্যাচের আগে এবং ম্যাচের পরে আসলে কেমন লেগেছে আয়ারল্যান্ড ক্রিকেট দলের ক্যারিবীয়ান কোচ ফিল সিমন্সের ? কোচ সিমন্সের মনের সাথে মনেপ্রাণে ক্যারিবীয়ান সিমন্স কি পেরে উঠেছেন ?

বিশ্বকাপের আগের চারটি ম্যাচেই জিতল আগে ব্যাট করা দল আর আগের চারটে ম্যাচেই আগে ব্যাট করা দল করলো ৩০০ পেরোনো টোটাল । সেই হিসেব অবশ্য মাথায় রাখলেন না আইরিশ ক্যাপ্টেন উইলিয়াম পোর্টারফিল্ড । পোর্টারফিল্ড যে সাহস আর সামর্থ্যে পূর্ণ এক দলের নেতা ! টসে জিতে ব্যাটিং এ পাঠালেন তরুণ জেসন হোল্ডারের ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ।

ক্রিকেটের মজাটাই এখানে ! কেউ ঝড়ো ব্যাট করে চমকে দেন, আবার ক্রিস গেইলের মতো ট্র্যাক রেকর্ড থাকলে কেউ কেউ স্লো ব্যাট করেও চমকে দিতে পারেন । ছন্দে থাকা গেইলের ব্যাটিং দেখা ছাড়া নন স্ট্রাইকে থাকা ব্যাটসম্যানের সাধারণত কোন কাজ থাকে না । তবে ঐ যে বললাম ! ক্রিস গেইল চমকটা দিলেন রয়ে সয়ে শুরু করেই । আউটও হলেন প্রথম দুইটা উইকেট পড়ার পরে । তবে তাতে আদতে দলের কোন লাভ হয় নি । জর্জ ডকরেলের বাঁহাতি স্পিনটা যেন বড্ড বেশি দুর্বোধ্য লাগলো সুনিল নারিনের টীমমেটদের । স্যামুয়েলস, রামদিন আর গেইলের উইকেট তুলে নিয়ে ছেঁটে দিলেন ক্যালিপ্সো টপ অর্ডার । নিজের ৩য় শিকার হিসাবে ডকরেল যখন রামদিনকে ফেরান তখন স্কোরবোর্ড দেখাচ্ছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ৮৭/৫ !

আইরিশদের উড়ন্ত সূচনা বোলিংয়ে
আইরিশদের উড়ন্ত সূচনা বোলিংয়ে

তারপরের স্টোরিটার সাথে মেলাতে পারেন গতকাল মিলার আর ডুমিনির উপাখ্যানের সাথে । না ! সিমন্স আর স্যামির জুটিটা ততোটা বড় হয় নি ! অবিচ্ছিন্ন থেকে ইনিংসও শেষ করতে পারেন নি ! হয় নি জোড়া শতকও ! ভাঙে নি আগের বিশ্বরেকর্ডও । তবে আজকের ওয়েস্ট ইন্ডিজ ইনিংসে এই জুটির দাম কোনভাবে কম নয় । জুটিটা ১৫৪ রানের ! তাতে স্যামির চার ছক্কায় ঝড়ো ৮৯ আর লেন্ডল সিমন্সের স্থিতিশীল ৬০ রান ! শেষতক স্যামি যাবার পরে রাসেল এসে দিয়ে যান ১৩ বলে ২৭ রানের ফিনিশিং টাচটা । কাঙ্খিত শতরানটাও এলো লেন্ডল সিমন্সের ।

সিমন্সের শোতকে ভালো পুঁজি  ক্যারিবীয়দের
সিমন্সের শতকে ভালো পুঁজি ক্যারিবীয়দের

৪০ ওভার শেষে ৫ উইকেটে ১৮০ রানে থাকা ওয়েস্ট ইন্ডিজের ইনিংস শেষে সংগ্রহ ৭ উইকেটে ৩০৪ রান !

ছোটদল শব্দটা যে আইরিশদের জন্যে ব্যবহার করাটা পাপ তা আয়ারল্যান্ড বুঝিয়ে দেয় ব্যাটিং এ নেমে তাদের চেইজ করার স্টাইল দিয়ে । সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার ছিলো আইরিশরা কখনোই ৩০৫ নামের ফিগারটা তাদের মাথায় রাখে নি । অনেক বড় দলের চাইতে অনেক বেশী প্রফেশনালিজমের রেশ রেখেই তারা চেইজ শুরু করে সাবলীলভাবে । ৭১ রানের ওপেনিং জুটিতে পোর্টারফিল্ড আর স্টার্লিং কোন বিলাসী শট না খেলে বেছে নিয়েছেন উইকেটের চারপাশে কপিবুক কিছু শট । পোর্টারফিল্ড যাবার পরে এড জয়েস নামলেই যেন আরো চড়াও হয়ে উঠেন স্টার্লিং । পল স্টার্লিং !!

স্টার্লিং এর মনোবল গুঁড়িয়ে দেওয়া ইনিংস
স্টার্লিং এর মনোবল গুঁড়িয়ে দেওয়া ইনিংস

রিকোয়ার্ড রান রেটটাকে একটু একটু করে মাটিতে নামানোর কাজটা করে যান এ দুজন । ১ম আর ২য় উইকেট জুটি যদি ভিত হয়ে থাকে আইরিশদের , তাহলে তাদের ম্যাচ থেকে ছিটকে দেয় ৩য় উইকেট জুটিতে । স্টার্লিং ফিরে যাবার পর রানরেট তো কমেই নি , বরং এড জয়েস আর নিয়াল ও ব্রায়েন আগের জুটির চাইতেও আগ্রাসী হয়ে তুলে নেন ৬৯ বলে ৯৬ রানের জুটি ।এড জয়েস ফিরে গেলেও হাত ছোঁয়া দুরত্বে তখন জয় !
আর এই সহজ কাজটা করতে আইরিশরা কিছু উইকেট হারিয়েছে বটে , তবে ভয়টা তাদের পেতে হয় নি । কারণ একপাশ থেকে ক্যারিবীয়দের ধোলাইয়ের কাজটা চালিয়ে যাচ্ছিলেন নিয়াল ও ব্রায়েন । ১১ চারে ৬০ বলে ৭৯ রানের ইনিংস খেলে ম্যাচটা পকেটে নিয়েই মাঠ ছাড়েন নিয়াল ও ব্রায়েন ।

উল্লোসিত আইরিশ সমর্থকেরা
উল্লোসিত আইরিশ সমর্থকেরা

আগের দিন দক্ষিণ আফ্রিকাকে ভয়ই পাইয়ে দিয়েছিল জিম্বাবুয়ে । আর আজ আইরিশরা ম্যাচ জিতল ৪ উইকেট আর ২৫টি বল রেখেই । বিশ্বকাপটাকে ৫ ম্যাচ পেরিয়ে এসেই লাগছে আগের অন্যান্য ক্রিকেট বিশ্বকাপের চাইতে অনেক বেশী উন্মুক্ত ! অনেক বেশি রোমাঞ্চকর ! আর অনেক বেশি স্নায়ুক্ষয়ী !

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

12 − 4 =