অঁরির ছোঁয়ায় বদলে যাওয়া লুকাকু

অঁরির ছোঁয়ায় বদলে যাওয়া লুকাকু

এই বিশ্বকাপ শুরু আগেরই তো ঘটনা। অনেকেই বলা শুরু করলেন, বেলজিয়াম দলটা তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী খেলতে পারছেনা শুধুমাত্র তাদের মূল স্ট্রাইকার রোমেলু লুকাকু এর কারণে। ইডেন হ্যাজার্ড, কেভিন ডে ব্রুইনিয়া, ড্রিয়েস মার্টেন্স প্রমুখ ট্যাকটিক্যালি অধিক পোক্ত খেলোয়াড়দের তুলনায় লুকাকু যেন একটু নিষ্প্রভ। দলের কাউন্টার আক্রমণগুলোকে লুকাকু ঠিক ভালোমত শেষ করতে পারেন না, আক্রমণ নষ্ট করেন – আরো কত অভিযোগ! রোমেলু লুকাকু মানেই শক্তিসর্বস্ব একজন স্ট্রাইকার, আর কিছুই নয়। মুভমেন্ট বা অন্যান্য খেলোয়াড়দের সাথে রসায়নটা ঠিক জমাতে পারেন না অলসতার কারণে। লুকাকুর বিরুদ্ধে এরকম হাজারো দোষের ফিরিস্তিই শোনা গিয়েছিল বিশ্বকাপের আগে।

কিন্তু বিশ্বকাপের মত একটা টুর্নামেন্ট কত তাড়াতাড়িই না একজন খেলোয়াড়কে বদলে দেয়, তাই না? এই বিশ্বকাপে বেলজিয়ামের হয়ে যেভাবে খেলছেন লুকাকু, কে বলবে তাঁর খেলার স্টাইল নিয়ে এই বিশ্বকাপের আগেই কত শত কথা উঠেছিল? এই বিশ্বকাপে এই পর্যন্ত ৫ ম্যাচে চার গোল আর এক গোলসহায়তা করেছেন লুকাকু। গোল্ডেন বুট পাওয়ার দৌড়ে আছেন দ্বিতীয় স্থানে, সামনে শুধুই ইংলিশ স্ট্রাইকার হ্যারি কেইন। কিন্তু গোল করা নয়, বরং লুকাকুর উদ্যমী খেলার স্টাইলটাই এখন বিশ্বকাপের “টক অফ দ্য টাউন”!

লুকাকু এখন শুধুই ডিবক্সের মধ্যে বসে থাকা সুযোগসন্ধানী শক্তিসর্বস্ব অলস স্ট্রাইকার নন। জাপানের বিপক্ষে ম্যাচটাই দেখুন, যে ম্যাচের একদম শেষ মূহুর্তের গোলে ম্যাচ জিতে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে আসে বেলজিয়াম। গোলটা করেছিলেন নাসের চ্যাডলি, কিন্তু সে গোলটার পেছনে লুকাকুর স্বার্থহীন ‘ডামি’র অবদানই ছিল সবচেয়ে বেশি। শুধু এটাই নয়, দুর্দান্ত এই কাউন্টার আক্রমণটা যখনই শুরু হল, লুকাকু খুবই চতুরভাবে ডানদিক থেকে মাঝে চলে আসেন, সাথে জাপানের দুইজন খেলোয়াড়কে সরিয়ে নিজের কাছে নিয়ে আসেন, ব্যস্ত রাখেন। ফলে যেটা হয়, ডানদিকে থাকা থমাস মিউনিয়ের বেশ অনেকটুকু জায়গা পেয়ে যান। ফাঁকা জায়গায় থাকা এই মিউনিয়েরকেই পাস দেন কেভিন ডে ব্রুইনিয়া ক্রস করার জন্য, মিউনিয়ের লুকাকুকে উদ্দেশ্য করে ক্রস দেন ঠিকই, কিন্তু লুকাকু জানতেন দুই-তিনজন ডিফেন্ডার তাঁকে মার্ক করে আছে, সামনে আছে আগুয়ান গোলরক্ষক এইজি কাওয়াশিমা, এই অবস্থায় লুকাকু শট মারার চেষ্টা করলে ম্যাচের শেষ মূহুর্তে জীবনেও গোল করতে পারবেন না তিনি। তো তিনি কি করলেন? সুন্দরমত ঐ ক্রসে শট না করে দুই পায়ের ফাঁকের ভেতর দিয়ে বলটাকে চলে যেতে দিলেন, ফলে বলটা চলে গেল লুকাকুর পেছনে ফাঁকা অবস্থানে দাঁড়িয়ে থাকা উইঙ্গার নাসের চ্যাডলির দিকে। গোল করতে ভুল করেননি তিনি। যে স্ট্রাইকার দলগতভাবে এমন একটা আক্রমণের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন, তাঁকে কিভাবে শক্তিসর্বস্ব অলস স্ট্রাইকার বলবেন আপনি?

ব্রাজিলের বিপক্ষে ম্যাচটার কথাই ধরুন। এই ম্যাচে বেলজিয়াম কোচ রবার্টো মার্টিনেজ তার পছন্দের ৩-৪-৩ ফর্মেশন থেকে বেরিয়ে এসে ৪-৩-৩ ফর্মেশনে খেলান দলকে। আর এই পরিবর্তনের পেছনেও মার্টিনেজের মূল হাতিয়ার ছিলেন এই লুকাকু। লুকাকু সম্পর্কে জনমনে থাকা সেই শক্তিসর্বস্ব অলস টিপিক্যাল ডি-বক্সের স্ট্রাইকার এই ধারণাটাকে যেন চ্যালেঞ্জই জানালেন মার্টিনেজ। ৪-৩-৩ ফর্মেশনে প্রথমে দেখা গেল লুকাকু খেলবেন মাঝে, ডানে আর বাঁয়ে থাকবেন যথাক্রমে ডে ব্রুইনিয়া আর হ্যাজার্ড। কিন্তু ম্যাচ শুরু হবার সাথে সাথেই ব্রাজিল দলসহ সবাইকে চমকে দিয়ে লুকাকু খেলা শুরু করলে ডানদিকে! “রাইট উইঙ্গার” লুকাকুকে জায়গা করে দিয়ে মাঝে চলে আসলেন কেভিন ডে ব্রুইনিয়া, তিনি নিজে খেলা শুরু করলেন ফলস নাইন বা স্ট্রাইকার হিসেবে, এই কৌশলের সুফল বেলজিয়াম সরাসরি পেল দ্বিতীয় গোলের সময়ে, দ্বিতীয় গোলটাই করেন ডি ব্রুইনিয়া। সেই ম্যাচে গোল না করতে পারলেও লুকাকুর স্বার্থহীন খেলা নজর কাড়ে সবার। কে ভেবেছিল, লুকাকু ডানদিক থেকে সতীর্থদের সাথে দলগত খেলায় এত ভালো খেলতে পারেন? কিংবা অত ভালো ক্রস ফেলতে পারেন ডানদিক থেকে প্রতিপক্ষের ডি-বক্সে?

অঁরির ছোঁয়ায় বদলে যাওয়া লুকাকু

বদলে যাওয়া এই লুকাকুর পেছনে কার অবদান সবচেয়ে বেশী? কে লুকাকুর খেলার ধরণ এভাবে আমূল বদলে দিয়েছেন? আড়ালে থেকে এই কাজটা করছেন একজনই। তিনি বেলজিয়ামের সহকারী কোচ থিয়েরি অঁরি। হ্যাঁ, ফ্রান্সের কিংবদন্তী স্ট্রাইকার এখন কাজ করছেন রবার্তো মার্টিনেজের সহকারী হিসেবে। আর লুকাকু কে বানিয়েছেন নিজের ভাবশিষ্য। অঁরির কাছ থেকেই লুকাকু এখন শিখছেন প্রতিদিন, প্রতিনিয়ত। লুকাকুর সাথে প্রত্যেকদিন ফুটবলে বিভিন্ন খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে কথা বলেন অঁরি, তর্ক করেন। এটাও শোনা যায় প্রতিদিন অনুশীলনের সময় লুকাকুকে নিত্যনতুন চ্যালেঞ্জ দিতে ভালোবাসেন অঁরি, শুধু এটা দেখার জন্য তাঁর শিষ্য কতটুকু শিখলেন, তাঁর শিষ্যর মধ্যে জেতা ও শেখার আগ্রহ কতখানি। ওদিকে লুকাকুও সুযোগটা নিচ্ছেন দু’হাত ভরে। এককালে দিদিয়ের দ্রগবাকে আইডল মানা ও চেলসিতে দ্রগবার সতীর্থ হিসেবে থাকা “বেবি দ্রগবা” হিসেবে পরিচিত লুকাকু এখন ইংলিশ লিগের আরেক সেরা স্ট্রাইকার অঁরির কাছ থেকেই নিচ্ছেন বিশ্বসেরা স্ট্রাইকার হবার পাঠ!

গত রাতে ফ্রান্সের কাছে হেরে গিয়ে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিয়েছে লুকাকুর বেলজিয়াম। পরিবর্তিত এই লুকাকুকে নিজের ক্লাবে ফিরে পাওয়ার জন্য ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সমর্থকদের হাত এখন নিশপিশ করতেই পারে!

কমেন্টস

কমেন্টস

মন্তব্য করুন

4 + 11 =